রাজকীয় এক বাসভবনের ইতিকথা

বাকিংহাম প্যালেস শুধু একটি প্রাসাদই নয়, বৃহৎ এক ইতিহাস। লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার শহরের এই রাজপ্রাসাদটি ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি আর রাজকীয় আতিথেয়তার কেন্দ্রবিন্দু। ১৮৭৩ সাল থেকে এই রাজপ্রাসাদটি ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে এটা শাসকদের প্রশাসনিক সদর দপ্তর। যদিও এটি রানীর অনেক অফিশিয়াল কার্যক্রম এবং অভ্যর্থনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কাজে ব্যবহৃত, তবুও প্রতি গ্রীষ্মকালে বাকিংহাম রাজপ্রসাদের রাষ্ট্রীয় কক্ষ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী বাকিংহাম রাজপ্রাসাদটি লন্ডন শহরের আবাসস্থল এবং রাজাদের প্রশাসনিক সদর দপ্তর হিসেবে স্বীকৃত।

১৭০৩ সালে বাকিংহামের ডিউক একটি বিশাল শহরের বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন বাকিংহাম প্রাসাদ নামে পরিচিত। প্রাসাদের একাংশ ১৫০ বছর যাবৎ ব্যক্তিমালিকানায় ছিল। ১৭১০ সালে উইলিয়াম উইনেল প্রথম বাকিংহামের ডিউক ও নরম্যানের জন্য বাকিংহাম নকশা তৈরি করেন। ১৭৬১ সালে রাজা তৃতীয় জর্জ রানী শার্লটের ব্যক্তিগত বাসভবন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকে এটি ‘কুইন্স হাউস’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। ১৯ শতকে প্রকৌশলী জন ন্যাশ এবং এডওয়ার্ড ব্লোর এই প্রাসাদটিকে বৃহৎ আকারে রূপান্তর করেন। টাইবার্ন নদীর পানি জলাভূমিবিশিষ্ট ভূগর্ভ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল, যা এখনো এই অঙ্গনের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিভিন্ন সময় এই এলাকার মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে।

নতুন মুকুটের মালিক, রাজা জর্জ তাঁর স্ত্রী কুইন শার্লটকে প্রকৃতপক্ষে এই ভবনটির ব্যক্তিমালিকানায় দখলে অভিপ্রেত ছিল, তাই তদনুসারে এটা ‘রানীর বাসভবন’ নামে পরিচিতি পায়। ১৭৬২ সাল থেকে অবকাঠামোর পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। ১৭৭৫ সালে পার্লামেন্টের আইন অনুযায়ী এই সম্পত্তি মীমাংসিত হয় এবং রানী শার্লট জন্মগ্রহণ করেন। কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব ও গৃহসজ্জা কার্টর হাউস থেকে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের পরে অন্য সবকিছু কেনা হয়। যখন সেইন্ট জেমস রাজপ্রাসাদ অফিশিয়ালিভাবে রাজকীয় অনুষ্ঠানাদির আবাসস্থলে পরিণত হয়, ১৭৯১ সাল থেকে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদ নামে পরিচিতি লাভ করে।

বর্তমানে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদ ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। যাবতীয় রাজকীয় কার্যক্রম এবং বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের অভ্যর্থনা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান এ প্রাসাদেই উদ্্যাপিত হয়। প্রতিবছর ৫০ হাজারেরও বেশি লোক রাষ্ট্রীয় ভূরিভোজ, দুপুরের খাবার, রাতের খাবারে, সমাদরে এবং গার্ডেন পার্টিতে অতিথি হিসেবে আপ্যায়িত হয়। মহারানী সর্বদা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাপ্তাহিক সাক্ষাৎকার দেন এবং বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের নতুন নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের গ্রহণ করে প্রায় সারা বছর ধরেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সরকারি, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা, কমনওয়েলথ এবং জীবনঘনিষ্ঠ আরও অনেক কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার অভ্যর্থনা অনুষ্ঠিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৩ সালে কমনওয়েলথ, ইয়ুথ এবং শিক্ষা উদ্্যাপনের জন্য নিমন্ত্রিতদের অভ্যর্থনা অনুষ্ঠিত হয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ৩৫০ জন অতিথি যোগ দেন এবং কমনওয়েলথ যুব রাগবি বিশ্বকাপের খেলোয়াড়, সংগঠক এবং সমর্থকদের অভ্যর্থনার জ্ঞাতার্থে নিমন্ত্রণ করে।

