যানজট এড়াবে ট্রানজিট এলিভেটেড বাস

নিত্যদিনকার যানজট আর কত ভালো লাগে বলুন! কোনো উপায়ই কি নেই এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার? রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের ঐকান্তিক এই ভাবনা সহজেই আঁচ করা যায়। নগরজীবনের এই সমস্যাটি শুধু ঢাকাবাসীর জন্যই নয়, বরং এ এক বৈশ্বিক সমস্যা অনেক নগরেই। সম্প্রতি বিশে^র অন্যতম সামরিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন। অভিনব আর উন্নত যত প্রযুক্তিনির্ভর এই দেশটিতে অত্যাধুনিক সব গণপরিবহন থাকা সত্ত্বেও যানজট যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না। প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশটির যন্ত্র প্রকৌশলীরা কুখ্যাত যানজট সমস্যার সমাধানে উদ্ভাবন করেছে অভিনব এক বাস, যা চলবে সড়কে চলাচলরত অন্যান্য গাড়ির ওপর দিয়ে। সে আবার কেমন গাড়ি; অলীক কল্পনা নয় তো! খটকাটা নিশ্চয় থেকেই যাচ্ছে। না, আপনি ঠিকই শুনেছেন। বিশেষ এই বাসের নাম রাখা হয়েছে ‘ট্রানজিট এলিভেটেড বাস’, সংক্ষেপে যা টিইবি। ল্যান্ড এয়ার বাস অথবা টানেল বাস নামেও অভিহিত করা হচ্ছে বিশেষ এ বাসটিকে।

নতুন এই বাসের ধারণা এসেছে দেশটির শেনজেন হাশি ফিউচার ইকুইপমেন্ট কোম্পানির হাত ধরে। এই প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী সং ইউঝাও। ২০১০ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রদর্শনী অনুষ্ঠান বেইজিং ইন্টারন্যাশনাল হাই-টেক এক্সপোতে এই বাসের ধারণা উন্মোচন করা হয়। একই প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের ২০১৬ সালের আসরে এর একটি কার্যকরী মডেল উপস্থাপন করা হয়। চীনের হেবেই প্রদেশের কিয়ংডাও শহরে ৩০০ মিটার লম্বা একটি ট্র্যাকে এই ট্রানজিট এলিভেটেড বাসের সফল পরীক্ষা চালানো হয়। সে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কিয়ংডাও শহর ছাড়াও নানিয়াং, শেনইয়াং, তিয়ানজিন এবং ঝাউকো শহর কর্তৃপক্ষও এউ বাস-ব্যবস্থা প্রবর্তনে সম্মত হয়। শুধু তাই নয়, বিশে^ও তৈরি হয় প্রযুক্তিটির আবেদন। ব্রাজিলের মানাউস শহর কর্তৃপক্ষও ইতিমধ্যে এই বাস সিস্টেম চালু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

পরিকল্পনাটি যেভাবে এল

প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি অত্যাধুনিক এক অভিনব ধারণা বলে মনে হলেও ১৯৬৯ সালে দুজন আমেরিকান স্থপতি ক্রেইগ হডগেট্স ও লেজার ওয়াকার গণপরিবহনের এই ধারণাটির প্রবর্তন করেন, যার নাম করা হয় ‘বস-ওয়াশ ল্যান্ডলাইনার’. পরে অন্য একটি ডিজাইন প্রণয়ন করে শেনজেন হাশি ফিউচার পার্কিং ইকুইপমেন্ট কোম্পানি’র হাত ধরে, যা ওই সময়ে থ্রিডি এক্সপ্রেস বাস নামে অভিহিত করা হয়।

বিবিসি

যেভাবে চলবে বাসগুলো

ট্রানজিট এলিভেটেড বাসটি দেখতে অনেকটাই সাবওয়ের মতো। এই চলন্ত বাসের তলা দিয়ে অনায়াসে গাড়ি যেতে পারবে। কিন্তু রাস্তাজুড়ে চললেও অন্যান্য যান চলাচলে বাধা তৈরি করবে না। বাসের তলা থেকে রাস্তার ব্যবধান থাকবে দুই মিটার। অর্থাৎ এটা শুধু কার লেন দিয়েই চলতে পারবে বাসটি। রাস্তার দুই প্রান্তে বসানো ট্রাম লাইনের মতো ট্র্যাক দিয়ে চলবে ঢাউস এই বাসটি। প্রচলিত রাস্তার ওপর রেললাইনের মতো লাইন বসিয়ে এর ট্র্যাক তৈরি করা হয়। টিইবি-এর মধ্যে সাবওয়ের সব ফাংশনই রাখা হয়েছে। রয়েছে লাইট সিস্টেম, ক্যামেরা ও অন্য গাড়ির দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিশেষ হর্ন। লেন পরিবর্তন ও টার্ন নেওয়ার সময় এই বাস অন্য যানবাহনকে সিগনাল বা সংকেত দেবে।

