সাধারণত পাবলিক আর্ট বলতে আমরা বুঝি রাস্তার দেয়ালে আঁকা গ্র্যাফিতি, শহরের কোনো চত্বরে বসানো ভাস্কর্য কিংবা কোনো ভবনের সম্মুখভাগে আঁকা বিশাল ম্যুরাল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পিটসবার্গ শহরে ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিল্পী শর্মিষ্ঠা রায় এবার সে শিল্প নামিয়ে এনেছেন একেবারে মাটিতে—খেলার মাঠে।
শিল্পী শর্মিষ্ঠা রায় সম্প্রতি পিটসবার্গের আর্টস ল্যান্ডিং এলাকায় তিনটি পিকলবল কোর্টকে রূপান্তরিত করেছেন এক বর্ণিল, জ্যামিতিক চিত্রকর্মে। শিরোনাম দেওয়া হয়েছে “জিওমেট্রি অব প্লে” (Geometry of Play)। এই প্রকল্পটিকে বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম শিল্পী-নকশাকৃত পিকলবল কোর্ট। খেলা আর শিল্পের এই মেলবন্ধনে দর্শক শুধু দাঁড়িয়ে ছবি দেখেন না, বরং সরাসরি সেই ছবির ভেতরেই খেলতে নামেন।

প্রকল্প ও কমিশনের প্রেক্ষাপট
পিটসবার্গ কালচারাল ট্রাস্টের (Pittsburgh Cultural Trust) উদ্যোগে গড়ে ওঠা আর্টস ল্যান্ডিং একটি নতুন নাগরিক সমাবেশস্থল। এই এলাকার জন্য পরিচালিত উদ্বোধনী পাবলিক আর্ট কর্মসূচির অধীনে মোট ১০ জন শিল্পীর ২৩টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে, যার একটি শর্মিষ্ঠা রায়ের এই কাজ।
কিউরেটর আনাস্তাসিয়া জেমসের (Anastasia James) তত্ত্বাবধানে এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটি কোর্টের আয়তন ২২ বাই ৪০ ফুট, আর সেই মাপেই সরাসরি খেলার মেঝের উপর আঁকা হয়েছে এই ম্যুরাল।

শিল্পীর পরিচয় ও প্রেরণা
শর্মিষ্ঠা রায়ের জন্ম কলকাতায়, বেড়ে ওঠা কুয়েতে, পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছেন। তাঁর কাজে বরাবরই দেখা যায় উজ্জ্বল রঙের জ্যামিতিক বিমূর্ততা, যার শিকড় দক্ষিণ এশীয় দৃশ্যকলার ঐতিহ্যে প্রোথিত—বিশেষ করে ক্যালাইডোস্কোপিক মন্ডলা এবং স্থাপত্যিক অলংকরণের ধরন থেকে অনুপ্রাণিত।
এই দৃশ্যভাষার সঙ্গে মিশে আছে কুয়ার পরিচয়, অভিবাসন এবং বহু সংস্কৃতির উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের ভাবনা। “জিওমেট্রি অব প্লে”-এর নকশায় তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন প্রাচীন বোর্ড গেমের দৃশ্যযুক্তি থেকে, বিশেষত ভারতীয় খেলা পাচিসি থেকে, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে পার্চিসি নামে পরিচিতি পায়।

নকশার বিন্যাস: বৃত্ত, ত্রিভুজ ও পথের জাল
কোর্টের সীমারেখাকেই ভিত্তি ধরে গড়ে তোলা হয়েছে এই বিমূর্ত রচনা। একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৃত্ত, ত্রিভুজ, গ্রিড এবং বিকিরণধর্মী পথরেখা কোর্ট দুটির উপর ঘন জ্যামিতিক বিন্যাসে ছড়িয়ে আছে। লক্ষ্যবস্তুর মতো গোলক, হীরকাকৃতি ও তারার আকৃতিও যুক্ত হয়েছে এই আয়তাকার তলে।
পাশাপাশি দুটি কোর্ট মিলে তৈরি করেছে প্রায়-বর্গাকার একটি কাঠামো, যার কেন্দ্রে কম্পাসের মতো একটি বৃত্তাকার নকশা দেখা যায়। যেটি দেখতে অনেকটা একটি চোখের মতোও মনে হতে পারে।
নকশায় ব্যবহৃত হয়েছে রামধনুর সাত রঙের (ROYGBIV) পুরো বর্ণালী, যা অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যগত সম্পর্কও বদলে দেয়।

খেলা ও শিল্পের মিথস্ক্রিয়া
এই ম্যুরালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি স্থির কোনো চিত্রকর্ম নয়। খেলোয়াড়দের চলাফেরার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। ফলে প্রতিটি খেলা হয়ে ওঠে একধরনের জীবন্ত পারফরম্যান্স। পিকলবল একটি সামাজিক ও সমবেত চরিত্রের খেলা হিসেবে পরিচিত—নিঃসঙ্গ মনোযোগের বদলে এখানে থাকে হইচই আর আড্ডার আবহ।
শর্মিষ্ঠা রায়ের এই কাজ সেই সামাজিক শক্তিকে দমিয়ে না রেখে বরং আরও উসকে দিয়েছে। ওপর থেকে দেখলে নকশাটি অনেকটা স্থাপত্যের মতো, কখনো মনে হয় এক টুকরো কুইল্ট বা মন্ডলা—কাছ থেকে দেখলে যেন গ্যালারিতে টাঙানোর মতো একটি চিত্রকর্ম।
উদ্বোধন ও উৎসব-প্রেক্ষাপট
পিটসবার্গের জনপ্রিয় পিকলবল উৎসব চলাকালীন “পিকলসবার্গ” কোর্টগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা সরাসরি এই রঙিন কোর্টে পিকলবল খেলার সুযোগ পান। উৎসব শেষেও কোর্টগুলো সাধারণ মানুষের নিয়মিত ব্যবহারের জন্য খোলা রাখা হয়েছে, অর্থাৎ এটি নিছক প্রদর্শনী নয়—দৈনন্দিন কমিউনিটি জীবনের একটি সক্রিয় অংশ।

“জিওমেট্রি অব প্লে” দেখিয়ে দেয়, পাবলিক আর্ট আর অ্যাথলেটিক অবকাঠামো—এই দুইয়ের মধ্যে বিভাজনরেখা ক্রমেই মুছে যাচ্ছে। যেখানে খেলার মাঠকে সাধারণত শুধু নিয়ম মেনে চলা এক কার্যকরী পরিসর হিসেবে দেখা হয়, সেখানে শর্মিষ্ঠা রায় প্রমাণ করেছেন যে বিনোদন আর সংস্কৃতি একই সঙ্গে একই স্থানে সহাবস্থান করতে পারে।
তথ্যসূত্র: ডিজাইনবুম


















