বুদ্ধগয়ায়, দূষণে-পরিশোধনে

আমার মা অধ্যাত্মবাদ চর্চা করেন আর এ নিয়ে বিস্তর লেখালখিও করেন। এ বিষয়ে তাঁর অনূদিত বইপত্রও আছে। তাঁরই ইচ্ছে ছিল গয়া যাওয়ার। আমাকে বলামাত্র মস্তিষ্কের স্মৃতি হাতড়ে যা সামনে এল তা হলো-

‘আমি গয়া গেলাম
কাশী গো গেলাম (গয়া গেলাম গো)
সঙ্গে নাই মোর বৈষ্ণবী
সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’

ধারণা হলো, গয়া একটি তীর্থস্থান, যেখানে ধর্মীয় দিক থেকে হিন্দু মতের প্রাধান্য বেশি। পরে মা নতুন এক নাম শোনাল, ‘বুদ্ধগয়া’। এখানে গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভ করেন। আর যে গাছের নিচে বসে তিনি এই ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, সে গাছটির অস্তিত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বজায় আছে সেই একই জায়গায়। এই কথা শোনার পর থেকে ভীষণ উত্তেজনা কাজ করছিল ভেতরে ভেতরে! ইন্টারনেট থাকার দরুন সবকিছুই আমরা আগে থেকে খোঁজ নিয়ে এমনকি যা দেখতে যাচ্ছি তাকেও দেখে যেতে পারি। এই কাজটি না করে যে আমি থাকতে পেরেছিলাম, তাই মনে মনে নিজের কাঁধ চাপড়ে দিচ্ছি!

ইতিহাসে মহাবোধি প্যাগোডা স্থাপনা

ভারতের বিহার রাজ্যের গয়া জেলায় মহাবোধি প্যাগোডার অবস্থান। মহাবোধি (সদা জাগ্রত) প্যাগোডা ইউনেসকো থেকে ঐতিহাসিক স্থানের স্বীকৃত পেয়েছে। বিগত দুই হাজার বছর ধরে এই জায়গাটি বজায় রেখেছে এর মাহাত্ম। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০ বছর আগে সম্রাট অশোক বুদ্ধের ভক্ত হয়ে এখানে একটি বিরাট স্থাপনা নির্মাণ করেন, যার উচ্চতা ৫০ মিটার। সম্পূর্ণ ইটের তৈরি এই স্থাপনাটি নিঃসন্দেহে ভীষণ আকর্ষণীয়। স্যার আলেক্সান্ডার কানিংহাম এক চীনা পরিব্রাজকের কাছে এই জায়গার খবর দেন সাতের দশকে। তেরোর দশকে এসে স্থাপনাটি পাল শাসকদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৮৬১ সালে এই স্থাপনাকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। 

বোধিলাভের ঐতিহাসিক ঘটনা

নেপালের রাজার ছেলে যখন সব যশ-খ্যাতি ত্যাগ করে মানুষের দুঃখের শেষ কোথায় তা ভাবতে এলেন, তখন একপর্যায়ে তিনি এই বিহারেরই ডুঙ্গেশ্বরীর এক গুহায় কঠোর তপস্যায় বসেন। বলা হয়, ছয় বছরের এই কঠিন তপস্যায় তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন! বুদ্ধগয়া থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে এই গুহায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই গুহার ভেতরে রাখা একটি বুদ্ধমূর্তি। অতি সুন্দর গড়নের বাইরে জীবনে এই প্রথম আমি কোনো জীর্ণকায় বুদ্ধমূর্তি দেখলাম। কারণ, এই বুদ্ধমূর্তির পাজরের সব হাড় বেরিয়ে আছে এবং অত্যন্ত দুর্বল বলেই মনে হচ্ছে, যা এখানে কাটানো তাঁর সময়কার ছবির সঙ্গে একেবারেই মিলে যায়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দীর্ঘ ছয় বছরের তপস্যা ছাড়ার ঘটনাটা কিন্তু ভীষণ হৃদয়স্পর্শী। তপস্যা চলাকালীন একদিন পাশের নদীতে নৌকায় করে গ্রামীণ গানবাদকের দল গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিল। তাদেরই একজন হাতের একতারাকে লক্ষ করে বলেছিলেন,

