মোগল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন  কমলাপুর মসজিদ

প্রাচীন বাংলাদেশ হাজার বছরের সভ্যতা আর সংস্কৃতির চারণভূমি। বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তনে অবকাঠামো ও স্থাপত্যিক উন্নয়নে সৃষ্টি হয়েছে বৈচিত্র্য। তবে শিল্প ও ঐতিহ্য তার নিজস্ব পথপরিক্রমায় রেখে যায় অতীত সমাজ ও লোকাচারের পদচিহ্ন। এই পানিবেষ্টিত ভূখন্ডে বিভিন্ন কালের; যুগের প্রভাবশালী গোষ্ঠী নির্মাণশৈলীর সীমাবদ্ধতার বলয় পেরিয়ে বিভিন্ন অবকাঠামোতে রেখেছে সৃষ্টিশীলতার ছাপ। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন থেকে শুরু করে স্বাধীন সুলতান এবং তৎপরবর্তী মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলী আজও সাক্ষীস্বরূপ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান ও দৃষ্টিগোচর। বরিশালের কমলাপুর মসজিদ তেমনই একটি স্থাপনা, যা প্রাক্্-মোগল যুগের অন্যতম স্থাপত্যকর্ম।

মোগলদের আগমনের আগেই, সুলতানি আমলে বিকাশ ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি স্থাপত্যরীতির। মুসলমানদের হাত ধরে এদেশে এসেছে সিরিয়া, বাইজেন্টাইন, মিসর ও ইরানের স্থাপত্যরীতির মিশ্রিত রূপ। তবে বাস্তবিক স্থাপত্যকর্ম গড়ে ওঠে এদেশের শ্রমজীবীদের হাতেই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী যে স্থাপত্যরীতি এনেছে, যার সঙ্গে স্থানীয় রীতির মিশ্রণে তৈরি হওয়া এই রীতিকে বিশেষজ্ঞগণ নামকরণ করেছেন ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যরীতি। আমাদের দেশে ইসলামিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের অনেক নিদর্শন রয়েছে, বিশেষ করে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা চমৎকার কিছু মসজিদ, যেগুলো কিনা বিভিন্ন সময়ের মুসলিম যুগকে প্রতিফলিত করে। তদানীন্তন বাকেরগঞ্জ তথা আজকের বরিশালের কমলাপুরে অবস্থিত মসজিদ স্থাপত্য কিছু ঐতিহ্যের একটি পর্যায়কে প্রকাশ করে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এবং সুলতানি স্থাপত্য নিদর্শনের এ এক অনন্য উদাহরণ। বরিশাল জেলার গৌরনদী থানায় এর অবস্থান। ইল্লা বাসস্ট্যান্ড থেকে আরও আগে কমলাপুর বাজারের ২৫০ মিটার দূরত্বে এটি অবস্থিত। মোগল ও সুলতানি আমলের কিছু যুগপৎ বৈশিষ্ট্য এই মসজিদকে করেছে স্বাতন্ত্র্য ও অনন্য।

সময়ের বিচারে কমলাপুর মসজিদ মোগল স্থাপত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। রাজমহলের যুদ্ধে ১৫৭৬ সালে দাউদ খান কররানি যখন পরাজিত হন, তখন বাংলাদেশ এলাকাটি মোগল শাসনের আওতায় আসে। সম্রাট শাহজাহানের পরে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে মীর জুমলা সুবেবাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। সেই সময়ে অধিকৃত বাংলার প্রশাসনকে যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক এবং প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। বাকেরগঞ্জ এলাকার তেমনই একজন স্থানীয় প্রশাসক ছিলেন মাসুম খান। স্থানীয় ব্যক্তিদের সূত্রমতে, তিনি ও তাঁর সহোদর সুফি খানের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল কমলাপুর মসজিদ, যে কারণে এটি মাসুম খান মসজিদ নামেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পরিচিত। মসজিদটি একসময় প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। বিশ শতকে ষাটের দশকের শেষদিকে এর উল্লেখযোগ্য অংশ পুরোপুরি মেরামত করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৭৫ সালে একে সংরক্ষণ করে এর প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

