দেয়ালের গায়ে বাগানের ধারণাটা একেবারে নতুন নয়। বাড়ির সামনের লনে এক টুকরো বাগানের প্রচলিত ধারণার বাইরে বাড়ির দেয়ালজুড়ে বাগানবিলাস, সেও প্রায় শত বছরের পুরোনো আইডিয়া। এ ব্যাপারে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান বোধ হয় ইতিহাসের প্রথম সাক্ষী। নগরায়ণ আর জনাধিক্যের কারণে কি শহর আর কি গ্রাম; সবখানেই এখন বহুতল ভবনের জয়জয়াকার। আধুনিক নগরের ভবনগুলো এখন আকাশচুম্বী। নগরায়ণের কারণে শুধু সুন্দর সুন্দর আকাশচুম্বী ভবন তৈরি হয়েছে তা কিন্তু নয়, সেই সঙ্গে উজাড় হয়েছে বনভূমি। শিল্পকারখানা স্থাপন, নদী-ভরাট, শহরের বিস্তৃতি সব মিলিয়ে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বায়ুদূষণ। বাড়ির সামনে বাগানবিলাসের জন্য খালি জায়গা কোথায়? কিন্তু তাই বলে তো সব কিছু থেমে থাকে না। মানুষ তাই নতুন কিছু নিয়ে ভাবছে নিরন্তর।
উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে কিংবা যেখানে সবুজের সমারোহ কম, সেসব দেশে উচ্চ অট্টালিকার দেয়ালজুড়ে বাগানের ধারণা ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যই নয়, আরও অনেক সুবিধা রয়েছে এর। ভবনের দেয়ালজুড়ে যখন ঘন সবুজ গাছগাছালি বেড়ে উঠবে, তখন তা ভেতরের কিংবা বাইরের দুই দিকের তাপমাত্রার ওপর দারুন প্রভাব রাখে। ঘরে এয়ারকন্ডিশনের ব্যবহার কমিয়ে দেয়, ফলে কম কার্বন নির্গত হয়। প্রচুর অক্সিজেন উৎপন্ন হয়ে আশপাশের বায়ুকে রাখে নির্মল। আর সেই সঙ্গে আছে চোখের প্রশান্তি।
এবার আসুন আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব থেকে বড় ভার্টিক্যাল গার্ডেনের সঙ্গে! এর অবস্থান কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার প্রাণকেন্দ্রে, এদিফিসিও সান্তালাইয়া নামক একটি সুরম্য বহুতল ভবনের দেয়ালজুড়ে। ১১ তলা এই ভবনটির ৩ হাজার ১০০ বর্গ মিটারের দেয়ালজুড়ে রয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার সজীব গাছগাছালির আচ্ছাদন। স্প্যানিশ কোম্পানি পেসাজিসমো আর্বানো এবং কলম্বিয়ান কোম্পানি গ্রোনকোল যৌথভাবে বৃক্ষসমৃদ্ধ এই ভবনটি নিয়ে কাজ করেছে। যা শেষ হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। তখন থেকে এদিফিসিও সান্তালাইয়ার পরিচিতি ‘দ্য গ্রিন হার্ট অব বোগোতা’ হিসেবে। আর হবেই-বা না কেন! শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন অপরূপ সবুজের সৌন্দর্য তো সবাইকে এ কথাই মনে করিয়ে দেয়।
পেসাজিসমো আর্বানোর বোট্যানিস্ট ইগ্নাসিও সোলানো এবং দলের বাকি সদস্য মিলে এই উদ্যানের জন্য কী ধরনের গাছ নির্বাচন করা যায় সেটি ঠিক করেন। কলম্বিয়ার কোকো ফরেস্ট থেকে ১০টি ভিন্ন প্রজাতির আর ৫টি ভিন্ন গোত্র থেকে গাছ বেছে নেওয়া হয়। এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় ছিল যে এই ভিন্ন ধরনের গাছগুলো একসঙ্গে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যাতে কোনো সমস্যা না হয়। শুধু তা-ই নয়, দেয়ালের গায়ে এগুলো সমভাবে বেড়ে উঠবে কি না সেটাও ছিল দেখার বিষয়। এ ধরনের ভার্টিকেল গার্ডেনের ক্ষেত্রে ইকোসিস্টেম অর্থাৎ প্রতিবেশ আর জৈববৈচিত্র্য কিছুটা ভিন্ন হয়। তাই এর সঙ্গে মানানসই বৃক্ষের প্রজাতি নির্বাচন ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ বৈকি! এ ছাড়া এমন বৃহৎ পরিসরে এমন উদ্যান গড়ে তোলাও কিন্তু কম চ্যালেঞ্জিং নয়।