মশাল হাতে নারীটি… স্ট্যাচু অব লিবার্টি

বর্তমান বিশ্বের সব চাইতে ক্ষমতাধর দেশ কোন্টি জানতে চাইলে সবার উত্তর যে একই হবে তাতে কোনো সংশয় নেই। সবাই পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের নামই বলবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সোনালি ইতিহাসের খবর কম-বেশি সবাই জানেন। নিজের দেশে গণতন্ত্রের সঠিক অনুশীলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে সুপরিচিত। এই দেশটির গণতন্ত্র, স্বাধীনতার কথা বলে এমন অনেক কিছুই আছে হয়তোবা। কিন্তু এই দেশে এমন একটি স্থাপনা রয়েছে যা কিনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র অথবা মানবাধিকারের কথা নয়, সারা বিশ্বের মানুষের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র অথবা মানবাধিকারের কথা বলে মাথা উঁচু করে। হ্যাঁ, পাঠক আমি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রতীক স্ট্যাচু অব লিবার্টির বা লেডি লিবার্টির কথাই বলছি।

কিভাবে এলেন লেডি লিবার্টি

১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি হবে ১৮৮৬ সালে। এ কথা মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো বন্ধু ফ্রান্স ভাবতে থাকে স্মরণীয় কিছু করার। এ সময় প্রকৌশলী ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি ফ্রান্স সরকারের কাছে একটি অভিনব পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার হিসেবে একটি অনন্য বিশাল মূর্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ফ্রেঞ্চ ভাষায় যার নাম হবে La liberté éclairant le monde। ইংরেজিতে স্ট্যাচু অব লিবার্টি, যা বাংলায় স্বাধীনতার মূর্তি। সেই থেকেই লেডি লিবার্টির জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয়। মূল নকশা প্রকৌশলী ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডির হলেও কাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেল। পাদমূলের প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন রিচার্ড মরিস হান্ট। ফ্রান্সে এটি নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। এর প্রায় দশ বছর পর নির্মাণ শেষ হয় ১৮৮৪ সালের জুন মাসে। এর পর মূর্তি নির্মাণ হয়ে গেলে ৩৫০ টুকরো করে এটিকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয় ১৮৮৫ সালের শেষ দিকে। যে জাহাজে করে লেডি লিবার্টি পাড়ি জমান নিউইয়র্কে তা ছিল একটি ফরাসি জাহাজ। নাম ফ্রিগেট ইসেরে। তার পর নিউইয়র্কের হাডসন নদীর তীরে অবস্থিত লিবার্টি দ্বীপে এটিকে পুনরায় সংযুক্ত করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সেই সোনালি ক্ষণ থেকে আজ পর্যন্ত লেডি লিবার্টি মশাল ও আমেরিকার সংবিধান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ঠায়। এর মাঝে ১৯২৪ সালের ১৫ অক্টোবর এটি আমেরিকার জাতীয় সৌধ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

