বিশে^র সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই বঙ্গীয় বা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বাংলা অঞ্চলের পুরো অববাহিকার বিশাল অংশজুড়ে বিদ্যমান, যা দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এ দেশের অভ্যন্তরীণ নদী, খাল, জলাধার এবং দক্ষিণে সমুদ্র বিপুল পানির আধার। এই পানিই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব করা গেলে এ দেশের অর্থনীতি হবে অত্যন্ত শক্তিশালী; রয়েছে অপার সম্ভাবনার হাতছানি। আর ব-দ্বীপের এসব নানা সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিশাল এক পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ‘ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ শিরোনামে গৃহীত এই উদ্যোগটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা, যার ব্যাপ্তি ১০০ বছর (২১০০ সাল পর্যন্ত)।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা, পানি ও খাদ্যের নিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজনে ঝুঁকি মোকাবিলা নিশ্চিত করতেই গৃহীত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনার নেপথ্যে
জলবায়ুর পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশে^র প্রতিবেশব্যবস্থা আজ অত্যন্ত বিরূপ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নিচু অঞ্চলসমূহ রয়েছে প্রবল ঝুঁকির মুখে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে; বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে অন্তত ১৪ শতাংশ জমি হারাবে বাংলাদেশ। পরিণামে ৩০ মিলিয়ন লোক পরিণত হবে জলবায়ু শরণার্থীতে। অপর দিকে দেশটির অর্থনীতি, জীবন-জীবিকা, খাদ্য সংস্থান, যোগাযোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে নদী, সমুদ্র ও জলাভূমি রাখছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
আর তাই পরিবেশ ও প্রযুক্তিবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি এ দেশের পানি সম্পদ তথা নদী, সমুদ্র, হাওর, বিল ও উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় তাহলে একদিকে যেমন জলবায়ুর পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, তেমনি বিকাশ ঘটবে কৃষি, জলজ সম্পদ, যোগাযোগ, শিল্প, পর্যটনসহ নানা খাতে। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ হবে এসব কিছুরই সমাধান।
যেভাবে বাস্তবায়িত হবে
বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ পরিকল্পনাটি করেছে সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। নেদারল্যান্ডের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হবে এই প্রকল্পটি। বাংলাদেশের মতো নেদারল্যান্ডও একটি ব-দ্বীপ রাষ্ট্র এবং একই সমস্যাকবলিত।
কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে, পানি অব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে প্রতিবছর অনিয়ন্ত্রিত বন্যা হয় আর নেদারল্যান্ডস এ ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার ফলে থাকে বন্যা থেকে সুরক্ষিত। তা ছাড়া পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। দেশটির মিনিস্ট্রি অব ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড দি এনভায়রনমেন্ট পানি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে।
দেশটির এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচু স্থানে অবস্থিত। সবচেয়ে নিচু স্তরের গভীরতা ৬ দশমিক ৭ মিটার। এতে ওই অঞ্চলটি পানির নিচে ডুবে থাকার কথা। কিন্তু সুষ্ঠু পানিব্যবস্থার মাধ্যমে তারা এই সমস্যাকে সমাধান করে এখন এই অঞ্চলটিকে পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা এ ধরনের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করে প্রায় ৬ হাজার স্কয়ার কিলোমিটার নতুন ভূমি পেয়েছে। তাই বাংলাদেশ সরকার চায় তাদের কৌশল কাজে লাগাতে।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-এর প্রাথমিক ধাপ বাস্তবায়ন হবে ২০৩০ সাল নাগাদ। এই পরিকল্পনা যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টি ভৌত অবকাঠামো-সংক্রান্ত এবং ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণাবিষয়ক প্রকল্প রয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থায়নসংবলিত বাংলাদেশ ডেল্টা তহবিল গঠনের প্রয়োজন। এর মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ৮০ শতাংশ সরকারি তহবিল থেকে এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসবে।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা তহবিল ও একটি জাতীয় উচ্চ কমিটি। এই তহবিলের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে (পিপিপি) বিবেচনা করা হয়েছে।
ডেল্টা প্ল্যানের সুফল যত
পানিসম্পদ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদী খনন বা অঞ্চলভিত্তিক নানা উন্নয়ন কাজ অতীতে নানা সময় গৃহীত হয়েছে কিন্তু সেগুলোর প্রতিটিই ছিল স্বল্প মেয়াদের। ১০০ বছরের দীর্ঘ সময়ের কোনো পরিকল্পনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় গুরুত্বসহকারে নির্ধারণ করা হয়েছে কিছু হটস্পট। হটস্পট বা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো হচ্ছে-
১. উপকূলীয় অঞ্চল
২. বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল
৩. হাওর
৪. আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা
৫. পার্বত্য অঞ্চল
৬. নগর এলাকা