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেচব্যবস্থা। দেয়ালের গায়ে বেড়ে ওঠা উদ্যানের সেচব্যবস্থা কেমন হলে সেটি বাগান পরিচর্চার জন্য সঠিক হবে এবং ভবনেরও কোনো ক্ষতি করবে না, এটা ছিল খুব বড় ধরনের সমস্যা। এর সমাধান করতে তাই ইগ্নাসিও সোলানো ও তাঁর দলকে অনেক মাথা খাটাতে হয়েছে। বাগানের গাছেরা যদি একই প্রজাতির হতো তাহলে হয়তো সেচ ব্যবস্থাপনা নিয়ে জটিল এত চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এতগুলো ভিন্ন প্রজাতির গাছ; তাদের জন্য আলো, বাতাস, পানি কিংবা অন্যান্য সব উপাদানের প্রয়োজনীয়তার কিন্তু তারতম্য রয়েছে। তাই এর জন্য প্রয়োজন ছিল একদম ভিন্ন ধরনের সেচব্যবস্থা উদ্ভাবনের। দলটি তাই একটি বিশেষ ধরনের সেচব্যবস্থা গড়ে তোলে। ইগ্নাসিও সোলানোর নামে প্যাটেন্টকৃত এই সেচ ব্যবস্থাপনা মোট ৪২টি ভাগে বিভক্ত আর প্রতিটি ভাগই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাইরের রোদের তাপ, বাতাসের আর্দ্রতা আর গাছের ধরন অনুযায়ী কী পরিমাণ সেচের প্রয়োজন, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নির্ধারিত হয়। অবশিষ্ট পানি এবং ভবনের বাসিন্দাদের ব্যবহৃত পানি রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহৃত হয়। পেসাজিসমো আর্বানো তাঁদের এই নতুন ধরনের সেচব্যবস্থাকে ‘F+P’ Hydroponic নামে প্যাটেন্ট করেছে।
এই প্রজেক্টের সদস্যদের মতে, সান্তালাইয়ার এই ভার্টিকেল গার্ডেন আনুমানিক ৭০০ মানুষের কার্বন ফুটপ্রিন্ট শোষণ করে, বছরে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে আর প্রায় ৭৪৫টি মোটরযান থেকে উৎপন্ন কার্বন দূষণ পরিশোধনে সক্ষম। এ ছাড়া দেয়ালের গায়ে পুরু সবুজের আচ্ছাদন থাকায় এটি ভবনের জন্য প্রাকৃতিক ইনসুলেটিংয়ের কাজ করে। ফলে গরমের সময় ভবনের ভেতরে বাইরের অতিরিক্ত তাপ প্রবেশ করতে পারে না। ভেতরের পরিবেশ থাকে ঠান্ডা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য তাই খরচটাও হয় কম।
দ্য ডিস্ট্রিক্ট এনভায়রনমেন্ট সেক্রেটারিয়েট অব বোগোতা পরিবেশের ওপর সান্তালাইয়ার ভার্টিকেল গার্ডেনের প্রভাবকে মূল্যায়ন করেছে এভাবে-
- সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য এলাকা থেকে বোগোতা শহরে যে অতিরিক্ত ৩-৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেশি বেড়েছে, সেটি ও শব্দদূষণ কমাতে সান্তালাইয়ার ভার্টিকেল গার্ডেন বেশ ভূমিকা রাখছে। শহরের অন্যান্য বিল্ডিংয়েও যদি এমন ভার্টিকেল গার্ডেন তথা ছাদবাগানের চর্চা বাড়ে তাহলে বোগোতা শহরে এ ধরনের সমস্যা বহুলাংশে কমবে।
- শক্তির অপচয় রোধেও এর ভূমিকা অনেক। একটা ছাদবাগান প্রায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত তাপ উৎপাদনের পেছনে শক্তির ব্যবহার কমাতে আর ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত এয়ারকন্ডিশনের পেছনে শক্তির ব্যয় কমাতে সাহায্য করে।
- ভার্টিকেল গার্ডেন কিংবা ছাদবাগান বৃষ্টির পানি ধরে রাখে; ফলে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা কম হয়। পরে বাষ্পীভবন ইত্যাদির মাধ্যমে সেটি পরিশোধিত হয়ে আবার প্রকৃতিতেই ফিরে যায়। ফলে পানি চক্রের এই আবর্তন পরিবেশকে আরও নির্মল ও বাসোপযোগী করে তোলে।
ভবনের বাইরের দেয়ালে এমন বাগান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কয়েকটি দিক বিবেচনায় রাখতে হয়। যেমন-
- আপনি কী ধরনের গাছ লাগাতে চান সেটি আবহাওয়া, গাছের অভিযোজন ক্ষমতা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা।
- গাছ রোপণের মাধ্যম কী হবে সেটি ঠিক করা।
- দেয়ালের গায়ে গাছ বেড়ে ওঠার জন্য কী ধরনের অনুষঙ্গ ব্যবহার করবেন, সেটি নির্বাচন করা।
- আর গাছের সেচব্যবস্থা এবং পরিচর্যা কীভাবে করবেন, সেটি ঠিক করে নেওয়া।
গ্রিন হার্ট অব বোগোতা আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান ও পরিবেশ আরও উন্নত করা যায়। সান্তালাইয়া ভবনের ভার্টিকেল গার্ডেন হয়তো জটিল স্থাপত্য আর বোট্যানির এক অনন্য উদাহরণ। এমন বৃহৎ পরিসরে না হোক ছোট্ট পরিসরে বাগানের চর্চা আমরা আমাদের এখানে করতেই পারি। আমাদের মতো এমন গ্রীষ্মপ্রধান দেশ আর দূষণের নগরীকে আরেকটু বাসোপযোগী করে গড়ে তুলতে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।