ভবনের ছত্রাক দূর করবেন যেভাবে

বর্ষাকাল, এ সময়ে বাড়ির দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে সাদাকালো ও সবুজাভ ছোপ দেখা যায়। বিশেষ করে পুরোনো ভবনের দেয়ালে। এটিই ছত্রাক বা ফাঙ্গাস (Damp/Mould)। স্থাপনার সৌন্দর্য ম্লান করতে এই অবাঞ্ছিত জৈববস্তুটি অনেকাংশেই দায়ী। ছত্রাক এক প্রকার জীবাণু। ছত্রাক দেয়ালের পলেস্তারা খসায়, নষ্ট করে দরজা-জানালার কাঠ, আসবাবপত্র, কাগজপত্র, কাপড়চোপড় প্রভৃতি। এটা যে শুধু ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করে তা কিন্তু নয়, বরং ক্ষতিকর মাইক্রোটক্সিন (একধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক) উৎপন্ন করে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া বদ্ধ পরিবেশে এটি দুর্গন্ধ ছড়ায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব স্থাপনা থেকে ছত্রাক দূর করা প্রয়োজন।

ছত্রাক জন্মে যেভাবে

সাধারণত ছত্রাক জন্মে ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে। বিশেষত বর্ষাকালে। কারণ, এ সময়ে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ থাকে বেশি। দেয়াল, ঘরের মেঝে, ছাদসহ ভবনের ভেতরে-বাইরে সবখানেই জন্মায় ছত্রাক। বৃষ্টি ছাড়াও বন্যা, দেয়ালের অভ্যন্তরীণ পাইপে ছিদ্র বা লিকেজ, ছাদে ফাটল, বদ্ধ পরিবেশসহ নানা কারণে দেখা দেয় এর প্রাদুর্ভাব। সাধারণত ভেজা দেয়ালে ধূলিকণা জমে সৃষ্টি করে ছত্রাকের। ভবনের যেসব স্থানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে না, সেসব স্থানে ঝুঁকি থাকে বেশি। স্বল্প পোড়ানো ইট ব্যবহার, জলমগ্ন স্থানে ভবন নির্মাণসহ নানা নির্মাণত্রুটিজনিত কারণও ছত্রাক জন্মানোর জন্য দায়ী।  

ভবনে ছত্রাক প্রতিরোধ ও প্রতিকার

ভবনে যেন ছত্রাক আক্রমণ না করে সে জন্য ভবন নির্মাণের সময়ই নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে কোনো না কোনোভাবে ছত্রাক বাসা বাঁধে। ছত্রাক স্থাপনার স্থায়িত্বে হুমকিস্বরূপ এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব তা দূরীকরণে সঠিক পদ্ধতির কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। আসুন জেনে নিই কিছু কৌশল-

  • প্রথমেই ভবনের আর্দ্রতার উৎস শনাক্ত করতে হবে। ভবনের আশপাশে জমে থাকা পানি নালা করে বের করে দিতে হবে।
  • ছাদে যেন বৃষ্টির পানি জমে না থাকে সে জন্য সঠিক ঢাল রাখা এবং পাইপের মাধ্যমে যেন দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • বৃষ্টির পানি যেন অনেকক্ষণ ধরে দেয়াল বেয়ে না চুইয়ে পড়ে সে জন্য সানশেড নির্মাণ করতে হবে।
  • ভবনের দেয়াল থেকে ধুলাবালু ও ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
  • ভবনের ভেতরে যেন পর্যাপ্ত সৌরালোক প্রবেশ করে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
  • ঘরগুলোতে যেন ভেন্টিলেশন বা বায়ু চলাচল ঠিকমতো হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ভবনের ভেতরের দেয়ালের পলেস্তারার (প্লাস্টার) ওপর মোম বা সিলিকেট দ্রবণ লাগানো এবং প্রক্রিয়াটি দুই-তিন বছর পরপর পুনরায়করণ।
  • দেয়ালের যেসব স্থানে ছত্রাক দেখা দেবে সেখানকার রং বা চুনের প্রলেপ ভালোভাবে সরিয়ে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর আক্রান্ত স্থানে ফাঙ্গিসাইড বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করে ভালোভাবে শুকিয়ে চুনকাম বা রং করে নিতে হবে।
  • ছত্রাকের পরিমাণ কম হলে গরম পানি অথবা তাতে ডিটারজেন্ট সলিউশন মিশিয়ে স্পঞ্জের সাহায্যে পরিষ্কার করতে হবে।
  • ড্রাই আইস ব্লাসটিং ও সোডা ব্লাসটিং পদ্ধতিতেও দেয়াল বা কাঠ থেকে ছত্রাক সরানো যায়।
  • দেয়ালে বিটুমিন শিট, প্লাস্টিক শিট, মেটাল শিট প্রভৃতি পানিনিরোধক আচ্ছাদন সংযোজনের মাধ্যমে ছত্রাক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
  • ঘরের মেঝে ও কার্পেটে ছত্রাক দেখা দিলে ভিনেগার ও গরম পানি মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • এ ছাড়া বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ সেবা প্রদান করে। প্রয়োজনে তাদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। 

সতর্কতা

ছত্রাক যেহেতু একধরনের জৈব জীবাণু এবং বিষক্রিয়ায় ক্ষতি হতে পারে, সে জন্য পরিষ্কারকালে মুখোশ, দাস্তানা ও নিরাপদ চশমা ব্যবহার করা উত্তম।

উপযুক্ত পরিবেশে ছত্রাক বেশ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। এ জন্য কোথাও ছত্রাক দেখা দিলেই তা দূর করতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তা না হলে ছত্রাক ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তখন রক্ষণাবেক্ষণ খরচও হবে বেশি। তাই অবহেলা নয়, ছত্রাক দেখা দিলেই তা দমন করাই শ্রেয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৬তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৬।

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top