‘ওরে অত শক্ত করে বাঁধিসনে তাতে তারটা ছিঁড়ে যাবে আর ঢিলে করে বাঁধলেও তা অসুর হবে।’

এই বাক্য বুদ্ধের ছয় বছরের তপস্যাকে ব্যর্থ করে তুলল। বুকে একরাশ হতাশা আর দুঃখ নিয়ে তিনি তপস্যা ভঙ্গ করলেন। জীবনের তারকে সঠিক সুরে বাঁধতে তিনি শরীরের প্রতি এই নির্যাতনকে বিদায় জানালেন। তিনি গুহা ত্যাগ করে উরুভেলায় চলে আসেন, যার নাম এখন বুদ্ধগয়া। এখানেই নীলাঞ্জনা নদীতে তিনি স্নান সেরে নেন। সে সময় সুজাতা নামের তাঁর এক ভক্ত এসে এই হাড় জিরজিরে বুদ্ধকে এক বাটি পায়েস খেতে দেন। সেই পায়েস পরম যত্নে খান বুদ্ধ। এই কঠোর তপস্যাকালীন তাঁর বেশ কিছু ভক্ত জুটেছিল। পায়েস খেয়ে জাগতিক জীবনকে আলিঙ্গন করায় তাঁর ওই ভক্তরা তাঁকে ফেলে চলে যায়। বুদ্ধ সেই পায়েসের পাত্র নদীতে ভাসিয়ে দেন। কিছু সময় তা স্রোতের দিকেই ভাসে। এর পরপরই সবাইকে চমকে দিয়ে পাত্রটি স্রোতের উল্টো দিকে ভাসতে শুরু করল! এই ঘটনার ফলে বুদ্ধ মনে জোর পান এবং বুঝতে পারেন তাঁর এই এত দিনের তপস্যা একেবারে ব্যর্থ হয়নি। এবার সুস্থশরীরে তিনি আবারও ধ্যানে বসেন বোধিবৃক্ষের নিচে, যার পূর্বনাম বনায়ন বৃক্ষ। এই বৃক্ষের নিচেই বোধিলাভ হয়েছিল বলে পরে তাঁর নাম হয়েছে বোধিবৃক্ষ। তাঁর বোধিলাভ হয় বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে। তাঁর জন্ম হয়েছিল বৈশাখী পূর্ণিমায় এবং মৃত্যুও এই একই দিনে। বলা হয়ে থাকে যে পৃথিবীর সব মহান মানুষের জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে হয়। এই বৃক্ষের নিচে বোধিলাভের পর পুরো চত্বরে কতগুলো জায়গা আছে, যেখানে তিনি এরপরের সাতটি সপ্তাহ কাটান। সেগুলো হলো-

১.     বোধিবৃক্ষ: বোধিবৃক্ষের নিচে তপস্যাকালীন বোধিলাভের সময়কাল নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই কিন্তু বোধিলাভের পরেও এক সপ্তাহ বুদ্ধ এখানেই থাকেন বলে জানা যায়।

২.    অনিমেষ লোচনা চৈত্য: ‘অনিমেষ লোচনা’, অর্থ উন্মুক্ত আঁখি। এই জায়গাটা বোধিবৃক্ষের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত। এখানে বসে বোধিবৃক্ষের দিকে চেয়ে অপলকভাবে বসে থেকেছিলেন বুদ্ধ তাঁর বোধিলাভের পর দ্বিতীয় সপ্তাহটি।

৩.    চংক্রমণ: আরেকটা জায়গা হলো ‘চংক্রমণ চৈত্য’, যার অর্থ হলো ‘স্বর্ণ সেতু’। এখানে বুদ্ধ বোধিলাভের পর তৃতীয় সপ্তাহটি কাটান। একটা লম্বা জায়গাজুড়ে তিনি হেঁটেছিলেন এবং প্রতিটা পদক্ষেপে পদ্ম ফুটে উঠেছিল।

