চীনের সাংহাই শহরের হংছিয়াও ইন্টারন্যাশনাল সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টে সম্প্রতি একটি নতুন ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চ ক্যাম্পাস উন্মোচন করেছে ব্রিটিশ স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান BDP। চীনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি Chia Tai Tianqing Pharmaceutical Group (CTTQ)-এর জন্য নির্মিত এই ১,৮৬,০০০ বর্গমিটারের গবেষণা ও উন্নয়ন সদর দপ্তরটির ডিজাইন-ধারণা এসেছে একেবারেই জীববিজ্ঞানের এক মৌলিক প্রক্রিয়া ‘কোষ বিভাজন’ থেকে। চারটি ভবন নিয়ে গঠিত এই ক্যাম্পাসটি শুধু একটি গবেষণাগারের পাশাপাশি শহর ও মানুষের সাথে সংযুক্ত থাকার এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

কোষ বিভাজনের ধারণা থেকে ডিজাইন
BDP-র পুরো ডিজাইন-কনসেপ্টটাই দাঁড়িয়ে আছে কোষের গঠন ও বিভাজন প্রক্রিয়ার ওপর। সাইটে দুই জোড়া পরস্পর-সংযুক্ত ভবন রয়েছে, যেগুলো কোষ বিভাজনের মুহূর্তকে অনুকরণ করে ডিজাইন করা হয়েছে। প্রতিটি জোড়া কাচে মোড়ানো ব্রিজের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত। যেন দুটো কোষ ঠিক বিভক্ত হওয়ার মুহূর্তে আটকে আছে।

গবেষণা ভবনের কাঠামো ও নমনীয়তা
দুটি গবেষণা ভবনের কোর (core) ভবনের দুই প্রান্তে ভাগ করে রাখা হয়েছে। এই বিন্যাসের ফলে মাঝখানে বড় ও নমনীয় ফ্লোর প্লেট তৈরি হয়েছে, যা পরিবর্তনশীল ল্যাবরেটরি প্রয়োজন অনুযায়ী সহজেই খাপ খাওয়ানো যায়। একটি গবেষণা ভবন যুক্ত হয়েছে কর্মীদের আবাসনের জন্য একটি ছোট ব্লকের সাথে, আর অন্যটি যুক্ত হয়েছে একটি উঁচু প্রশাসনিক ভবনের সাথে।
ক্যাম্পাসের কেন্দ্রবিন্দু প্রশাসনিক ভবন
সাইটের সবচেয়ে উঁচু ভবন এই প্রশাসনিক ব্লক, যা পুরো হেডকোয়ার্টারের একটি ফোকাল পয়েন্ট তৈরির লক্ষ্যে ডিজাইন করা হয়েছে। এই ভবনের সাথেই যুক্ত রয়েছে একটি কনফারেন্স সেন্টার, যা সংস্থার বড় পরিসরের বৈঠক ও আয়োজনের জন্য ব্যবহৃত হবে।

সংযোগের কেন্দ্রীয় সূত্র স্কাই ব্রিজ
চারটি ভবনকেই একসাথে সংযুক্ত করেছে প্রথম তলার একটি উঁচু স্কাই ব্রিজ, যা পুরো সাইট জুড়ে বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে চলে গেছে। এই ব্রিজ শুধু চলাচলের পথ নয়, বরং মানুষের মিলিত হওয়া ও মতবিনিময়ের জন্য একাধিক ইনডোর ও আউটডোর স্পেসও তৈরি করে দিয়েছে।
জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কেন্দ্রীয় পার্ক
চারটি ভবন মিলে ঘিরে রেখেছে একটি কেন্দ্রীয় পার্ক, যা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। BDP-র পরিচালক তিয়ানই গু (Tianyi Gu) বলেন, “এটি এমন একটি জায়গা যেখানে গবেষণা চলে এমন এক ক্যাম্পাসের মধ্যে, যা শহর বা এর ব্যবহারকারীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে না। কেন্দ্রীয় হৃদয় সাইটটিকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, আর ভবনগুলো এমনভাবে পরিকল্পিত যাতে গবেষণা, সহযোগিতা এবং দৈনন্দিন জীবন একসাথে কাজ করতে পারে।”

কর্মীদের সুস্থতা ও কর্ম-জীবনের ভারসাম্য
ভবনগুলোর নিচের তলাগুলোতে রাখা হয়েছে ক্যাফে, ক্যান্টিন ও জিম। যা কর্মীদের সুস্থতা এবং কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। BDP-র মতে, দিনের আলো ও তাজা বাতাসে প্রবেশাধিকার, মিলিত হওয়া-খাওয়া-ব্যায়ামের জায়গা এবং ল্যাব থেকে সরে আসার স্পেস এসব বিষয়ই কর্মীদের কর্মদিবসে বড় পার্থক্য তৈরি করে বলে তারা মনে করেন।
চারটি ব্লকের বিন্যাস ও স্কেল ভাঙা
BDP জানিয়েছে, চারটি ব্লকের বিন্যাসটি এমনভাবে করা হয়েছে যাতে বিশাল ক্যাম্পাসের স্কেল ভেঙে একাধিক ছোট ছোট গন্তব্যে রূপান্তরিত হয়। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো, বিশাল একটি কমপ্লেক্সকেও মানুষের কাছে ঘনিষ্ঠ ও সহজবোধ্য করে তোলা।

প্যাসিভ ডিজাইন কৌশল ও পরিবেশগত দিক
পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে প্যাসিভ ডিজাইন কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক ভেন্টিলেশন, ফ্যাসাদে সোলার শেডিং, এবং ভবনের বিভিন্ন দিক ও কার্যকারিতা অনুযায়ী কাস্টমাইজড ফ্যাসাদ ডিজাইন। এনার্জি পারফরম্যান্স উন্নত করতে ব্যবহার করা হয়েছে কম এনার্জি ধারণ করে এমন গ্লাস, আর ছাদে বসানো হয়েছে বিশাল একটি ফটোভোল্টাইক প্যানেলের সারি, যা একইসাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং ক্যাম্পাসের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরে এক অনন্য প্যাটার্নও তৈরি করে।
তিয়ানই-এর মন্তব্যে ডিজাইন-দর্শন
তিয়ানই গু আরও বলেন, “CTTQ-র জন্য এটি এমন একটি রিসার্চ ক্যাম্পাস, যা পরিবর্তনের জন্য নির্মিত, কিন্তু একইসাথে এটি মানুষের জন্যও একটি জায়গা, একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এবং সাংহাইয়ের সাথে একটি চিহ্নিতযোগ্য সংযোগসহ।”

BDP-র এই CTTQ রিসার্চ ক্যাম্পাস একটি চমৎকার উদাহরণ, কীভাবে জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা কোষ বিভাজন— স্থাপত্যের ভাষায় রূপান্তরিত হতে পারে। শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়, বরং কার্যকারিতা, নমনীয়তা এবং মানুষের সুস্থতার কথা মাথায় রেখেই পুরো ডিজাইনটি সাজানো হয়েছে।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন

















