গ্রেট ডিজেনি মসজিদ
আফ্রিকার বিস্মৃত স্থাপত্য ঐতিহ্য

আফ্রিকা মানেই দুঃখ, জরা, অভাব, ব্যাধি আর কান্নাপীড়িত বিপন্ন এক জনপদ। অমাবশ্যার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এই জনপদের ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টালে ধূসর ছবির মতো ভেসে ওঠে শিল্প-সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সোনালি অধ্যায়। মধ্য আফ্রিকার ছোট দেশ মালির ডিজেনি শহরের বানী নদীর তীরে গ্রেট ডিজেনি (Djenne) মসজিদ সেই ঐতিহ্য আর শিল্পকলার নিদর্শন হয়ে এখনো তাক লাগিয়ে যাচ্ছে সমসাময়িক বিশ্লেষক আর গবেষকদের। ভ্রমণে আসা পরিব্রাজকদের কাছে মাটির তৈরি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বিস্ময়কর এক স্থাপনা এটি।

গ্রেট ডিজেনি মসজিদ ভিন্ন দর্শনের মাটির ভবন, যা কি না পৃথিবীব্যাপী সুদানো-সাহেলিয়ান স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত। মসজিদটি বানী নদীর বন্যাপ্রবণ সমতল এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে দৃশ্যমান কাঠামোটি আসলে ১৯০৭ সালের পুনর্নির্মিত।  তবে এর সূচনা বেশ আগে, যার নির্ভরযোগ্য তারিখ পাওয়া যায়নি।

আবদ আল সাদিসের ইতিহাস গ্রন্থ তারিখ আল সুদান-এ মসজিদের যে প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায় এর নির্মাণকাল ১২০০ শতাব্দীতে। যখন আব্বাসীয় এবং তৎপরবর্তী উসমানিয়া খেলাফতের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। আফ্রিকায়ও এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আগত আরব বণিকদের সংস্পর্শে স্থানীয় অধিবাসীরা ইসলামের ছোঁয়ায় আলোকিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১২০০ সালের প্রথম দিকে তৎকালীন শাসনকর্তা কানবুরু ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নিজের রাজকীয় প্রাসাদ ছেড়ে দেন মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য এবং এখান থেকেই আসলে সূচনা এই মসজিদের। প্রাসাদটিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয় মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য। পরবর্তী শাসকেরা বিভিন্ন সময় এতে মিনার এবং সীমানা প্রাচীর যোগ করেন। ফরাসি পর্যটক রেনে ক্যালি ১৮২৮ সালে যখন ডিজেনি ভ্রমণে আসেন, তত দিনে মসজিদ অনেক পুরোনো ও ভগ্নদশায় উপনীত হয়েছে। তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায়, জেনিতে দুটো বড় তবে অনুচ্চ টাওয়ারের সমন্বয়ে একটি মসজিদ আছে, যা সমসাময়িক স্থাপত্যের বিচারে একটু ভিন্ন। এটি যদিও অনেক বড়, তবে একেবারেই সাধারণ হাতে নির্মিত। হাজারো চড়ুই পাখি আস্তানা বানিয়েছে একে ঘিরে; ফলে অসহ্য দুর্গন্ধ এড়াতে সাধারণ মানুষ মসজিদের সামনের ছোট উঠোনেই বেশির ভাগ সময় নামাজ আদায় করেন। ১৮৯৩ সালে ফরাসি বাহিনীর ডিজেনি দখলের পরপরই সাংবাদিক ফেলিক্স ডুবোই শহরটি ভ্রমণ করেন এবং আসল মসজিদের ধ্বংসস্তূপ সম্পর্কে মোটামুটি বর্ণনা দেন। ওই সময়কার একটি প্ল্যানও আঁকেন, যার মাধ্যমে তিনি আদতে মসজিদের অবয়ব কেমন ছিল তার একটি প্রচ্ছন্ন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

