পৃথিবীতে খুব কম শিল্পকর্ম রয়েছে, যেখানে রং কিংবা আলোর ব্যবহার নেই। শিল্পীর কল্পনা নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে তাঁরা এমন কিছু মাধ্যম ও উপকরণ ব্যবহার করেছেন, যেগুলো এক কথায় তাক লাগানোর মতো। চিত্রকলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রের প্রচলন কয়েক হাজার বছর আগে। সে সময় পাহাড়ের দেয়াল বা এ ধরনের কোনো স্থানকে ব্যবহার করা হতো আঁকাআঁকির ক্ষেত্র হিসেবে। এরপর সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে দেয়ালচিত্রের ইতিহাস, যা এখন চলে এসেছে আমাদের বেডরুমে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার বা স্থপতিরা শিল্পকলার বিভিন্ন অনুষঙ্গকে কার্যকরভাবে ব্যবহারে শুরু করেন তাঁদের ডিজাইনের কাজে। ফলে শিল্পকলা সীমাবদ্ধ থাকেনি কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা গোষ্ঠীর মধ্যে। মানুষের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নিত্যনতুন উপাদান আবিষ্কার তৈরি করছে শিল্পের নতুন নতুন ধারা। আর এ রকম নতুন এক ধারা ‘গ্লোয়িং ম্যুরাল’।
গ্লোয়িং ম্যুরাল একেবারেই নতুন কোনো মাধ্যম নয়। যখন থেকে অন্ধকারেও দেখা যায় এ রকম রং আবিষ্কৃত হলো তখন থেকেই শুরু শিল্পের নতুন এ ধারার। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিক পর্যন্ত শুধু সবুজ ছাড়া আর কোনো গ্লোয়িং পেইন্ট পাওয়া যেতো না এবং বর্তমানে যে রং ব্যবহার করা হয় তার তুলনায় এ রং ছিল খুবই নিম্নমানের। তাই বলে তখন শিল্প চর্চা যে থেমে ছিল তা কিন্তু নয়। তখনো শিল্পীরা তাঁদের মতো করে ঘরের ভেতর বিশেষত ছাদে তাঁদের তুলির কাজ ফুটিয়ে তুলতেন। তবে একে সাধারণের কাছে পরিচিত বা জনপ্রিয় করে তোলেন ইউরোপিয়ান চিত্রকর বোগি ফাবিয়ান। বলা যেতে পারে বোগিই ইন্টেরিয়রের সঙ্গে প্রথম এই আর্টের সার্থক সমন্বয় ঘটান। একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে ঢুকে যদি সুন্দর, স্নিগ্ধ ও স্বপ্নীল আলো-আঁধারির খেলা দেখতে পাওয়া যায় তবে তা অবশ্যই যে কাউকে মুগ্ধ করবে। তাঁর দেয়ালচিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকৃতিকে ঘরে আনা। ঘরের দেয়াল আর মেঝেকে রং দিয়ে এমনভাবে রাঙানো হয় যেন একটা স্বপ্নীল আবহ তৈরি হয়, যেন মনে হয় পূর্ণিমার রাতের কোনো একটা ঝরনা বা জলপ্রপাত কিংবা তারা ঝলমলে আকাশ, যা সৌরজগতের অংশবিশেষ।
গ্লোয়িং ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্রের মূল উপাদান হলো ‘গ্লো ইন ডার্ক পেইন্ট’। শুরুর দিকে এ ধরনের পেইন্টগুলোর বড় একটা সমস্যা ছিল, এসব পেইন্ট ছিল উদ্বায়ী জৈব যৌগসমৃদ্ধ। এ কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও ছিল মারাত্মক। তা ছাড়া জিংক সালফাইড দিয়ে তৈরি এসব পেইন্ট তুলনামূলকভাবে ছিল কম উজ্জ্বল। কিন্তু বর্তমানে স্ট্রনটিয়াম অ্যালুমিনেট ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই বললেই চলে। এসব পেইন্টের আরেকটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো, দিনের আলোয় অর্থাৎ সাদা লাইটে সাদা কিংবা হালকা ঘিয়ে রঙের দেখায়। কিন্তু অন্ধকার বা অতি বেগুনি রশ্মিতে এসব পেইন্ট জ্বলজ্বল করে। আর এর সঙ্গে যদি কোনো দক্ষ শিল্পীর হাতের ছোঁয়া লাগে, তবে তৈরি হয় সুন্দর এক শিল্পকর্ম।