গঠনশৈলী

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রতীক এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের লিবার্টি দ্বীপে অবস্থিত। প্রায় ১২ একর জায়গা নিয়ে রয়েছে এটি। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের হাতে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার দেখভাল করার দায়িত্ব। এর উচ্চতা কত জানার আগে জেনে নিন, যে ভিত্তির উপর এটি দাঁড়িয়ে আছে তার উচ্চতাইবা কত? তবে শুনুন। এর ভিত্তির উচ্চতা ৬৫ ফুট। মানে প্রায় ৬ তলার সমান! এর পর ভিত্তি থেকে পাদমূল পর্যন্ত ৮৯ ফুট। পাদমূল থেকে হাতে ধরে থাকা মশালের উচ্চতা হলো ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি। অর্থাৎ মাটি থেকে মশাল পর্যন্ত মোট উচ্চতা হলো ৩০৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। মানে প্রায় ত্রিশ তলা দালানের সমান! দাঁড়ান, আরও বাকি আছে। লেডি লিবার্টির গোড়ালি থেকে মাথার উচ্চতা : ১১১ ফুট ৬ ইঞ্চি। হাতের দৈর্ঘ্য : ১৬ ফুট ৫ ইঞ্চি। এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত ১০ ফুট। হাতের তর্জনী ৮ ফুট ১ ইঞ্চি। দুই চোখের মধ্যবর্তী দূরত্ব ২ ফুট ৬ ইঞ্চি। মুখ ৩ ফুট, নাক ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি, কোমর ৩৫ ফুট… কি হাঁফিয়ে উঠেছেন? আরও যে কিছু তথ্য জানার আছে। লেডি লিবার্টির মাথার মুকুটে কাঁটা রয়েছে ৭টি। এই সাতটি কাঁটা নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই সাতটি কাঁটা সাত মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। আবার অনেকের মতে, এই সাত কাঁটা সাত মহাদেশের নয়, বরং সাত মহাসাগরের প্রতিনিধিত্ব করে। লেডি লিবার্টির মুকুটে জানালার সংখ্যা ২৫টি। যে সকল দর্শনার্থী লেডি লিবার্টির ভেতর দিয়ে লিফটে করে মুকুট অবধি পৌঁছতে পারেন তারা সেখান থেকে বিশ্বের এক চমৎকার ছবি দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন। লেডি লিবার্টির হাতে ধরা বইটি দৈর্ঘ্যে ২৩ ফুট ৭ ইঞ্চি, চওড়ায় ১৩ ফুট ৭ ইঞ্চি, পুরুত্বে ২ ফুট। বইয়ের গায়ে লেখা JULY IV MDCCLXXVI। যার অর্থ হলো ৪ জুলাই ১৭৭৬, আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। এই বিশালাকৃতি মূর্তি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে স্টিল ও কপার। ব্যবহৃত স্টিলের ওজন ১১৩.৪ মেট্রিক টন আর মূর্তিতে ব্যবহৃত তামার ওজন ২৭.২২ মেট্রিক টন। মূর্তির মোট ওজন ২০৪.১ মেট্রিক টন। ১৮৮৬ সালে লিবার্টি আইল্যান্ডে স্থাপনের পর ১৯৩৮, ১৯৮৪ ও ২০১১ সালে এটির সংস্কার করা হয়েছে তিন দফা। এর সংস্কার কাজ এখনও চলছে। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে এটিকে আবার দর্শকদের দেখার জন্য খুলে দেওয়া হবে।

বিশ্বের সেরা স্থাপনা

২০১১ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের মাঝে এক জরিপ চালানো হয়। তাতে বিশ্বের সব চাইতে জনপ্রিয় স্থাপনা হিসেবে মর্যাদা পায় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। বিশ্বের তাবত চমৎকার সব স্থাপনা যেমন আইফেল টাওয়ার, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, রোমের কলোসিয়াম, লন্ডনের বিগ বেন এসবকে পিছু রেখে পর্যটকরা বেছে নিয়েছেন এই নারী মূর্তিটিকেই। প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি পর্যটক এই মূর্তিটি দেখতে আসেন নিউইয়র্কে। যারা আসেন তারা ফিরে যান এক অজানা ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে।

ওহ হো, যাওয়ার আগে আরেকটা কথা জানিয়ে দেই চুপিচুপি। আসছে ২৮ অক্টোবর এক বিশাল উৎসবের মাধ্যমে লেডি লিবার্টির ১২৫তম জন্মদিন পালন করবে মার্কিনিরা। মূর্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে নিউইয়র্ক বন্দরে জাহাজের বহর, সঙ্গীতানুষ্ঠান, বক্তৃতার আয়োজন করা হবে। সেই সাথে থাকবে একটি বিশাল কেক ও চোখ ধাঁধানো আতশবাজি অনুষ্ঠান। পাশাপাশি লেডি লিবার্টির ১২৫ বছরের কথা মাথায় রেখে নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে, যেখানে ১২৫ জনকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ইতিহাসের অংশ হতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন লিবার্টি আইল্যান্ড থেকে, আর যদি যানই লেডি লিবার্টিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছাটা জানিয়ে আসতে ভুলবেন না যেন!

ফয়সাল হাসান সন্ধী

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৮ তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১২

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top