ইটের পর ইট গেঁথে অথবা কংক্রিট ঢালাই দিয়ে যেসব সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মিত হচ্ছে, তার নেপথ্যে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে অনন্য ভূমিকা রাখছে সিমেন্ট। মানবসভ্যতা বিনির্মাণে সিমেন্টের অবদান বলে শেষ করার নয়। শক্ত, মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী স্থাপনা নির্মিত হয় সিমেন্টে। আর তাই হাজার হাজার বছর আগে থেকে বিশ^ব্যাপী নির্মাণে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে সিমেন্ট। শুধু ভবনই নয়, সড়ক, সেতু, ড্রেন ইত্যাদি নির্মাণেও এই উপকরণটির রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা। দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে এই সিমেন্ট সুপ্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি ধরে রেখেছে মানুষের আস্থা। কিন্তু কীভাবে উদ্ভাবিত হলো এই সিমেন্ট, সেটা নিয়ে হয়তো জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। পাঠকের সেই কৌতূহল মেটাতেই সিমেন্ট আবিষ্কারের বৃত্তান্ত এবারের আয়োজনে।
সিমেন্টের ব্যবহার প্রথম কারা করেছিল বা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা বলা কঠিন। একদম সঠিকভাবে বলাও যাবে না এর আবিষ্কারের রহস্য। তবে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বি¡ক ও প্রাচীন স্থাপত্যিক গবেষণা থেকে গ্রহণযোগ্য নানা তথ্য পাওয়া যায়। তবে সিমেন্ট আবিষ্কারের তথ্য জানতে হলে প্রথমেই জানতে হবে এই উপাদানটি আবিষ্কারের প্রয়োজন কেন হলো? সে ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারের পুরো কৃতিত্ব দেওয়া যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রকৃতির নানা বৈরিতাকে। মূলত ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা এমনকি বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে রেহাই পেতেই মানুষ গড়ে তোলে ঘর। প্রথম দিকে এই ঘর বাঁশ-কাঠ ও পাথরে তৈরি হলেও তা ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়। এ জন্য মানুষ চেষ্টা চালাতে থাকে এমন কোনো মজবুত ও দৃঢ় স্থাপনা বা কাঠামো বানাতে, যা রক্ষায় সক্ষম হবে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে। এমন ভাবনা থেকেই আসলে শুরু সভ্যতা গড়ার উপাখ্যানের।
আমরা জানি, বিশে^র ভূপৃষ্ঠের গঠন এক নয়। কোথাও পাহাড়, কোথাও সমতল, কোথাও বালুকাময়, কোথাও কর্দমাক্ত, কোথাও বা বরফাচ্ছন্ন। এই ভূ-প্রকৃতির কারণেই স্থাপনা নির্মাণকৌশল ও উপকরণের ধরনও ভিন্ন। যেসব স্থানে পাথুরে পাহাড়ের আধিক্য, সেসব স্থানে মানুষ পাহাড় কেটে ঘর বানিয়ে বাস করতে থাকে। পেত্রা, মাদাইন সালেহসহ এমন অনেক পাথুরে জনমুল্লুকের মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শহরেই দেখা মেলে। কিন্তু যেসব স্থানে এমন পাথুরে পাহাড় নেই, তারা কাদা-মাটি দিয়ে ইট বানিয়ে বা পাথরখণ্ড সংগ্রহ করে ঘর বানাতে থাকে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় এসব