বদলে যাওয়া ঈদগাহ মাঠ

জল সবুজে ঢাকা

রাজধানী ঢাকাকে বসবাসের যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরই অংশ হিসেবে ‘জল সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে নগরের ৩১টি পার্ক ও ঈদগাহ মাঠকে (খেলার মাঠ) নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। ‘জল সবুজের ঢাকা’, বস্তুত এমন একটি উন্নয়ন প্রকল্প, যেখানে নানা বিচক্ষণ গোষ্ঠী আর সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টার সমন্বয়ে পার্ক, খেলার মাঠ ও ভূ-দৃশ্যাবলির উন্নয়ন সাধন করা হয়। এই চিন্তক গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন সর্বস্তরের নাগরিক, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী এবং জনপ্রতিনিধিদের একটি দল, যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই উন্নয়ন এবং সংরক্ষণ প্রকল্পে কাজ করে যাচ্ছে। কাজ শেষে মাঠগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়াই এই দলের মূল উদ্দেশ্য। জল সবুজে ঢাকার অন্যতম প্রয়াস, প্রকল্পসমূহকে সাধরণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা এবং বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করে বিনোদনস্থলগুলোকে মেরামত করে পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করে তোলা। বাংলাদেশেই প্রায় ৭০ জন স্থপতির এক বিশাল দল এই প্রকল্প কাজে নিয়োজিত। প্রকল্পের প্রধান স্থপতি রফিক আজম সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৭টি প্রকল্পেই। এরই মধ্যে যে প্রকল্পটি সবার আগে জনমানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে সেটি ঢাকেশ্বরী, লালবাগের শহীদ হাজি আবদুুল আলিম ঈদগাহ মাঠ তথা খেলার মাঠ। মাঠটির উন্নয়ন ঘিরে নানা রূপকল্প এবারের আলোচ্য। 

মাঠ পরিচিতি

  • বাস্তবায়নে: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
  • প্রধান স্থপতি: স্থপতি মো. রফিক আজম
  • প্রকল্প পরিচালক: অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান 
  • পরামর্শক প্রতিষ্ঠান: সাতত্য, জেপিজেডজেভি
  • সহযোগী স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান: কিউব ইনসাইড লিমিটেড
  • ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান: KTA-AT(AV) 

যেমন ছিল মাঠটি

চার বিঘা আয়তনের শহীদ হাজি আবদুুল আলিম ঈদগাহ মাঠটি আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী রোডে অবস্থিত। ঈদগাহ মাঠের উত্তর দিকে ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী মন্দির, দক্ষিণ-পূর্বে মসজিদ, পূর্বে ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব। সংস্কারের আগে মাঠটি ট্রাক-ভ্যান পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হতো। মাঠে ছিল না খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ। চারপাশে উঁচু সীমানা দেয়ালের ওপরে গ্রিল দিয়ে ঘেরা থাকায় সবার পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। বয়স্কদের জন্য হাঁটাচলার বা বিশ্রাম নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না ছোটদের খেলাধুলার সরঞ্জাম ও পরিবেশ। মাঠের পানি নিষ্কাশনের সুবিধা না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। সর্বোপরি জনসাধারণের ব্যবহারের অনুপযোগীই ছিল মাঠটি। জমে থাকা পানিতে জন্মাত মশা ও পোকামাকড়।

