Image

জলবায়ু পরিবর্তনে টেকসই উন্নয়ন

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশ বিপর্যয় আজ চূড়ান্তে। প্রতিবছরই বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বৈশি^^ক সংকটও হচ্ছে প্রবল। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে অক্সফোর্ড অভিধানের নিয়ন্ত্রক ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জরুরি অবস্থা’কে এবারের ‘বর্ষসেরা শব্দ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার দাবি নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গের শুরু করা এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে বিশে^র কোটি কোটি মানুষ। গত ২০ সেপ্টেম্বর ১১ লাখ শিশু তাদের ক্লাস বর্জন করে এই একই দাবিতে। বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে যে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে, তাতে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। এ দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আন্দোলনে শামিল হয়েছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকিসূচক (সিআরআই)-এর এক গবেষণায় বিশে^র সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় অন্যতম নাম বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্যজনিত নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে দেশটি প্রতিনিয়ত। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার গতানুগতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে সুষম টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের জোর দাবি।

জলবায়ু পরিবর্তন কী?

জলবায়ু হচ্ছে কোনো এলাকা বা ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০-৩৫ বছরের গড় আবহাওয়া। কোনো জায়গার গড় জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থপূর্ণ পরিবর্তন, যার ব্যাপ্তি কয়েক যুগ থেকে কয়েক লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে, একেই বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এই পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হলেও কয়েক দশক যাবৎ তা ঘটছে আশঙ্কাজনক হারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা বৈশি^ক উষ্ণতা নামে পরিচিত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাড়ছে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরাসহ নানা ধরনের দুর্যোগ।

যে কারণে জলবায়ু পরিবর্তন

জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে যেমন আছে পৃথিবীর বিভিন্ন গতিশীল প্রক্রিয়া, তেমনি রয়েছে বহির্জগতের প্রভাব। তবে বিগত কয়েক দশকে মানুষের পরিবেশবিধ্বংসী নানা কর্মকাণ্ডের ফলে এই পরিবর্তন ত্বরানি¦ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মধ্যে রয়েছে- 

প্রাকৃতিক কারণ

  • মহাদেশীয় ড্রিফট
  • সৌর বিকিরণের মাত্রা
  • পৃথিবীর অক্ষরেখার দিক পরিবর্তন
  • আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত
  • সামুদ্রিক স্রোত
  • প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি।

মানবসৃষ্ট কারণ

  • কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি/কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়
  • খনিজ জ্বালানির ব্যবহার
  • অতিরিক্ত খনিজ পদার্থ উত্তোলন
  • বাতাসে ক্ষতিকর নানামুখী গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি
  • পাহাড় নিধন
  • বনভূমি উজাড়
  • বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন
  • নদী, খাল, জলাভূমি ভরাট প্রভৃতি।

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বাংলাদেশকে কেন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। ভূতাত্ত্বিকভাবেই এ দেশটির উত্তরে থাকা হিমালয় পর্বতমালা থেকে বরফগলা পানির প্রবাহে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য নদী। এসব নদীর পানি গিয়ে মিশছে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে। দেশটির প্রায় মাঝ দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করায় বর্ষা মৌসুমে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে নদী উপচে সৃষ্টি হয় বন্যা। এ ছাড়া মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের আগে বা পরে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, নিম্নচাপ, জল-ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি ঘটে। জলোচ্ছ্বাসের সময় সমুদ্র্র থেকে আসা লোনা পানিতে অনেক নিম্নভূমিতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (Climate Risk Index-CRI) অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি, ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফটের তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শীর্ষে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্র্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ততার বিচারে বিশ্বব্যাপী গবেষকগণ বাংলাদেশকে ‘পোস্টার চাইল্ড’ হিসেবে আখ্যা দেন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে যেসব ক্ষতি সম্মুখীন বাংলাদেশে; সেগুলো হচ্ছে-