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। গৃহীত এসব কার্যক্রম এবং তা থেকে যেসব সুফল মিলবে সেগুলো হচ্ছে-
- বন্যার ঝুঁকি কমাতে ও নদীর পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়াতে নদ-নদী খনন ও ড্রেজিং;
- খাল, বিল, পুকুর, হ্রদের মতো প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, বাঁধ ও অন্যান্য পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সংস্কার;
- নদীভাঙন, নিয়ন্ত্রণ, নদী শাসন এবং নাব্যতা রক্ষাসহ সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা;
- নদীতে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌ-পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা;
- বন্যা ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো;
- সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা;
- যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা;
- নগর ও গ্রামে স্বাদু পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা;
- জলাভূমি ও হাওরের প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা;
- বন্যা ও ঝড়-বৃষ্টি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহর রক্ষা;
- পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো;
- নতুনভাবে জেগে ওঠা চর এলাকায় নদী ও মোহনা ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ;
- ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে বিদ্যমান বোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা অনুপ্রবেশের মোকাবিলা করা;
- উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে ওঠা নতুন জমি উদ্ধার এবং সুন্দরবন সংরক্ষণ করা;
- ব্লু ইকোনমির সুবিধা নিতে সমুদ্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ইকো-ট্যুরিজম চালু প্রভৃতি।
ডেল্টা প্ল্যানের ব্যয়-বৃত্তান্ত
ডেল্টা প্ল্যানের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ আসবে বেসরকারি খাত থেকে এবং বাকি ২ শতাংশ সরকারিভাবে নির্বাহ করা হবে। বর্তমানে এ খাতে মোট দেশজ আয়ের শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় হওয়ায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে ১ দশমিক ২ শতাংশের।
২০১৭ অর্থবছরে ডেল্টা প্ল্যানে ব্যয়ের অঙ্ক ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩১ সাল নাগাদ তা ২৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় ধরা হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ-
- ২৭ হাজার ৭৩৮ বর্গকিলোমিটারের উপকূলীয় অঞ্চলের ২৩টি প্রকল্পে ৮৮ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা
- ২২ হাজার ৮৪৮ বর্গকিলোমিটার ব্যাপ্তির বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের নয়টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা
- হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের ১৬ হাজার ৫৭৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছয়টি প্রকল্পে ২ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা
- পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় আটটি প্রকল্পে ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা
- ৩৫ হাজার ২০৪ বর্গকিলোমিটার নদী ও মোহনা অঞ্চলের সাতটি প্রকল্পে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা
- এ ছাড়া নগর অঞ্চলের ১৯ হাজার ৮২৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১২টি প্রকল্পে ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি ও
- ক্রসকাটিং বা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অঞ্চলের (শেরপুর, নীলফামারী ও গাজীপুর) ১৫টি প্রকল্পে ৬৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা
বিশেষজ্ঞ ভাবনা
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বিইএন), ন্যাশনাল রিভার কনজারভেশন কমিশন, ভূতত্ত্ববিদ, পানি বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞসহ বেশ কিছু পরিবেশবাদী ও অন্যান্য সংগঠন ব-দ্বীপ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে যেহেতু দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা এই পরিকল্পার সঙ্গে জড়িত, সেক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় রয়েছে নানা অসম্পূর্ণতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা। এগুলো দূর করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে ‘পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এই ডেল্টা প্ল্যান তৈরি করছে পর্যাপ্ত সমীক্ষা ও পরামর্শ না করেই। সঠিক গবেষণা ও সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই ছাড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে দেশের প্রকৃতি পড়বে হুমকির মুখে; উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশব্যবস্থা বিনষ্ট হতে পারে। কারণ, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলে পানি ও পলির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া যেসব অসংগতি রয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ-
- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূল অঞ্চলকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নতুন পোল্ডার (সমুদ্র থেকে উদ্ধারকৃত নিচু জমি) নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো পোল্ডার শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পোল্ডার হচ্ছে ব-দ্বীপ ভূমি গঠনের জন্য অন্যতম হুমকি। আর প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা দেওয়ার মানেই পলিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা। কারণ, ব-দ্বীপ গঠনের মৌলিক প্রক্রিয়ায় এই পলিপ্রবাহ।