সুলতানি আমলে স্থাপত্যের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, মোগল শাসনামলে সেখানে পরিবর্তন আসে। নির্মাণ-উপকরণ ও নির্মাণকৌশলÑ দুটোতেই আসে নতুনত্ব। প্রচলিত জনপ্রিয় ধারার সঙ্গে রাজকীয় মোগল স্থাপত্যের একটা চমৎকার সমন্বয় শুরু হয় এখানে। মসজিদের নির্মাণ সময় নিয়ে রয়েছে কিছুটা ভিন্নমত। প্রত্নতত্ব বিভাগের সূত্র অনুযায়ী মসজিদটি ১৭ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল। এটাই বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে নির্মাণ-উপকরণ, অন্দর নকশা ও অলংকরণ থেকে কমলাপুর মসজিদ সুলতানি আমলে তৈরি বলেও কেউ কেউ মনে করেন। স্থাপত্য ও ঐতিহ্য গবেষক অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমদ তাঁর বিশ্লেষণ থেকে বলেছেন, এটি আসলে ১৬ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছে এবং ইউনেসকো এভাবে এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত শিলালিপিটি হারিয়ে গেছে, তাই এখন মসজিদ নির্মাণের সময়ক্ষণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না। সার্বিকভাবে দুই মতের সমন্বয় করলে বলা যায়, কমলাপুর মসজিদ মোগল যুগের স্থাপত্য হলেও বিভিন্ন কারণে মোগল স্থাপত্যরীতি এখানে পুরোপুরি মানা হয়নি। একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বলা যায়, মোগল সম্রাট আকবর যদিও ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা জয় করেন, কিন্তু বাংলার শক্তিশালী স্থানীয় জমিদারদের প্রতিরোধ ভেদ করতে মোগলদের আরও কয়েক দশক সময় লেগেছিল। পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সপ্তদশ শতকেরও কয়েক দশক পেরিয়ে যায়। তা ছাড়া ঢাকায় নির্মিত মসজিদগুলো যখন মোগল রাজকীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত হয়েছে, তখনো কিন্তু রাজধানী থেকে দূরের অনেক মসজিদেই সুলতানি রীতি টিকে ছিল। কমলাপুর মসজিদ সে ধরনেরই স্থাপনা। বাহ্যিক অবয়বে প্রকাশ ঘটেছে কিছু মোগল বৈশিষ্ট্য। চোখের দেখায় এটি রাজশাহীর তিন গম্বুজবিশিষ্ট কিসমত মারিয়া মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

উইকিপিডিয়া

ইট দিয়ে বানানো কমলাপুর মসজিদটি নিচু জায়গায় অবস্থিত, যা দেখতে আয়তাকার। মসজিদটির সামনে লাগোয়াভাবে উঁচু উঠান (খোলা বারান্দা) আছে, যা অনুচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত এবং একটি তিন ধাপ ছোট সিঁড়ি দ্বারা ভূমিতে সংযুক্ত। আয়তনে যা ১৭.২২ মিটার লম্বা ও প্রস্থে ৮.০৮ মিটার। মসজিদের পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে মোট পাঁচটি বহুখাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে। পূর্ব পাশের প্রবেশপথটি অন্যগুলোর চেয়ে কিছুটা বড় হওয়ায় এটির প্রাধান্য বেশি। মসজিদের কিবলার দিকে তিনটি অর্ধ-অষ্টভুজ মিহরাব আছে। মাঝখানের মিহরাবটি বাইরের দিকে অভিক্ষিপ্ত এবং দুপ্রান্তে দুটি ছোট অষ্টভুজ বুরুজ রয়েছে। পাবনার চাটমোহর এবং বগুড়া শেরপুরের খেরুয়া মসজিদে এক ‘আইল’ এবং তিন ‘বে’বিশিষ্ট যে ভূমি নকশা ব্যবহৃত হয়েছে, সেটাই পরবর্তী সময়ে মোগল মসজিদ স্থাপত্যের আদর্শ হয়ে ওঠে। কমলাপুর মসজিদেও চলমান রয়েছে একই ধারা।