৪.    রত্নগৃহ: চতুর্থ সপ্তাহটি কাটে রত্নগৃহে। এখানে তিনি জ্ঞানের চরম উচ্চতায় পৌঁছে যান, যার দরুন তাঁর শরীর থেকে নীল, হলুদ, লাল, সাদা, কমলা এবং এই পাঁচ রঙের মিশ্রণে সৃষ্ট রঙের আলোক রশ্মি বের হয়। সে কারণেই বুদ্ধধর্মের পতাকায় এই রঙের দেখা মেলে।

৫.    অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষ: পঞ্চম সপ্তাহ অজপাল ন্যাগ্রোধ বৃক্ষের নিচে কাটান। এখানে এক ব্রাহ্মণ এসে তাঁর কৌতূহল মনে বুদ্ধকে প্রশ্ন করেন, ‘ব্রাহ্মণ জন্মে হয় নাকি কর্মে?’ জবাবে বুদ্ধ বলেন, ‘কর্মে’।

৬.   মুচলিন্দ: এখানে বুদ্ধ কাটান তাঁর ষষ্ঠ সপ্তাহ। কথায় আছে, এক দিন প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে জঙ্গলের এক ভয়ানক দেখতে সাপ এসে বুদ্ধের মাথার ওপরে ছাতার মতো ঢাল হয়ে থাকে। বুদ্ধের প্রতি পরম দরদ ও ভক্তি এই প্রাণীটির প্রাণেও জেগে ওঠে।

৭.    রাজায়তন বৃক্ষ: সপ্তম সপ্তাহ কাটে রাজায়তন বৃক্ষের নিচে। সেখানে দুজন ভক্ত তাঁকে পোড়া ভাত এবং মধু দিয়ে সেবা দেয়। এটাই ছিল বোধিলাভের পর বুদ্ধের প্রথম আহার।

বোধিবৃক্ষের ইতিহাস যা জানলাম যে বৃক্ষটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানেই বেড়ে উঠছিল। একপর্যায়ে সম্রাট অশোকের স্ত্রী রাগ করে বৃক্ষটি কেটে ফেলেন। যেহেতু অশোক বুদ্ধ ছাড়া আর কোনো কিছুই বুঝতে পারতেন না। এই গাছের একটি প্রজন্ম ছিল শ্রীলঙ্কায়। সেখান থেকে একটি প্রজন্ম এনে ১৪০ বছর আগে আবার এখানে রোপণ করা হয়। সেই গাছটিরই চতুর্থ প্রজন্মকে এখন আমরা দেখছি।

পরিশোধনের গল্প

কীভাবে ট্রেনে চেপে কলকাতা থেকে, হাওড়া থেকে, গয়া থেকে, বুদ্ধগয়া গেলাম সেটা আর বলছি না। আমি আর মা ছিলাম বুদ্ধগয়ায় মহাবোধি প্যাগোডার একেবারে কাছাকাছি একটা হোটেলে। ভোরবেলা পৌঁছানো মাত্র প্যাগোডা থেকে আসা প্রার্থনার ধ্বনি আমাদের দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিল! সত্যি বলতে সেখানে যাওয়ার জন্য মনটা খুব উতলা হয়ে ওঠে আমাদের। ভরপেট খেয়ে ফ্রেশ হয়ে হেঁটে হেঁটে প্যাগোডার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি আমরা। আমি মূলত মাকে জায়গাটা দেখানোর দায়িত্বেই এসেছি। আগ্রহ আমার নেই তা নয়, কিন্ত মায়ের মতো ভক্তিসুলভ কোনো অনুভূতির ছিটেফোঁটা নেই বা বলা ভালো ছিল না। শ্রদ্ধা আছে, যা অন্য সব ধর্মের প্রতিই সমানভাবে আছে। তাই দারুণ দারুণ স্থাপনা আর সেই বৃক্ষের ছবি তুলব অনেক-এই ছিল আমার মূল ভাবনা। অথচ শুরুতেই সব মোবাইল জমা নিয়ে নেওয়া হলো। কী যে মনটা খারাপ হয়েছিল তখন! পরে অবশ্য এর ভীষণ সুফল পেয়েছি। পুরো জায়গাটা মগজে ও মননে ঢুকেছে এ কারণেই। মোবাইল বাদে অন্য যেকোনো ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা সম্ভব সামান্য কিছু টাকা দিয়ে। এ ছাড়া এখানে আসতে কোনো টিকিট কাটা লাগে না। বছরখানেক আগে এই গোটা চত্বরে ভিন্ন ভিন্ন দশ জায়গায় বোমা ফাটার পর থেকে কঠিন নিরাপত্তার বলয় পড়েছে। দফায় দফায় চেকিং ছাড়াও চত্বরের ভেতরে মাঝেমধ্যেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহল দেন।