বাকিংহাম ভবনটির সম্মুখভাগ ১০৮ মি. লম্বা, ১২০ মি. গভীর (কেন্দ্রীয় চতুর্ভুজক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত) এবং ২৪ মি. উচ্চতাবিশিষ্ট। প্রাসাদের মোট কক্ষের সংখ্যা ৭৭৫। এগুলোর মধ্যে ১৯টি রাষ্ট্রীয় কক্ষ, ৫২টি রাজপরিবার ও অতিথিদের কক্ষ, ১৮৮টি কর্মচারীদের কক্ষ, ৯২টি অফিসকক্ষ এবং ৭৮টি স্নানাগার। রাজপ্রাসাদের পশ্চাতভাগে বিশাল এবং পার্কের সাদৃশ্য বাগান আছে, যা লন্ডন শহরের সর্ববৃহৎ ব্যক্তিগত বাগান। এখানে প্রতি গ্রীষ্মকালে গার্ডেন পার্টির বিভিন্ন রাজকীয় অনুষ্ঠান, যেমন জন্মজয়ন্তী উদ্্যাপন করা হয়। এটা ৪০ একর (১৬ হেক্টর) বিস্তৃত, যা একটি হেলিকপ্টার নামার এলাকা, একটি হ্রদ এবং একটি টেনিস কোর্টের সমান। রাজপ্রাসাদের নিকটস্থ এলাকায় রাজকীয় আস্তাবলসমূহ; স্থপতি ন্যাশ যার নকশা তৈরি করেছিলেন, যেখানে রাজকীয় বাহন যেমন স্বর্ণখচিত কোচগুলো রাখা হয়েছে। রাজপ্রাসাদের এক স্থান থেকে অন্যত্র যাওয়ার ছায়াচ্ছন্ন সমতল স্থানটি স্যার অ্যাস্টন ওয়ব কর্তৃক নকশাকৃত এবং ১৯১১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার বৃহৎ স্মরণীয় অনুষ্ঠানে সম্পন্ন করা হয়। এটা প্রধানত রাষ্ট্রের অশ্বারোহীদের এবং গাড়ি আরোহীদের দীর্ঘ মিছিল এবং রাজকীয় পরিবারের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং বার্ষিকী সৈন্যদলের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়।

বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের ঝুলন্ত বারান্দা বৈশ্বিকভাবে অধিক প্রসিদ্ধ। ১৮৫১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার সময় প্রথম রাজকীয় বারান্দার প্রদর্শনী উদ্্যাপিত হয়, তখন এটা উন্মুক্ত করা হয়। তখন থেকে রানীর বার্ষিক জন্মদিন উদ্্যাপন উপলক্ষে সাধারণের কাছে বিশেষ ভূমিকায় রাজকীয় আত্মপ্রকাশ হয়, RAF বিমানাদির আনুষ্ঠানিক উড্ডয়ন, রাজকীয় বিবাহ অনুষ্ঠান, এমনকি বিশেষ জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান যেমন ব্রিটেনের সেনাবাহিনীর ৭৬তম বার্ষিকী উদ্্যাপন।

বাকিংহাম রাজপ্রাসাদকে শুধু প্রশাসনিক রাজতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয় না, এটা অনেক বেশি  পারিবারিক এক বাড়ি, বিশেষ করে রানীদের গ্যালারি এবং রাজকীয় উন্মুক্ত অঙ্গনের চারদিকে নির্মিত আস্তাবলসমূহ। এই রাজপ্রাসাদে রানী, রাজপুত্র চার্লস এবং রাজপুত্র এন্ডুয়ের জন্ম দিয়েছিলেন এবং সেই দিন থেকেই রাজপ্রাসাদের সম্মুখভাগে রাজকীয় জন্ম এবং মৃত্যুর সবার অবগতির জন্য তালিকা এখনো সংযুক্ত হয়। রাজকুমার ওয়েলস, ইয়র্কের ডিউক এবং রাজকুমার উইলিয়ামের নামকরণের পাশাপাশি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল এবং অনেক রাজকীয় বিবাহ অনুষ্ঠান বাকিংহাম রাজপ্রাসাদে উদ্্যাপিত হয়। অতি সম্প্রতি ক্যামব্রিজের এবং ডাস্তেসের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।