  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি
  • ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস
  • সমুদ্র্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি
  • লবণাক্ততা সমস্যা
  • হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন
  • অকাল বন্যা
  • অস্বাভাবিক তাপমাত্রা
  • অতিবৃষ্টি
  • স্থায়ী জলাবদ্ধতা
  • নদী ও বাঁধ ভাঙন
  • ভূমিকম্প বৃদ্ধি
  • বিভিন্ন ধরনের জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদ প্রজাতি ধ্বংস প্রভৃতি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে বিশে^র প্রথম সারির ১০টি দেশ

ক্রমিকবন্যাঝড়সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশফিলিপাইনসব নিচু দ্বীপদেশ
চীনবাংলাদেশভিয়েতনাম
ভারতমাদাগাস্কারমিসর
কম্বোডিয়াভিয়েতনামতিউনিশিয়া
মোজাম্বিকমলদোভাইন্দোনেশিয়া
লাওসমঙ্গোলিয়ামৌরিতানিয়া
পাকিস্তানহাইতিচীন
শ্রীলঙ্কাসামোয়ামেক্সিকো
থাইল্যান্ডটোঙ্গামিয়ানমার
১০ভিয়েতনামচীনবাংলাদেশ

বৈশ্বিক উষ্ণতার ঝুঁকিতে থাকা ক্যাটাগরিভিত্তিক দেশের তালিকা। সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নে যা করণীয়

প্রতিনিয়ত সংগঠিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে এ দেশের অবকাঠামো যে ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে দেশের স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষক, পরিবেশবিদ, অর্থসংস্থানকারী ও নীতিনির্ধারকগণকে সমনি¦তভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ুর এ বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ করে বিভিন্ন অভিযোজন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে, যাতে ক্ষতি ও ঝুঁকির মাত্রা কমানো যায়। প্রথমেই চিহ্নিত করতে হবে দেশের কোন কোন খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এ ধরনের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে যে বিষয়গুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে-

  • দুর্যোগ সহনীয় টেকসই সড়ক নির্মাণ
  • দুর্যোগ সহনীয় টেকসই বাঁধ ডিজাইন ও নির্মাণ
  • নদী-খালে পানির স্বাভাবিক গতি ও ধারণক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত খনন ও দখল উচ্ছেদ
  • ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মেটাতে ভূপৃষ্ঠ ও বৃষ্টির পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা
  • বন্যা সমস্যার সমাধানে জলাধার সৃজন ও ভূগর্ভস্থ রিজারভার ব্যবস্থা গড়ে তোলা
  • দুর্যোগ সহনীয় টেকসই আবাসন নির্মাণ
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলীয় বন রক্ষা ও সবুজ বেষ্টনী সৃজন।

দুর্যোগ সহনীয় টেকসই সড়ক নির্মাণ

বাংলাদেশে মোট আয়তনের তুলনায় সড়কের পরিমাণ অনেক কম। প্রচুর যানবাহন চলাচলের ফলে সড়কগুলোতে যে চাপ পড়ে, তাতে সড়কগুলো দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে ব্যর্থ হয়। তা ছাড়া দেশের অধিকাংশ সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত হয় বিটুমিন। বাংলাদেশের মতো বৃষ্টিবহুল দেশে বিটুমিনের সড়ক মোটেও কার্যকর নয়। কারণ, পানি প্রবাহের সঙ্গে বিটুমিন উঠে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক। এ ছাড়া সড়ক নির্মাণে যুক্ত নানা ধরনের ত্রুটি। আর তাই টেকসই সড়ক নিশ্চিত করতে যা যা করণীয়-