মূল চত্বরে ঢোকার পথে একই জায়গায় পাশাপাশি একটা মসজিদ, একটা মন্দির আর একটা প্যাগোডা। বেশ মন ভালো করা একটা পরিবেশ। আমরা যে স্তরে প্রবেশ করি, সেখান থেকে মূল চত্বর প্রায় ২০ ফুট নিচে। সেখান থেকে যখন প্যাগোডার অংশবিশেষ দৃশ্যমান হতে শুরু করল, আমি চমকে উঠি! কারণ, স্থাপত্যবিদ্যার পাঠ্যে আমি ঠিক এই প্যাগোডা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আজ তাকে নিজ চোখে দেখে বহুদিন বাদে শিশুসুলভ উত্তেজনা তৈরি হলো! একেবারে গেটের মাথায় কয়েকজন সার্টিফাইড চিত্রগ্রাহক দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি তাঁদের নেই। ফলত স্থাপনার সঙ্গে ছবি যে কেউই তুলতে পারছেন কিন্তু বৃক্ষের সঙ্গে নয়। কারণ, সে বৃক্ষ রয়েছে এই বিশাল স্থাপনার ঠিক পেছনে। আবারও আমার মনটা ভেঙে গেল। সেখানে দাঁড়ালে কেবল স্থাপনার একটা গ্র্যান্ড ভিউ পাওয়া যায়। যেটা খুবই দারুণ। কিন্তু তখনো সেই বোধিবৃক্ষের দেখা মেলেনি। আমি খুবই অতিষ্ঠ হয়ে পড়ি। প্যাগোডায় ঢোকার মুখেই দেখা যায় অনেক সাধক নানাভাবে নিজ নিজ ধ্যানে মগ্ন। ব্যাপারটা জানি না কেন খুব স্বস্তিদায়ক।

এই প্রথম কোনো ধর্মীয় স্থানে এসে আমি খুব আরামবোধ করছি। আমি অন্য ধর্মের কি না, আমি কি পোশাক পরে আছি না আছি, আমি কোন জাতি-গোত্রের তার কোনো কিছুতেই এখানে কারও এসে-যায় না। এখানে যাঁরা আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই থাইল্যান্ড, কোরিয়া বা শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছেন। ভারতীয় আছেন অল্প বিস্তর। খুব অল্প বয়সী রাশিয়ান বা অন্যান্য দেশের ভক্তরাও আছেন। যাঁরা এখানেই এই বিশাল চত্বরের নানা কোনায় একটা তোশক নিয়ে খোলা আকাশের নিচে নিজেদের জায়গা করে সারাটা দিন কেবল ধ্যান করছেন নানা উপায়ে। নিজেরাই রান্না করে সামান্য সহজে দিনযাপন করছেন। কিসের তাড়নায় কিসের জোরে সেই কোন দূরদেশ থেকে এখানে মশার ঝাঁকের মধ্যে এসে এই তপস্যা তাঁরা করছেন, দেখলে অবাকই লাগে! এই চত্বর দিনে একরূপ নেয়, রাতে আরেক রূপ! দিনের বেলায় সে সবার কিন্তু রাত হতে থাকলে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় শূন্যে চলে এসে পুরো জায়গাটা ভক্তের আসরে জমে ওঠে।