১৮১৮ সালে ফুলানী উপজাতি নেতা সেকু আমাদু লব্ব তদানীন্তন শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে একপর্যায়ে শহরটি দখল করে। ধারণা করা হয়, সেকু আমাদু মসজিদের দুরবস্থা দেখে এটিকে মেরামতের চিন্তা বাদ দিয়ে বরং নতুন মসজিদের পরিকল্পনা করেন। রেনে ক্যালির বর্ণিত পুরোনো মসজিদটি একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। বর্তমান মসজিদের সামনে স্থানীয় নেতাদের যে  কয়েকটি সমাধি দেখা যায়, এই সীমানা পর্যন্ত মূল মসজিদ ছিল। সেকু আমাদু পুরোনো মসজিদের পূর্বপাশে অবস্থিত কানবুরুর নতুন প্রাসাদকে ভেঙে নতুন মসজিদ হিসেবে নির্মাণ করেন। একই সময় আশপাশের কিছু ছোট মসজিদ বন্ধ করিয়ে ডিজেনি মসজিদকে কেন্দ্রীয় মসজিদের মর্যাদা দেন। এই মসজিদের উচ্চতা অনেক কম ছিল, যাতে কোনো ধরনের মিনারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

তবে এই মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি অনেকেরই ভালো লাগেনি সেটা কিন্তু বোঝা যায়। ১৯০৬ সালে যখন মসজিদের বড় ধরনের সংস্কারের প্রশ্ন আসে তখন স্থানীয় অধিবাসীরা বরং আদি অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় কি না তারই প্রস্তাব করেন। শেষ পর্যন্ত মূল মসজিদের স্থলে পুনরায় মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেকু আমাদু যেখানে মসজিদ স্থানান্তর করেছিলেন, সেটা ব্যবহৃত হতে থাকে মাদ্রাসা হিসেবে। ইসমাইলা ত্রাওরির স্থাপত্য নকশায় তৈরি হওয়া এই মসজিদটিই আসলে বর্তমান সময়ের গ্রেট ডিজনি মসজিদ।

১৯০৭ সালে মতান্তরে ১৯০৯ সালে নতুন মসজিদটির কাজ শেষ হয়। ২৪৫ ফুট মাপের বর্গাকৃতির একটি ভিত্তির ওপরে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এই ভিত্তি সাধারণ ভূমি লেভেল থেকে প্রায় নয় ফুট উঁচু। বানী নদীর বন্যা থেকে বাঁচার জন্যই এ ব্যবস্থা। চতুর্দিকে ছয়টি আলাদা  সিঁড়ি দিয়ে এটির উঁচু ভিত্তির ওপর ওঠা যায়। সিঁড়িগুলো পিনাকলস দ্বারা অলংকৃত। ভবনের উত্তর দেয়ালে প্রধান প্রবেশপথ। নির্মাণ ত্রুটির জন্যই হোক আর জায়গায় সহজলভ্যতার অভাবে হোক মসজিদের নকশা একদম সমকোণে করা যায়নি। চতুর্দিকের আউটলাইন একটু ট্রাপিজিয়াম ধাঁচের।

ভৌগোলিক কারণে আফ্রিকার কিবলা হচ্ছে পূর্ব দিকে। পুরো প্রজেক্টের পূর্ব অংশ হচ্ছে মূল মসজিদ আর পশ্চিম অংশ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ উঠোন মসজিদের পরিভাষায় যেটিকে শান বলা হয়। এই অভ্যন্তরীণ উঠোন ৬৫ ফুট এবং ১৫০ ফুট লম্বা আর্চড ওপেনিংসমৃদ্ধ গ্যালারি দিয়ে তিন দিক ঘেরা। পশ্চিম গ্যালারি মহিলাদের জন্য। অপর দিকে মূল মসজিদ ৮৫ ফুট এবং ১৬৫ ফুট। পূর্ব দিকের কেবলমুখী দেয়ালের পুরুত্ব হচ্ছে তিন ফুট। এই দেয়ালকে মজবুত করার জন্য ১৮টি পায়ার মতো সংযুক্ত করা হয়েছে, যার প্রতিটির মাথায় একটি করে পিনাকেল। বাক্স আকৃতির তিনটি টাওয়ার দেয়াল থেকে একটু বেরিয়ে আছে। মাঝের টাওয়ার ৪৩ ফুট উঁচু। মাঝের টাওয়ারের বর্ধিত অংশে মিহরাবের অবস্থান। 

