স্বপ্নের আবাসন নিরালা
সৌন্দর্যের নিভৃত সৌরভে

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়া তুলনামূলক চরমভাবাপন্ন বলেই অনেকের ধারণা। গরমের তীব্রতায় যেমন আসে ক্লান্তি, তেমনি শীত এসে কাঁপিয়ে দিয়ে যায় এখানকার জনমানুষের স্বাভাবিক জীবন। তবে আবহাওয়া বৈরী হলেও এখানকার মানুষ কিন্তু সহজাত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। নিরিবিলি-শান্ত পরিবেশে যাপিত সরল জীবনই তাদের পছন্দ। খোলামেলা প্রকৃতির ছায়া, সুরেলা পাখির গানে তারা সহজেই আন্দোলিত হয়। দিনাজপুরের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নাজিম উদ্দীন মণ্ডলের চাওয়াও ঠিক এমনই। সারা জীবনের সঞ্চয় আর শেষজীবনের কিছু প্রাপ্তি মিলিয়ে তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসে পড়ে স্থপতি রুবায়েত তানভীর চৌধুরী ও স্থপতি যুবায়ের হাসানের ওপর। স্থপতিদ্বয়ের মিলিত প্রয়াসে জন্ম নাজিম উদ্দীনের নিরালা কিন্তু শৈল্পিক ছোট্ট কুটিরের।

দিনাজপুরের নিউটাউন এলাকায় সাড়ে সাত কাঠা জায়গার ওপর দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল এই বাড়িটির প্রতি তলার সর্বোচ্চ আয়তন সাড়ে সতের শ বর্গফুট। খুব ছোট হলেও এর বাহ্যিক কিন্তু নান্দনিক রূপকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। লাল ইটের তৈরি দেয়াল, জানালায় কাঠের ফ্রেমে স্বচ্ছ কাচের পাল্লা, সামনে এক চিলতে ঘাসের বিছানা সাধারণের মধ্যেও মনে রাখার মতো বিশেষ কিছু। তিনটি প্রশস্ত ধাপ পেরিয়ে উঠে আসতে হয় প্রবেশ-বারান্দায়। বারান্দার ওপরে দোতলার উচ্চতায় এসে মিশেছে বাড়তি ছাদ। 

বাড়ি করার আগে থেকেই বেশ কিছু গাছগাছালির সমাহার ছিল জায়গাটায়। গৃহকর্তার ইচ্ছা যতটা সম্ভব সবুজকে বাঁচিয়ে গড়ে তুলতে হবে স্বপ্নের আবাস। জায়গার একদিকে তুলনামূলক প্রশস্ত হওয়ায় বাউন্ডারি লাইন যেখানে বাঁক খেয়েছে, ভবনও সেখানে ভাঁজ হয়ে এগিয়েছে সম্মুখপানে। গাছের সারির পাতা বাড়ছে বারান্দার দিকে। দোতলায় দুটো থাকার রুম। আছে বিস্তৃত পারিবারিক অঙ্গন, এর সঙ্গে একটি আছে প্রশস্ত বারান্দা সামনের বাগানের দিকে মুখ করে। দোতলার সঙ্গে নিচতলার সংযোগের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ খোলামেলা কিন্তু প্রশস্ত সিঁড়ি। নিচে আছে আরও দুটি কক্ষ, ডাইনিং হল, লিভিং রুম, রান্নাঘরসহ অন্যান্য।

শুধু নকশাই নয়, ভবনের নির্মাণ-ব্যবস্থাপনাও স্থপতি নিজেই তদারকি করেছেন। বাড়ির কর্তা নিশ্চিন্তে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন তাঁদের ওপর। নির্মাণ-ব্যবস্থাপনায় স্থপতিদ্বয় স্থানীয় কর্মী আর সহজলভ্য নির্মাণ উপকরণের দিকে নজর দিয়েছেন। মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ইটের তৈরি ফাউন্ডেশনকেই নির্ধারণ করেছেন ভবনের ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য। দৃশ্যমান অংশেও ব্যবহার করা হয়েছে এই ইটকেই। ফলে আলাদা আস্তর বা রঙের প্রয়োজন হয়নি। এমনকি ভবনের ভেতরের অনেক জায়গায় আস্তর ছাড়া ছাদ ব্যবহার করা হয়েছে। সুদূর অতীত থেকেই উত্তরাঞ্চলের নির্মাণকর্মীদের এমন স্থাপনা নির্মাণে আলাদা খ্যাতি আছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় মানুষ অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় সে ঐতিহ্য এখন কমতে চলেছে, পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় ধাঁচের বিচিত্র নকশার বৈচিত্র্যতা। বাড়ির কর্ণধারের ইচ্ছায় ভবনের নির্মাণকাজে স্থানীয় ধাঁচের একটি পরিশীলিত রূপের ছাপ লক্ষণীয়। ভবনের বাইরে ও অন্দরের সার্বিক সজ্জায় একটা নিজস্বতা আপনাআপনিই প্রকাশিত হয়। যাতে পুরো প্রকল্পই হয়ে উঠেছে দারুণ উপভোগ্য ও দর্শনীয়।

স্থপতি রুবায়েত ও যুবায়েরের ভাবনায় এ স্থাপনায় তাঁরা মূলত তিনটি বিষয়কে ধারণ করতে চেয়েছেন।

প্রথমত, বিভিন্ন ঋতুতে নিজস্ব পরিসরকে উপভোগ করা। মুক্ত ছাদ ও বারান্দা বৃষ্টি ও তার পানিকে অনুমতি দিচ্ছে নিজ আঙিনায় আসার, ছায়া-ঢাকা অন্তর্মুখী বারান্দা গরমের সময়েও বাইরের সৌন্দর্যকে উপভোগের সমান সুযোগ করে দিচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ভবনের কাঠামো এবং কক্ষবিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যেন অন্তঃস্থ পরিসরে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক বাতাস ও আলোর খেলা জমে ওঠে। কৃত্রিম আলো বা বাতাসের প্রয়োজনীয়তা কমায়, এভাবে আসলে এনার্জি খরচ বাঁচবে উল্লেখযোগ্যহারে। এর পাশাপাশি তৃতীয় বিষয় হচ্ছে সামনের খোলা বাগান ও খেলার জায়গা, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হবে অনেক সুখকর স্মৃতির সাক্ষী। গৃহের বাসিন্দাদের ফেলে আসা শৈশবকে তাঁরা ছড়িয়ে দিতে চান আগামী প্রজন্মের স্বপ্নের অনুষঙ্গ করে।

বাহুল্য নেই, অতিরিক্ত সংযোজন নেই, স্থপতিদ্বয়ের মূল চিন্তা হচ্ছে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের মননের চাহিদা পূরণই প্রথম কর্তব্য। বাকিটা রয়ে যাক যেমন, তেমনই। পূর্ব-দক্ষিণে বাতাস থাকবে, থাকবে ঘরভর্তি ঝকঝকে আলো, বিকেলে সবুজ ঘাসের ওপর নিত্যদিনের ছায়া থাকবে, থাকবে গোধূলির লাল রং দেখার জন্য খোলা আকাশ, দিনান্তে যেখানে হেসে উঠবে পূর্ণিমার চাঁদ। ‘নাজিম হাউজ’ তাই সত্যিই আড়ম্বরহীন নিরালা সৌন্দর্যের এক প্রতীকী রূপ।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top