ডিজাইন দর্শন

স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনার সময়ে যেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি প্রকল্পকে পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া শেখানো হয় এখানেও স্থপতি একইভাবে প্রকল্পটি অবলোকন করেছেন, পর্যালোচনা করেছেন। এই প্রকল্পে একটি ভবন নিয়ে কেবল কাজ করা হয়নি, যা সচরাচর স্থপতিরা করে থাকেন। এটা নগর পরিকল্পনার অধীনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কেবল ঈদগাহ মাঠের সংস্কার বলে মনে হলেও সামাজিক, মনস্তাত্তি¡ক, যোগাযোগ, মূল্যবোধ ইত্যাদি নানা শাখায় এর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত ভীষণ দায়িত্বসহকারে পালন করতে হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে স্পষ্ট করেই বলা ছিল যে ১৯টি পার্ক এবং ১২টি খেলার মাঠের সংস্কারকাজ ও উন্নতি সাধন করতে হবে। চধৎশং ধহফ চষধু এৎড়ঁহফ দুটি শব্দ দিয়ে একটি জায়গাকে যেভাবে দুটি ধারণার আলোকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে স্থপতি রফিক আজম প্রথমেই এই চিন্তাকে প্রশ্ন করেন। একটা খেলার মাঠে শুধুই খেলা হবে আর পার্কে শুধুই হাঁটাহাঁটি আর বসা হবে এই জাতীয় চিন্তা থেকে তিনি সরে আসেন। ফলে আবদুুল আলিম মাঠেই কিন্তু আমরা দেখতে পাই এখানে একাধারে যেমন ফুটবল খেলার মাঠ রয়েছে, তেমনি আছে গাছে-ঢাকা সবুজ খেলার চত্বর, শিশু ও মহিলাদের জন্য আলাদা স্থান, সাইকেল রাখার জায়গা। এ ছাড়া মাঠের এক কোণে আছে ছোট্ট একটা ভবন, যেখানে রয়েছে চায়ের দোকান, ব্যায়ামাগার ও লাইব্রেরি। ফলে খেলার মাঠ বা পার্ককে ছাপিয়ে জায়গাটা তখন একটি সম্প্রদায়ের হয়ে গেল এবং পেল আরও ব্যপকতা। জল সবুজে ঢাকার প্রায় সব মাঠেই এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। 

প্রকল্পটির অন্যতম বিশেষত্ব মাঠটিতে রাখা হয়নি কোনো সীমানাপ্রাচীর; নেই প্রবেশেরও কোনো সময়সীমা। ফলে নিরাপত্তাজনিত প্রশ্ন এলে জবাবও কিন্তু এই চিন্তার আড়ালেই রয়ে গেছে। মাঠটির দেখভাল করবে তো এলাকাবাসীই। কারণ মাঠে তাদের অবাধ আনাগোনা থাকলে অপরাধ ঘটার সুযোগটা কোথায়! তা ছাড়া মজার বিষয় হলো, যখন মাঠের চারপাশে দেয়াল ছিল তখনো কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নেই সেই কাজটি করা হয়েছিল অথচ তার পরিণতি তো আমরা সবাই জানি। যেহেতু কোনো আড়াল নেই, রাতে চারদিকে আলোক বাতি জ্বলায় থাকছে না অন্ধকার, আর এই যে এত্ত মানুষের চোখই তো সব থেকে বড় নিরাপত্তা। তা ছাড়া মাঠকে নিছক গন্তব্য না ভেবে তাকে দৈনন্দিন যোগাযোগের একটি অংশ করে তোলার মধ্য দিয়ে মাঠের দুই দিকে রাস্তার সঙ্গে হাঁটাপথের এমন সম্পর্ক করা হয়েছে যে কেবল মাঠের ব্যবহারকারী নন বরং আশপাশের অধিবাসীরাও নিয়মিত খেয়াল রাখতে পারছেন এখানে কী ঘটছে!  

বিগত প্রায় ২০-৩০ বছর ধরে মাঠগুলো কেন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল সে অনুসন্ধানেই বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। যে মাঠকে রক্ষার জন্য চারপাশে প্রাচীর দেওয়া হলো, সেই প্রাচীরই ঈদগাহ মাঠটিকে করে ফেলল বেদখল! যখন থেকে ঈদগাহ মাঠে গেট দিয়ে তালা ঝুলিয়ে এলাকাবাসীকে পর করে দেওয়া হয়, তখন থেকেই সেখানে চলতে থাকে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। যে মাঠ এলাকার হৃৎপিন্ড হওয়ার কথা তা পরিণত হয় অভিশাপে। স্থপতি তাই মাঠটির চারদিকের দেয়াল সরিয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে এলাকাবাসীর আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছেন। কারণ একটি দেয়াল থাকার ফলে তাকে ঘিরে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ যেমন, নেশা জাতীয় দ্রব্যাদির বেচাকেনা ও ব্যবহার, ময়লা ফেলার স্থান, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে জোরপূর্বক দখলদারি ইত্যাদি নানা কুকর্মের ফলভোগ করতেন এলাকাবাসীই। এতে ঈদগাহ মাঠটি ব্যবহারগত দিক থেকে যেমন সবার অনীহা দেখা যায়, সেই সঙ্গে একটি সুন্দর সবুজ মাঠের মূল কার্যকরী উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়। মাঠটির এই পরিণতি কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক নয়, আমরা প্রতিনিয়ত অসচেতন হয়ে যেসব আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি তারই ফল ছিল ঈদগাহ মাঠটির এই ভয়ংকর চেহারায়। এই যে দেয়াল দেওয়ার ফলে মানুষে মানুষে সৃষ্ট অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা তাদের সমূলে নিপাত করাই ছিল স্থপতির দৃষ্টিকোণে মূল ভাবনা। এই কারণেই মাঠটি নকশার ক্ষেত্রে স্থপতির মূল দর্শনগত অবস্থান ছিল ‘সংকেতবাদ’। 

মাঠটির নিজস্ব নাম থাকলেও সবার কাছে ‘বালুর মাঠ’ নামেই এটি অধিক পরিচিত। কেননা এই মাঠে কেবল বালুর দেখা মেলে। সেই হিসেবে ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মাঠই আসলে বালুর মাঠ। মাঠগুলোকে সবুজ করার মাধ্যমে মানুষের মাঝের সজীবতাকে জাগিয়ে তুলতে চায় সাতত্য ও কিউব ইনসাইড। তাতে মাঠটির প্রতি ব্যবহারকারীদের দরদ জন্মায় এবং জায়গাটি নোংরা না করে বরং রক্ষা করতে সবাই সদিচ্ছা দেখায়। 

সবুজের পাশাপাশি পুরান ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা পানি ব্যবস্থাপনা। প্রবল বর্ষণে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এই এলাকায় খুবই করুণ। তাই জলাবদ্ধতার দরুন খেলার মাঠ, রাস্তাঘাট সবই ড্রেনের পানিতে মিলেমিশে এক অস্বাস্থ্যকর এবং বসবাসের অযোগ্য এক পরিবেশের সৃষ্টি করে। স্থপতি তাই মাঠটিতে চতুষ্কোণ ফুটবল খেলার মাঠের চারপাশ দিয়ে হাঁটাপথ তৈরি করেছেন, যার নিচে রয়েছে প্রায় সাত ফুট গভীর এক পরিখা। এই পরিখায় ৫ লাখ লিটার পানি ধারণ করা সম্ভব। কিছুদিন আগের বর্ষাতেও লক্ষ করা গেল যে মাঠে আর পানি জমছে না। এ এক বিশাল অর্জন। মাঠের সবুজ ঘাস ও গাছপালার যতেœ সেচের পানির কাজে এই পানি ব্যবহার করে অপচয় রোধ করা সম্ভব। তা ছাড়া পানি পরিশোধনের মাধ্যমে তা নানা কাজেও ব্যবহৃত হবে। এই ঈদগাহ মাঠের মাটিতে ঘাস জন্মায় না বলে প্রযুক্তিগতভাবে ঘাস জন্মানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিয়মিত তার যত্ন নিয়ে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো হচ্ছে। এভাবেই একটি সুষ্ঠু চিন্তার প্রয়োগ নিমেষেই পুরান ঢাকার অভিশপ্ত পানিকে আশীর্বাদে রূপান্তরিত করে। 

আশপাশের আবাসিক এলাকার সব বয়সের লোকজনই যেন এই ঈদগাহ মাঠ ব্যবহার করতে পারে তাই একই সঙ্গে বড় খোলা খেলার জায়গা, ক্রিকেট খেলার জন্য আলাদা নেটের পাশাপাশি হাঁটাচলার জায়গা নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর তাই নতুন নকশায় বড় আকারের খেলার মাঠ রেখে এর চারপাশে সুপ্রশস্থ পায়ে হাঁটার পথ রাখা হয়েছে।  মাঠ ও হাঁটাপথের মধ্যে দেওয়া হয়েছে নেট, যাতে খেলার সময়েও পার্কে অন্যান্য আগমনকারীর অসুবিধা না হয়।  

রাতের বেলায় চলার পথে বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে দিনে কি রাতের যেকোনো সময়েই সবাইকে আমন্ত্রণ জানায় মাঠটি। দেয়াল না থাকাতেই সবার এই আগমন আরও কামনীয় যেন এলাকাবাসীর দৃশ্যগত স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে মাঠটি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। খেলার মাঠের চারপাশ ঘিরে হাঁটাপথের নিচেই রয়েছে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ড্রেন। যার কারণে মাঠটি থাকবে জলাবদ্ধতা মুক্ত, দুর্গন্ধহীন ও নির্মল। ঈদগাহ মাঠের পূর্ব দিকে একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় মাঠে আগতদের জন্য টয়লেট, ব্যায়ামাগার এবং দোতলায় পাঠাগার ও ক্যাফের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিশুদের খেলার জন্য পার্কের পূর্ব দিকে আলাদা স্থান রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে হাঁটাপথের সঙ্গেই রয়েছে বসার জন্য বেঞ্চ আর বিভিন্ন রকমের গাছপালা লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা।

