এর নকশাটি ছিল সরাসরি জাপানি লোকজ স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংবেদনশীলতার মাধ্যমে এর যুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। কাঁচের সম্মুখভাগগুলো শোজি পর্দার মতো করে অন্দর ও বাইরের সীমানা বিলীন করে দেয়; কালো স্লেটের মেঝে তাতামি মাদুরের জ্যামিতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ছাদগুলো কম-প্রতিফলনশীল সৌর টাইলস দিয়ে আবৃত, যা ঐতিহ্যবাহী জাপানি ছাদের নকশার একটি প্রযুক্তিগত রূপান্তর।
বলছি NOT A HOTEL Setouchi (নট আ হোটেল সেতোউচি)-এর কথা। জাপানের সেতো ইনল্যান্ড সমুদ্রের ধারে নীরব জলরাশি, কুয়াশা ঢাকা পাহাড়ি ঢাল আর সবুজে ঘেরা জাপানের সাগিশিমা দ্বীপ। এই প্রাকৃতিক নাট্যমঞ্চের মাঝেই BIG (Bjarke Ingels Group) নির্মাণ করেছে NOT A HOTEL Setouchi (নট আ হোটেল সেতোউচি)। যা ছিল BIG-এর জাপানে প্রথম করা কোন প্রকল্প। কি আছে এই আশ্চর্য রিসোর্টে! প্রায় ৩০,০০০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রকল্পে রয়েছে তিনটি ভিলা, একটি সমুদ্রকে সামনে রেখে একটি রেস্তোরা এবং প্রাইভেট বিচ।
ভূদৃশ্য থেকে জন্ম নেওয়া স্থাপত্য
এই প্রকল্পের ভবনগুলো যেন দ্বীপের ওপর বসানো কোনো বস্তু নয়, বরং ভূদৃশ্যের শরীর থেকেই উঠে এসেছে বলে মনে হয়। এই কারণে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান একে ঠিক হোটেল বলতে নারাজ! পাহাড়ি ঢাল বরাবর ফিতার মতো বাঁক নিয়ে তিনটি ভিলা ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলোর নাম ১৮০, ২৭০ ও ৩৬০, যা তাদের প্যানারমিক সি ভিউ এর তিনটি কোণকে নির্দেশ করে। এই সংখ্যা শুধু নাম নয়, বরং ভিউ–এর জিওমেট্রি।
BIG এখানে ভূপ্রকৃতিকে শুধু context হিসেবে নেয়নি; বরং এর ঢাল, এর রূপ পরিবর্তন, সমুদ্রতট–কে ডিজাইনের উৎসাহ হিসেবে বিবেচনা করেছে। দূর থেকে দেখলে বাঁকানো ছাদকে এই পাহাড়ি দ্বীপের বাঁকানো রেখার একটি বর্ধিত অংশ বলে মনে হয়।
মাটি দিয়ে গড়া দেয়াল
এই রিসোর্টের ডিজাইনের কেন্দ্রে রয়েছে rammed earth walls বা ঠেসে তৈরি মাটির দেয়াল। সাইটের মাটি সরাসরি ব্যবহার করে তৈরি এই দেয়ালগুলো। শুধু টেকসই নয়, বরং সাগিশিমার ভূতত্ত্ব যেন অন্দরসজ্জার অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। দেয়ালের স্তরবিন্যাসে মাটির টেক্সচার, রঙের সরল ভিন্নতা, এবং হাতের কাজের ছাপ স্পষ্ট। এতে ভবনের ভেতরেও দ্বীপের মাটির স্মৃতি বহমান থাকে।
স্ক্যান্ডিনেভীয় স্বচ্ছতা ও জাপানি স্থানিক স্মৃতি
BIG–এর স্বাক্ষরধর্মী স্ক্যান্ডিনেভীয় মিনিমালিজম এখানে জাপানি ঘরবাড়ির ঐতিহ্যের সঙ্গে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মিশে গেছে। কাঁচের দেয়ালগুলো ভেতর ও বাইরের সীমারেখাকে প্রায় মুছে দেয়। ফ্লোর প্ল্যানিংয়ে তাতামি মাপের প্রভাব, নিচু অনুভূমিক রেখা, সমুদ্রদৃশ্যকে ফ্রেমবন্দি করা জানালা এবং আঙিনার নীরবতা সবমিলিয়ে এক ধরনের জেন-অনুপ্রাণিত শান্ত বিলাসিতা তৈরি হয়েছে।
এক পরিকল্পিত যাত্রা
এই প্রকল্পে স্থাপত্য শুধু ভবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আগমনের যে সাজপদ্ধতিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। স্পিডবোট বা হেলিকপ্টারে পৌঁছে প্রাইভেট বিচে নামা, তারপর রেস্তোরাঁর প্যাভিলিয়ন পেরিয়ে হাওয়াঘেরা পথ ধরে ভিলাতে ওঠা… এই পুরো যাত্রাটা এই রিসোর্টের গল্পেরই অংশ।
সাগিশিমার পাহাড়, সমুদ্র, মাটি ও নীরবতার সঙ্গে মিশে গিয়ে BIG এমন একটি স্থাপত্য নির্মাণ করেছে, যা অবিস্মরণী। NOT A HOTEL Setouchi আমাদের মনে করিয়ে দেয় সবচেয়ে শক্তিশালী স্থাপত্য আসলে আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দেয় না, বরং তার ভাষাতেই কথা বলে।
তথ্যসূত্র:
আর্কোডেইলি, ডিজেইন, নট আ হোটেল