এখনো কিন্তু সেই বোধিবৃক্ষের দেখা মেলেনি। মা আর আমার পথচলাটা যেখানে এসে থেমেছিল, সেখান থেকে আবার শুরু করি। এই প্যাগোডার সম্মুখভাবে আমরা একটা ছবি তুলি সার্টিফাইড চিত্রগ্রাহকদের কাছ থেকে। এরপরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসি। ধীরে ধীরে অশোকের স্থাপত্যে প্রবেশ ঘটে। নিরেট ইট-পাথরের তৈরি বিশাল দম্ভওয়ালা এই স্থাপত্যেও ভেতরের একটুখানি এই জায়গাটাও গুহার মতোই অনুভূতি জোগায়। মেঝের পাথরখণ্ডে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব লাগে পায়ের তালুতে। স্বাভাবিক সিঁড়ির চেয়ে উঁচু এক ধাপ পেরিয়ে ভেতরে উচ্চ আসনে দেখা যাচ্ছে গৌতম বুদ্ধের বিশাল এক মূর্তি। এখানে এসে ভক্তেরা ভক্তি জানাচ্ছেন। খুব শান্ত জায়গাটা আর অনেক ভালোবাসা সংবলিত। আমার মা এগিয়ে সামনে চলে যায়। আমি সেই উঁচু ধাপেই দাঁড়িয়ে থাকি। মা খুব ভক্তির সঙ্গে ভালোবাসার সঙ্গে বুদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বুদ্ধের চোখ দুটো নিচের দিকে চেয়ে আছে। ফলে একেবারে বরাবর সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন ভক্তকেই দেখছেন। এর যে জাদুকরী এক ক্ষমতা আছে, তা এই ঘরের সবাইকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নিজে থেকেই সবাই খুব স্থির-শান্ত। খুব ভালো লেগেছিল আমার। নিঃসন্দেহে আমার মায়ের মতো কিছু মনে হয়নি। আগেই বলেছি, তাঁর মূল চর্চার বিষয় এগুলো তাই তাঁর মতো রোমাঞ্চকর অনুভূতি আমার হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। মা একবার হাত নেড়ে ডেকেছিল আরও ভেতরে যেতে। কিন্তু আমি যাইনি। সত্যি বলতে যারা খুব বেশি আকুল হয়েছিল, সেখানে তাদের দেখে আমার বেশ হাসিই পাচ্ছিল। তখনো সেই বৃক্ষটি দেখার জন্যই আমার যত যাতনা।

প্যাগোডা থেকে বেরিয়ে স্থাপনার ঠিক পেছনে এক প্রান্তে দেখা মিলল সেই বোধিবৃক্ষের। এত ভালো লাগল দূর থেকেই তাকে দেখে যে বোঝাতে পারব না। দিনের বেলার শিরশিরে হাওয়ায় সেই গাছের বুড়িয়ে যাওয়া পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে আর সব দর্শনার্থী বিশেষ করে ভিক্ষুর দল সেই পাতা কুড়োতে ছুটে বেড়াচ্ছেন। নিজেরাই হেসে কুটিপাটি এখানে নিজেদের ছেলেমানুষি দেখে। উফফফ এই পাতা নেওয়ার যে কী তীব্র লোভ জন্মাল আমার ভেতরে! মা সামনে সামনে হাঁটছেন আমি পেছন পেছন। গাছটির আরও কাছে চলে আসি। সকাল থেকে বিকেল অবধি সারাক্ষণই এখানে পাতা ঝড়ে; পাতা কুড়ায় সবাই। আমি ঠিক করেছি আমি সবার মতো পাতা কুড়াব না। দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে এদের কাণ্ড দেখি। মা আশপাশেই কোথাও আছে। পাতা নেব না ভাবার খানিক পরেই একটা পাতা টাস করে আমার মাথা বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ল! যেখানে সবাই পাতা নিয়ে হুমড়ি খাচ্ছে, পাতা নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও আমি জানি এই লাফালাফি আমার কম্ম নয়, অথচ কী তীব্রভাবেই না চাইছি তাকে, সেই সময়ে বিনা চেষ্টায় একটা পাতা নিজ থেকে গায়ে পড়লে অনুভূতিটা কেমন হয় পাঠক? আমি অত ভাবার সময় তখন পাইনি। পাতাটা পড়ার পরেই আমি নুয়ে তাকে নিতে গেলাম, তখনই আরেকজন পাশ থেকে পাতাটা নিতে আসে। দুজনে একসঙ্গে পাতাটা তুলতে গেলে তাকিয়ে দেখি সে আর কেউ নয়, আমার মা! মা পাতাটা ছেড়ে দেয়, আমাকে দিয়ে দেয়। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে আলিঙ্গন করি ঠিকই কিন্তু ভেতর থেকে একরাশ কান্নার দলা এসে দুজনাকে জাদু করে দিয়ে গেল! একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি আমরা! আমাদের সুখ দেখে আশপাশের মানুষের মুখে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। যতই অবিশ্বাসী মন হোক, আমার ধারণা এটা বুদ্ধের দান। কারণ, আমার মায়ের সঙ্গে আমার একটা দূরত্ব ছিল, যা ওই এক আলিঙ্গনে, এক অন্তরের ক্রন্দনে, একটি পাতা শেষ করে দিল। আমরা কেমন যেন হুট করে কাছে চলে এলাম। একই সঙ্গে মনে হলো বুদ্ধ বলছেন, ‘কী হে, একটু আগে বাকিদের দেখে হাসলে আর নিজেই এখন উজাড় হয়ে কাঁদছ! এ কেমন ফাঁকি তোমার!’

