এস্কিমোদের তুষারবাড়ি ইগলু

ইগলু!!! উহু! আইসক্রিম নয়, বলছি তুষারবাড়ির কথা। চিরতুষার দেশের বাসিন্দা এস্কিমোরা যে বাড়িতে বাস করে, সেটিই আসলে ইগলু নামে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় সব চিরতুষারময় শীতপ্রধান দেশগুলোতেই দেখা যায় এই ইগলুবাড়ি। বিশেষ করে পূর্ব সাইবেরিয়া, আলাস্কা, কানাডা, গ্রিনল্যান্ডের মতো শীতপ্রধান অঞ্চলে। ইগলুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, পুরো ঘরটিই তৈরি করা হয় বরফ কেটে ইটের মতো চাই বানিয়ে। তুষারের এই ঘরগুলো দেখতেও অত্যন্ত চমৎকার, অনেকটা গম্বুজের মতো। তবে ইগলু বরফের বাড়ি হলেও ভেতরটা কিন্তু বেশ উষ্ণ। তুষার জনপদের হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রাকে রুখে দিয়ে বরফঘরে এস্কিমোরা নিজেদের শুষ্ক ও উষ্ণ রেখে স্বাচ্ছন্দ্যেই বাস করতে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থান

আর্কটিক সার্কেল পৃথিবীকে যেখানে ঘিরে রয়েছে, সেই বরফময় অঞ্চলেই এস্কিমোদের বাস। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের এই বিন্দুতে এর ঘূর্ণন অক্ষ পৃষ্ঠতলের সঙ্গে মিলেছে। বরফ কখনোই স্থির থাকে না উত্তর মেরুতে। বরফের ওপর উত্তর মেরুর বিন্দুটি নির্দেশ করলেও, এর নিচে কোনো মাটি নেই। রয়েছে সমুদ্র। এই রেখা বরাবর উত্তর মেরুর দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, আলাস্কা, ফিনল্যান্ড, কানাডা, রাশিয়ার মতো দেশ। আর্কটিক সার্কেলের আরও উত্তরে ৮০০ দ্রাঘিমাংশে আছে পোলার সার্কেল। গ্রিনল্যান্ডের উত্তরাংশ পোলার সার্কেলকে স্পর্শ করেছে। এসব অঞ্চলেও আদিম এস্কিমোরা বিস্তীর্ণ সমতল ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে বসবাস করছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বিশাল এলাকা হলেও তাদের সংখ্যা খুবই কম। সব মিলিয়ে হবে মাত্র দেড় লাখ মানুষ। এখানকার আবহাওয়া ও প্রকৃতি চেনা জগৎ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ছয় মাস দিন আর ছয় মাস রাত। বছরের অধিকাংশ সময় থাকে তুষারাচ্ছন্ন। 

এস্কিমোদের জীবনচরিত

উত্তরের মেরু ও মেরুবাসীদের জীবন সব সময়ই মানুষের কাছে এক রহস্য। ‘এস্কিমো’ শব্দটি উত্তর আমেরিকার অ্যালগোনকিউয়ান ইন্ডিয়ানদের ভাষা থেকে আগত। যার প্রকৃত অর্থ ‘কাঁচা মাংসখেকো’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে বাদ দেওয়া হয়েছে ‘এস্কিমো’ শব্দটি। এস্কিমোর বদলে তারা নিজেদের ‘ইনুইট’ বলতে পছন্দ করে বেশি। যার অর্থ ‘মানুষ’। ইনুইট শব্দটি বহুবচন। ইনুইট গোত্রের প্রতিটি সদস্যদের আলাদাভাবে বোঝাতে বলা হয় ‘ইনুক’। এস্কিমোদের মধ্যে অনেক স¤প্রদায় আছে। উত্তর সাইবেরিয়া, ফিনল্যান্ড, কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডে যারা থাকে, তাদের বলা হয় ইনুইট। তাদের ভাষায় ইগলু মানে কিন্তু শুধু বরফের বাড়ি নয়। তারা যেকোনো ধরনের বাসস্থানকে ইগলু নামে ডাকে। সেটা হতে পারে তাঁবু, তুষারের ঘর কিংবা শহুরে দালান। তবে সাধারণ মানুষ ইগলু বলতে তুষারের ঘরকেই বোঝে। 