  • বিটুমিনের বদলে কংক্রিট সড়ক বা পেভমেন্ট নির্মাণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে বন্যা ও বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায়।
  • বৃষ্টি ও বন্যা সমস্যায় সড়ক নির্মাণে সমাধান হতে পারে পারভিয়াস কংক্রিটে পেভমেন্ট নির্মাণ। মূলত এ কংক্রিট একধরনের স্ট্রাকচারাল পেভমেন্ট কংক্রিট, যাতে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ছিদ্র বা ভয়েড (১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ) থাকে। সাধারণ কংক্রিট ও বিটুমিন যেখানে পানি ধরে রাখে, সেখানে এই কংক্রিট শোষণ করে তা ভূ-অভ্যন্তরে প্রেরণ করে। এতে একদিকে যেমন সড়ক হয় স্থায়ী, তেমনি ভূগর্ভে পানি প্রবেশে বাধা দেয় না। আমাদের দেশে এই কংক্রিটের ব্যবহার তেমন নেই, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে উপযোগী হলে ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • বিটুমিন বা কংক্রিটের সঙ্গে অব্যবহৃত প্লাস্টিক ও গাড়ির ব্যবহৃত টায়ারচূর্ণ ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ করা যেতে পারে। এতে যেমন ব্যয় কমবে, তেমনি সড়কও হবে টেকসই।
  • তবে যে ধরনের সড়কই নির্মাণ করা হোক না কেন, মাটির ভারবহন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ, এ দেশের মাটি পলিসমৃদ্ধ ও নরম প্রকৃতির। এ জন্য সড়ক বা রেললাইন নির্মাণকালে বেইজ কোর্স, সারফেস কোর্স, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শোল্ডারিং সঠিকভাবে সম্পন্ন করা উচিত।

দুর্যোগ সহনীয় টেকসই বাঁধ ডিজাইন ও নির্মাণ

বাংলাদেশ অসংখ্য নদীবিধৌত বদ্বীপ ও ভাটির দেশ হওয়ায় প্রতিনিয়ত শিকার হয় বন্যা ও নদীভাঙনের। কারণ, দেশের মাটি পাললিক ও নরম। মাটির এই গঠন ভাঙনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। খরস্রোতা নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে বাঁধগুলোও দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে ব্যর্থ হয়। এ জন্য বাঁধ নির্মাণে নিতে হয় বিশেষ ব্যবস্থা। যেমন, 

ভূমিক্ষয় ও পলিরোধে জিওসিন্থেটিক্সের ব্যবহার

ভাঙন রোধে ও বাঁধ নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত উপকরণ জিওটেক্সাইল বা জিওসিন্থেটিকস ব্যাগ। পলিমার বা প্লাস্টিকের বিভিন্ন উপাদান যেমন, পলিলেফিন, পলিস্টার, রাবার, ফাইবার গ্লাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানও এতে ব্যবহৃত হয়। জিওটেক বর্তমান বিশ্বে সম্প্রসারণশীল প্রযুক্তির অন্যতম। সড়ক, নদী ও সমুদ্রের বাঁধ, ক্যানাল লাইনিং, ল্যান্ডফিল্ডস, বিমানবন্দরের ট্যাক্সিওয়ে প্রভৃতিতে এই ব্যাগ বেশ কার্যকর।

সিসি (কংক্রিট) ব্লক স্থাপন

নদী-সমুদ্র ভাঙন রোধে সিসি (কংক্রিট) ব্লক অত্যন্ত প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু এই ব্লক দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হয় না, বরং ব্লকগুলোই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত এলাকা ব্লকের আওতায় না আনা। তা ছাড়া ভুল ডিজাইন, অপর্যাপ্ত ব্লক স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব তো রয়েছেই। সঠিকভাবে ব্লক স্থাপন করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে বাঁধ রক্ষা সম্ভব। তবে ব্যবস্থাটি বেশ ব্যয়সাধ্য। 

