স্থাপত্যকৌশলে স্বাস্থ্যকর আবাসন 

স্থাপত্যের সঙ্গে নান্দনিকতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এ সম্পর্ক বজায় রেখেই তৈরি হয় ব্যবহারিক উপযোগিতা। তবে প্রতিটা সময়েরই রয়েছে নিজস্ব কিছু চাহিদা। এরই আলোকে বিভিন্ন সময় নানামুখী চাহিদার ওপর মনোযোগ তৈরি হয় বিশেষভাবে। এখন বিশ^ব্যাপী পরিবেশগত পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুতই। এ সময়ের বৈশি^ক মহামারি স্থাপত্য ও পরিবেশ-ভাবনার মনোযোগের কেন্দ্রে এনেছে স্বাস্থ্যসচেতনতাকে। প্রাকৃতিক আলো, মুক্ত বায়ু, সবুজ প্রকৃতির মতো চিরন্তন প্রয়োজনগুলোকে নিয়েই আবার ভাবতে হচ্ছে নতুন করে। স্থাপত্য ডিজাইনে সামান্য পরিবর্তন এনেই সম্ভব আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন।

চাই মুক্ত বায়ু

বেঁচে থাকার জন্য মুক্ত বায়ু তথা বাতাস অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ১৯৭০-এর দশকে শীতপ্রধান দেশে শক্তিসংকটের অন্যতম প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভবনগুলো বায়ুশূন্য করে নিয়ন্ত্রণ করা হতো এর অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা ও শীতলতা। তবে আমাদের দেশে এর প্রচলন হয় বাড়তি আরাম আর ক্ষেত্রবিশেষে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে, যার একটি অনিচ্ছাকৃত ও অনিবার্য পরিণতি ছিল ‘আবদ্ধ বাতাস’। ভবনের পরিকল্পক ও নকশাবিদেরা নান্দনিকতা আর আভিজাত্যের দিকে নজর রাখলেও বায়ু চলাচলের সর্বোত্তম ব্যবস্থার উপযোগিতার বিষয়ে গুরুত্ব দেন কম। বর্তমান সময়ের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ আর্দ্রতা আর ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব মানুষকে করে তোলে গুমোট আর ক্লান্ত। অপর দিকে ভবনের অভ্যন্তরে যদি মুক্ত বায়ু চলাচল উৎসাহিত করা যায়, তবে অধিবাসীদের কর্মস্পৃহার পাশাপাশি বাড়ে সৃজনশীলতা। মুক্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিতে স্থপতিদের ভাবতে হবে আরও গুরুত্ব দিয়ে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা- এটা সবার অজানা নয়, তবে যেটা নতুন করে জানাতে হবে সেটা হচ্ছে স্থপতিরাও কখনো কখনো নিতে পারেন প্রায় একই কিংবা সমান ভূমিকা।

চাই আরও প্রাকৃতিক আলো 

একটি ভবনের ব্যবহারকারীদের তাদের পরিসরের পর্যালোচনা করার সুযোগ দেওয়া হলে এর বড় অংশই হয় আলোকস্বল্পতাবিষয়ক। বেশির ভাগেরই অভিযোগ পর্যাপ্ত আলোর অভাব। ঘর কবরের মতো অন্ধকার এমন কথা বলা হয় সচরাচর। সারা দিন ফ্লুরোসেন্ট বাতি জ¦ালিয়ে রেখে ঘর আলোকিত করা ¯্রফে তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে কিন্তু কার্যকর সমাধান হচ্ছে প্রাকৃতিক আলোকে আরও বেশি অভ্যন্তরে প্রবেশের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের পাশাপাশি আলোকে পরিবর্ধিত করার পদ্ধতিগুলো শুধু শক্তি সঞ্চয়ই করে তা নয়, বরং তা সহায়তা করে ব্যবহারকারীকে আরও উৎপাদনশীল ও আরামদায়ক করতে।

