ফেরোসিমেন্ট দিয়ে ছাদ ঢালাই

ফেরোসিমেন্ট

স্টিলের রডে তৈরি সমান দূরত্বে রাখা জালিতে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ যুক্ত করা হয়। ঢালাইকৃত সিমেন্ট, বালু ও স্টিলের যৌথ মিশ্রণে তৈরি এ উপকরণই ফেরোসিমেন্ট। পাতলা সিট হিসেবে, বাঁকানো সিটে নৌকার হাল তৈরিতে, ঘরের অভ্যন্তরীণ ছাদে আর পানির আঁধার নির্মাণে মূলত এটি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও মূর্তি তৈরি ও প্রি-ফেব্রিকেটেট আবাসিক অবকাঠামো নির্মাণে রয়েছে এর সমান ব্যবহার। 

উৎপত্তি-কথন
ফেরোসিমেন্ট শব্দটি ফ্রান্সের আবিষ্কারক জোসেফ মনিয়েরর দেওয়া। ১৮৫০ সালে কফি তৈরির পর কীভাবে তা গরম রাখা যায় এই ভাবনাটা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। ভাবনার উদ্দেশ্য ছিল বৃহৎ পাত্র বা জলাধার তৈরিতে কোনো চুল্লি ব্যবহার না করে কিংবা কোনো ধরনের তাপ প্রয়োগ ছাড়াই কীভাবে সহজে তা তৈরি করা যায়। ১৮৭৫ সালে তার হাত ধরেই শুরু হয় স্টিল ও কংক্রিটের সেতু নির্মাণ, যার ওপরের আস্তরণে কৃত্রিমতাবিহীন কাঠের গুঁড়িতে কংক্রিট ব্যবহার করা হয়। এখন যা ফেরোসিমেন্ট তথা রিইনফোর্স কংক্রিট নামে পরিচিত।

ফেরোসিমেন্ট ঢালাই
ফেরোসিমেন্ট ঢালাই

ফেরোসিমেন্ট কংক্রিট অধিক শক্তি ও ভারবহনের ক্ষমতাসম্পন্ন। উন্নত দেশে বাড়ি নির্মাণে ফেরো কংক্রিটের রয়েছে বহুল ব্যবহার। এটি অগ্নিনিরোধক, ভূকম্পসহনীয় ও মরিচারোধী। অন্যান্য নির্মাণ উপাদান যেমন- লোহা, পাথরের সঙ্গে তুলনীয়। উন্নয়নশীল দেশে হালকা নৌযান তৈরিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সময় লাগে কম। এতে সাশ্রয় হয়  শ্রমঘণ্টা। যুক্তরাষ্ট্রে অবকাঠামো তৈরিতে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পদ্ধতিটি ছিল দারুণ জনপ্রিয়।

নির্মাণকৌশল
প্রথমে অবকাঠামোটিকে শক্ত অবস্থানে ধরে রাখতে নকশা অনুযায়ী কয়েকটি স্তরে লোহার রডের জালি তৈরি করা হয়। রডের তৈরি করা জালিতে যাতে মরিচা না পড়ে সে জন্য গ্যালভানাইজ লোহার রড, বার বা স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করা হয়। এরপর লোহার রডের জালিটিতে কংক্রিট, বালু ও পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের মিশ্রণ ঢেলে দেওয়া হয়। লক্ষ রাখা হয় মিশ্রণটি যাতে জালির প্রতিটি অংশে সমানভাবে প্রবেশ করতে পারে। শক্ত হওয়ার জন্য স্থাপনাটিকে দীর্ঘদিন ধরে জলীয় বাষ্পে রাখা হয়। এতে কংক্রিটের মিশ্রণ ধীরে ধীরে জালির প্রতিটি অংশে প্রবেশ করে স্থাপনাটিকে শক্ত করে তোলে, যাতে তৈরি হয় না কোন ধরনের ফাটল সেই সঙ্গে স্থাপনাটি হয়ে পড়ে না দুর্বল। এ সময় লক্ষ রাখতে হবে, যাতে কোনো স্থানে বাতাসের প্রবাহে বোলহোল তৈরি না হয়। কেননা বোলহোলে বাতাস থাকলে সেখানে পানি জমার আশঙ্কা থাকে। এতে থাকে স্টিল বা লোহার বারে মরিচা পড়ার আশঙ্কা। বর্তমান প্রযুক্তিতে অবশ্য স্প্রে করা হয় মিশ্রণে কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করা হয় যাতে জমাট বাতাসকে সহজেই বের করে দেওয়া যায়।