ইট বা পাথরের গাঁথুনিতে। আর সে সমস্যা সমাধানেই মূলত উদ্ভব হয় সিমেন্টের মতো বাইন্ডিং মেটেরিয়ালের। এলাকাভেদে উপযোগী সহজলভ্য উপকরণগুলোই বেছে নেওয়া হয় মজবুত গাঁথুনির জন্য। যেমন, আগ্নেয়গিরিসমৃৃদ্ধ এলাকার মানুষজন সেখান থেকে সংগ্রহ করে বিশেষ ধরনের নুড়ি পাথর ও ছাই, সমুদ্রবর্তী এলাকার মানুষ সংগ্রহ করে বিশেষ ধরনের ঝিনুক, আবার কেউ কেউ ঝামা পাথর ও চুনাপাথর বা লাইম দিয়েও চলে ইট-পাথর জোড়া দেওয়ার কাজটি। তবে মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং বহুতল ভবনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমেই উন্নত হতে থাকে এই জোড়া লাগানোর উপকরণসমূহ যা ধীরে ধীরে রূপ পায় আধুনিক সিমেন্টে।
সিমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত প্রাথমিক উপাদানসমূহ
ইট বা পাথর জোড়া লাগানোর জন্য মানুষ সভ্যতার সূচনালগ্নেই উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে প্রাকৃতিক নানা উপাদান। এসব উপাদানের ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং সমন¦য়েই তৈরি হয়েছে আধুনিক সিমেন্ট। সিমেন্ট উদ্ভাবনে সহায়ক প্রাথমিক উপাদানগুলো হচ্ছে-
- আগ্নেয়গিরির খনিজ (পাথর ও ছাই)
- ঝামা পাথর
- নুড়ি পাথর
- লাইম বা চুন
- ঝিনুক-শেল চূর্ণ
- মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো
- জিপসাম
- সাগরের ফসিল
- পাললিক কাদা প্রভৃতি।
সিমেন্ট উদ্ভাবনে অগ্রপথিক
বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে সিমেন্টধর্মী উপাদান আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু হলেও নানা প্রাচীন সভ্যতায় এটি ব্যবহারের সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। এসব সভ্যতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মায়ান, মেসোপটেমিয়া, মিসরীয়, আসিরিয়ান এবং পরবর্তীকালের সভ্যতার মধ্যে রোম, গ্রিস, স্পেন উল্লেখযোগ্য। ব্যাবিলিয়ন ও আসিরিয়ান সভ্যতায় বিটুমিনের সঙ্গে একধরনের খনিজ পুড়িয়ে ইট বা অ্যালবাস্টার স্ল্যাব জোড়া লাগানো হতো। মিসরে পাথর ব্লকের মধ্যে বালু ও পোড়া জিপসাম মিশিয়ে একধরনের মর্টার তৈরি করা হতো, যা অনেকটাই ক্যালসিয়াম কার্বনেটের আকার ধারণ করত। খ্রিষ্টের জন্মেরও তিন হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার ভবন নির্মাণে সিমেন্ট বা এই ধরনের কিছু বস্তু ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। সেই সময়ে চুনের সঙ্গে ছাই বা ঝামা পাথর মেশানো হতো, যেটা জমাট বাঁধতে সাহায্য করত। পরবর্তী সময়ে রোমান স্থপতিরা এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। মার্কস ভিরুভিয়াস পোলিও (Marcus Vitruvius Pollio) একজন রোমান স্থপতি ও প্রকৌশলী তাঁর ‘টেন বুকস অব আর্কিটেকচার’-এ রোমান স্থাপত্যের নির্মাণ উপকরণ সম্পর্কিত বিষয় তুলে ধরেন।