নদীতীরের ভূমিক্ষয় রোধে ভেটিভার রোপণ

নদীতীরে মাটিভাঙন ও ভূমি ক্ষয়রোধ রোধে ভেটিভার (Vetiver) অত্যন্ত কার্যকর ধরনের তৃণ। বিন্নাঘাস, খাস-খাস, বিন্নাছোবা, চেঙ্গামুরা নামেও দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচিত এই ঘাসটি। ভেটিভারের শক্ত গুচ্ছমূল মাটির নিচে ৪ মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করে, যা মাটির অভ্যন্তরীণ ভাঙন প্রতিরোধে সক্ষম। একই সঙ্গে মাটির ওপরে খাড়া সুস্থিত ঝোপ বেগবান পানির প্রবাহকে বাধা দিয়ে নদীতীর রক্ষা করে। ক্ষরা, বন্যা বা যেকোনো জলাবদ্ধতার বিপক্ষে ভেটিভার দীর্ঘদিন টিকতে সক্ষম। বর্তমানে এই ঘাস চীন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারী কংক্রিট ব্লক বা পাথর দিয়ে তীর রক্ষা করা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ বলে ভেটিভার দিয়ে স্বল্পমূল্যের বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব।

নদী-খালের পানির স্বাভাবিক গতি ও ধারণক্ষমতা বজায় রাখতে খনন-দখল-উচ্ছেদ

গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বেসিন ও অন্যান্য নদী বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রতিবছর প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি নিয়ে। বিশাল এই পানির ধারা যদি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত না পৌঁছে এ দেশের মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। হিসাব বলছে, এই বিপুল পরিমাণ পানি দেশের ৮০ শতাংশ প্লাবন সমভূমিকে ৯ মিটার পানির নিচে ডুবিয়ে দেবে! অর্থাৎ বাংলাদেশের ভূভাগের ৮০ শতাংশ থাকবে প্রায় ৩০ ফুট বা তিনতলা সমান পানির নিচে! তবে পরিস্থিতি এখন এ পর্যায়ে না থাকলেও দেশের নদী-খালগুলো যেভাবে ভরাট ও দখল হয়ে যাচ্ছে, তাতে আশঙ্কা থেকেই যায়। আর এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে আমাদের করণীয়-

  • নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে হবে। বড় নদীতে ড্রেজিং করলেও তা আবার দ্রুতই ভরাট হয়ে যায়। এ জন্য নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। অপেক্ষাকৃত ছোট নদীতে ড্রেজিংয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় বিধায় সেগুলোতে অধিক মনোযোগ দিতে হবে।
  • বৃষ্টির পানিতে মাটি-বালু ধুয়ে যেন নদী-খাল ভরাট করতে না পারে সেজন্য প্রচুর পরিমাণে বনায়ন ও নদীর পাড়ে গাছ লাগাতে হবে।
  • যত দ্রুত সম্ভব দেশের সব নদী, খাল ও জলাভূমি উদ্ধার করতে হবে।

বন্যা সমস্যার সমাধানে জলাধার সৃজন ও ভূগর্ভস্থ রিজারভার ব্যবস্থা গড়ে তোলা

বন্যা বৈশি^ক এক সমস্যা। অতি বর্ষণে নদীর পানি বেড়ে দেখা দেয় বন্যা। তবে বিশে^র উন্নত কিছু দেশ উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থা ও উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে বন্যাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। যেমন-

  • নদী, খাল, পুকুর ও জলাধার সৃষ্টির মাধ্যমে বন্যার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে প্লাবন থেকে শহর, গ্রাম ও জনপদ রক্ষা।
  • নদীর বা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণের জন্য স্টোরেজ বা রিজার্ভার পদ্ধতি বেশ প্রচলিত সারা বিশ্বে। জাপানের টোকিওতে ওয়াটার রিজার্ভার বা বিশালাকার ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা যায়।
  • নেদারল্যান্ড ম্যায়েসলানটেকারিং নামের একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা বিশ^ব্যাপী বেশ সমাদৃত। ইস্পাতের তৈরি একটি ‘মুভেবল’ বাঁধব্যবস্থার মাধ্যমে তারা বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। জোয়ার-ভাটার সময় এই কপাট খুলে-বন্ধ করে আশপাশের প্রাচীন শহর ও কৃষিজমিকে রক্ষা করা হয়।
  • এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হুভার ড্যাম, ইতালির মোস প্রজেক্ট ইত্যাদি বন্যা নিয়ন্ত্রণে চমৎকার কার্যকরী ব্যবস্থা।

ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মেটাতে ভূপৃষ্ঠ-বৃষ্টির পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

একসময় নদী-নালা, পুকুর, খাল ও জলাধারের পানি পান করতে, গোসল, কৃষির সেচসহ সর্বত্রই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ব্যাপক নদীদূষণ, ফসলে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের পোড়া তেল, কলকারখানার বর্জ্য ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার দিন দিন কমছে। এমনকি অসংখ্য উৎসের পানি পরিশোধন করেও ব্যবহার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। আর সে কারণেই দৈনন্দিন প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। এখন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি পানিই উত্তোলন করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ থেকে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ দ্বারা এই পানি উত্তোলনের ফলে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে আশঙ্কাজনকভাবে। সবচেয়ে দ্রুত নামছে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে ভয়াবহ এক পরিবেশ বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় আমরা। সুপেয় পানির সংকট ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর তাই ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মেটাতে অতিদ্রুত যা যা করণীয়-

  • কৃষি উৎপাদনে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ বাড়ানো।
  • ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করা হলেও বিভিন্নভাবে তা আবার পূর্ণ হয়ে যায়। এ জন্য পুকুর, খাল, নদী খননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধারণ।
  • পানি যেন গাছপালার মাধ্যমে ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য প্রচুর বনায়ন করা।
  • নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা ছেড়ে স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণ।
  • ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সব ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন নিশ্চিত করা।

দুর্যোগ সহনীয় টেকসই আবাস

আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্তি পাচ্ছে না দেশীয় ঘরবাড়িগুলো। এ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর বন্যাকবলিত। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ জন্য টেকসই আবাসন নির্মাণকৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্যাকবলিত এলাকায় এমন স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে, যা হবে বন্যা সহনীয়। অর্থাৎ স্থাপনাটি যেন বন্যার পানিতে ভেসে থাকতে পারে। বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ওপরে উঠবে। পানি যত দিন থাকবে, ঘরটিও তত দিন স্বস্থানে ভাসমান অবস্থায় থাকবে। পানি নেমে গেলে আবার আগের অবস্থানে ফিরবে। এই ঘর নির্মাণে দরকার-

  • পিভিসি প্লেট
  • ব্যারেল
  • বাঁশ
  • কাঠ
  • ফেরোসিমেন্ট প্যানেল
  • ইন্টারলকিং প্লাস্টিক ব্লক ইত্যাদি।

এই উপকরণসমূহ ব্যবহার করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় সহজেই ভাসমান বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব।

এ ছাড়া ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি এবং সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বাড়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় বেড়েছে লবণাক্ততা। লবণাক্ততার মারাত্মক শিকার হচ্ছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। লবণাক্ততার কারণে ভবনের কলামে, ছাদে, বিমে ধরছে ফাটল। বেরিয়ে আসছে মরিচা ধরা রড। রড পারছে না কংক্রিটের ঢালাই ধরে রাখতে। ফলে ভবনগুলো হচ্ছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী। এ ছাড়া ভবনের গায়ে ড্যাম্প (Damp) হওয়া অতি সাধারণ এক সমস্যা। এসব সমস্যা থেকে ভবনকে সুরক্ষিত রাখতে যে উপকরণসমূহে স্থাপনা নির্মাণ করা যেতে পারে-