ট্রানজিট এলিভেটেড বাসের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ ফুট আর প্রস্থ ২৫ ফুট। বাসটি চলবে বিদ্যুতে। সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। এই বাসের যাত্রীধারণক্ষমতা প্রচলিত বাসগুলোর চেয়ে বেশি। ৩০০ জন পর্যন্ত যাত্রী বহন করতে পারবে বাসটি। তবে চারটি বাস একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে চালানো সম্ভব হবে, তখন যাত্রী ধরবে ১ হাজার ২০০ জন। এলিভেটেড বাসটি সাবওয়ের বা পাতাল রেলের মতো দেখতে হলেও সাবওয়ে নির্মাণের থেকে এর খরচ হবে অনেক কম, মাত্র এক-পঞ্চমাংশ।

বাসটির বহুমাত্রিক সুবিধা

  • বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তি দ্বারা চালিত বিধায় জ্বালানি খরচ হয় না
  • দূষণমুক্ত যানবাহন
  • ট্রাফিক জ্যামে ঝামেলামুক্ত
  • দুর্ঘটনার আশঙ্কা কম
  • শব্দদূষণ সৃষ্টি করে না
  • পার্কিংয়ের জন্য জায়গা কম লাগে
  • বাসে ব্যবস্থা রাখা হয় ইমারজেন্সি ব্রেকিং সিস্টেম, যা দুর্ঘটনা বা জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
  • এই বাসের ট্র্যাক নির্মাণ খরচ মেট্রোরেলের চেয়ে অনেক কম।

আছে সমালোচনাও

২০১০ সালে যখন এই বাসের ধারণাটি উন্মোচন করা হয় তখন সমালোচকেরা বাসটির সম্ভাবনা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাঁদের মতে, এই বাস অন্য গাড়িগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা বজায় রেখে চলতে পারবে না, বিশেষত যখন গাড়ির চালকেরা লেন পরিবর্তন করতে চাইবে। তা ছাড়া অনেক পুরোনো শহরে এখনো লেন-ব্যবস্থা তেমন চালু হয়নি, সেখানে এই যানটি চলার উপায় নিয়েও কর্তৃপক্ষ সঠিক ধারণা দেয়নি। তা ছাড়া এই বাসে যাত্রী ওঠা-নামার জন্য স্টেশন তৈরিতে অনেক জায়গা প্রয়োজন হবে, যা নগরের প্রধান সড়কগুলোর জন্য তেমন উপযোগী নয়। তা ছাড়া কর্নার, ফুটওভারব্রিজগুলোর কীভাবে মোকাবিলা করবে।

বিবিসি

এসব নানা সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে আজও সাফল্যের মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। তবে বাসটি চালুর আশ^াস দিয়ে যখন শেনজেন হাশি ফিউচার ইকুইপমেন্ট কোম্পানি ইন্টারনেটে একটি ভিডিও ছাড়ে, তখন তা ব্যাপক উন্মাদনার জন্ম দেয় দেশটিতে। বিশ্বজুড়েও তৈরি হয় বিস্ময়। কোম্পানিটি এই প্রকল্পের শেয়ার বিক্রিরও ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার পর দেশটির অনেকেই শেয়ার কেনে। কিন্তু ২০১৭ সালের জুলাই মাসের পর টিআইবি ডেভেলপারের ভূমি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা বাড়াতে রাজি হয় কর্তৃপক্ষ। ফলে এই বাস ট্যাকটি কর্তৃপক্ষ উঠিয়ে নিতে বাধ্য নয়। বিনিয়োগকারীরা যখন বুঝতে পারে এই প্রকল্পটি আলোর মুখ খুব শিগগিরই দেখছে না, তখন তাঁরা নগর থানায় অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তদন্ত করে অবৈধভাবে অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে তহবিল গঠনের দায়ে দায়ী প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে। ফলে অভিনব এই গণপরিবহনের ভবিষ্যৎ গন্তব্য হয় পরীক্ষাগারে, আরও কার্যকরীভাবে বাসটি উপস্থাপনের জন্য। এখন অপেক্ষা শুধু সময়ের…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১০০তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৮।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top