এত জায়গা থাকতে এই হিমশীতল অঞ্চলে মানুষ বাস করতে গেল কেন? এর সদুত্তর এখনো মেলেনি। ইনুইটরা সংগ্রামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাই এখন আর তারা অন্য কোথাও যেতে চায় না। এ ছাড়া চিকিৎসকেরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন যে উষ্ণ অঞ্চলের মানুষের চেয়ে মেরু অঞ্চলের মানুষেরা বেশি সুস্থ থাকে। ইনুইটদের খাবার বলতে কাঁচা মাংস, মাছ আর কিছু ঘাস। বরফ গলিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করে তারা। উত্তর মেরুতে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে থাকা পশু শিকার করে তারা খাবার জোগাড় করে। এখানে রয়েছে আর্কটিক অঞ্চলের ভালুক, বল্গা হরিণ, খরগোশ, পাখি, ভেড়া, শিয়াল আর কুকুর। আরও আছে সিল মাছ। সিল মাছের তেল দিয়ে ঘরের প্রদীপ জ্বালায় তারা। শিকার করতে ব্যবহার করে পশুর দাঁতের বর্শা ও তির। শিকার করা পশুর চামড়া থেকেই বানায় পোশাক। এই বরফ এলাকায় এখনো যোগাযোগের অন্যতম বাহন হলো নৌকা এবং কুকুরের গাড়ি বা প্লেজ। এ গাড়িকে তারা বলে কামুতিক। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ইনুইট জাতি বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে খুব একটা জানে না। ইনুইটরা কেন উষ্ণ অঞ্চলে চলে যায় না তা কিন্তু অনেকেরই কৌতূহল। 

যেভাবে তৈরি হয় ইগলু

বরফঘর ইগলু সাধারণত স্থায়ী ও অস্থায়ী দুই ধরনের হয়ে থাকে। শিকার করতে দু-এক দিনের জন্য কোথাও থাকার ক্ষেত্রে এস্কিমোরা ছোট আকৃতির ঘর বানায়, সেগুলো সাধারণত অস্থায়ী। মাঝারি সাইজের ইগলু তৈরি করা হয় একটি পরিবারের বসবাসের উপযোগী করে। এ ধরনের কয়েকটি ইগলু মিলে ইনুইটরা একেকটি গ্রাম গঠন করে। আর সবচেয়ে বড় ইগলুগুলোতে পাঁচটা পর্যন্ত ঘর থাকতে পারে। এগুলো একাধিক ছোট ইগলু মিলে তৈরি করা হয়, সেগুলোকে যুক্ত করা হয় আবার টানেল দিয়ে। 

দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলে তুষার ঘর বানানো মোটেও সহজ বিষয় নয়। তবে এস্কিমোদের কাছে তা যেন তুড়ির ব্যাপার। বংশ পরম্পরায় ইনুইটরা ইগলুবাড়ি বানিয়ে আসছে। প্রায় প্রত্যেকেরই জানা ঘর নির্মাণকৌশল সম্পর্কে, যা তারা শিখে এসেছে বড়দের কাছ থেকে। ক্রান্তিকালে বা তুষারঝড়ের সময় খুব দ্রুততার সঙ্গে একটি জুতসই ঘর বানিয়ে নিতে পারে তারা। 

ইগলু নির্মাণকৌশল বেশ সাদামাটা। তেমন ঝামেলা নেই বললেই চলে। ইগলু বানাতে প্রয়োজন শুধু বরফ। আর নির্মাণকাজের সহায়ক হিসেবে প্রয়োজন একটি মাত্র বরফ কাটা ছুরি। ব্যস! তবে ইগলু তৈরির জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এরপর দরকার শক্তপোক্ত তুষারের ব্লক, যা বরফ কেটেই বানাতে হয়। তবে তুষারের চাই বেশি শক্ত হওয়া চলবে না। তাতে বরফের ব্লক ফেটে যেতে পারে। কঠিন বরফের তুলনায় জমাট বাঁধা তুষার ব্লকগুলো ঠান্ডা রোধে বেশি সহায়ক। কারণ, এটা তাপ অপরিবাহী হিসেবে বেশি কার্যকর। ব্লক যত বড় ও পুরু হবে, ঘর হবে তত মজবুত। সাধারণত ইগলুর উচ্চতা রাখা হয় পাঁচ থেকে ছয় ফুট। তবে অস্থায়ী ঘরের জন্য ইনুইটরা সাধারণত তিন ফুট লম্বা, দুই ফুট চওড়া ও চার ইঞ্চি পুরু ব্লক ব্যবহার করে থাকে। 