বিগত ১১ হাজার বছর ধরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ডেল্টা গঠিত হতে পেরেছে পলিপ্রবাহের মাধ্যমে। ১৭৮০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ব-দ্বীপের পূর্বাঞ্চলের তটরেখা ৫০ মাইল এগিয়েছে। কিন্তু পোল্ডার এই প্রাকৃতিকভাবে পলি পড়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। উপকূলীয় অঞ্চলে পোল্ডার-সুরক্ষিত এলাকা বাইরের এলাকার তুলনায় ইতিমধ্যেই এক থেকে দেড় মিটার নিচে চলে গেছে। কারণ, পোল্ডারের বাইরের এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে পলি পড়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। পোল্ডার সংরক্ষিত এলাকা পরিণত হচ্ছে বাঁওড়ে।
পোল্ডার বা সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা নিচু জমি ভাঙনের মুখে পড়লে পোল্ডার সংরক্ষিত এলাকার মানুষ প্লাবনে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের শিকার হয়। কারণ, পোল্ডার সংরক্ষিত এলাকা থেকে পানি সেচে সহজেই বের করা সম্ভব হয় না।
- পদ্মা ও যমুনার মতো প্রধান প্রধান নদীতে ব্যারাজ বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা আছে যমুনাকে সরু করার এবং নদীতীর কংক্রিট দিয়ে বাঁধানোর। এটা খুবই মারাত্মক পরিকল্পনা। পানিপ্রবাহ কমে পদ্মা নদীসহ বাংলাদেশের অনেক নদীতে পলি জমে চর জেগে নদীর নাব্যতা হারিয়েছে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে।
অনেক নদী, খাল, বিল এরই মধ্যে অস্তিত্ব হারিয়েছে। এখন ডেল্টা পরিকল্পনার আওতায় পদ্মার ওপর ড্যাম তৈরি করলে ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব দ্বিগুণে পৌঁছাবে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি দেশের আরও ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে। এতে করে ফসল উৎপাদন ও বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তা বিনষ্ট হবে।
- পরিকল্পনায় প্রস্তাব করা হয়েছে উড়িরচরে উপকূল বরাবর ভূমি সংযোজনের জন্য মেঘনায় ক্রস-ড্যাম নির্মাণের। যখন কৃত্রিম ভূমি সংযোজনের জন্য একটি নদী যখন ব্লক করে দেওয়া হয়, তখন এটি সৃষ্টি করে নতুন পরিবেশ পরিস্থিতি। প্রস্তাবিত এই ক্রস-ড্যাম মেঘনার স্রোতপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে। আর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে জলজ প্রাণীর জীবনচক্র।
যে জায়গাটিতে এই ড্যাম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটি মূলত ডিম পাড়ার সময়ে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র। এই ড্যামের মাধ্যমে নতুন ভূমি ভেসে উঠবে সত্য, তবে এর ফলে উপকূল অঞ্চলের পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে যাবে। তখন মানুষ ও তার জীবনযাপনের ওপর ক্রস-ড্যামের সম্ভাব্য প্রভাব আবিষ্কার করতে হবে এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে, যে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।
- এই ডেল্টা পরিকল্পনার আওতায় হাওর এলাকায় আরও বাঁধ ও মহাসড়ক নির্মাণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর ফলে এ এলাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যেসব নদী প্রবাহিত হয়েছে, এগুলো এতটাই প্রবল যে এগুলো বাধা ঠেলে তাদের প্রবাহের পথ করে নেবে। কৃত্রিমভাবে ভূমি সংযোজনের ফলে নদীর প্রশস্ততা কমে আসবে। তখন অনেক স্থানে নদীভাঙন বেড়ে যাবে।
- নেদারল্যান্ডসের ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনার আলোকে বাংলাদেশের ডেল্টা প্ল্যান তৈরি করা হলেও দুই দেশের বাস্তবতায় অনেক তফাৎ রয়েছে। ইউরোপের নিচু সমভূমি দেশটির সমুদ্রতীরবর্তী প্রায় পুরো সীমানাকে কয়েক শ ড্যাম ও ডাইক দিয়ে বাঁধা হয়েছে। কিন্তু উপকূলজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থাকায় আমাদের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সমীচীন নয়।
- নির্দিষ্ট ব-দ্বীপ সংরক্ষণে সেই ব-দ্বীপে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। দেশীয় পদ্ধতিতে ভোলা, পটুয়াখালীর গ্রামীণ জনপদে যে বাঁধ গ্রামবাসীরা নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছে, তা বেশ টেকসই ও কার্যকর। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় এ ধরনের স্থানীয় প্রযুক্তিও আমলে নেওয়া উচিত।
- পানি ব্যবস্থাপনার বর্তমান আইনি কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে ও কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে, নয়তো নদী সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যেই বহু নদ নদী মরে গেছে, এ সংখ্যা যেন আর না বাড়ে। বাংলাদেশ ডেল্টা আইন, ডেল্টা নলেজ ব্যাংক এবং ডেল্টা ফান্ড চালু করা উচিত এখনই। অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা নীতিমালার সংস্কার করা প্রয়োজন।
- জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোকে স্থানীয় মৎস্য ও কৃষিজীবী মানুষের জীবনধারার সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা থাকা উচিত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। বর্ষায় ভারত নিজ দেশে বন্যা ঠেকাতে বড় বড় আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে দেওয়া বাঁধের স্লুইস গেট ছেড়ে দিয়ে অতি স্বল্পসময়ে ফ্ল্যাশ ফ্লাড তৈরি করে, যা দীর্ঘস্থায়ী বন্যাপরিস্থিতি তৈরি করে কিংবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। ডেল্টা প্ল্যানে মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং ভারতের ছেড়ে দেওয়া পানির প্রবাহকে কীভাবে সমন্বিত করে দেশের বর্ষাকালীন ফলন এবং যোগাযোগব্যবস্থা ঠিক রাখা যাবে সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তঃসীমান্ত সংলাপ ও বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে। অবশ্য এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা আছে এ মহাপরিকল্পনায়। তবে সরকারকে কঠোরভাবে এর তদারকি করতে হবে।
- বিডিপি ২১০০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থার সঙ্গে অন্যান্য সহযোগী সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় সাধনের কাজটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন
ডেল্টা প্লান ২১০০-এর মতো একটি উচ্চাভিলাষী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। এসব সংস্কারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব যেমন এ পরিকল্পনার মাধ্যমে কমাতে হবে, তেমনি জলবায়ুর পরিবর্তনকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। এর মাধ্যমে কৃষি, ভূমি, পানিসম্পদ, শিল্প, বনায়ন, মৎস্যসম্পদসহ অন্যান্য সম্পদকে এ পরিকল্পনার আওতায় এনে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নকে সমন্বিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
- পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বর্ষা মৌসুমে আমাদের দেশে অনেক অঞ্চল প্লাবিত হয়। এই পানির প্রায় ৯২ শতাংশ চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মতো উজানের দেশগুলো থেকে আসে। ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে সৃষ্টি হয় বন্যার।
- বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ পানি অন্যত্র চলে যাওয়ায় পানির অপচয় ঘটে, যেটা ধরে রেখে খরার সময় কাজে লাগানো যায়। অন্যদিকে গ্রীষ্মকালে অনেক সময় বাংলাদেশকে খরার মধ্যে পড়তে হয়। এর ফলে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো কীভাবে পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়, তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এ জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে এর সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
- গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টি ও বন্যার পানিকে কীভাবে সংরক্ষণ করে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহার করা যায়, তা এই মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
- নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি অন্যতম সমস্যা। হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি, বসতবাড়ি, সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পৃথিবীতে সয়েল ইরোশন বা মাটির ক্ষয় কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা চললেও আমাদের দেশে তা হয় না। আমেরিকার সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার কনজার্ভেশন সোসাইটি বিভিন্ন ধরনের মাটির ক্ষয় রোধের প্রযুক্তি বের করেছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও মাটির ক্ষয় রোধে গবেষণার কাজ চলছে। এখান থেকে ধারণা নিয়ে কীভাবে আমরা নিজস্ব পদ্ধতিতে মৌলিক ও ফলিত গবেষণার মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ করতে পারি, সে বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি করে ভাবার সময় এসেছে।
শেষের আগে
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা এবং কৌশলের কোনো বিকল্প নেই। ব-দ্বীপ, পানি সম্পদ এবং কৃষির বিকাশে সরকার অতীতে আইইসিও মাস্টার প্ল্যান ১৯৬৪, ন্যাশনাল ওয়াটার প্ল্যান-১ (১৯৮৬), ন্যাশনাল ওয়াটার প্ল্যান-২ (১৯৯১), ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষিতে দ্য ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান (এফএপি-১৯৮৮), বাংলাদেশ ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি (১৯৯৫), ন্যাশনাল ওয়াটার পলিসি (এনডব্লিউপিও, ১৯৯৯), ন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (এনডব্লিউএমপি, ২০০৪) সহ বিভিন্ন সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করলেও তা কাক্সিক্ষত সুফল লাভ করেনি।
তা ছাড়া আমাদের দেশে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হয়, যা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ স্বাধীনভাবে কার্যকর করে থাকে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ মহাপরিকল্পনা দেশের এ যাবৎকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বিধায় সমন্বিত, আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিবান্ধব বিষয়সমূহ এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করা না হলে তা যেমন কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে, তেমনি হবে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি। এই পরিকল্পনাটি আরও যাচাই-বাছাই, গবেষণা, পরিবর্তন, পরিমার্জন, ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন ইত্যাদি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই বাস্তবায়ন করা হবে সুবিবেচকের কাজ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০২০।