উত্তর-দক্ষিণ বরাবর প্রলম্বি^ত কোনাকৃতির আর্চওয়েসমৃদ্ধ নয়টি দেয়ালের ওপর ভর দিয়ে বসানো হয়েছে মসজিদের ছাদ। ভেতরে প্রায় ৯০টি কলাম রয়েছে। এত বেশি কলাম হওয়ার কারণে অনেক সময়ই দৃষ্টি আটকে যায়। তা ছাড়া মসজিদের ভেতরে কয়েকটি করিডোর এবং আলাদা আলাদা হলের মতো তৈরি হয়েছে। মাটির দেয়াল হওয়ায় খুব বেশি জানালা দেওয়ার সুযোগ হয়নি। উচ্চতাভেদে দেয়ালের পুরুত্ব ৪০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার। সবচেয়ে বড় হলের ভেতরের মেঝে এখনো পাকা নয়। চাইলে জুতা পায়েই একদম ভেতরে হেঁটে যাওয়া যায়। দুটো সিঁড়ি সরাসরি ছাদে উঠে গেছে। এর একটি মসজিদ হলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এবং অপরটি উত্তর দেয়ালে প্রধান প্রবেশপথসংলগ্ন। দ্বিতীয়টিতে মসজিদের বাইরে থেকে সরাসরি প্রবেশ করতে হয়। ছাদের ওপরে ছোট ছোট ছিদ্র ছিদ্র আছে, যার মুখে মাটির কলসির মতো পাত্র বসানো এবং এর মুখ ঢাকা। গরমে বাতাস বেরোনোর জন্য প্রয়োজনে এর মুখ খোলা যায়।

গ্রেট ডিজেনি মসজিদ আফ্রিকার স্থাপত্য চরিত্রে যোগ করেছে ভিন্ন এক মাত্রা। নির্মাণকালে মালি ফরাসি শাসনামলের আওতায় ছিল বিধায় এতে ফরাসি স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে মসজিদের কিবলা দেয়ালের সঙ্গে যে তিনটি উঁ”ু টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে, সেটা নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করতে থাকেন এই পুনর্নির্মাণে হারিয়ে যায় পুরোনো মসজিদের প্রকৃত চেহারা। মসজিদের কোনাকৃতির পিনাকলসগুলো বারুক টেম্পলকেই ওখানে প্রতিস্থাপিত করেছে। কেউ কেউ একে আফ্রিকান স্থাপত্য বলে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবতা হচ্ছে মসজিদের বাহ্যিক দর্শনে ফরাসি স্থাপত্যের ছাপ যতটা স্পষ্ট, মুসলিম স্থাপত্য ততটাই উপেক্ষিত। ১৯১০ সালে ফেলিক্স ডুবোই যখন পুনরায় মসজিদ পরিদর্শনে আসেন তখন মসজিদের এই পরিবর্তন দেখে হতভম্ব^ হয়ে পড়েন। তাঁর কাছে এটি ছিল একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। তবে ১৯০৭ সালের পরে আর কোনো পরিবর্তন হয়নি, শুধু ১৯৯০ সালে দুটো আলাদা তোরণ এতে সংযোজন ছাড়া। দেয়াল নির্মাণের সময় চেষ্টা করা হয়েছে পুরোনো হারিয়ে যাওয়া মসজিদের ভগ্নাবশেষ অনুসরণে যতটা সম্ভব বহিঃসীমানা ঠিক রাখা। তবে ভেতরের ছাদের জন্য কলাম ও সাপোর্টগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজাইন করা।

