ধরুন এমন কোথাও আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে রাশি রাশি মেঘ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে আপনাকে; আপনার চোখে ধরা দিচ্ছে অর্ধশত মাইল দূরের জিনিসও; সবার আগে দেখছেন সূর্যোদয় আর সবার শেষে সূর্যাস্ত। নিশ্চয় এমনটি অনুভব করতেই আপনি রোমাঞ্চিত হচ্ছেন! তবে ভাবনার জগৎটাকে বাস্তব করতে আপনাকে আরোহণ করতে হবে বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চতম স্থাপনার চূড়ায়! কিছুটা অক্সিজেনস্বল্পতা অনুভব করলেও প্রশান্তিময় হয়ে উঠবে আপনার মন। হয়তো মনে প্রশ্ন জাগবে, কীভাবে মানুষ এই সুউচ্চ স্থাপনা নির্মাণ করল! সভ্যতার অগ্রযাত্রায় স্থাপনা নির্মাণে হাজার হাজার বছরের বর্ণাঢ্য যাত্রা, নিরন্তর পুরকৌশল গবেষণা, নিখুঁত গাণিতিক হিসাব, শ্রম- এ সবকিছু আপনাকে মুগ্ধ করবেই। স্থাপনা বিনির্মাণের মাধ্যমে মানুষের আকাশছোঁয়া সব গল্প থাকছে এ আখ্যানে।
নির্মাণের ক্রমবিবর্তন
ঠিক কবে থেকে মানুষ স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে! এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণামতে, স্থাপনা নির্মাণের প্রাথমিক কারণ ছিল বন্য প্রাণী ও বিরূপ প্রকৃতি থেকে সুরক্ষিত থাকা। অবশ্য পরে বিশ্রাম ও আরাম-আয়েশের ব্যাপারটিও চলে আসে। নিওলিথিক যুগ, যা নব্য প্রস্তের যুগের (খ্রিষ্টপূর্ব ১০,০০০-৪,৫০০) শেষাংশে মানুষেরা পশুর হাড়, পাথর, গাছের ডাল, ঘাস, পশুর চামড়া ও আঁশ দিয়ে আধুনিক ঘর বানাতে শুরু করে। এ সময় নির্মাণে পানির ব্যবহারও শুরু হয়। গড়ে ওঠে কৃষিভিত্তিক ক্লাস্টার ও গৃহপালিত পশুপালনের ব্যবস্থা। মৃতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে পাথর কেটে নির্মিত হয় সমাধিস্তম্ভ, যা মেগালিথিক স্থাপত্য নামে পরিচিত। পাথুরে পাহাড় কেটে তৈরি হয় সুবিশাল স্থাপনা। এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে নির্মাণের অগ্রযাত্রা। তবে সবচেয়ে যুগান্তকারী সূচনা ঘটে ইট আবিষ্কারের ফলে। ইট তৈরি হতো মাটি ও ঘাস মিশিয়ে, যা পরিচিত ‘অ্যাডোব ব্লক’ নামে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ বছর আগে আগুনে পোড়ানো ইট ব্যবহার শুরু হয়, যা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিও হতো। ইটের গাঁথুনিতে ব্যবহার করা হতো কাদা ও চুনাপাথর। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০-৫০ সালে লোহা আবিষ্কৃত হলে নির্মাণকাজেও এর ব্যবহার শুরু হয়। ব্রোঞ্জের থেকে লোহা হালকা ধাতু হলেও তাতে কার্বন মিশ্রণের ফলে তা রূপ নেয় শক্তিশালী স্টিলে। তবে এর ব্যবহার শুরু হয় আরো পরে।
সভ্যতার অগ্রযাত্রায় স্থাপনার উন্নয়ন
প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় মানুষ সক্ষম হয় বড় বড় ভবন নির্মাণে। প্রাচীন শহর উররুক, ব্যাবিলন, সুসা ও উর শহরে বেশ কিছু ভবনের অস্তিত্ব মেলে। তখনকার সময়ে সবচেয়ে উঁচু স্থাপনার মধ্যে ছিল মন্দির, মানমন্দির ও জিগগুরাট। আধুনিক ইরানে অবস্থিত ‘ছোঘা জানবিল’ নামক জিগগুরাট দেখলে সহজেই তাদের নির্মাণক্ষমতা অনুধাবন করা যায়। পারস্য, ইনকা ও মায়ান সভ্যতায়ও মেলে উঁচু স্থাপনার প্রমাণ। প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০ সালে নির্মিত আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরটির উচ্চতা ৩৩০ ফুট বলে অনুমান করা হয়, তবে এর প্রকৃত উচ্চতা জানা যায়নি। তবে উচ্চতর স্থাপনা নির্মাণে মিসরের স্থপতি ও প্রকৌশলীদের জ্ঞান ও কৌশল অভাবনীয়। পাথর কেটে বিশাল ব্লক তৈরি করে নিখুঁত গাণিতিক হিসাবে ত্রিকোনাকার পিরামিড তৈরি অত্যন্ত বিস্ময়কর। নিখুঁতভাবে পাথর কাটা, সেগুলো বয়ে আনা, ওপরে ওঠানো ও নির্দিষ্ট ডায়মেনশনে সাজানো মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। তখনো কোনো পুলার বা লিফটিং মেশিন আবিষ্কারের প্রমাণ মেলেনি। তবে তাদের অন্যতম আবিষ্কার ছিল র্যাম্প। এর সাহায্যে তারা অনেক উঁচুতে পাথর উত্তোলনে সক্ষম হয়। মিসরজুড়ে কয়েক শ পিরামিড নির্মিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু ও বিখ্যাত পিরামিড ‘গির্জা’। ৪৮১ ফুট উঁচু এই স্থাপনাটিই ৩৮০০ বছর ধরে সবচেয়ে উঁচু স্থাপনার আসন দখল করে ছিল। তবে গ্রেট পিরামিডটি বসবাসযোগ্য নয় বলে এটি বিল্ডিং হিসেবে বিবেচ্য নয়। এরপরের আসন অলংকরণ করে লিংকন ক্যাথেড্রল ১৩১১ সালে। ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন মনুমেন্ট ছিল সবচেয়ে উঁচু ক্যাথেড্রল। এরপর আইফেল টাওয়ারসহ একটি ছাপিয়ে গেছে আরেকটিকে।
প্রাচীন গ্রিস স্থাপনা নির্মাণ ইতিহাসে অনেক বড় অংশ দখল করে আছে। টেম্পল অব অ্যাপোলো, টেম্পল অব ডিডাইমা ইত্যাদি ইতিহাস বিখ্যাত মন্দিরগুলো গ্রিক স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ। পাথরের কলামের নৈপুণ্যময় ব্যবহার লক্ষণীয়। গ্রিক স্থপতি ও প্রকৌশলীরা অভাবনীয় কিছু নির্মাণপ্রযুক্তি ও কৌশল আবিষ্কার করেন। যেমন, প্লাম্বিং সিস্টেম, স্পাইরাল সিঁড়ি, সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম, ওয়াটার হুইল, ক্রেন, নগর পরিকল্পনা প্রভৃতি। দীর্ঘ স্প্যানের বিমের ক্ষেত্রে তাঁরা আবিষ্কার করেন ট্রাস। গাঁথুনির কাজে ব্যবহৃত লাইম মর্টার ব্যবহার তাঁদেরই কৃতিত্ব। তবে প্রাচীন গ্রিকরা শক্তিশালী মর্টার তৈরি করতে না পরলেও এ ক্ষেত্রে সফল হয় রোমানরা। তারা উদ্ভাবন করে হাইড্রোলিক লাইম মর্টার, যা রোমান সিমেন্ট নামেও পরিচিত। এ ছাড়া রোমানরা মর্টারে আগ্নেয়গিরিরি ছাই বা পজ্জোলনা ব্যবহার করত পানির নিচে কর্মক্ষম করতে। রোমের অন্যতম একটি স্থাপনা পান্থিয়ন (১৪৩ ফুট), যা এখনো টিকে রয়েছে। বিশেষ ধরনের কাঠের ক্রেন, করাতকল এবং আর্চ উদ্ভাবন রোমানদের দ্বারাই হয়েছিল।
মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁস পরবর্তী নির্মাণযজ্ঞ
মধ্যযুগের পরবর্তী সময়ে স্থাপত্যনির্মাণের ধরন বদলে যায়। তখন উঁচু আসন অলংকৃত করে দুর্গ এবং ক্যাথেড্রালগুলো। এ সময়ে রোমান ও গ্রিক স্থাপত্য যুগের সমাপ্তি ঘটলেও তাদের অনেক স্থাপত্যকৌশল রয়ে যায়। বিশেষ করে লোহার রিং-বিম ব্যবহার। প্যালাটাইনে চ্যাপেল ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার চার্চগুলোতে এর ব্যবহার লক্ষণীয়। তখন নির্মাণে কাঠের লগ ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনে। সম্পূর্ণ কাঠের নির্মিত স্থাপনা হিসেবে রাশিয়ার ‘কিজি’ চার্চটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত। চীনা মন্দির ও মঠগুলো নির্মিত হতো রেমড আর্থ এবং পাথরের ভিতের ওপর কাঠের ফ্রেমে। রেনেসাঁস পরবর্তী সময়ে (১৩০০-১৯০০) বিশ্বের উচ্চতর স্থাপনার মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য-