এখানে যতবার ওই কয় দিনে গিয়েছি, কেবল এই গাছতলাতেই বসে থেকেছি আমরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও মন পূর্ণতা পায় না। পাতা কুড়ানো দেখেছি, কেউ পাতা না পেলে আরেকজন তার নিজের পাতা অন্যকে দিয়ে দিচ্ছে সেটাও দেখেছি। চোখে চোখ পড়লে ভিক্ষু শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। প্রাণীদের জন্য বিশেষ করে কুকুরদের জন্য ভালো জায়গা। ভারতীয় এক গার্ডকেই কেবল লাথি দিতে দেখেছি। একজন কোরিয়ান ভক্ত তা দেখে প্রায় কেঁদে দিচ্ছিলেন। চারপাশে যার বড্ড অভাব, সেই ‘মানবিক’ মানুষগুলোকে নিজের আশপাশে দেখছিলাম। আর আমার খুব ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমিও ভালো মানুষ হয়ে গেছি। একজন ভক্ত আমার পাশে বসে প্রায় আধা ঘণ্টা ধ্যানে ছিলেন। তাঁর গায়ে একটি পাতা এসে পড়ে। সেই পাতা বাতাসে উড়ে আমাদের দুজনের পাশেই থাকে। আমার ভেতরে অদ্ভুত এক দায় জন্ম নেয়। এই পাতাটা যে তাঁর উনি তো সেটা জানেনও না। কিন্তু তাঁর ধ্যান শেষে পাতাটি তাঁকে দেওয়ার এক ভয়ানক দায় আমার তৈরি হয়। একে অপরের ভাষা জানি না এবং প্রায় মিনিট বিশেক বাদে আমি তাঁকে পাতাটি দিতে পারি। আমার খুব আরাম বোধ হয়।

এক রাশিয়ান জুটি এখানে ধ্যান করছিল। সে এক অন্য ধ্যান। সটান দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ে, যাকে বলে গড় হয়ে নমস্কার করা এবং আবার দাঁড়িয়ে যাওয়া। এই গরমে পুরো চত্বরে এই জিনিস করছিল ছেলেটি। আর মেয়েটি তাঁকে সেবা দিতে পানি আর ঘাম মোছার তোয়ালে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিল। এদের সবার সঙ্গে কথা না বলেও সম্পর্ক স্থাপন হয়ে যাচ্ছিল। আমি আর মা ওদের দেখছিলাম। গাছের কাছে আসতেই খুব সম্ভবত ধ্যানের চক্রটি শেষ হয়। ওখানে ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আর ঠিক আমার আর মায়ের মতোই খুশিতে কেঁদে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে দুটো পাতা ওদের কাছে এসে পড়ে। ওরা কি যে খুশি হয় তখন!! আমি আর আম্মা একে অপরের দিকে তাকাই। আমরাও ঠিক একই স্বস্তি-সুখের ভাগীদার হয়ে পড়ি, যার সঙ্গে আমরা পরিচিত।

ভক্তি (?) নাকি ক্ষমতার দৃশ্যগত দূষণ

এই জায়গাটা দাঁড়িয়েই আছে কেবল একটি বৃক্ষের জন্য, স্থাপনার জন্য নয়। হ্যাঁ স্থাপনাটির ঐতিহাসিক প্রাধান্য থাকলেও বস্তুগত এই অসামান্য একটি মহাত্ম আছে। আর খুব মজার ব্যাপার এই যে এই বস্তু একটা প্রাণ! একতা ছবি বা মূর্তি বা স্থাপনা পেলে ঈশ্বরকে ইন্দ্রিয়তে ধারণ করা সহজতর হয়। আমার খুব ভালো লাগে এটা ভাবতে যে এই একই কাজের জন্য এখানে একটি বৃক্ষ আছে!

