স্থাপত্যের ইতিহাসে পিরামিড হলো শক্তি, স্থায়িত্ব এবং সভ্যতার প্রতীক। হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপত্যরূপ সাধারণত মরুভূমি, সমাধিক্ষেত্র কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যদি একটি পিরামিডকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে একটি সমসাময়িক জাদুঘরের অভ্যন্তরে স্থাপন করা হয়, তাহলে কি তার অর্থ বদলে যায়?
চেক শিল্পী ম্যাগডালেনা জেটেলোভা তাঁর পিরামিডের গৃহায়ন (Domestication of Pyramids) প্রকল্পে ঠিক এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছেন। বৃহৎ আকারের এই ইনস্টলেশন স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং প্রদর্শনী-পরিসরের সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। এখানে পিরামিড কেবল একটি আকার নয়; বরং এটি মানুষের উপলব্ধি, স্মৃতি এবং স্থানবোধ নিয়ে নির্মিত একটি ধারণাগত অভিজ্ঞতা।

শিল্পী ও তাঁর কাজের পরিসর
ম্যাগডালেনা জেটেলোভা সমসাময়িক ইউরোপীয় ইনস্টলেশন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট স্থানের বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে বৃহৎ পরিসরের ইনস্টলেশনের নির্মাণ করা। তিনি আলো, ভর, উপকরণ এবং স্থাপত্যকে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যা কেবল একটি শিল্পকর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দর্শনার্থীরা সেই স্থানের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্কও তৈরি করেন।
পিরামিডের গৃহায়ন তাঁর এই শিল্পচর্চারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

পিরামিডকে নতুন প্রেক্ষাপটে দেখা
এই প্রকল্পে জেটেলোভা একটি পূর্ণাঙ্গ পিরামিড নির্মাণ করেননি। বরং তিনি এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করেছেন, যার কেবল একটি অংশ দর্শকের সামনে দৃশ্যমান। অবশিষ্ট অংশ ভবনের দেয়াল ও স্থাপত্যের ভেতরে যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।
ফলে দর্শক বাস্তবে যতটা দেখেন, তার চেয়ে অনেক বেশি কল্পনা করেন। পিরামিডের অনুপস্থিত অংশটি দর্শকের মানসচক্ষে সম্পূর্ণতা লাভ করে। এই কৌশলই প্রকল্পটির মূল ধারণাগত শক্তি।

জাদুঘর ও ইনস্টলেশনের সংলাপ
পিরামিডের গৃহায়ন বিভিন্ন সময়ে ইউরোপের একাধিক জাদুঘর ও প্রদর্শনীস্থলে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রতিটি স্থানে ইনস্টলেশনটি ভবনের বিদ্যমান স্থাপত্যের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার Museum of Applied Arts (MAK)-এ প্রদর্শিত সংস্করণে দেখা যায়, পিরামিডের ঢালু তল ভবনের অভ্যন্তরীণ স্থানের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে দর্শকের কাছে ভবন ও ইনস্টলেশনের সীমানা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। মনে হয়, পিরামিডটি যেন ভবনের ভেতর দিয়ে অদৃশ্যভাবে এগিয়ে গেছে।

উপকরণ ও উপস্থিতির ভাষা
ইনস্টলেশনটির পৃষ্ঠ আগ্নেয় ছাই দিয়ে আবৃত। যা এর রঙ ও টেক্সচারে এক ধরনের আদিম ও ভূতাত্ত্বিক অনুভূতি তৈরি করে। এই উপাদান পিরামিডের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক প্রতীকী অর্থকে আরও জোরালো করে।
তবে কাজটির শক্তি উপকরণে নয়, এর উপস্থিতিতে। বিশাল আকার, অসম্পূর্ণ দৃশ্য এবং স্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক দর্শকের মধ্যে বিস্ময় ও কৌতূহল সৃষ্টি করে।
‘গৃহায়ন’ ধারণার তাৎপর্য
প্রকল্পটির শিরোনামে ব্যবহৃত গৃহায়ন (Domestication) শব্দটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ অর্থে এর অর্থ গৃহপালিত বা গৃহস্থালি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। জেটেলোভা এই ধারণাকে ব্যবহার করেছেন সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে।
পিরামিড, যা মূলত উন্মুক্ত ভূদৃশ্যের একটি স্থাপত্যরূপ, তাকে তিনি জাদুঘরের নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরে নিয়ে এসেছেন। ফলে দর্শক একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে তার স্বাভাবিক প্রেক্ষাপটের বাইরে নতুন অর্থে দেখতে বাধ্য হন। এই স্থানান্তরই প্রকল্পটির ধারণাগত ভিত্তি।

স্থাপত্যের দৃষ্টিতে প্রকল্পটির গুরুত্ব
স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে পিরামিডের গৃহায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ভবনকে যেমন প্রদর্শনীর পাত্র হিসেবে ব্যবহার করে তেমনি ভবনকেই শিল্পকর্মের সক্রিয় অংশেও পরিণত করে।
এখানে দেয়াল, ছাদ, আলো, চলাচলের পথ এবং দর্শকের অবস্থান সবকিছুই ইনস্টলেশনের অর্থ নির্মাণে ভূমিকা রাখে। ফলে কাজটি স্থাপত্য ও ইনস্টলেশন শিল্পের মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ম্যাগডালেনা জেটেলোভা একটি প্রাচীন স্থাপত্যরূপকে সমসাময়িক প্রদর্শনী-পরিসরে এনে দর্শকের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে ধরেছেন, কোনো স্থাপত্য কি তার প্রেক্ষাপট বদলালেও একই অর্থ বহন করে? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর তিনি দেন না। বরং দর্শককেই নিজের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার মাধ্যমে সেই উত্তর খুঁজে নিতে আহ্বান জানান। আর এখানেই Domestication of Pyramids একটি সাধারণ ইনস্টলেশন থেকে স্থাপত্য-ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

শিল্পীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ম্যাগডালেনা জেটেলোভা (৪ জুন ১৯৪৬)একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চেক ইনস্টলেশন শিল্পী, ভাস্কর এবং ল্যান্ড আর্ট শিল্পী। তিনি প্রাগের Academy of Fine Arts (AVU)-এ ভাস্কর্য বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ইতালির Accademia di Belle Arti di Brera-তে অধ্যয়ন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি পশ্চিম জার্মানিতে চলে যান এবং পরবর্তীকালে জার্মানির বিভিন্ন শিল্পবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।
তাঁর শিল্পচর্চার মূল ক্ষেত্র বৃহৎ আকারের সাইট-স্পেসিফিক ইনস্টলেশন, ল্যান্ড আর্ট, আলোভিত্তিক শিল্প এবং স্থাপত্য-নির্ভর ধারণাগত কাজ। Domestication of Pyramids, Place (The Giant’s Chair), Atlantic Wall এবং Iceland Project তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাঁর কাজে মানুষ, স্থাপত্য, ভূদৃশ্য এবং স্থানগত অভিজ্ঞতার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তথ্যসূত্র
পাব্লিক ডেলিভারি, প্রকাশকাল: ১১ জানুয়ারি ২০১২
