চিত্রকর বোগি ফাবিয়ান ‘গ্লো ইন ডার্ক পেইন্ট’-এর এই বৈশিষ্ট্যকেই কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর শিল্পকর্মে। দিনের আলোয় তাঁর চিত্রকর্ম একটা সাদামাটা নান্দনিকতা তৈরি করে কিন্তু রাতের আঁধারে তৈরি হয় নৈসর্গিক দৃশ্য। বোগি তাঁর নিজস্ব ওয়েবসাইটে জানান, ‘আমার লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটা জায়গা বা ঘর তৈরি করা, যা ব্যবহারকারীকে দেবে স্বাতন্ত্র্য। এখানে তিনি পাবেন প্রশান্তির অনন্য এক অনুভূতি।’ তাঁর কিছু কিছু ম্যুরাল এমন যে সাধারণ আলোতে দেখলে মনে হয় একটা হোয়াইট ওয়াশ করা দেয়াল বা ঘর; কিন্তু দেয়ালটি অন্ধকার করলেই ফুটে উঠবে অনন্য সুন্দর দৃশ্যকল্প, যেখানে রয়েছে জীবনের কিছু জটিল রেখা কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বোগি তাঁর শিল্পকর্মে বিভিন্ন ধরনের ত্রিমাত্রিক বস্তু ব্যবহার করেন। এসব ত্রিমাত্রিক বস্তু তৈরি করার সময় কখনো তাঁকে কাজ করতে হয় স্বাভাবিক আলোতে কখনো করতে হয় অন্ধকারে। আর এ ধরনের বস্তু দেয়ালে যে বাস্তবতা এনে দেয় তা রীতিমতো বিস্ময়কর। আপনি চাইলেই আপনার শোবার ঘরটিকে বানিয়ে ফেলতে পারেন সমুদ্রের তলদেশ অথবা বানিয়ে ফেলতে পারেন হাজার নক্ষত্রখচিত খোলা আকাশ। শুধু ঘরের বাতিটিকে বন্ধ করে দিলেই এ রকম একটা পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব আপনারই ঘরে। রং নিয়ে তার এ রকম আলো-আঁধারির খেলাই তাকে করে তুলেছে অনন্য।
১৯৮৪ সালে হাঙ্গেরিতে জন্ম বোগির; বয়স যখন বিশ, তখন ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য তাঁর সৃজনশীলতা ও দক্ষতাকে আরও এগিয়ে নেওয়া। নিজের মতো তৈরি করেন চিত্রকলার নতুন এক দর্শন, যা ছড়িয়ে দিতে থাকেন বিশ্বময়। নতুন এ কৌশল ‘মাল্টিলুমিনিজম’। ‘মাল্টিলুমিনিজম’ চিত্রকলার এমন এক ধারা, যেখানে ফ্লুরেসেন্ট ও ফটোলুমিনেসেন্ট বা ফসফরেসেন্ট টেকনোলজি একসঙ্গে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের চিত্রকর্ম, দেয়ালচিত্র, সিরামিক বা কাঠের ভাস্কর্য, বিভিন্ন ধরনের আসবাব, বডি পেইন্টিং বা আলোকচিত্র তৈরি করা হয়। অর্থাৎ শিল্পকর্মটি যেমন দিনের আলোয় দেখা যাবে, তেমনি অন্ধকারে অথবা আলট্রাভায়োলেট রশ্মিতেও দেখা যাবে। কিন্তু এটি এক আলোতে সৃষ্টি করবে এক এক রকম অনুভূতির। বোগি মনে করছেন তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবিত মাল্টিলুমিনাস পদ্ধতিতে দিনের আলোতে যেমন বহুমাত্রিক রং পাওয়া সম্ভব তেমনি আলট্রাভায়োলেট রশ্মিতে বা অন্ধকারেও বিস্তৃত মাত্রার রং পাওয়া সম্ভব। এমনকি ক্রোমা ডেপথ গ্লাস অর্থাৎ যেটাকে আমরা সাধারণত থ্রি-ডি গ্লাস বলে জানি, এ রকম গ্লাস ব্যবহার করে যেকোনো লাইটে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখতে পাওয়াও সম্ভব।
চিত্রকর বোগি ফাবিয়ান যে শুধু ইন্টেরিয়র বা ঘরের ভেতরেই কাজ করতে আগ্রহী তা কিন্তু নয়। তিনি চিত্রকলা, ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প, ফার্নিচার ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, ভিডিও, বডি পেইন্টিংসহ কাজ করতে চান আরও বিস্তৃত মাধ্যমে। স্বপ্ন আর প্রকৃতিকে আনতে চান মানুষের একেবারে দোরগোড়ায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯০তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৭।