রেনেসাঁস পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় স্থাপত্যচর্চার বাইরেও আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে থাকে বিশ^জুড়ে। তবে প্রথম দিককার উঁচু ভবনগুলো ৫-১৬ তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে তখন লিফটের ব্যবহার শুরু হয়। এ ছাড়া শিল্পবিপ্লবের ফলে নির্মাণপণ্যে আসে নানা বৈচিত্র্য। যেমন, কাচ, সিরামিকস, রড আয়রন, মোজাইক প্রভৃতি উপকরণ ব্যবহারের ফলে স্থাপনার সৌন্দর্যও বেড়ে যায় অনেকাংশে। তৎকালীন উঁচু ভবনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নপূরণ
একটি ভবন যখন আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, তখন তার কাঠামোর ওপরে পাশ থেকে প্রচন্ড চাপ আসে। উচ্চতা যত বাড়তে থাকে, বাতাস বা ভূমিকম্পের চাপও তত বাড়তে থাকে। প্রকৌশলের ভাষায় একে বলে ‘ল্যাটেরাল লোড’। এই চাপ সহ্য করার জন্য সুউচ্চ ভবন তৈরিতে, ভিত্তি থেকে শুরু করে কলাম এবং বিমের আয়তন প্রচলিত জ্ঞানে প্রকান্ড করার দরকার হতো। এতে যে শুধু ভবন তৈরিতে যেমন অনেক জায়গা লাগত, তেমনি ভবনের চেহারাও হতো দানবাকৃতির। সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল ভবনকে ওপরে বর্ধিত করার সীমাবদ্ধতা। যুক্তরাষ্ট্রের স্কিডমোর ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল (এসওএম) ফার্মের বিখ্যাত বাংলাদেশি স্থপতি ও প্রকৌশলী ড. ফজলুর রহমান খান (এফ আর খান) এ সমস্যার সমাধানে এক যুগান্তকারী পন্থা উদ্ভাবন করেন। ‘টিউবুলার কনসেপ্ট’ বা বান্ডিল টিউব সিস্টেম নামে একটি মৌলিক প্রকৌশল তত্ত¡ স্কাইস্ক্র্যাপার ডিজাইনে আনেন। অর্থাৎ ভবনের অঙ্গে যে ল্যাটারেল লোড আসে, সেটা সহনীয় করতেই তিনি একটি ফাঁপা সিলিন্ডারের মতো কাঠামো প্রস্তাব করেন। যে কাঠামোর মূল ভর থাকবে মাটির নিচে, ওপরের অংশ ভূমির সমান্তরালে ক্যান্টিলিভার হয়ে বেড়ে উঠবে। খুব ঘন ঘন করে বসানো কলাম এবং স্প্যান্ড্রেল বিমের সংযোগে গড়া হবে সেই সিলিন্ডারের দেয়াল। এই দেয়াল একদম নি-িদ্র না হওয়ায় অবকাঠামো থেকে যাবে তুলনামূলকভাবে হালকা। শুধু তা-ই নয়, ভেতরের অন্যান্য কাঠামোর ওজনের অনেকটাও সেই বাইরের অবকাঠামোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে। এই ধারণা থেকেই এফ আর খান ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে গড়ে তোলেন ১০০ তলাবিশিষ্ট ভবন, জন হ্যানকক সেন্টার। এর কিছুদিন পর একই শহরে নির্মিত হয় সিয়ারস টাওয়ার (১৪৫০ ফুট, টাওয়ারের ওপরের অ্যান্টেনাসহ ১৭৩০ ফুট), যা ১৯৭৩ সাল থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। এফ আর খানের আবিষ্কৃত এই টিউব স্ট্রাকচারাল প্রকৌশলজগতে সবচেয়ে যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। স্কাইস্ক্র্যাপার ডিজাইনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনায় তাঁকে বলা হয় কাঠামো প্রকৌশলের আইনস্টাইন।
শিকড় থেকে শিখরে