আধুনিক লাইটিং ডিজাইন গবেষণায় দেখা যায়, মানবদেহের ওপর বাইরের আলো বা অন্ধকারের প্রতিক্রিয়া দৈনিক চক্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যা ‘সারকাডিয়ান রিদম’ বা  ‘ছন্দ পূর্ণ চক্র’ নামে পরিচিত। এটি দেহের ২৪ ঘণ্টাব্যাপী আলো-অন্ধকার বা নিদ্রা-জাগ্রত কার্য নিয়ন্ত্রণের জৈবিক প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ, সূর্যের রশ্মিতে থাকা নীলসমৃদ্ধ আলো দিনের বেলায় স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক বিসরিত আলো দেহ অনুসরণ করায় রাতে ফলস্বরূপ ভালো ঘুম হয়। আবার দিনের প্রথম ভাগের সূর্যালোকে প্রচুর ভিটামিন ডি থাকে, যা মানবদেহের গঠন ও বৃদ্ধিতে উপকারী। এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে স্থপতি ও পরিকল্পকদের আলোবর্ধন কৌশলে। 

উন্মুক্ত নকশার কার্যকারিতা

ভিক্টোরিয়ান যুগের ভবনের বৃহৎ সিঁড়িগুলোকে মনে করা হতো নির্মাণশৈলী ও অভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্থপতিরা একে সার্ভিস ফাংশন ভেবে তাঁদের ভবনের কোনায় ফেলে রাখতে শুরু করেন। এতে করে ভবন ব্যবহারকারীদের কষ্ট হতো প্রায়ই সিঁড়ি খুঁজে পেতে। সিঁড়ি লুকানোর এই প্রবণতাকে আরও উৎসাহিত করেছে ভবনের ফায়ার সেফটি কোড। ফলে সিঁড়িগুলো আরও আবদ্ধ হতে শুরু করে। একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন, আবদ্ধ, অপরিচ্ছন্ন সিঁড়ি বাড়িয়ে দেয় ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এটা বেশ নতুন ভাবনার জন্ম দিচ্ছে। শুধু সিঁড়ি নয়, বৃহৎ আকারের প্রকল্পে মুক্ত সিঁড়ি, প্রশস্ত গণপরিসর, সেটব্যাক তথা আবশ্যিক উন্মুক্ত পরিসরকে নিয়ে স্থপতিরা এখন কাজ করছেন। স্বাস্থ্য আর পরিবেশ বিবেচনায় নিলে স্থাপত্য নকশা পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে অনেক কিছুই নতুনভাবে।

বাহিরকে আনছে ভেতরে 

স্থাপত্য ভূমিকা রাখে ভবনের বাইরের পরিবেশকে ভেতরে আনতে। প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর অন্তর্ভুক্তিকে বলা হয় ‘বায়ো ফিলিয়া’। অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস। এ ক্ষেত্রে নকশা এমনভাবে করা হয়, যেন ভবনের ভেতর থেকে বাইরের প্রাকৃতিক ভূ-বৈচিত্র্যকে (ন্যাচারাল ল্যান্ডস্কেপ) সহজেই অনুভব করা যায়। গবেষণায় দেখা যায়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রকৃতি থেকে সুবিধা নেওয়া উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশের আবহ নিয়ে আসা মানসিক শান্তির পরিচায়ক। গাছপালা বাতাসকে দূষণমুক্ত করে সৃষ্টি করে ভবন ব্যবহারকারীর ওঠা-নামার সঙ্গে প্রাকৃতিক-আমন্ত্রণমূলক দৃশ্যের। কিছু ক্ষেত্রে, যেমন কর্মপরিসরে (ওয়ার্কস্টেশন) এরই মাধ্যমে স্থাপন করা যেতে পারে প্লান্টার।