জায়গাটিকে সম্মানের সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে তার বাকি স্মৃতিময় জায়গাগুলোর সঙ্গে একটা পরিষ্কার দৃশ্যময় যোগাযোগের খুব দরকার ছিল বলে আমার মনে হয়। এই প্রথম স্থপতি হিসেবে আমার খুব লজ্জা হলো। যৌক্তিক/ভক্তিমূলক/দরদের উপস্থাপন না ক্ষমতা প্রদর্শনে আমরা সাহায্য করি আমাদের ক্ষমতাধরদের সে প্রশ্ন আমাকে খুব আঘাত করছিল। এ রকম একটি গাছের চেয়েও এই প্যাগোডা পেল বেশি প্রাধান্য! সেটা কি কষ্টের বিষয় নয়! চোখ ধাঁধানো স্থাপনায় আমার কি কাজ। কেবল সম্রাট অশোকের ক্ষমতার দাপট দেখলাম। দর্শনার্থীদের বেশির ভাগের মন কেড়েছে সেই স্থাপত্যই। কারণ, এই প্যাগোডার এতটাই কাছ ঘেঁষে এই বৃক্ষটি তার আগের স্থানে দাঁড়িয়ে আছে যে তাকে চারদিক থেকে দেখার উপায় নেই। বন্দিমার্কা একটা অনুভূতি হয়। সত্যি বলতে স্নায়ুর ওপর দারুণ চাপ পড়ে। বর্তমান বিশ্বের যে উদারতার অভাব আমরা সবাই বোধ করছি, সেটাই যেন আরও স্পষ্ট হয়। শুধু তাই-ই নয়, বাকি যে স্থানগুলো রয়েছে, সে স্থানগুলোর সঙ্গে এই জায়গাটির বিন্দুমাত্র দৃশ্যগত যোগাযোগ নেই। ওপরে দেওয়া এই চত্বরের প্ল্যানের ছবিটি দেখলে বোঝা যায় সমস্ত ঐতিহাসিক জায়গার সঙ্গে দৃশ্যগত যোগাযোগ নেই এবং সেটা ঘটানো খুবই সম্ভব ছিল। আর ছিল বলেই আমার খুব কষ্ট হয়। কারণ, বর্তমান অভিজ্ঞতা আমাকে হারিয়ে দেয়, এলোমেলো অস্থির করে তোলে।

ওপরের ছবিতে আমি জায়গাটার বর্ণনার সুবিধার্থে ব্যবহার করলাম। প্রবেশ করছি আমরা যেদিক থেকে তার ঠিক উল্টো দিকে বৃক্ষের অবস্থান। একেবারে স্থাপনার সঙ্গে লাগোয়া। স্থাপনার চওড়া এতটাই বেশি যে তাকে মূল প্রবেশদ্বার থেকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সামনে কেন পেছন থেকে দেখেও খুব আরাম নেই। স্থাপনার চারপাশ জুড়ে একটা উঁচু প্রাচীর আছে। তার মধ্যে বৃক্ষটিকে আরেকটি প্রাচীরের মধ্যে নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে। এখানে বুদ্ধের পালংক আছে। খুব কষ্ট করে সেসব দেখতে হয়। বুদ্ধের যে দৃশ্যগত অভিজ্ঞতা এই গাছের নিচে বসে হয়েছিল, সেখানে এখন একটা ৫০ মিটার উঁচু দেয়াল! আমার খুব কষ্ট হয় এটা দেখে।