লোহার জালির অবকাঠামো
লোহার জালির অবকাঠামো

পুরোনো পদ্ধতির নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আরও সহজভাবে ফেরোসিমেন্ট তৈরির পদ্ধতিতে এসেছে উদ্ভাবনী চিন্তা। বাতাস বের করে দেওয়া ছাড়াও বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে কংক্রিট মিশ্রণের সঙ্গে অ্যাক্রেলিক মিশ্রণ ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে ধীরে ধীরে জলীয় বাষ্প গ্রহণ করা যায়; এতে বাড়ে স্থাপনাটির ভারবহন ক্ষমতাও। কিউরিং ক্ষমতাও সমভাবে বৃদ্ধি পায়। বাণিজ্যিকভাবে টাইলস তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রযুক্তিটির ব্যবহার। এটা অবকাঠামোকে আরও মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। পলিফাইবার ব্যবহার করা হয় ফেরোসিমেন্ট তৈরির টাইলসে যাতে ফাটল না ধরে। এতে বাইরের আস্তরণ থাকে সুরক্ষিত ও মসৃণ। পলিফাইবার যুক্ত কংক্রিট মিশ্রণ সহজেই স্টিলের জালিতে আস্তরণ তৈরি করতে সক্ষম, যা পরে মরিচা ধরা রোধ করে।

ফেরোসিমেন্টের বাণিজ্যিক পরিপ্রেক্ষিত 
ফেরোসিমেন্টে তৈরি অবকাঠামোর সুবিধা অনেক। কারণ, এটি শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। ফেরোসিমেন্টে নির্মিত অবকাঠামোতে বাড়তি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। এর সাহায্যে মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী পানির ট্যাংক তৈরি করা যায়। ফেরোসিমেন্টের অবকাঠামো দ্রুত নির্মিত হয়, যা অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী।

ফেরোসিমেন্টে নির্মিত স্থাপনা
ফেরোসিমেন্টে নির্মিত স্থাপনা

১৯৭০ সালে নৌকা তৈরিতে প্রথমবার ফেরোসিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। এর বড় সুবিধা কম খরচে এটি তৈরি করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম বা স্টিলের তৈরি নৌকার হালের তুলনায় ফেরোসিমেন্টে তথা ফাইবার রিইনফোর্স প্লাস্টিক দ্বারা তৈরি করা হাল যথেষ্ট শক্ত ও হালকা। নব পদ্ধতিতে সিমেন্ট ও স্টিল ব্যবহার করে তারের জালিতে ফেরোসিমেন্টের নৌকা তৈরি হচ্ছে সহজেই। 

সুবিধা যত
স্টিলের তৈরি অবকাঠামোর তুলনায় ফেরো কংক্রিট অবকাঠামোর সুবিধা হচ্ছে এটি হালকা, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম ও দীর্ঘস্থায়ী। ফ্রেমওয়ার্কটি মরিচা নিরোধক। ফেরো কংক্রিট সিমেন্টের ভঙ্গুরতা কম। তবে এ সবকিছুই নির্ভর করে নির্মাণের সময় ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর।

অসুবিধা
পশ্চিমা বিশ্বে ফেরো কংক্রিট অবকাঠামো তৈরিতে শ্রমিক বেশি কাজে লাগানোয় নির্মাণ খরচ হয় বেশি। বিশেষত শিল্প কারখানায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মরিচা পড়াও এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা। বর্তমানে তরল অ্যাক্রেলিক এডিটিভ ব্যবহার করা হয়। উন্নত ব্যবস্থায় এখানে অন্যান্য মিশ্রণ মেশানো হয় খুব ধীরে ধীরে যাতে জলীয় বাষ্প গ্রহণ করা যায় সহজেই। এ ছাড়া বন্ডিং প্রক্রিয়াটি হয় ত্বরান্বিত।

ফেরোসিমেন্টের নকশাকৃত ভবন
ফেরোসিমেন্টের নকশাকৃত ভবন

অবকাঠামো আর স্টিল সামগ্রীর পাশাপাশি বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গাড়ির বহিরাংশে বাড়ছে এর ব্যবহার। পুরোনো স্টিলের সামগ্রীতেও ফেরো কংক্রিটের নিত্যনতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে একে করা হচ্ছে আরও উন্নত ও মরিচারোধী।

প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদ
সাবেক অতি. প্রধান প্রকৌশলী
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৩ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৪

Related Posts

আধুনিক নির্মাণ উপকরণ হিসেবে মাটি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নির্মাণশিল্পের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো মাটি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ঘরবাড়ি, দুর্গ, উপাসনালয় এবং নগর…

ByBySarwar Alam Jun 9, 2026

স্মার্ট বিল্ডিং নয় মাটির দেয়ালে হোক আরামদায়ক আবাসন

সময়ের ব্যবধানে ভবনের দেয়ালগুলো আধুনিক হয়ে উঠছে। কাদামাটি আর চুনসুরকির প্রলেপ নয় প্রযু্ক্তির ছোঁয়ায় স্মার্ট হয়ে উঠেছে আমাদের…

আগামী দিনের নির্মাণ উপকরণ (পর্ব ১)

আধুনিক সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই চলতে হচ্ছে আমাদের। প্রতিদিন বিশ্বের বুকে গড়ে উঠছে কোন না কোন আকাশচুম্বী ভবন।…

ইরান যুদ্ধের অজুহাতে আকাশচুম্বী নির্মাণ পণ্যের দাম

ইরানের যুদ্ধ শুধু ইরান আর ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। শেলের আঘাতে বিদ্ধস্ত পক্ষ-বিপক্ষ। তবুও আগুন ছড়িয়ে গেছে সারা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *