দুজনের একাত্ন হবার স্মারক

রিবন চ্যাপেল আসলে একটি ওয়েডিং ভেন্যু। জাপানের হিরোশিমা অঞ্চলের ওনোমিচি শহরের অন্যতম রিসোর্ট হোটেল ‘বেলা ভিস্তা সাকাইগাহামা’-এর উদ্যানের মাঝে এই নান্দিক চ্যাপেলটির অবস্থান। জাপানের বিখ্যাত স্থপতি হিরোশি নাকামুরা ‘রিবন চ্যাপেল’-এর ডিজাইনার। অত্যাধুনিক এই চ্যাপেলটি যেহেতু বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের উদ্দেশ্যে নির্মিত, তাই এর গঠনের পেছনে ‘বিবাহ দর্শন’ মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। দুটি মুক্ত রিবন বা ফিতা শূন্য থেকে উড়িয়ে দিলে যেমন ঢেউ খেলিয়ে নিচের দিকে নেমে আসে এই চ্যাপেলটি সেই দৃশ্যটিকেই নিজের কাঠামোতে ফুটিয়ে তুলেছে। আর দুটি পৃথক ফিতার একে অপরের সঙ্গে মিলে যাওয়া বিয়ের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন মানুষের এক হওয়ার যে চিরকালীন প্রথা, সেটিরই গুরুত্ব বহন করছে। একটি পেঁচানো সিঁড়ি যদি ওপরে উঠত, তাহলে সেটি ততটা মজবুত হতো না, কিন্তু দুটি পেঁচানো সিঁড়ি পরস্পর পরস্পরকে শক্ত ভিত্তি দেওয়ার পাশাপাশি বরং নিজের অস্তিত্বকেও আরো দৃঢ় করেছে। রিবন চ্যাপেল তাই বিবাহের যে মূল দর্শন ‘দুজন মিলে এক হওয়া’ সেটিকে আধুনিক স্থ্যাপত্যের মাধ্যমে অসাধারণভাবে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছে। বেলা ভিস্তা সাকাইগাহামা রিসোর্টটি সুমদ্রের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত হওয়ায় রিবন চ্যাপেলের সৌন্দর্যকে যেন অন্য এক মাত্রা দান করেছে।

রিবন চ্যাপেলের কাঠামো তেমন জটিল কিছু নয়। দুটি পেঁচানো সিঁড়ি ওপরের দিকে এমনভাবে উঠে গেছে যেন এটি একে অপরকে সাপোর্ট দিতে পারে। নিচের দিকে আলাদাভাবে উঠে গিয়ে ওপরে আবার এক হয়েছে। আর এই পেঁচানো বিপরীতমুখী সিঁড়ির কারণে চ্যাপেলের স্ট্র্যাকচার অনেকটাই উন্মুক্ত ধরনের। দেখে যেন মনে হয় দুজন মানুষ মিলে এক হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগে নিজেদের জীবনের অনেকগুলো বাঁক পেরিয়ে এসেছে! নিচের দিক থেকে আলাদা উঠে যাওয়া ফিতাসদৃশ সিঁড়ি দুটি ১৫.৪ মিটার উঁচুতে শীর্ষদেশে গিয়ে পরিণত হয়েছে একক ফিতায়। পেঁচানো ফিতার মধ্যদেশে চ্যাপেলের মূল ফ্লোর, যেখানে বর-কনেকে অভ্যর্থনা জানাতে অতিথিরা জমায়েত হয়। আগত অতিথিবৃন্দ বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা উপভোগের পাশাপাশি চ্যাপেলের করিডর দিয়ে বাইরের পাহাড়ি গাছ আর গাছের ফাঁকে উঁকি দেওয়া সমুদ্র দেখার সুযোগ পান ষোলো আনাই। সমুদ্রের দিকে ফেরানো ৮০টি আসন যে এভাবেই বসানো।

সাধারণ যেকোনো ভবনের ক্ষেত্রে কিছু উপাদান একই রকম, যেমন- ছাদ, দেয়াল আর মেঝে। রিবন চ্যাপেলের ক্ষেত্রে পেঁচানো ফিতাসদৃশ সিঁড়িই ছাদ, দেয়াল আর মেঝের কাজ করছে। বিল্ডিংয়ের ব্যবহারিক প্রয়োজন অনুযায়ী সিঁড়ি দুটির ভেতরে কোথাও বেশি প্রশস্ত প্রস্থ রাখা হয়েছে, কোথাও-বা এটি পুরু শেডের মতো। যেমন একেবারে শীর্ষদেশে যেখানে বর-কনের জন্য নির্ধারিত স্থান, সেখানে বাইরে দেখার জন্য উন্মুক্ত হলেও এমনভাবে সিঁড়ি দুটি মেলানো হয়েছে যেন সরাসরি সূর্যের আলো ভেতরে এসে না লাগে।

ভবনের বাইরের দিকে খাঁড়া কাঠের প্যানেল দেওয়া। সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়ায় চ্যাপেলের সৌন্দর্য যেন আরও বেশি করে ফুটে উঠেছে। টাইটেনিয়াম জিঙ্ক অ্যালয় ব্যবহারের কারণে এটি বহিরাবরণকে সমুদ্রের লোনা হাওয়া থেকে সুরক্ষার কাজটি বেশ ভালোভাবেই করতে পারবে। চ্যাপেলজুড়ে জিঙ্ক অ্যালয় দিয়েই রঙের প্রলেপের কাজ করা হয়েছে, যেমন: দেয়াল, সিলিং, জানালার শার্সি প্রভৃতি। এ যেন সাদাসিধে অলংকরণের মাধ্যমে আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলা।

