অধুনা বিশ্বে নির্মাণযজ্ঞের সিংহভাগ কাজই হয় ভূ-পৃষ্ঠকে ঘিরে। সড়ক, রেললাইন, ভবন ও সব ধরনের অবকাঠামোর নির্মাণকাজ পরিচালিত হয় মাটিতেই। এক তলায় হোক বা এক শ তলা মাটিকে ভবনের পুরো ওজনটাই বহন করতে হয়। কিন্তু সব জায়গার মাটি এক রকম নয়। কোথাও পাথুরে, কোথাও বেলে, কোথাও জলযুক্ত আবার কোথাও মিশ্র। মাটির ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনা করেই অবকাঠামো নির্মাণ করা উচিত। কিন্তু মাটি যেমনই হোক না কেন প্রকারভেদে মাটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাপের বেশি ওজন বহন করতে পারে না। এ জন্য কাঠামো ডিজাইন করার আগে নির্মাণ স্থানের মাটির ভারবহন ক্ষমতা নির্ণয় করেই স্থাপনা তৈরি করতে হয়। নির্মাণ সাইটের মাটির ভারবাহী গুণাগুণ যদি কম থাকে তাহলে বিভিন্ন কারিগরি কৌশল অবলম্বন করে তা উপযুক্ত করতে হয়।
মাটির ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধির সাধারণত যত পদ্ধতি
গ্রাউটিং করে
আলগা গ্রাভেল এবং ছিদ্রযুক্ত পাথরের স্তরে সিমেন্ট গ্রাউট অধিকতর চাপে প্রবেশ করানো হয়। ফলে মাটির ছিদ্রপথ বন্ধ হয়ে যায় এবং মাটির ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সিমেন্ট গ্রাউট এর সুষম প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য মাটিতে গর্ত করে ছিদ্রযুক্ত পাইল প্রবেশ করিয়ে (১৬০kg/cm2) চাপে তরল সিমেন্টকে প্রবেশ করানো হয়।
ভিত্তির গভীরতা বাড়িয়ে
গ্রানুলার (Granular) বা দানাদার মাটিতে ভিত্তির গভীরতা বাড়িয়ে মাটির ভারবহন ক্ষমতা বাড়ানো যায়। মাটির যত গভীরে যাওয়া যাবে ততই ভারবহন ক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু খুব বেশি গভীর করাতেও রয়েছে কিছু অসুবিধা। কারণ, বুনিয়াদ যদি বেশি গভীর করা হয়, তবে গভীরতর বুনিয়াদের কাঠামোর নিজস্ব অতিরিক্ত ওজন এসে মাটিতে পড়বে।
রাসায়নিক ক্রিয়ার সাহায্যে
এই পদ্ধতিতে তরল সিমেন্টের পরিবর্তে তরল সিলিকেট অব সোডা এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ মাটির মধ্যে চাপের সাহায্যে প্রবেশ করানো হয়। ফলে মাটির কণাগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে শক্ত পাথরের মতো নিরেট হয় এবং ভারবহন ক্ষমতা বাড়ায়।
মাটিকে সীমাবদ্ধ করে
যেখানে আলগা গ্রানুলার (Granular) মাটির সরণের ফলে ভারবহন ক্ষমতা কমে যায়, সেখানে শিট পাইলের সাহায্যে মাটিকে নির্দিষ্ট এলাকায় ভিত্তির পরিসীমায় সীমাবদ্ধ করে ভারবাহী ক্ষমতা বাড়ানো যায়। এ পদ্ধতিকে cupping বলে। বেলেমাটিতে অগভীর ভিত্তির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর।
মাটির পানি নিষ্কাশন করে
যে মাটিতে জলীয় পদার্থের পরিমাণ বেশি, সে মাটিতে যখন কাঠামোর চাপ পড়ে তখন চাপের ফলে জলীয় অংশ সরে যায়। ফলে মাটির ভারবহন ক্ষমতা কমে। তাই সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থা মাটির ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। মাটিতে অতিরিক্ত পানির উপস্থিতি মাটির শিয়ারিং স্ট্রেন্থ কমিয়ে দেয়। পানি নিষ্কাশনের ফলে ভয়েড রেশিও হ্রাস পায়, ফলে মাটির ভারবহন ক্ষমতা বাড়ে। ভিত্তির খাদে ফুটিং বেইজের ওপর ড্রেন স্থাপন করে সাব-সয়েলের পানি নিষ্কাশন করা যায়।
মাটিকে ঘন সন্নিবিষ্ট করে
আলগা মাটি ঘন সন্নিবিষ্ট করা হলে মাটিতে ভয়েড হ্রাস পায় এবং ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মাটিকে যেভাবে কম্পাকশন করা হয়-
- স্যান্ড পাইল ব্যবহার করে: বেলে বা নরম মাটির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে ভারবহন ক্ষমতা বাড়ানো সুবিধাজনক। পাশাপাশি ফাঁপা পাইপ মাটিতে প্রবেশ করানো হয়। পরে এ পাইপকে পরপর উঠিয়ে সেই গর্তের মধ্যে বালু দিয়ে পূর্ণ করে র্যামিং করা হয়।
- মাটিকে প্লাবিত করে: আলগা বেলেমাটির ওপর দিয়ে পানি প্লাবিত করে মাটিকে কম্পাকশন করা যায়।
- মাটি আর্দ্র করে: ভিত্তি মাটিকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে হ্যান্ড র্যামার, যন্ত্রচালিত ফ্রগ র্যামার অথবা ভাইব্রেটরি রোলারের (Vibratory Roller) সাহায্যে কম্পাকশন করা যায়।
- ভাইব্রোফ্লোটেশন (Vibroflotation): ভাইব্রোফ্লোট (Vibroflot) নামক ভারী সিলিন্ডার মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়ে কম্পন সৃষ্টি করা হয়। একই সঙ্গে চাপে পানি সরবরাহ করে কম্পাকশন করা যায়। এ কাজটিকেই ভাইব্রোফ্লোটেশন বলে।
- রাবল কম্পাকশন: ৩০ সেমি থেকে ৪৫ সেমি পুরু উৎকৃষ্ট মানের রাবল ভিত্তি তলে ছড়িয়ে র্যামিং করে মাটির ভারবহন ক্ষমতা বাড়ানো যায়।
- কম্পন (Vibration): ৩ মিটার গভীরতা পর্যন্ত গ্রানুলার মাটির ওপরে কম্পন সৃষ্টিকারী ভারী রোলার এবং কম্পাকটরের সাহায্যে মাটিতে কম্পাকশন করা যায়।
- পূর্বে লোড প্রয়োগ: ভিত্তি নির্মাণের আগে লোড প্রয়োগ করে কাদা মাটিকে কম্পাকশন করা যায় সহজেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।