  • প্লাস্টিক ব্লক
  • অটোক্লেভড গ্যাসবেটন ব্লক
  • কংক্রিট হলো-ব্লক
  • ফেরো সিমেন্ট ব্লক
  • রেমড আর্থ
  • প্রি-স্ট্রেসড কংক্রিট হলো-স্লাব
  • প্রিকাস্ট ফেরোসিমেন্ট চ্যানেল
  • ফেরোসিমেন্ট পানির ট্যাংক
  • বাঁশ
  • কাঠ প্রভৃতি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলীয় বন রক্ষা ও সবুজ বেষ্টনী সৃজন

উপকূলীয় বন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে জীবনহানি এবং সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচায়। বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম সফল উপকূলীয় বনায়নকারী দেশ। বরাবরের মতো এবারও বুক পেতে দিল সুন্দরবন। বুলবুলের ক্ষতির ধাক্কা একাই ৭৩ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে সুন্দরবন। অতীতেও সুন্দরবন বহুবার নিজে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্ষা করেছে দক্ষিণ জনপদকে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার গতিশক্তিও অনেকটাই কমে গিয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনের কারণে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলের সবুজ এই বেষ্টনী প্রতিনিয়ত সুরক্ষা প্রদান করলেও উপকূলীয় বনের গাছ কাটা, অবৈধ দখল ও পরিবেশবান্ধবহীন উন্নয়নের ফলে উজাড় হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের রক্ষাকবচ। জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় তথা উপকূলীয় এলাকার মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার স্বার্থে সবুজ বেষ্টনীর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সুরক্ষা এখন সময়ের দাবি।

আরও কিছু সুপারিশ

  • স্থাপনা নির্মাণে ভূমির সঠিক ব্যবহার ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
  • পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার।
  • স্থাপনায় নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর, বায়ু) ব্যবহার
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার
  • পোড়ানো ইটের বদলে ইকো ব্রিক বা কংক্রিট হলো-ব্লকের ব্যবহার বৃদ্ধি করা
  • নদীতে অপ্রয়োজনীয় ও অসাঞ্জস্যপূর্ণ বাঁধ, সেতু, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে অক্ষুণ্ন রাখা।
  • শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য, পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা নদী বা জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করা এবং ফেললেও সঠিক পরিশোধন করে ফেলানো।
  • সীমিত পানি, উন্নত প্রযুক্তি ও চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করে ফসল ফলানোর বিষয়ে কৃষকদের উৎসাহী করা। সে লক্ষ্যে হাইড্রোপনিক ও গ্রিন হাউস প্রযুক্তির মতো উন্নত চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করে তোলা এবং সে পদ্ধতিতে চাষ করতে বাধ্য করা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।  

Related Posts

ঢাকা: এক অবিরাম অন্তবিস্ফোরণ

অ্যারন বেটস্কি ফিলাডেলফিয়ার একজন সমালোচক ও শিক্ষক। এর আগে তিনি ভার্জিনিয়া টেকের স্কুল অফ আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের অধ্যাপক…

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আগামীর সাশ্রয়ী আবাসন শিল্পকে বদলে দেবে

বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির ফলে সাশ্রয়ী বা এফোর্ডেবল হাউজিং আজ একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে…

বাংলার বাঘা মসজিদ সুলতানী ঐতিহ্যের এক সাক্ষী

বাংলার ইতিহাস কত সমৃদ্ধ তা শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখলেই বুঝা যায়। দেশে দেশে ইতিহসে রয়েছে বৈচিত্রতা। কোন দেশে…

স্থপতি নিশাতের ঘরে মা দিবসের এক দুপুর

মা দিবস উপলক্ষে কি ধরনের লেখা দিব তা নিয়ে বেশ চিন্তাই ছিলাম। সাথে সাথে মনে হলো, দুই প্রজন্মের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Award
দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউলের আবাসন স্থাপত্যে নতুন দিগন্ত
ভবিষ্যতের ৮টি স্টেডিয়াম যা প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে
নুহাশ পল্লী: হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সবুজ রাজ্য
Cover
Ramna Park
রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়
Qatar
Electric