আর্কডেইলি

যে ধরনের চ্যাপেলে বিয়ের কাজ সুসম্পন্ন হয় সেসব চ্যাপেলের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন যে করিডর দিয়ে কনে তার বাবার হাত ধরে বিয়ের স্টেজে (যেখানে বর কনের শপথগ্রহণের মাধ্যমে বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়) আসে, বিয়ে শেষে ঠিক সে পথ ধরেই কনে বরের সঙ্গে তার নতুন গন্তব্যে রওনা হয়। রিবন চ্যাপেলে এই প্রথাকে গুরুত্বসহকারে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরতে বর-কনের জন্য ভিন্ন পথ বা করিডরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বর আর কনে যেমন আলাদা দুটি মানুষ, বিয়ের আগে তারা দুজনে জীবনের ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ পেরিয়ে এসেছে, তেমনি এখানেও তারা দুটি ভিন্ন পথ ধরে এসে চ্যাপেলের শীর্ষদেশে বিয়ের স্টেজে এসে মিলিত হয়। এখানে তারা একসঙ্গে বিয়ের শপথ নেয়, গুরুজন আর সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ গ্রহণ শেষে দুজনে এক সঙ্গে এক পথ ধরে নিচে নামে তাদের নতুন গন্তব্যে যেতে।

রিবন চ্যাপেল খুবই সহজ নকশার স্থাপত্য। এ স্থাপনায় কোনো জটিল কাঠামো ব্যবহার করা হয়নি। এতে শুধু কিছু পথ আর করিডর (সর্বমোট ১৬০ মিটার দৈর্ঘ্য) আছে যেটি এমনভাবে নকশা করা যেন সেটি এর পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পুরোমাত্রায় ব্যবহার করতে পারে। পাহাড়ি বন আর সমুদ্রের যে সুন্দর মেলবন্ধন, সেটিকে বর-কনের নতুন জীবনের শুরুতে শুভকামনায় রূপান্তরিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এর স্থপতি হিরোশি নাকামুরা।

চ্যাপেলের চারদিকে চারটি পয়েন্টকে ঘিরে এর মূল ফিতাসদৃশ পেঁচানো সিঁড়িপথটি ওপরের দিকে উঠে গেছে। সিঁড়ি দুটিকে ত্রিমাত্রিক হুপ ইফেক্ট (ধাতুর পাতের সাহায্যে সিঁড়ির ধাপগুলোকে আটকে রাখার বিশেষ ব্যবস্থা)-এর সাহায্যে বাইরের দিকে স্ফীত (দেখে যেন মনে হয়ে ওপর থেকে পেঁচানোভাবে দুটি ফিতা নিচের দিকে নেমে এসেছে) করার জন্য এবং আনুভূমিক ভর সহ্য করার জন্য ত্রিমাত্রিক ব্রেস ইফেক্ট ব্যবহার করায় সিঁড়ি দুটি পরস্পর পরস্পরকে সাপোর্ট করে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম। ১০০ মিলি মিটার ব্যাসার্ধের সলিড স্টিলের রডের মাধ্যমে সিঁড়িগুলোর উলম্বিক ভর রক্ষা করা হয়েছে (হুপ ইফেক্ট), এই রডগুলো শুধু সিঁড়ির ভেতরের প্যাঁচের ভর রক্ষার জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। ওপরের দিকে সিঁড়ির স্টিলের ফ্রেমের ভর কমাতে পেন্ডুলামের মতো পৃথক বেস ব্যবহার করা হয়েছে, যেমনটা ব্যবহার করা হয় হালকা ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে। যে তিন জায়গায় প্যাঁচের কারণে ভবনে কম্পনের আশঙ্কা বেশি, সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে ঝুলনার মতো টিউনড ম্যাস ড্যাম্পার।

কাচের জানালাগুলোর প্রতিটির কাচের উচ্চতা, পুরুত্ব এমনকি আকার পর্যন্ত ভিন্ন। ঘোরানো ত্রিমাত্রিক টর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এটি অক্ষত রাখার প্রয়োজনেই জানালার কাচগুলোর আকারে, পুরুত্বে নানামাত্রিক বিচিত্রতা।

আর্কডেইলি

স্থাপনাটির কাজ শেষ হলে এর বাড়তি লাগোয়া ফ্রেম খুলে ফেলার পর স্বাভাবিকভাবেই এর ওজনের কারণে আশঙ্কা ছিল ভবনটি হেলে পড়ার। তাই এটি নির্মাণের সময় এমন একটি স্ট্রাকচার মডেল তৈরি করা হয় যেন তাতে এর প্যাঁচের উল্টো দিকে ঘোরানো টর্ক বা হেঁসোর ব্যবহার করা হয়, যেন এটি নির্মাণকালীন কিছুটা হেলে থাকলেও আলগা ফ্রেম খুলে ফেলার পর এটার মূল নকশা অনুযায়ী খাড়াভাবে দাঁড়ানো পজিশনে ফিরতে পারে। আর মাত্র ২/১০০০ মার্জিন ত্রুটির এই অসামান্য কাজটির স্রষ্টা বিশ্ববিখ্যাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান অরূপ (Arup) কনস্ট্রাকশনের প্রধান নির্বাহী ইকুহিকো শিবাতা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top