স্থপতি রফিক আজমের চিন্তায় এই পার্কে নতুন ল্যান্ডস্কেপ অর্থাৎ সবুজকে নিয়ে নতুন করে ভাবা হয়েছে। ভবনের মতো সবুজও অনেক চিন্তা করে প্রয়োগ করতে হয়। কারণ পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর সবচেয়ে প্রভাব এই সবুজ থেকেই পড়ে। ঈদগাহ মাঠে লাগানো হয়েছে কৃষ্ণচূড়া, লটকন, কামরাঙা, সোনালু, শ্বেতকাঞ্চন, সফেদা, কলাবতী, রাধাচূড়া, পুটুশ, শ্যাওড়া, কাঠবাদাম, বকুল, মানিপ্ল্যান্ট, হেলেঞ্চা, গাবগাছ, আকাশ মল্লিকা, বিলিম্বি, বাগান বিলাস ও ঢাকগাছ বা পলাশগাছ (ঢাকগাছ থেকে ঢাকা নামের উৎপত্তি বলে শোনা যায়)। এসব গাছ পাখিদের আমন্ত্রণ করে। তা ছাড়া গাছ ও ফলের যা ধরন তাকে ঘিরে দখলদারির মতো নোংরা ঘটনা ঘটার সুযোগ থাকে না।  আশপাশের শিশুদের সঙ্গে নিয়ে স্থপতি নিজেই মাঠে গাছ রোপণ করেছেন। এতে করে গাছের সঙ্গে তাঁদের একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়; পরিচিত হয়। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ঈদগাহ মাঠেই মিটিং করে কোন কোন গাছ রোপণের মাধ্যমে মাঠে ছায়া, পাখি ও প্রজাপতিদের আমন্ত্রণ জানানো যাবে, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে মাঠটির প্রতিটি জায়গায় কিন্তু বেশ দরদ দিয়ে, যত্ন করে কাজ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে মাঠটিতে উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ার আগে থাকা গাছগুলোর একটিও কাটা হয়নি। স্থপতি তাঁর এই চিন্তার ক্ষেত্রে বলছেন, ‘বাচ্চারা পুরান ঢাকার প্রজাপতির পেছনে ছুটুক, ড্রাগের পেছনে নয়।’

মাঠটির নির্মাণের পুরো পরিকল্পনায় স্থপতির সব থেকে সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত হলো তিনি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের পলিসিগত বা নীতি নির্ধারণেও ভূমিকা রাখছে। একটি প্রকল্প কেবল নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তাকে দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথভাবে টিকে থেকে সমাজের সেবক হতে হয়। ফলে মাঠটির রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা নিয়েও কাজ করছেন স্থপতি। মাঠের জল, সবুজ ও পরিকাঠামোগত যাবতীয় বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণের তালিকা তৈরি ও তাদের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে, যা বাংলাদেশে স্থাপত্যচর্চায় নিঃসন্দেহে নতুন এক মাত্রা যোগ করবে। এই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় কারও সাহায্য নয়, বরং মাঠেই যে উপার্জনের ক্ষেত্রগুলো তৈরি হচ্ছে (চায়ের দোকান, ব্যায়ামাগার, লাইব্রেরি ভাড়া দেওয়ার মধ্য দিয়ে) সেখান থেকেই ঈদগাহ মাঠের সঞ্চালনা প্রক্রিয়া চালু থাকবে। তা ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিতে সিটি করপোরেশন, স্থপতি, ঠিকাদার ছাড়াও এলাকাবাসীর মধ্যেও নানা বয়সের প্রতিনিধি থাকছেন, যাঁদের দ্বারাই ঈদগাহ মাঠটি দীর্ঘকাল টিকে থাকবে। বিচ্ছিন্নভাবে নয় বরং পরিকল্পিত স্থাপত্য নকশায় আবালবৃদ্ধবনিতার পৃথক পৃথক সুযোগ-সুবিধার মেলবন্ধনে পূর্ণতা পেয়েছে এই খেলার মাঠ, যা শুধু পুরান ঢাকার জন্য নয়, আধুনিক ঢাকার ক্ষেত্রেও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১১০তম সংখ্যা, জুন ২০১৯

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top