দৃশ্যপট-১: গাড়ি কিনেছেন নতুন আর আজই লংড্রাইভে কোথাও ঘুরতে যাবেন। মনটা বেশ উৎফুল্ল। গাড়িতে বসলেন। গাড়িটা স্টার্ট দিতেই কিছুক্ষণ ঘরঘর করে বন্ধ হয়ে গেল। গিয়ারটা নিউট্রালে আছে কি না দেখে আবার চাবিটা ঘোরালেন কিন্তু গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। মনটাই আপনার খারাপ হয়ে গেল।
দৃশ্যপট-২: গতকালই একটা স্মার্টফোন ফোন কিনেছেন। ব্রান্ডনিউ। ভাবছেন বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলি। কিন্তু ফোনের সুইচ অন করতেই আলো জ্বলে উঠল ফোনের স্ক্রিনে। এরপর দপ করেই নিভে গেল। বারবার চেষ্টা করেও সেই একই অবস্থা।
দৃশ্যপট-৩: নতুন কম্পিউটার কিনেছেন। অন করতেই কিছুক্ষণ পর কম্পিউটারের স্ক্রিন আলোকিত হলো। যেই না কোনো কিছু লেখার জন্য কি-বোর্ডে চাপ দিলেন আর অমনিই কম্পিউটার অফ হয়ে গেল।
ওপরের সমস্যাগুলোর কারণ একটাই। ব্যাটারির সমস্যা। কেননা প্রতিটি যন্ত্রাংশই প্রাথমিকভাবে সচল রাখে ব্যাটারি। ব্যাটারি মূলত ইলেকট্রিক সেলবিশেষ। ব্যাটারি থেকে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। একটি ব্যাটারি মূলত দুই বা ততধিক সেলের সমন্বয়ে গঠিত, যা সিরিজ তথা প্যারালালভাবে যুক্ত থাকে। ব্যাটারির সেলে একটি নেগেটিভ ইলেকট্রোড থাকে, যা আয়ন তৈরি করে থাকে ইলেকট্রলাইট, যা আয়ন কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করে আর থাকে একটি পজিটিভ ইলেকট্রোড, যা ব্যাটারিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। সেই রাসায়নিক পদার্থ পরবর্তী সময়ে ফেলে দেওয়া হয় তখন সেই ব্যাটারিতে ইলেকট্রোড থাকে। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে বিদ্যুৎশক্তি এর ভেতর প্রবাহিত হয়ে পুনরায় ফিরে আসতে পারে। যেটাকে স্টোরেজ বা রিচার্জ-অ্যাবল ব্যাটারি বলা হয়। এটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
ব্যাটারির রিসাইক্লিনিং বা পুনর্ব্যবহার
ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে অব্যবহৃত বা অকেজো ব্যাটারি যাতে পরিবেশের ক্ষতি না করে। ব্যাটারি ব্যবহারের শেষে যে স্থানে পরিত্যক্ত দ্রব্য হিসেবে এটি ফেলে দেওয়া হয়, সেখানে স্বভাবতই একটা ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে সেখানকার মাটি ও পানি দূষিত হওয়ার ঝুঁকিটা বেশি।
ব্যাটারির ধরন অনুযায়ী পুনর্ব্যবহারোপযোগীকরণ
সব ধরনের ব্যাটারিকেই পুনর্ব্যবহারোপযোগী করা যায়। যদিও কোনো কোনো ব্যাটারি খুব তাড়াতাড়ি পুনর্ব্যবহারোপযোগী করা সম্ভব। যেমন লিড অ্যাসিড অটোমোটিভ ব্যাটারি (এটা প্রায় ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহারোপযোগী)। অন্যান্যের মধ্যে নিকেল ক্যাডমিয়াম, নিকেল মেটাল হাইড্রাইড, লিথিয়াম আয়ন ও নিকেল জিঙ্ক উল্লেখযোগ্য।
লিড অ্যাসিড ব্যাটারি
এ ধরনের ব্যাটারি সাধারণত গাড়ির গল্ফ কোর্টে, ইউপিএস, কলকারখানায় ফর্ক লিফট গাড়িতে, মোটরসাইকেলে ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। লিড অ্যাসিড ব্যাটারির লিডকে পুনর্ব্যবহারোপযোগী করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অনেক শহরে লিড অ্যাসিড ব্যাটারিকে পুনর্ব্যবহারোপযোগী করার সার্ভিস সেন্টার রয়েছে। তারা ব্যবহৃত ব্যাটারিকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে পুনর্ব্যবহারোপযোগী করার জন্য অধিক উৎসাহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯৭ শতাংশ লিড পুরোনো ব্যাটারি থেকে সংগৃহীত। গাড়িতে নতুন যে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, সেটিও পুরোনো ব্যাটারিতে তৈরি পুনর্ব্যবহারক্ষম ব্যাটারি। পরবর্তী সময়ে সেই পুরোনো ব্যাটারিকে পুনর্ব্যবহারোপযোগী করে আবার বিক্রি করা হয়। বেশির ভাগ ব্যাটারির দোকান এবং পুনর্ব্যবহারোপযোগী ব্যাটারি, যা পরিত্যক্ত হিসেবে গণ্য হয় তা মুদ্রার বিনিময়ে বিকিকিনি হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবসায় ঝুঁকি কম। যখন লিড মেটালের বাজার উচ্চমূল্য হয় তখন পরিত্যক্ত ব্যাটারিগুলোর প্রয়োজন বেশি দেখা দেয়।
সিলভার অক্সাইড ব্যাটারি