উইকিপিডিয়া

প্রথমেই বরফের ব্লকগুলোকে প্রয়োজনমতো নির্ধারিত স্থানে চক্রাকারে বসাতে হয়। গোলাকার ঘরের ভিত বা ব্লকগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তা স্লোপের মতো করে নিচ থেকে ক্রমান্বয়ে ওপরে উঠে যাবে। একটার পর একটা ব্লক বসানোর ফলে ক্রমেই তৈরি হতে থাকে গোলাকার দেয়াল যা শেষাংশে রূপ নেয় একটি গম্বুজে। গম্বুজ আকৃতি হওয়ায় ঘর হয়ে ওঠে অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে ঘর তৈরির বিশেষত্ব হলো, ইগলু তৈরি করা হয় সব সময় ভেতর থেকে। প্রথমে এর দরজা থাকে না, তবে ইগলু তৈরি করা শেষ হয়ে গেলে নির্মাণকারী নিচের দিকে একটা দরজা কেটে বের হয়ে আসে, যা পরবর্তী সময়ে ভেতরে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। তুষারের ভেতর অসংখ্য কোটর থাকে, যেখানে বাতাস জমা হয়ে তৈরি করে জালের মতো বিস্তৃত বায়ুকোটর। এগুলো বাইরের ঠান্ডাকে সহজে ভেতরে আসতে দেয় না। ব্লক বসানোর ফলে যে ছোট ছোট ফাঁকফোকর তৈরি হয়, সেখানে তুষার লেপে বাতাস ঢোকার পথ বন্ধ করে দেয়। ইগলুর ভেতরে ঢোকার পথটি সমকোণে বাঁকানো থাকে, যেন বাতাস সরাসরি ভেতরে ঢুকতে না পারে। 

উল্লেখ্য, বরফে বানানো ইগলু ইনুইটদের শীতকালের ঘর। কিছু এলাকায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বাড়লে এই বাড়ি গলে যায়। ফলে ইনুইটরা গ্রীষ্মকালের জন্য বানায় মাটি ও পাথরের তৈরি ঘর। ছাদের বিম তৈরি করা হয় তিমি মাছের পাঁজরের হাড় দিয়ে। আর দেয়াল তৈরি করা হয় সিল মাছের চামড়ার ভেতরে মাটি ও শেওলা পুরে পুরে। সঠিকভাবে তৈরি করা হলে তুষারের তৈরি এ ঘরগুলোর ছাদে একজন মানুষ অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, এতে ইগলুর কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া শিকারের খোঁজে যখন ঘুরে বেড়ায় এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়, তখন তারা পশুর চামড়া দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি বানিয়ে নেয়।  

তুষারবাড়ির উষ্ণতার রহস্য

একটি প্রশ্ন নিশ্চয় মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে যে বাড়িগুলো খোদ বরফে তৈরি তা কীভাবে বাসিন্দাদের শুষ্ক ও উষ্ণ রাখে? এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ইগলু ঘরের বরফ তাপ অপরিবাহী হিসেবে কাজ করে। বরফখন্ড তাপ ও উষ্ণতা অপরিবাহী বলে বরফ ইগলুতে তাপ বাইরে বা বাইরের তাপ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এ ছাড়া, ইগলুর গম্বুজ আকৃতির গঠন ঘরকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