১৮২০ সালে সিংহাসনপ্রাপ্তির পর চতুর্থ কিং জর্জ সাধারণ মানের ছোট্ট একটি ধারণা থেকে এই আরামদায়ক বাসস্থানের নকশা প্রনয়ণ করেন। ১৮২৬ সালে যখন নির্মাণকাজের অগ্রসর হচ্ছিল, তখন প্রকৌশলী জন ন্যাশের সাহায্যে তিনি এটিকে আবাসস্থল বাড়ি থেকে রাজপ্রাসাদে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। রাজপ্রাসাদের বহিরাকৃতির নকশা ফ্রান্সের নিও ক্ল্যাসিক্যাল নকশানুযায়ী হয়। ১৮২৬ সালে রাজা বাড়িটিকে রাজপ্রাসাদে পরিণত করার প্রয়াস পান এবং পুনর্নির্মাণের খরচ ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড থেকে বেড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডে উন্নীত হয়। নবরূপদানের খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়েই চলেছিল এবং ১৮২৯ সালে অমিতব্যয়ী ন্যাশের নকশা প্রকৌশলী হিসেবে পদচ্যুতি করা হয়। ১৮৩০ সালে রাজা চতুর্থ জর্জের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাই রাজা চতুর্থ উইলিয়াম এই কাজটি শেষ করার জন্য এডওয়ার্ড ব্লোরকে নিয়োজিত করেন। ১৮৩৪ সালে অগ্নিকাণ্ডে ওয়েস্টমিনিস্টার রাজপ্রাসাদ ধ্বংসের পরে উইলিয়াম রাজপ্রাসাদকে নতুন পার্লামেন্টে পরিবর্তিত করার সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

১৯১১ সালে রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনের অংশ, যা প্রকৌশলী স্যার অ্যাস্টন ওয়েব দিয়ে নির্মিত, ভাস্কর স্যার টমাস ব্রক সেই দিকটাতেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্থাপন করেন। ১৯৩৮ সালে উত্তর-পশ্চিমের তাঁবু পটমণ্ডপ/চন্দ্রাতপের নকশা কোমল গাছপালাকে রক্ষা করার গৃহ হিসেবে ন্যাশ তৈরি করেন কিন্তু পরে তা একটি সুইমিংপুলে রূপান্তরিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রাজপ্রাসাদে বোমা বিস্ফোরিত হয়। ১৯৪০ সালে রাজপ্রাসাদসংলগ্ন ভজনালয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি বোমা প্রাসাদের চতুষ্ক স্থানে, যেখানে রাজা চতুর্থ জর্জ এবং রানী এলিজাবেথের আবাসস্থল এবং অনেক জানালাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। লন্ডনের ইমপেরিয়াল যুদ্ধ জাদুঘরে পরে বোমা বিস্ফোরণের ইঞ্জিনটির প্রদর্শন হয়। যুদ্ধের পর জন মলেম অন্যদের সঙ্গে নিয়ে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত এই রাজপ্রাসাদটি পুনঃস্থাপিত করেন। ১৯৭০ সালের গ্রেড-১ তালিকার ভবনগুলোর আকৃতি সাদৃশ্য ছিল।

এই সেই রাজপ্রাসাদ, যা অসংখ্য ইতিহাসের সাক্ষী, পৃথিবীর ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের বিখ্যাত সব রাজা-বাদশাহ, রাজনীতিবিদ, শিল্পী, অভিনেতা, খেলোয়াড়সহ অন্যদের পদধূলিকে ধন্য হয়েছে। আর ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে। বাকিংহাম প্যালেস শুধু একটি রাজপ্রাসাদই নয়, এ যেন ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৯তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৮।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top