গ্রেট মসজিদের দেয়াল রোদে পোড়া ইট এবং বালু ও এঁটেল মাটির মিশ্রণে তৈরি মসলার সাহায্যে প্রস্তুতকৃত। এর পরে মাটির সাহায্যেই পলেস্তারা লাগানোর পর মসজিদটি মোটামুটি মসৃণ চেহারা পায়। দেয়ালের ওপরের দিকে সারা গায়ে পামগাছের গুঁড়ি বেরিয়ে থাকে। মসজিদের দেয়াল থেকে প্রায় দুই ফুট লম্বা পর্যন্ত এগুলো বের করে রাখা হয়, যাতে মসজিদের দেয়ালে দৃশ্যমান বিশেষ ধরনের প্যাটার্ন তৈরি হয়। এ ছাড়া মেরামতের সময় এটি স্ক্যাফোল্ডিং হিসেবে কাজ করে। বাঁশ, কাঠ দিয়ে মাচা বানানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে গাছের আড়া ব্যবহার করার মূল কারণ হিসেবে ধারণা করা হয় ভবনের স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য বিম হিসেবে ব্যবহার করা মাটির দেয়ালের ফাটল যতটা সম্ভব কমাতেই এ প্রচেষ্টা।

মাটির মসজিদ মালির মুসলিম সমাজের দিনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফরাসি ঔপনিবেশিকেরা যখন প্রথম মাটির এই স্থাপনা দেখেন তখন একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান এটি অস্থায়ী ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে কি না তাই ভেবে। কারও কারও ধারণা ছিল হয়তো অর্থাভাবে ভালো নির্মাণ উপকরণে স্থায়ী কিছু হচ্ছে না এ জন্যই তাঁরা অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বস্তুত ফরাসি বিপ্লব ও ঔপনিবেশিক জৌলুশের বিপরীতে এই মাটির স্থাপনা তাদের গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এর মেরামত উৎসবে অংশ নিতে পারাটা বরং তাঁদের জন্য উত্তম ও সম্মানজনক কাজ হিসেবে বিবেচিত। এ সময় দলমত-নির্বিশেষে সবাই একটি আনন্দময় ধর্মীয় উৎসবে মেতে ওঠেন। প্রতিবছর বর্ষাকালের শেষে স্থানীয় অধিবাসীরা একটি উৎসবের আয়োজন করে, যার মূল উদ্দেশ্য মসজিদের সংস্কার করা। মানুষ একত্র হয়, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে গান, খাওয়াদাওয়া করে। তবে উৎসবের সবচেয়ে কাজের দিক হচ্ছে কয়েক দিন আগে থেকেই মসজিদের মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ এবং কাজের উপযোগী করা। বরকতের আশায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও এ কাজে যুক্ত করা হয়। মুরব্বিরা মসজিদের সামনের চত্বরে বসে দেখভাল করেন। যুবক বয়সীরা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে কাজে নেমে পড়ে। প্রথমে প্লাস্টার প্রস্তুত করা হয়। প্লাস্টার একসঙ্গে শুকানো যায় না বরং ধাপে ধাপে তা করা হয় এবং শুকাতে হয়। ওপরের অংশে কাজের জন্য একটি গ্রুপ ভবনের গায়ে চড়ে এবং নিচে থেকে মসলা তুলে দেওয়ার জন্য আরেক দল কাজ করে। জনপদের মহিলারাও বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়। কে কার আগে প্লাস্টার সম্পন্ন করতে পারে তা নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

১৫-১৬ শতাব্দী ডিজেনি মুসল্লিদের মিলনমেলা হয়ে ওঠে এবং এই সময়ে বেশ নামকরা একটি শিক্ষায়তন হিসেবেও ডিজেনি মসজিদ পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮৮ সালে মসজিদসহ পুরো ডিজেনি শহরটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। মালিতে আরও কিছু মসজিদ আছে, যা গ্রেট ডিজেনি মসজিদের চেয়েও পুরোনো, তবে নির্মাণশৈলী এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে গ্রেট মসজিদটিই ডিজেনি শহর এবং পুরো মালির জন্য বিশেষ গুরুত্ববহ।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top