পোড়ামাটির ইটের তৈরি সংলগ্ন স্তম্ভের ওপর থেকে আড়াআড়িভাবে নির্মিত দুটি বিশাল আকৃতির খিলানের সাহায্যে মসজিদের অভ্যন্তরকে তিনটি ‘বে’তে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগের ছাদে রয়েছে একটি করে গম্বুজ। সামান্য কন্দাকৃতির গম্বুজগুলো অনুচ্চ পিপার-এর ওপর স্থাপিত। কমলাপুর মসজিদের নির্মাণকৌশলের সঙ্গে ঢাকার লালবাগ দুর্গ মসজিদের গম্বুজ নির্মাণকৌশলের বেশ সাদৃশ্য বা মিল রয়েছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি অপর দুটি অপেক্ষা বৃহত্তর ও সুসজ্জিত। গম্বুজগুলোর শীর্ষে রয়েছে পদ্ম-কলস নকশাশোভিত শীর্ষচূড়া। প্রতিকোণের অষ্টভুজ বুরুজগুলো বর্তমান প্রাচীর পর্যন্ত উঁচু হলেও আদিতে এগুলো মোগল স্থাপত্যের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ছাদ ছাড়িয়ে ওপরে প্রলম্বিত ছিল বলে মনে করা হয়। এগুলোর শীর্ষে রয়েছে ক্ষুদ্রাকৃতির ছত্রী। খিলানের স্প্যানড্রিলগুলোতে প্যাঁচানো নকশা আছে, যার মধ্যে রয়েছে খোদাই করা গোলাপের পাশে পূর্ণ বিকশিত লোজেন্স (হীরকাকার)। অন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতেও কলস নকশা দেখা যায়। বহির্দেয়ালজুড়ে খোপ নকশার কারুকাজ। মিহরাবগুলো বর্তমানে নিরাভরণ। কেবল এগুলোর অর্ধ-অষ্টভুজাকৃতির খিলানের ওপরের অংশে রয়েছে সামান্য অভিক্ষিপ্ত একটি ব্যান্ড নকশা; আর এর ওপরে রয়েছে বদ্ধ পদ্ম-কলস নকশার সারি। মিহরাবের বহুখাঁজ নকশাগুলো কারুকার্যশোভিত।

কমলাপুর মসজিদের পুরো স্থাপনাটা নির্মিত হয়েছে চুন, সুরকি ও ইট দিয়ে। দেশের অন্যান্য পুরাতন মসজিদের সঙ্গে এই মসজিদের একটি সাধারণ ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়, তা হলো মসজিদটির একেবারে সন্নিকটে কোনো বড় জলাধার বা পুকুর-দিঘি নেই। মসজিদটি মোগল রীতিতে ইটের তৈরি হলেও বহির্দেয়ালে কিছু সুলতানি ধাঁচের পোড়ামাটির অলংকরণ দৃশ্যমান। প্রবেশপথ বহুখাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত। প্রধান প্রবেশপথের আয়তাকার অংশে প্যাঁচানো ফুলেল নকশা, গোলাপ নকশা, জালি নকশা প্রভৃতি মোটিফসংবলিত পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সাজানো। গম্বুজের পিপা ও পদ্মশোভিত শীর্ষচূড়া আর পদ্ম-পাপড়ির অলংকরণ মোগলরীতির। তবে বাইরে থেকে দৃশ্যমান এর অষ্টকোনাকার পার্শ্ববুরুজ, বক্র কার্নিশ, পিপাবিহীন নিচু গম্বুজ, ইটের নির্মাণশৈলী এবং দ্বিকেন্দ্রিক সুচালো খিলান এই ইমারতগুলোকে সুলতানি যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেছে। টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদের মতো কমলাপুর মসজিদকেও সুলতানি ও মোগল স্থাপত্য ধারার সময়ের বাস্তবায়ন বলে বিবেচনা করা হয়।

পুরাতন মুসলিম স্থাপত্য আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সে তুলনায় অধ্যয়ন কম। বিশ^ স্থাপত্যের বিচারে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সুলতানি কিংবা মোগল আমলের বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় মসজিদের নির্মাণ শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন মিটিয়েছে তা নয় বরং সামাজিক, প্রশাসনিক কিংবা সাংস্কৃতিক প্রয়োজনগুলোকেও পূরণ করেছে। সাধারণভাবে কিছু সমাজে স্থানীয় এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে তাদের নিজেদের স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলো রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করছে। তাদের এই সম্মিলিত প্রয়াস এবং সচেতনতার কারণেই নিজস্ব ঐতিহ্যকে তারা সংরক্ষণ করতে পারছে, আমরাও এখনো ইতিহাসের সাক্ষী স্থাপত্য এবং এর কাজের সাক্ষী হতে পারছি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই মসজিদগুলো পরিবর্তিত হয়েছে। যেহেতু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখানে খুব সামান্যই মনোযোগ আছে। তা ছাড়া মসজিদে বাড়তি মুসল্লিদের স্থানসংকুলানের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই সম্প্রসারিত হয়েছে। মসজিদের মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে গেলে সেটা সমাধানের জন্য নতুন মসজিদ নির্মাণ বা অন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, সেটা চিন্তা করা উচিত। এই ধরনের একটি জাতীয় পর্যায়ের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হলে আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থাপত্যের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আরও যেসব স্থাপনা আছে, সেটা মসজিদ হোক, সেটা হোক কোনো রাজবাড়ি অথবা কোনো সামাজিক ব্যক্তিগত স্থাপনা হোকÑ সবই বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার্থে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, জুলাই ২০২১।

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts
স্থপতি সৈয়দ আবু সালেক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top