বিদ্যুৎ আমাদের জন্য অনন্য এক আশীর্বাদ। নানা ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মানুষের জীবনযাত্রাকে যে কতটা ঝামেলামুক্ত ও আরামদায়ক করেছে তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু প্রতিটি বৈদ্যুতিক ডিভাইস চালু রাখতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগ। এই সংযোগের একমাত্র উপায় বৈদ্যুতিক ক্যাবল বা তার। অনেক সময় ভবনের দেয়ালে ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক ডিভাইসে তার সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। তা ছাড়া সম্প্রতি অনেক ব্যয়সাশ্রয়ী স্থাপনা গড়ে উঠছে যেখানে প্যানেল কিংবা বোর্ডে ব্লক ব্যবহার করা হয়। যেখানে দেয়ালে গ্রুভ কেটে ওয়্যারিং করার সুযোগ নেই বললেই চলে। এসব দেয়ালে বৈদ্যুতিক তার টানার সহজ সমাধান ইলেকট্রিক ক্যাবল কেসিং। নিরাপদ এই কেসিংয়ের নান্দনিক ও ¯িøম লুকের জন্য স্থাপনার সৌন্দর্য ¤øান না হয়ে ওঠে স্টাইলিশ।
ইলেকট্রিক ক্যাবল কেসিংকে ট্রে ওয়্যারিং ও পিভিসি জ্যাকেট ট্রেও বলা হয়। এই ক্যাবল কেসিং উন্নতমানের ভার্জিন মেটেরিয়াল ও পিভিসি (পলি ভিনাইল ক্লোরাইড) প্লাস্টিকে তৈরি বিধায় রাসায়নিক নির্গত হয় না। তা ছাড়া কেসিংগুলো মসৃণ, নমনীয় কিন্তু দারুন শক্তিশালী।
তারের ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট ঝামেলার। লাইট, ফ্যান, কলিংবেলের সংযোগ তারগুলো সাধারণত ভবনের দেয়ালের ভেতরে গোছানো অবস্থায় থাকে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় কম্পিউটার, টিভি, ফ্লাশলাইট, সাউন্ড সিস্টেম, মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টারসহ নানা বৈদ্যুতিক ডিভাইসের ক্ষেত্রে। কারণ, এগুলো কোথাও স্থায়ীভাবে রাখা হয় না আর প্রয়োজনবোধে স্থানান্তর করতে হয় হরহামেশাই। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় মাল্টি প্লাগ। মাল্টি প্লাগের তারগুলো থাকে বিছিন্নভাবে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। কারণ, বিদ্যুৎ সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ এই বিদ্যুতের সঙ্গেই আমাদের নিত্য বসবাস। বাসাবাড়ি, বা অফিসে তারে হোঁচট খায়নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অফিস বা বাসার দেয়ালের মেঝেসংলগ্ন অংশে বা মেঝেতে অনায়াসে স্থাপন করা যায় ইলেকট্রিক কেবল কেসিং, যা দুর্ঘটনা ও বিড়ম্বনার ঝামেলা দূর করে।
পুরোনো বাড়ি নতুন করে রেনোভেশন করার সময় ঝুঁকি কমাতে বদলে ফেলা হয় পুরোনো তার। বদলে যায় সুইস-সকেট। কিন্তু বিড়ম্বনা দেখা দেয় এর ব্যবস্থাপনায়। পুরোনো দেয়ালে গ্রুভ কাটাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকে আবার পিভিসি পাইপ লাগিয়ে সমস্যাটির সমাধান করেন। কিন্তু তা স্থাপনার দেয়ালের সঙ্গে মানানসই না হওয়ায় দেখতে সুন্দর লাগে না। এ ক্ষেত্রে সহজ সমাধান ইলেকট্রিক ক্যাবল কেসিং।
ভবনের বৈদ্যুতিক তার ব্যবস্থাপনাও কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কোনো কারণে তার লিকেজ হলে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। যেহেতু ভবনের পার্টিশন ওয়ালে করা হয় ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিংয়ের কাজ, তাতে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তখন দেয়ালের প্লাস্টার ভাঙা ছাড়া গতি নেই। এতে একদিকে যেমন ক্ষতি হয় আর্থিক, তেমনি ক্ষতি হয় স্থাপনারও। অথচ ইলেকট্রিক ক্যাবল কেসিং মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সহজেই দেয়ালে স্থাপন করা যায়। পরে যদি বাড়তি তার টানার প্রয়োজন হয় তবে সহজেই কেসিং খুলে সেখানে তার লাগানো যায়।
বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের রকমফের
হরেকরকম ওয়্যারিং ব্যবস্থা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম-