সিমেন্ট বা বাইন্ডিং মেটেরিয়াল হিসেবে গ্রিকরা ‘থেরা দ্বীপ’ থেকে আগ্নেয়গিরির টাফ ব্যবহার করে পোজ্জোলান (pozzolan) হিসেবে এবং রোমানরা ব্যবহার করে চুনযুক্ত আগ্নেয়গিরির ছাই (সক্রিয় অ্যালুমিনিয়াম সিলিকেট)। রোমানদের আবিষ্কার করা এই সিমেন্ট সমুদ্র বা পানির নিচের অবকাঠামো নির্মাণেও দারুণ ব্যবহারের উপযোগী ছিল। লাইমের সঙ্গে মেশানো পোজ্জোলান বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি ভিসুভিয়াস থেকে উদ্্গিরিত খনিজ থেকে সংগ্রহ করা হতো। আর আগ্নেয়গিরির নিকটবর্তী গ্রাম পজোওলির নামের সঙ্গে মিল রেখে উপাদানটির নামকরণ করা হয় পোজ্জোলান নামে। তবে ইউরোপের যেসব দেশে আগ্নেয়গিরির ছাই পাওয়া যেত না, সেখানে ইটের খোয়া বা ভাঙা টাইলস ব্যবহার করা হতো। রোমে প্যান্থিয়ন এবং বাথস অব কারাকাল্লা এই বিশেষ কংক্রিটে তৈরি প্রাচীন কাঠামোর উদাহরণ, যা এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়।
কালে কালে সিমেন্টের বিবর্তন
প্রাথমিক পর্যায়ে সিমেন্ট তৈরিতে পোজ্জোলান, লাইম, ঝামা পাথর, ঝিনুক চূর্ণ ইত্যাদি ব্যবহার হলেও তা ক্রমেই বিবর্তিত ও উন্নততর হতে থাকে। ১৬ শতকে স্পেনে ট্যাববি (Tabby) নামক একটি নির্মাণ উপকরণ ব্যবহৃত হতো কংক্রিট হিসেবে যা তৈরি ঝিনুক-শেল চূর্ণ ও বালু মিশিয়ে। মধ্যযুগে রোমানরাই প্রথম হাইড্রোলিক সিমেন্টে ব্যবহৃত ও আবিষ্কার করে যা আগ্নেয়গিরির ছাই, পটারির ভাঙা টুকরো, পোড়ানো জিপসাম এবং লাইম বা চুনের মিশ্রণে। তখন কিছু কিছু খাল, বন্দর বা জাহাজের ডক আর দুর্গ নির্মাণে সিমেন্ট ব্যবহারের নমুনা পাওয়া যায়। গোথিক সময়কালে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের পাশাপাশি পশ্চিমেও লাইম মর্টার এবং অ্যাগ্রিগেট ইট ও পাথর সঙ্গে মিশ্রণ তৈরি করে ব্যবহৃত হয়, যার ধারাবাহিক বিকাশ ১৮ শতকেও অব্যাহত থাকে। জেমস পার্কার বিশেষ এই রোমান সিমেন্টকে পেটেন্ট করেছিলেন, যা পেয়েছিল জনপ্রিয়তা। তবে তার বদলে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ১৮৫০-এর দশকে।
১৮ শতকে সিমেন্ট অনেক বেশি আধুনিক রূপ লাভ করে। মূলত ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের সময়কাল থেকে আধুনিক সিমেন্টের আবির্ভাব ঘটে। তখন ফরাসি ও ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা হাইড্রোলিক সিমেন্ট তৈরির জন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। ফলে সে সময়ে পানি-নিরোধক সিমেন্টও আবিষ্কৃত হয়। জন স্মিটন (John Smeaton) নামক একজন ব্রিটিশ প্রকৌশলী ইংলিশ চ্যানেলে তৃতীয় এডিস্টন বাতিঘর (১৭৫৫-৯৫) নির্মাণের পরিকল্পনার সময় সিমেন্টের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তৎকালে এমন এক সিমেন্টের দরকার হয়, যা ধারাবাহিক উচ্চ জোয়ারের মধ্যে কাজ করবে এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে জমাট বেঁধে যথেষ্ট শক্তিসঞ্চয় করবে। এই ধরনের সিমেন্টের জন্যে তিনি বাজারের সব ধরনের হাইড্রোলিক লাইম (hydraulic limes) নিয়ে গবেষণা করেন। পরিদর্শন করেন উৎপাদন ক্ষেত্র আর লক্ষ করেন চুনের মধ্যকার