প্রকৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করার আরেকটি উপায় হলো, জীবিতরা যেভাবে সমস্যা সমাধান করছে, সেই প্রক্রিয়াকে যথাযথ অনুসরণ করা। এই শাখাকে বলা হয় ‘বায়ো মিমিক্রি’। অর্থাৎ প্রকৃতির মডেল বা সিস্টেম থেকে সম্ভব মানুষের জটিল সমস্যার সমাধান করা। উদাহরণ হিসেবে উইপোকার টিবিতে প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহকে মাথায় নিয়ে শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা পদ্মপাতার ওপরের আবরণ থেকে ধারণা নিয়ে ময়লা প্রতিরোধী পেইন্টস নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এ ক্ষেত্রে নকশা কতটা উচ্চশক্তিসম্পন্ন এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কতটা প্রাকৃতিক উপায়ে প্রয়োগ করা হচ্ছে তা-ই মুখ্য। সবুজ ডিজাইনের কথা এলেই মনে রাখতে হবে, এটি উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন সরঞ্জাম নয় বরং প্রযুক্তি হচ্ছে এটির অনেক নতুন উপায়।

জরুরি সময়ে ভবনের স্পর্শকাতরতা

ভবন ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাকে মাথায় রেখে ভবনের নকশাবিদেরা পরিবর্তিত জলবায়ুু দ্বারা সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর হুমকির সঙ্গে লড়াই করার পরিকল্পনা সমন্বয় করতে হবে আগামী দিনের কর্মকৌশলের সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে নেওয়া কৌশলগুলোর মধ্যে মূল বিষয় হলো ভবনের ভূমিসংলগ্ন প্রাথমিক পরিসরকে মুখ্য ব্যবহার থেকে বাদ দিয়ে এই পরিসরকে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের সুযোগ থাকা। পাশাপশি ক্রমবর্ধমান সমুদ্রের স্তর, বন্যা, ঝড়ের  ক্ষেত্রে প্রয়োজন ভবনের অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা। 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্সে হারিকেন ক্যাটরিনার পর ওই এলাকার হাসপাতালে বায়ু চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আবদ্ধ জানালার গøাস ভাঙতে বাধ্য হয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এটাকে ছোট্ট একটা উদাহরণ হিসেবে নিয়েই বলা যায়, ভবনের টেকসই নকশা প্রণয়ন আধুনিক স্থাপত্যকৌশলের অংশ। ভবনের একটি সবুজ ছাদও সহায়তা করতে পারে ঝড়ের পানির প্রবাহকে প্রশমিত করতে। ভূ-কম্পন, বিদ্যুৎবিভ্রাট হলেও যেন ভবনগুলো ব্যবহারকারীদের জন্য থাকে সুরক্ষিত। 

স্বাস্থ্যকর বিল্ডিং আন্দোলনকে নেওয়া হচ্ছে ক্রমবর্ধমান রিয়েল এস্টেট প্রফেশনাল আর মার্কেটপ্লেস হিসেবে। যিনি পরিবশেবান্ধব সবুজ নকশায় দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাঁর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিসর নতুন কিছু নয়। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একে কর্মপরিকল্পনার কেন্দ্রে আনা। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের টেকসই স্থাপত্যবিষয়ক পরামর্শদাতা স্থপতি ও ওয়াশিংটন ডিসির স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান পার্কিনস+উইলের কর্ণধার জোনাথন পেনডর্ফ বলেছেন, ‘টেকসই স্থাপত্যকর্মের ক্ষেত্রে স্থপতির নতুন কিন্তু গুরুদায়িত্ব হচ্ছে স্বাস্থ্যকর ভবন নিশ্চিতকরণ।’ এখনকার লক্ষ্যটি হলো আমাদের নির্মিত পরিবেশটি মানুষের জন্য শারীরিকভাবে আরও সুস্থ করা। হয়তো এই লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই অবিষ্যতে চলমান সবুজ স্থাপত্যের আন্দোলন এগিয়ে যাবে সামনের দিকে।  

লেখক:

 সহকারী অধ্যাপক

স্থাপত্য বিভাগ 

ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২১

স্থপতি সৈয়দ আবু সালেক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top