- ক্লিট ওয়্যারিং
- কেসিং অ্যান্ড ক্যাপিং ওয়্যারিং
- ব্যাটেন ওয়্যারিং
- লিড শিদেড ওয়্যারিং
- কনডুইট ওয়্যারিং।
ব্যবহার যেখানে
- বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক ও শিল্পকারখানায়
- বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ তারের নিরাপত্তা নিরোধক
- টেলিকমিউনিকেশন ক্যাবল স্থাপন
- টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে
- ইন্টারনেট
- মিউজিক্যাল ইনস্ট্র্রুমেন্ট ও
- জেনারেটরে।
ক্যাবল কেসিংয়ের উপযোগিতা
- উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ও অধিক নিরাপদ
- বৈদ্যুতিক তারকে তাপ থেকে সুরক্ষিত রাখে
- বৈদ্যুতিক তারকে সুরক্ষিত রাখে চাপ থেকেও
- ইলেকট্রিক কনডুইট পাইপে সহজে জং বা মরিচা ধরে না
- ১২০০ ভোল্ট পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।
গঠন
- আয়তকার
- বর্গাকার
- ট্রপিজিয়াম
- আর্চ আকৃতির।
হরেক রঙের ক্যাবল কেসিং
- সাদা
- নীল
- সবুজ
- ধূসর
- বাদামি।
বৈশিষ্ট্য
ক্যাবল কেসিংয়ের রয়েছে উপযোগী নানা বৈশিষ্ট্য। এসবের মধ্যে রয়েছে-
- দামে সাশ্রয়ী
- টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী (৫০-১০০ বছর)
- শক্তিশালী
- দৃষ্টিনন্দন
- হালকা ওজন (এমএস ও এসএস পাইপের তুলনায়)
- সহজে স্থাপনযোগ্য
- কম স্থাপন ব্যয়
- রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নেই বললেই চলে
- উচ্চক্ষমতা ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থেও তেমন ক্ষতি হয় না
- বিরূপ আবহাওয়ায় টিকে থাকে
- মরিচারোধী
- রাসায়নিকরোধী
- সর্বোচ্চ চাপ সহনীয়
- বিদ্যুৎ অপরিবাহী
- অগ্নিরোধী
- ছিদ্র হয় না
- সহজ জয়েন্ট সিস্টেম
- সহজে কাটা যায়
- পরিবহন করা সহজ
- বাঁকানো যায়
- কোনো ধরনের ওয়েল্ডিং অথবা পেস্টিং লাগাতে হয় না বিধায় খরচ হয় কম
- ক্ষতিকর আলট্রা ভায়োলেটেড (UV) রে প্রতিরোধী।
ক্যাবল কেসিং ও ফিকচারস
কেবল কেসিংয়ের সঙ্গে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ফিকচারসের মধ্যে রয়েছে-
- ফ্ল্যাট অ্যাঙ্গেল
- ফ্ল্যাট টি
- ইন্টারনাল অ্যাঙ্গেল
- এক্সটারনাল অ্যাঙ্গেল
- টার্মিনাল
- কাউপলার
- স্টপ।
কেনা ও স্থাপনের আগে
- কেবল কেসিংয়ের পুরুত্ব ও গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
- কতগুলো সুইস ও সকেটের জন্য তার টানা হবে তা হিসাব করেই যথযথ আকারের ক্যাবল কেসিং কেনা উচিত।
- অবশ্যই অভিজ্ঞ মিস্ত্রির সাহায্যে পাইপ স্থাপন করতে হবে।
- ক্যাবল কেসিং স্থাপনকালে অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।
- কেনার আগে কেসিংয়ে কোনো বাজে গন্ধ আছে কি না দেখে নিতে হবে। কারণ, উন্নতমানের কেসিংয়ে কোনো গন্ধ থাকে না।
- ক্যাবল কেসিংয়ে নির্ধারিত ভোল্টের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা ঠিক নয়।
দরদাম
ইলেকট্রিক ক্যাবল কেসিং মূলত পিস হিসেবে বিক্রি হয়। প্রতিটি কেসিং সাধারণত ৬ ফুটের মতন হয়। তবে কোম্পানিভেদে এ আকার কমবেশি হতে পারে। বিশ্বে বিভিন্ন আকারের ইলেকট্রিক কেবল কেসিং পাওয়া গেলেও দেশীয় বাজারে সাধারণত আয়তকার কেসিংই অধিক বিক্রি হয়। সাইজভেদে ইলেকট্রিক কেবল কেসিংয়ের দরদাম-
প্রাপ্তিস্থান
ইলেকট্রিক কেবল কেসিং রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ইলেকট্রিক্যাল শপ বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানে পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার বংশাল ও নবাবপুরে এই কেসিং খুচরা ও পাইকারি বিক্রি হয়। এ ছাড়া হাতিরপুল, বাংলামোটর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বনানীসহ সারা দেশের ইলেকট্রিক্যাল পণ্য বিক্রির দোকানেও পাবেন দরকারি এই পণ্যটি।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৩তম সংখ্যা, নভেম্বর, ২০১৮