দেশীয় ঐতিহাসিক সেতু-কাব্য (পর্ব ১)

নিগূঢ় ভাব-বচন

মুসলিম বিজয়ের পরে বাংলা ১২০০ শতক থেকে ১৫২৬ শতক পর্যন্ত ছিল বাংলা সালতানাত যুগ। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বহু নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা গড়ে ওঠে এই বঙ্গে। মুসলমানরা নগরায়ণের প্রক্রিয়া অনুসরণ ও অনুকরণ করে এই বঙ্গে গড়ে তোলে নানা স্থাপনা। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে-মসজিদ, সমাধি স্থাপনা, খানকাহ, দরবার শরিফ, দরগাহ, ঈদগাহ, তোরণদ্বার, প্রাচীর, ঘাট প্রভৃতি। আবার ১৫২৬ শতক থেকে ১৮৫৮ শতক পর্যন্ত ছিল এই বাংলার মোগল সালতানাত যুগ। মোগলদের হাত ধরেও বহুমুখী স্থাপনা গড়ে ওঠে এই বঙ্গে। সুলতানি আমলের অধিকাংশ স্থাপনার বর্ধিতকরণ, অলংকরণ ও পরিবর্তন ঘটে এই সময়ে। মোগলরা এই বঙ্গে দুর্গ বা কেল্লা, অতিউচ্চ ঘেরা প্রাচীর, অন্ধকূপ, মসজিদ, ইমারত, সেতু ও ঘাট নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। সেতু বিনির্মাণের পেছনে মোগলদের হাতে খনন করা পরিখা, দিঘি বা খালের কথা উল্লেখ করতেই হয়। ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত পুরানা কিল্লার পাশে খনন করা পরিখা যেমন প্রকৃষ্ট উদাহরণ, তেমনি বাংলাদেশের খিজিরপুর (বর্তমান হাজীগঞ্জ কেল্লা) ও সুবর্ণকান্দি (সোনাকান্দা কেল্লা) সংলগ্ন স্থানে কেল্লার পুল খাল ও ত্রিবেণী খাল খনন করা হয়েছিল। প্রতিটি স্মৃতিবিজড়িত খাল বা পরিখার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একেকটা সেতুর গল্প। আমরা যাকে ‘পুল’ নামেও ডাকি। কেল্লার পুল খালে অবস্থিত ‘কেল্লার পুল’ ও ত্রিবেণী খালে অবস্থিত ‘ত্রিবেণী পুল’। এসব সেতু বা পুল আজ অবধি টিকে রয়েছে বহু চড়াই-উতরাই পেরিযে। কালের করালগ্রাসে নিমজ্জিত এই সেতু স্থাপনাসমূহ। যুগ সন্ধিক্ষণে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে এদের অবস্থাও ভঙ্গুর ও জবুথবু।

আবার অনেক সেতু বা পুল স্থাপনা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে মিশে গেছে কালের অতল গহ্বরে। আজ এদের অস্তিত্বও বোঝা যায় না। যেমন, খাঁজা আম্বার পুল, তাঁতীবাজার পুল। মানুষ নির্মমভাবে পুরোনো সেতু ভেঙে নতুন সেতু স্থাপন করেছে এর উদাহরণ-ত্রিবেণী সেতু, কেল্লার পুল সেতু ইত্যাদি। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বিভীষিকাময় দিনগুলোর শিকার ঐতিহাসিক তালতলা সেতু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেটির অবসান ঘটে। আর যেসব সেতু স্থাপনা এখনো টিকে রয়েছে, কে জানে, পরবর্তী ১০০ বছরে এদের হাল-হকিকত কী হবে?