ওপরে ওঠার সব বাধা যখন দূর হয় তখন বিশ^ব্যাপী শুরু হয় ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা। প্রবাদ ছড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শুধু ওপরের দিকেই বাড়ে! শুধু শিকাগো নয়, সারা বিশ্বেই শুরু হয়ে যায় উঁচুতে ওঠার প্রাণান্ত চেষ্টা। ২০০১ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার, যার উচ্চতা ছিল ১৩৫০ ফুট। ১৯৯৬ সালে নির্মিত মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের উচ্চতা ১৪৮৩ ফুট। প্রকৌশলীরা এফ আর খানের যুগান্তকারী কনসেপ্ট ধরেই আজও উঁচু ভবনের ডিজাইন করছেন। তবে বৈচিত্র্যময় স্থাপত্য নকশার সঙ্গে এখন পুরকৌশল বাস্তবায়ন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন
২০১০ সালে আরব আমিরাতের দুবাই শহরে উদ্বোধন করা হয় বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ‘বুর্জ খলিফা’। ১৬৩ (মতান্তরে ১৬০-১৬৯) তলাবিশিষ্ট এ স্থাপনার মোট উচ্চতা ২,৭১৭ ফুট। ভূমিকম্প প্রতিরোধী বিশ্বের সর্বোচ্চ এই ভবনটির মোট ওজন ৫ লাখ টন। ভবনটি নির্মাণে লেগেছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কিউবিক মিটার কংক্রিট, ৩৯ হাজার মিটার স্টিল, ১ লাখ ৩ হাজার বর্গমিটার কাচ এবং ১ লাখ ৫৫ হাজার বর্গমিটার স্টেইনলেস স্টিল। ছয় লাখ বর্গফুটবিশিষ্ট এই ভবনে একসঙ্গে ১২ হাজারেরও বেশি লোকের সমাবেশ হতে পারে। এটি তৈরি করতে যে পরিমাণ গ্লাস ও স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো একসঙ্গে রাখতে ১৭টি স্টেডিয়ামের সমান জায়গা প্রয়োজন হবে। ভবনটি তৈরি করতে যে পরিমাণ ইট-বালি-সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, তা দিয়ে ১২৮৩ মাইল লম্বা দেয়াল তৈরি করা যাবে।
এই স্থাপনার স্থপতি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অড্রিয়ান স্মিথ। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শ্রমঘণ্টা লেগেছে ভবনটি নির্মাণে। এ প্রকল্পে জড়িত ছিলেন ৩৮০ জন দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ। ভবনটি তৈরি করতে এমনও দিন গেছে যেদিন একসঙ্গে ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করেছে। সে সময় প্রতি তিন দিন পরপর এক-একটি ছাদ ঢালাই দেওয়া হতো। দুবাইতে প্রচন্ড উত্তাপের কারণে দিনের বেলা ছাদ ঢালাই দেওয়া যেত না। কারণ, তাপে কংক্রিটের ড্রাই শ্রিংকেজ বেড়ে যাওয়ায় তা সঠিক স্ট্রেন্থ অর্জনে ব্যর্থ হতো। এজন্য রাতে ঢালাই দেওয়া হতো, যাতে বাতাসের সংস্পর্শে কংক্রিট সহজেই জমে যেতে পারে। অনেক সময় কংক্রিটের সঙ্গে বরফও ব্যবহার করা হতো। বিলাসবহুল এই ভবনে রয়েছে সুইমিংপুল, রেস্টুরেন্ট কাম অফিস।
বিশ্বের গগনচুম্বী ভবনের তালিকা
ভবিষ্যতের লক্ষ্যভেদী আকাশচুম্বী ভবন
উঁচু ভবন একসময় ছিল প্রয়োজন; নির্মাণে ছিল চ্যালেঞ্জ। আর এখন তা হয়ে উঠেছে একটি দেশের গৌরবের প্রতীক। কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে সে প্রতিযোগিতা। তা ছাড়া গগনচুম্বী ভবনসমূহকে ঘিরে আজকের সর্বোচ্চ স্থাপনার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অধিকারে যাবে আগামীর কোন ভবনে। কাউন্সিল অন টল বিল্ডিংস অ্যান্ড আরবার হ্যাবিট্যাট বিশ্বের কিছু ভিশনারি (লক্ষ্যভেদী) স্কাইক্রেপারসের তালিকা প্রকাশ করে, যেগুলোর উচ্চতা বিস্ময়কর। এ ভবনগুলোর কিছু প্রস্তাবনায় এবং কতগুলোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। উল্লেখিত গগনচুম্বী ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম-
