যেকোনো মুসলিম সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য হচ্ছে তার মসজিদ। স্থাপত্যে, নকশায়, সৌন্দর্যে নয়নাভিরাম এসব মসজিদ শতাব্দীর পর শতাব্দী লালন করে চলেছে ওই স্থানের ওই সময়ের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। কালের নীরব সাক্ষী হয়ে পবিত্র এ স্থাপনাগুলো সেই সময়কার শাসকদের করছে জীবন্ত। প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম লীলাভূমি বিখ্যাত টাইগ্রিস নদী (স্থানীয় ভাষায় দজলা) বিধৌত ছোট শহর সামারা। ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যানখ্যাত ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ১২০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থান এ শহরের। ইসলামের চারটি পবিত্রভূমির অন্যতম এই নগর, যাকে প্রাচীনকালের সর্ববৃহৎ আকর্ষণীয় নগর হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেখানেই অবস্থিত দি গ্রেট মস্ক অব সামারা।
নবম শতকে আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল মনোমুগ্ধকর এই মসজিদের নির্মাতা, যেটা কিনা নির্মাণের পর থেকে পরবর্তী ৪০০ বছর পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মসজিদ হিসেবে বিরাজমান। মঙ্গল রাজা হালাকু খান ও তার সৈন্য কর্তৃক ১২৭৮ সালে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
সময়টা ৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দ। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কায় আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল বাগদাদ থেকে পলায়ন করে আশ্রয় নেন ছোট্ট শহর সামারায়। পরবর্তী ১৪ বছরের রাজত্বকালে তিনি তৈরি করেন অসংখ্য স্থাপনা। তন্মধ্যে তৎকালীন সর্ববৃহৎ ও নয়নাভিরাম দি গ্রেট মস্ক অব সামারা খ্যাত এ মসজিদটি ছিল শ্রেষ্ঠ। ১৭ হেক্টর জমির ওপর সম্পূর্ণ ইট ও কাদার সমন্বয়ে নির্মিত এ মসজিদটি। আর মূল কাঠামো দখল করে আছে ৩৮ হাজার বর্গমিটার তথা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার বর্গফুট। ৮৪৮ সাল থেকে ৮৫১ খিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় তিন বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল অনিন্দ্য সুন্দর এ মসজিদটি।
মসজিদের অবস্থান আয়তাকার। চারপাশে ৩০ ফুট উচ্চতার ও প্রায় ৯ ফুট চওড়া দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত, যা মসজিদের সুরক্ষাকে করেছে অটুট। ৪৪টি অর্ধবৃত্তাকার ও চার কোনায় চারটি বৃত্তাকার মিনারের সমন্বয়ে মসজিদটি তৈরি। প্রতিটি প্রবেশমুখে রয়েছে খিলানাকৃতির জানালা। আর মিনারের মাঝখানে রয়েছে বর্গাকৃতির কারুকার্য। রয়েছে ১৭টি করিডোর। মসজিদে প্রবেশের জন্য এর ১৬টি প্রবেশদ্বারের যেকোনোটি আপনি ব্যবহার করতে পারবেন। দেয়ালগুলো গাঢ় নীল রঙের মোজাইকে আবৃত। মার্বেল পাথরে নির্মিত মসজিদটির মেহরাবটি আয়তাকার। দেয়ালে অবস্থিত ২৮টি জানালার মধ্যে ২৪টি দক্ষিণমুখী। দক্ষিণমুখী হওয়ায় চারপাশের নির্মল বাতাস পাওয়া যেত প্রচুর, যা মসজিদের নামাজিদের জন্য আরামদায়ক এক পরিবেশ সৃষ্টি করত।
মালিয়া মিনার নামে খ্যাত মূল মসজিদের বাইরে অবস্থিত মসজিদের মিনারের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। মালিয়া অর্থ প্যাঁচানো অথবা শামুকের আবরণ। এর সর্পিলাকৃতির জন্যই মিনারটির এই নামকরণ। ১৭০ ফুট উচ্চতার ও ১০৮ ফুট চওড়া মিনারটি রয়েছে মসজিদের বাইরের দেয়াল ঘিরে। এর সর্পিল আকৃতি অন্যান্য সব মিনার থেকে একে করেছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। মিনারটি বেলেপাথরের তৈরি। মসজিদের উত্তর পাশ থেকে একটু উত্তরমুখী এর অবস্থান। মসজিদের দেয়াল থেকে প্রায় ৮৮ ফুট দূরে অবস্থিত মিনারটির সঙ্গে মূল দেয়ালের রয়েছে একটি সংযোগ সেতু। মিনারের মাথা চন্দ্রাকৃতি। আর ভেতর থেকে বাইরের দৃশ্য দেখার জন্য রয়েছে আটটি কুলুঙ্গি। বলা হয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল তাঁর প্রিয় গাধার পিঠে চড়ে মিনারের শীর্ষে উঠে যেতেন বাইরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকন করতে। এই মিনারের মাথায় উঠেই দেওয়া হতো আজান। এর উচ্চতা ও অবস্থান আজানের শব্দকে অনেক দূর ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করত। টাইগ্রিস নদীর উপত্যকা থেকেও মিনারটি দেখা যেত।
১ এপ্রিল, ২০০৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক আক্রমণকালে মিনারের কিছু অংশ বিদ্রোহী কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাদের ধারণা ছিল আমেরিকান সৈনিক মিনারটি তাদের অবস্থান দেখার জন্য ব্যবহার করছে।
মসজিদের শৈল্পিকতা ও স্থাপত্য নিপুণতার দাবিদার। জ্যামিতিক ধাঁচে পুষ্পশোভিত পলেস্তারা দিয়ে মসজিদের ভেতরের সম্পূর্ণটা আবৃত, যা কিনা তৎকালীন ইসলামিক সজ্জার অন্যতম নিদর্শন। পরবর্তীকালে কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদটি সামারার এই মসজিদের আদলে নির্মাণ করা হয়।
মসজিদটির বাইরের দেয়াল ও ভেতরের কিছু সজ্জা আজও বিদ্যমান। রয়েছে মূল কাঠামো, যা স্মরণ করে দেয় সেই সময়কার কথা। দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে নামাজরত মুসল্লিদের ছবি। মানসপটে ভেসে ওঠে ব্যস্তময় একটি সাজানো, সুশোভিত নগরের ছবি।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