এ ধরনের ব্যাটারি সাধারণত ব্যবহার করা হয় হাতঘড়ি, দেয়াল ঘড়ি, খেলনা এবং কিছু কিছু মেডিকেল যন্ত্রাংশে। সিলভার অক্সাইড ব্যাটারিতে পারদের পরিমাণ থাকে কম। বেশির ভাগ দেশে এমন আইন প্রণয়ন করা আছে যে সিলভার অক্সাইড দ্বারা তৈরি ব্যাটারি যেন সঠিকভাবে চালনার পাশাপাশি সঠিক স্থানে পরিত্যাগ করা হয়। এর প্রধান কারণ যাতে পরিবেশে পারদের আধিক্য না থাকে। সিলভার অক্সাইড ব্যাটারি থেকেও পারদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বিশ্বব্যাপী যে দেশগুলোতে ব্যাটারির পুনর্ব্যবহারোপযোগী করা হয় বেশি
১. বেলজিয়াম – ৫৯ শতাংশ
২. সুইডেন – ৫৫ শতাংশ
৩. অস্ট্রিয়া – ৪৪ শতাংশ
৪. জার্মানি – ৩৯ শতাংশ
৫. নেদারল্যান্ড – ৩২ শতাংশ
৬. ফ্রান্স – ১৬ শতাংশ
৭. যুক্তরাজ্য – ৩২ শতাংশ
৮. বাংলাদেশ – ৫০ শতাংশ
ব্যাটারির পুনর্ব্যবহারোপযোগিতা প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রয়োজনীয়তা যেমন বেড়েছে, সে অনুযায়ী গাড়ি, খেলনা, রেলওয়ের, বার্তা প্রদানের যন্ত্র, কম্পিউটার মতো প্রতিটি স্থানে ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। তাই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যারা ব্যাটারি তৈরি করে, তাদের চাহিদা রয়েছে মেটাল রিকভোর করার। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ লিড সংগ্রহ করা হয় পুরোনো ব্যাটারি থেকে।
ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার পরিবেশদূষণ কমায়
ব্যাটারি একবার ব্যবহার করে ফেলে না দিয়ে সেটা যদি পুনর্ব্যবহারোপযোগী করে ব্যবহার করা যায়, তবে পরিবেশদূষণ কম হবে। উত্তর আমেরিকায় প্রায় ১৫ বিলিয়ান ব্যাটারি বিক্রি হয় প্রতিদিন। যে হারে ব্যাটারি বিক্রি হয়, তাতে ধারণা করা যায়, সেখানে হয়তো অনেক ব্যবহৃত ব্যাটারি ফেলে দেয় আবর্জনার স্তূপে, যা পরিবেশের জন্য মোটেই ভালো নয়। ব্যাটারি ব্যবহার করার পর যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট একটা স্থানে ফেলা উচিত। পরবর্তী সময়ে সেগুলো যে স্থানে রিসাইকেলিং করা হয়, সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষত যে স্থানে পরিত্যক্ত বর্জ্য পদার্থ জমা করা হয়, সেখান থেকে ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ করা যেতে পারে। তা ছাড়া বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করা উচিত যাতে এর দ্বারা পরিবেশ বিপন্ন না করে। যেমন নিকেল-ক্যাডমিয়াম ব্যাটারি। ব্যাটারি উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমন ধরনের কারখানা ডিজাইন করা দরকার, যেখানে যে ব্যাটারি তৈরি হবে, সেটার মেটাল যাতে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী হয়।
লিড অ্যাসিড ব্যাটারি সাধারণত অটোমোবাইল এবং মোটরসাইকেলে ব্যবহার করা হয়। সে জন্য এগুলো খুব সহজেই চেনা যায় সাইজ আর ওজন দেখে। বিশেষ করে সেই ব্যাটারিগুলোতে মেটাল লাগ (Lug) লাগানো থাকে। লিড অ্যাসিড ব্যাটারির ব্যবহার হয় যান্ত্রিক উপায়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যাতে চুরি সম্বন্ধে সতর্ক করা যায়, কম্পিউটারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এবং ব্ল্যাকআউটের সময় এর ব্যবহার বেশি। বেশির ভাগ ব্যাটারির গায়ে একটা লিফলেট থাকে যে কারণে সহজেই অনুমান করা যায় কোন ধরনের কাজের জন্য ব্যাটারিটি উপযোগী।
শেষকথা
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ব্যাটারি রিসাইকেলিং করা হয়। এ দেশে ব্যাটারি প্রস্তুতকারকদের মধ্যে রয়েছে রহিম আফরোজ রিনিউবল এনার্জি লি., পান্না ব্যাটারি লি. এবং ইনজেন টেকনোলজি লি.। এদের মধ্যে বৃহত্তম লিড অ্যাসিড ব্যাটারি প্রস্তুতকারক হচ্ছে রহিম আফরোজ। এরা ব্যাটারি তৈরি করে এবং পুনর্ব্যবহারোপযোগীও করে থাকে। তাদের পরিত্যক্ত ব্যাটারি এখানে সেখানে না ফেলে ঢাকার অদূরে সাভারে একটি নির্দিষ্ট নিরাপদ স্থানে ফেলা হয়। তা ছাড়া ব্যাটারির বর্জ্য থেকে লিড আলাদা করার জন্য একটি মেটাল গলানোর নিজস্ব প্লান্টও রয়েছে তাদের।
প্রকাকশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