আগামীর লক্ষ্যভেদী আকাশচুম্বী যত ভবন
বাংলাদেশের যত আকাশছোঁয়া ভবন
বিশ্বের উন্নত দেশের সুউচ্চ স্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চতম ভবনসমূহের বিস্তর ফারাক। এখন ৪০ তলার নিচেই অবস্থান করছে স্থাপনাগুলো। যদিও ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা, মাটির প্রকৃতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধ্যবাধকতার কারণে উঁচু ভবন নির্মাণে পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। তবে আশার কথা, দেশে সবচেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণে নেওয়া হয়েছে একটি মেগা প্রকল্প। ‘বঙ্গবন্ধু ট্রাই টাওয়ার’ নামক এ প্রকল্পটি গড়ে উঠছে ঢাকার পূর্বাচলে। প্রকল্পে আরও থাকছে যথাক্রমে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ৫২ তলা, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ৭১ তলা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লিগ্যাসি স্মরণে ১১১ তলা ভবন। এই তিন টাওয়ারের চারদিকে ৪৯ তলার আরও ৪০টি ভবন নির্মিত হবে। বর্তমানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তত্ত¡াবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে শিকদার গ্রæপের সিস্টার কোম্পানি পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংস লিমিটেড এবং জাপানের কাজিমা করপোরেশন। ২০২৪ সালে প্রকল্পটি দৃশ্যমান হবে বলে নির্মাতাদের আশা। এখনো পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে-
স্থাপনার স্থায়িত্বে ও দৃঢ়তায় আধুনিক প্রযুক্তি
বহুতল ভবন নির্মাণে আগে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ইট, রড, সিমেন্ট, বালু ও কংক্রিট ব্যবহৃত হতো। তবে নির্মাণপণ্য নিয়ে নিরন্তর গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এসব সামগ্রীর মান যেমন উন্নয়ন হয়েছে, তেমনি এসেছে নিত্যনতুন সামগ্রী। উদ্ভাবন করা হয়েছে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার। স্টিল কাঠামো ওজনে হালকা হওয়ায় স্থাপনা নির্মাণের সময়, ব্যয় উভয়ই কমেছে। এ ছাড়া এসেছে প্রি-ফেব্রিকেটেড কংক্রিট, যা দ্রুত নির্মাণে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্টিলের মান উন্নয়নে চলছে নিরন্তর গবেষণা। তাতে মেশানো হচ্ছে কার্বন ন্যানো ফাইবার, টাঙ্গস্টেন, টাইটানিয়াম ইত্যাদি, যা সাধারণ রডের তুলনায় ১০-২০ গুণ বেশি শক্তিশালী। কংক্রিটে মেশানো হচ্ছে রি-অ্যাকটিভ পাউডার, সিলিকাফিউমসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাডমিক্সার, যা সাধারণের তুলনায় ৩৩৪ গুণ পর্যন্ত বেশি শক্তিশালী হতে সক্ষম। আগামীর এ গগনচুম্বী স্থাপনাগুলো হয়তো শিকড় ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে সুউচ্চ শিখরে।
তথ্যসূত্র:
কনস্ট্রাকশন হিস্ট্রি সোসাইটি, কাউন্সিল অন টল বিল্ডিংস অ্যান্ড আরবার হ্যাবিট্যাট, প্রকৌশল পত্র, ডিফেন্স রিসার্স ফোরাম-অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, উইকিপিডিয়া।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০২১