কাদার পরিমাণের সঙ্গে চুনাপাথরের সরাসরি সম্পৃক্ততা। চুনাপাথরের এই নীতিটি ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে লুই ভিকাটও লক্ষ করেছিলেন। ভিকাট ১৮১৭ সালে খড়ি এবং কাদামাটি মিশ্রিত করে সেটিকে আগুনে পুড়িয়ে একধরনের কৃত্রিম সিমেন্ট তৈরি করেন। জেমস ফ্রস্ট (James Frost) নামের এক ব্রিটিশ প্রায় একই সময়ে ভিকাট-এর মতো করে একধরনের সিমেন্ট তৈরি করেছিলেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ব্রিটিশ সিমেন্ট’। তিনি এটি পেটেন্ট করেন ১৮২২ সালে। ১৮৪২ সালে জোসেফ অ্যাসপডিনও (Joseph Aspdin) প্রায় একই ধরনের সিমেন্টের প্যাটেন্ট করেন। আর এই সিমেন্টর নাম দেন ‘পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট’। কারণ, এই সিমেন্টের রং ছিল ইংল্যান্ডের পোর্টল্যান্ড নামক উপকূলের একধরনের দামি পাথরের মতো।
পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট আবিষ্কারের ফলে ব্রিটেন তথা ইউরোপে অনেক বড় বড় স্থাপনা ও অবকাঠামো গড়ে উঠতে থাকে। বিশেষ করে জাহাজের ডক ও বন্দর। এ ছাড়া গড়ে ওঠে প্রচুর নতুন নতুন ইট তৈরির শিল্প। জোসেফ অ্যাসপডিন পোর্টল্যান্ড সিমেন্টকে ইংল্যান্ডের বাজারে নিয়ে আসলেও তাঁর পুত্র উইলিয়াম অ্যাসপডিন ‘আধুনিক’ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট তৈরি করেছিলেন, যা বাজারে বেশ চাহিদা সৃষ্টি করে। কিন্তু তা স্বত্বেও পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের প্রকৃত জনক বলে মনে করা হয় আইজাক চার্লস জনসনকে। তিনি কিলন পদ্ধতিতে মেসো-পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট বিকাশের প্রক্রিয়াটি প্রকাশ করে সিমেন্ট আধুনিকায়নে ব্যাপকভাবে অবদান রাখেন। ১৯ শতাব্দীতে, নিউইয়র্কে রোজেন্ডেল সিমেন্ট আবিষ্কৃত হয়। যদিও এই সিমেন্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল কিন্তু কিউরিং সময় বেশি লাগায় বাজারে চাহিদা কমে পোর্টল্যান্ড সিমেন্টটি আবারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২০ শতকে ব্যাপক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটে সিমেন্টের। সেটিং টাইম নিয়ন্ত্রণের জন্য জিপসাম সংযোজন করা হয়। এছাড়াও ক্লিংকার গ্রাইন্ড করার জন্য বল মিল ব্যবহার শুরু হয়। মূলত রোটারি কিলনের (Rotary Kiln) আবিস্কার সিমেন্ট উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। এর ফলে বিভিন্ন উপকরণের মিশ্রণে মানসম্পন্ন ও শক্তিশালী সিমেন্ট উৎপাদন সম্ভব হয়। বল মিলে ক্লিংকার ও অন্যান্য কাঁচামাল গ্রাইন্ডিং সহজ হয়। উন্নয়নের এমন ধারাবাহিকতায় পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের পাশাপাশি সমধর্মী আরও কিছু সিমেন্ট উদ্ভাবিত হয়। যেমন, ব্লাস্ট ফার্নেস স্ল্যাগ সিমেন্ট, পোর্টল্যান্ড ফ্লাই এ্যাশ সিমেন্ট, পোর্টল্যান্ড পোজ্জোলান সিমেন্ট, পোজ্জোলান লাইম সিমেন্ট, স্ল্যাগ-লাইম সিমেন্ট প্রভৃতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।