ইগলুর গম্বুজ আকারের গঠনকে মূলত তিনটি অংশে ভাগ করা হয়। ওপরের অংশে বাসিন্দারা থাকে, ঘুমায়; মাঝের অংশে আগুন জ্বালানো হয় এবং নিচের দিকের ঠান্ডা অংশে পানি জমা হয়। ইগলুর ভেতরে পরিচলন পদ্ধতিতে বাতাস ঢোকে। তুলনামূলক গরম অণুসমূহ বাতাসের ঘনত্ব কমিয়ে ফেলে। এর ফলে গরম বাতাস ইগলুর ওপরের অংশে উঠে আসে ও ঠান্ডা বাতাস নিচের অংশে জমা হয়। ইগলুর প্রবেশ দরজা রাখা হয় নিচের অংশে। প্রবেশদ্বারটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এর একটি প্রান্ত বর্গাকার ও বাকি তিনটি অংশ অনেকটা গোলাকার হয়। ফলে অধিক পরিমাণ ঠান্ডা বাতাস ইগলুর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। 

আগুন জ্বালানোর মাধ্যমে ইগলুর ভেতরে তাপমাত্রা আস্তে আস্তে বাড়ানো যায়। আগুনের ধোঁয়ায় যেন দম বন্ধ হয়ে না আসে সে জন্য ইগলুর চূড়ায় একটি ছোট ছিদ্র রাখা হয়। তা ছাড়া এই ছিদ্রটি ভেন্টিলেটর (ঠবহঃরষধঃরড়হ ঐড়ষব) হিসেবেও কাজ করে। হালকা আগুনে ইগলুর ভেতরের বাতাস ধীরে ধীরে গরম হয়ে ওঠে। তাই, বাইরের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও ইগলুর ভেতরে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো হয়। এভাবে বরফ এলাকার মানুষ ইগলুর মাধ্যমে নিজেদের শীতের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। 

ইগলু ঘরের স্বাদ পেতে

ইগলু ঘর নিয়ে আর সবার মতো আপনারও নিশ্চয় আগ্রহের কমতি নেই; আর তেমন একটি ঘরে যদি থাকার সুযোগ মেলে তবে তো কোনো কথাই নেই! মজার বিষয় হলো আপনি চাইলে তেমন একটি ঘরে বন্ধু বা প্রিয়জন নিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে সারা বছর বা শীতে তুষারে ছেয়ে যায়, সেসব দেশ ইগলুকে কাজে লাগাচ্ছে পর্যটন সহায়ক হিসেবে। বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে বানানো হচ্ছে ইগলু হোটেল ও রিসোর্ট। সেসব ইগলু ঘরে থাকার জন্য ভিড় করছে উৎসাহী পর্যটকেরা। আপনি হয়তো ভাবছেন এত দূরের দেশে যাওয়ার সাধ্য কজনেরই-বা আছে! তাদের জন্য সুখবর হচ্ছে, আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের শৈলশহর মানালিতেও রয়েছে বরফঘরে থাকার সুব্যবস্থা। আলাস্কা বা গ্রিনল্যান্ড যাদের কাছে দূরের দেশ বা ব্যয়বহুল, তাদের কাছে এ স্থানটি হয়তো সাধ্যের মধ্যেও হতে পারে। ইন্টারনেট ঘেঁটে আপনার পছন্দ ও সামর্থ্যরে মধ্যে বেছে নিতে পারেন কোনো ইগলু হাউস। তবে অধিকাংশ ইগলু হোটেলই খোলা থাকে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত।  