স্থাপনাটি না থাকলে ঠিক ওখানেই দেখা যেত বোধিবৃক্ষ এবং বুদ্ধের আসন। আরও সামনের দিকে আছে অনিমেষ লোচনা। বোধিলাভের দ্বিতীয় সপ্তাহ বুদ্ধ ঠিক এখানে বসে উল্টো চেয়ে থাকেন বোধিগাছের পানে অপলক নয়নে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সবাই বঞ্চিত। আমি নিজে অনিমেষ লোচনা চৈত্যতে দাঁড়িয়ে কল্পনা করেছি পুরো ঘটনাটা। কী যে ভয়ংকর সেই সৌন্দর্য, তা আমি মনের দৃষ্টিতে টের পেয়েছি!!! কথিত আছে, তাঁর বোধিলাভের দরুন গাছটির মধ্যেও এক অদ্ভুত আমেজের রচনা হয়। এই গুরুত্ব না বোঝার ব্যাপারটি আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে। জানি না কেউ এভাবে ভেবেছেন কি না।

একটা বিস্তৃত খোলা জায়গায় গাছগুলো যে যার মতো প্রাকৃতিক ভূমির উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। ব্যস, আর কিছু লাগত না এখানে। এটুকুই চাওয়া ছিল। মনের চোখে দেখেছি তো বহুবার। এই প্যাগোডাটি না থাকলে সব ঘটনার সঙ্গে মুহূর্তেই সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। এখন গেলে আপনাকে আলাদা করে খুঁজে বের করতে হবে তাদের। আর বাকি জায়গাগুলো সম্বন্ধে আগে থেকে না জানলে হয়তো খেয়ালই করবেন না। আমি যে প্ল্যানে বিস্তারিত জানালাম, এসব কিছুই সেখানে নেই। এখন যে অবস্থায় গাছটি রয়েছে, তাতে তাকে দেখেও দেখা হলো না এ রকম এক অদ্ভুত যন্ত্রণা আমার হয়। দুই স্তরে উঁচু প্রাচীর দেওয়ার ফলে গাছটির পরিপূর্ণ নির্যাস নেওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়।

এই গাছতলায় বসে থেকে দেখেছি এ রকম হাজারটা কেচ্ছা আমি বলতে পারব। এই যেমন রাতের বেলায় এই গাছের নিচেই যখন বিশাল দল প্রার্থনায় বসে, তখন গাছটিও ভয়ানক স্থির হয়ে যায়। দিনের বেলার পাতা নড়চড় সব বন্ধ। প্রথম দিন যখন রাতে গেলাম আমি, সত্যি একটু স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এ যেন সম্পূর্ণ এক অন্য রূপ! বৃক্ষ নিজেই তখন গুরুর মতো। তার দিকে মুখ করেই সবার মনোযোগ প্রতিষ্ঠিত। আমার আত্মায় জায়গা করে নিল যেই গাছটি, মহৎ মানুষের কাছে থাকা একমাত্র বস্তুগত যে প্রাণটি, যে নিজেই আমার সামনে বুদ্ধ হয়ে দৃশ্যমান, তাঁকে এভাবে আটকে থেকে দেখতে খুব কষ্ট হয়। বুদ্ধের কথাতেই আমার গয়া ভ্রমণের চিত্র স্থির করছি-

‘বুদ্ধের মায়া: একমাত্র তুমিই সেখানে যাও, যেখানে আর কেউ যেতে সাহস করে না, তুমি কি আমার ঈশ্বর হবে?

বুদ্ধ: হে স্থপতি! শেষ পর্যন্ত তাহলে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো। তুমি আর কখনো তোমার বাড়িটা বানাতে পারবে না। বরং উল্টো আমিই এখন তোমার বাড়ি। আর তুমিই বাস করছ এই আমার মাঝে। হে আমার সব অহংবোধের মালিক, তুমি সম্পূর্ণই মায়া। আর এই মাটি হলো তার সাক্ষী।’

বুদ্ধ ঘর ভেঙেছেন নির্বাণপ্রাপ্তির মাধ্যমে। জন্ম-জন্মান্তরের ফাঁদের এই স্থপতিকে তিনি ধরে ফেলেছেন। তিনি বলছেন,

‘হে স্থপতি, তোমার ঘরের ছাদ ফেটেছে, আমি এখন বে-ঘর, বে-আমি!’

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।  

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top