ইগলু বরফের ঘর হলেও সেখানে গিয়ে শীতে কাবু হয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকবেন বিষয়টি এমন নয়। অধিকাংশ অবকাশ কেন্দ্রের ইগলুগুলো সত্যিকারের ইনুইটদের জীবনাচারের ছোঁয়া পাওয়ার সব ধরনের আয়োজন থাকলেও আরাম-আয়েশের একটুও কমতি নেই। ইগলু অবকাশ কেন্দ্রের ঘরগুলো বরফ ও কাচ মিলিয়ে তৈরি। আপনাকে উষ্ণ রাখার সব ব্যবস্থাই আছে সেখানে। প্রতিটি ইগলুর ভেতর আছে নিজস্ব গরম বাষ্প স্নানের ব্যবস্থা। বার আছে, দোকান আছে। তবে রোমাঞ্চপ্রিয় যাঁরা সত্যিকারের ইগলুর স্বাদ পেতে চান, তাঁদের জন্য আছে স্নো ইগলু। এর কাঠামোটি তুষার দিয়েই মোড়া। বাইরের তাপমাত্রা যেখানে হিমাঙ্কের নিচে ৩০ ডিগ্রি, সেখানে স্নো ইগলুর ভেতরে থাকে মাইনাস ৩ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতিথিদের বাঁচিয়ে রাখতে গরম ¯িøপিং ব্যাগ, হাত-পা মোজা, এসব দেওয়া হয়। আর এই স্নো ইগলুতে থাকা বরফগুলোই আলো ছড়ায়, বাড়তি আলোর ব্যবস্থা নেই। খানিকটা আরামপ্রিয়দের জন্য আছে লগ কেবিন ও গ্লাস ইগলু। এর মধ্যে গ্লাস ইগলুতে আপনার মোটেও ঠান্ডা লাগবে না। এতে আছে আরামদায়ক বিছানা, বাথরুম ও আসবাব। 

ফেসবুক

এস্কিমোদের জীবনে পরিবেশ ও আধুনিকতা

গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই এস্কিমো এবং মেরু অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করছেন। এসব গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে তাদের নিত্যপরিবর্তন। একদিকে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব যেমন তাদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে, অন্যদিকে আধুনিকতাও বাধাগ্রস্ত করছে তাদের জীবনাচরণ ও সংস্কৃতি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই এলাকায় অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি মেরুর বরফ গলে যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে ‘আর্কটিক অ্যামিপ্লিফিকেশন’। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরুর বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির পরিমাণ বাড়ছে। শ্বেতশুভ্র বরফ সমপরিমাণ পানির তুলনায় অনেক কম তাপ গ্রহণ করে। বরফের রং সাদা হওয়ার কারণেই এটি সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত হয়। এর তুলনায় পানি অনেক বেশি তাপ গ্রহণ করে। ফলে সমুদ্রের পানিতে অনেক বেশি তাপ বন্দী হয়ে থাকে, যা আবার পৃথিবীর উষ্ণায়ন এবং মেরুর বরফ গলনে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। এভাবেই ‘আর্কটিক অ্যামিপ্লিফিকেশন’-এর দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খেয়ে মেরু এলাকার বরফের পুরুত্ব কমছে প্রতিবছর। শীতকালে তুষারঝড়ের কবলে উত্তর মেরুর পরিবেশ হয়ে উঠছে আরও ভয়াবহ। 

একসময় এস্কিমোরা পুরোপুরিই যাযাবর ছিল। শিকার করেই তাদের জীবন কাটত। বন্য প্রাণীরা ক্রমেই বিলুপ্তি হচ্ছে। আগের মতো আর পাওয়া যায় না শিকারে। আর দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করে আসা এই ইনুইটরা নিজভূমেই যেন পরবাসী। তা ছাড়া আধুনিকতার দিকেও ঝুঁকে পড়ছে তারা। অনেকেই হয়ে পড়ছে নগরমুখী। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে উত্তর মেরু যাওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। এখন আর কষ্ট করে পায়ে হেঁটে বা প্লেজে চেপে সেখানে যেতে হয় না। সেখানেও পৌঁছে গেছে বেতার ও মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থা। শহুরে মানুষের যাতায়াতও বেড়েছে। ফলে এদের জীবনেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। যাযাবর জীবন পরিত্যাগ করে এরা এখন স্থায়ী বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। পড়াশোনা করে আজকাল অনেকেই শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। শিকার-জীবন ছেড়ে নিজেদের যুক্ত করছে নানা কাজকর্ম আর ব্যবসা-বাণিজ্যে। তবুও দিনশেষে রাত এলে পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিচারণা করে তাদের অতীত রোমহর্ষক শিকার-কাহিনি; বাবা-মা, দাদা-দাদিরা মেরু অঞ্চলের রূপকথার গল্প শুনিয়েই ঘুম পাড়ান ছোট্ট ইনুইটদের। 

তথ্যসূত্র:

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ডকুমেন্টারি

বিবিসি ডকুমেন্টারি
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৯

আশিক মাহমুদ
+ posts