প্রারম্ভিকা

অতি প্রাচীনকাল থেকে এই বাংলা বৃহত্তর ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ও শাসিত অঞ্চল ছিল। বাংলার ইতিহাস পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতা থেকে আমরা দেখতে পাই-

  • খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৯ অব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ বৌদ্ধ যুগ
  • খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৯ অব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ হিন্দু যুগ
  • ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৫২৬  খ্রিষ্টাব্দ সুলতানি যুগ
  • ১৫২৬  খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ মোগল বা নবাবী যুগ
  • ১৮৫৮  খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল
  • ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশভাগ, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধ্যায়।

প্রতিটা লগ্ন (সময়) পার হয়েছে বিস্তর ক্রান্তিলগ্নের মধ্য দিয়ে। কোনো সময়েই পথপরিক্রমা বিষয়টা বাদ দিয়ে হয়নি। কাফেলায় পথ ঘুরে ঘুরে যেমন পথিকেরা পথের সৃষ্টি করেছে, তেমন পথে পথে নিজেদের নামাঙ্কিত করার জন্য কূপ খনন ও জল সেচনের ব্যবস্থা, ঘাট নির্মাণ, সেতু নির্মাণÑএ সবকিছুই হয়েছে। কোথাও কোথাও সন্ধান মেলে খুব ছোট আকৃতির সেতুর, যেগুলো কালের মানচিত্রে হয়তো তেমন জায়গা করতে পারেনি। আবার সেতুসংলগ্ন দুর্গ বা, কেল্লা দেখে এদের অবয়ব বোঝা যায়। তবে সর্বযুগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মাধ্যম হচ্ছে রাস্তাঘাট সংস্কার ও নির্মাণ। যেমন, এশিয়ার প্রাচীনতম সড়ক পথ ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’। এই সড়কটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া হয়ে পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সড়কের অপর নাম ‘সড়ক-এ-আযম’। সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ‘শের শাহ সুরি’ (১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দ-১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) এই ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নির্মাণ করেন।

রেনেলের মানচিত্র অনুযায়ী প্রাচীন সেতু

বঙ্গদেশের প্রাচীন মানচিত্রের উদ্যোক্তা জেমস রেনেল (১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দ-১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি একজন ব্রিটিশ ভূবিদ, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবেত্তা ও নৌ-প্রকৌশলী। রেনেলকে মহাসমুদ্রবিদ্যার জনক বলা হয়। বঙ্গীয় নদীব্যবস্থার ওপরে সুনির্দিষ্ট জরিপ, তথ্যচিত্র ও মানচিত্র করার জন্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে দায়িত্ব দেয়। জেমস রেনেল টানা ১০ বছরে এই কাজটি রপ্ত করেন। অর্থাৎ, ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার মানচিত্র প্রস্তুত করেন। রেনেলের মানচিত্রে বঙ্গীয় স্থাপনার দেখা মেলে। প্রাচীন এই ম্যাপে যেমন কালজয়ী দুর্গের সন্ধান মেলে, তেমন বহু সেতু স্থাপনার তথ্য মেলে। রেনেলের মানচিত্র অনুযায়ী সেতুর পরিচয় ও অবস্থান জানা যায়।

রেনেলের ম্যাপ অনুযায়ী প্রাচীন সেতু স্থাপনার নাম:

  • টঙ্গি সেতু
  • খাঁজা আম্বার সেতু
  • পাগলা পুল
  • গেন্ডারিয়া পুল
  • কদমপুর পুল

বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রাচীন সেতু

কিন্তু, বাস্তবটা অত দিনে অনেক দূর পৌঁছে গেছে। অনেক স্থানের নাম বদলে গেছে তাই ম্যাপ অনুযায়ী নাম মেলানো কঠিন ও দুরূহ ব্যাপার। যেমন, রেনেলের ম্যাপে, কদমপুর পুলের নাম আছে কিন্তু বাস্তবে যে তা কোথায় তার হদিস মেলে না। ম্যাপ অনুযায়ী সোনাকান্দা কেল্লা ও খিজিরপুর কেল্লার মধ্যবর্তী একটি স্থানে এই কদমপুর পুল অবস্থিত। বাস্তব পর্যবেক্ষণে কদমপুর নামের অস্তিত্ব মেলে না। সোনাকান্দা ও খিজিরপুর (বর্তমান হাজীগঞ্জ)-এর মধ্যবর্তী স্থানটি যতটা সম্ভব প্রাচীন কত্রাভু (বর্তমান নবীগঞ্জ)-কে নির্দেশ করে। নবীগঞ্জের পার্শ্ববর্তী ইস্পাহানি এলাকায় আরেকটি মোগল আমলের পুল বা সেতুর দেখা মেলে। যার অপর নাম ‘চাপাতলীর ইটের পুল’। স্থানীয়দের  মতে, এই স্থানের নাম কখনোই কদমপুর ছিল না। কিংবা প্রাচীন ইতিহাসে এই নাম নেই। আবার, রেনেলের ম্যাপে চাপাতলীর ইটের পুলের নাম নেই। সোনাকান্দা কেল্লাসমেত স্থানে ‘ত্রিবেণী খাল’ ও ‘ত্রিবেণী পুলের’ অস্তিত্ব আমি শৈশব থেকে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। যদিও বর্তমানে ত্রিবেণী পুল ভেঙে ফেলা হয়েছে। আবার, খিজিরপুর কেল্লাসহ (বর্তমান হাজীগঞ্জ দুর্গ) ‘কেল্লার পুল’-এর নবনির্মিত ও রূপান্তরিত স্থাপনা বিদ্যমান। এখন প্রশ্ন হলো,

১.     কদমপুর পুল-ই কি চাপাতলীর ইটের পুল? হয়তো, চাপাতলী গ্রামের পূর্ববর্তী নাম ছিল কদমপুর গ্রাম। যদিও এর ভিত্তি নেই।

২.    কদমপুর নামে গ্রামে অবস্থিত কদমপুর পুল। যদিও কদমপুর গ্রামের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

৩.    কদমপুর পুল-ই কী ত্রিবেণী পুল? বা কেল্লার পুল? কিন্তু তাদের নাম তো শুরু থেকেই স্ব-স্ব নামে পরিচিত।

প্রাচীন এই ম্যাপে অনেক সেতুর নাম উল্লেখ নেই কিন্তু ইতিহাসে এর প্রমাণ মেলে। যেমন, চাপাতলীর ইটের পুল, কেল্লার পুল, ত্রিবেণী পুল। যদিও বর্তমানে কেল্লার পুল, ত্রিবেণী পুলকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। পুরোনো এই পুল ভেঙে নতুন সড়ক সেতু তৈরি হচ্ছে।

প্রচুর গবেষণা, ইতিহাসের নিরিখে তথ্য যাচাই-বাছাই করে লব্ধ আজকের ঐতিহাসিক সেতুর তালিকা:

  • পানাম সেতু, পানাম নগরীসংলগ্ন
  • দালালপুর পুল, সোনারগাঁ
  • পানাম নগর সেতু, সোনারগাঁ
  • পিঠাওয়ালীর পুল, সোনারগাঁ
  • ত্রিবেণী পুল, সোনাকান্দা দুর্গসংলগ্ন
  • কেল্লার পুল, খিজিরপুর দুর্গসংলগ্ন
  • ত্রিমোহনী পুল, আমুলিয়া বাজারসংলগ্ন, রূপগঞ্জ
  • কদমপুর পুল 
  • চাপাতলীর ইটের পুল, প্রাচীন কত্রাভুসংলগ্ন
  • পাগলা পুল, পাগলা, বেগ মুরাদের দুর্গসংলগ্ন
  • খাঁজা আম্বার পুল
  • তাঁতীবাজার পুল
  • টঙ্গী পুল, টঙ্গী-আব্দুল্লাহপুর সড়কসংলগ্ন
  • পুলঘাটা পুল, মীরকাদিম, ইদ্রাকপুর দুর্গসংলগ্ন
  • তালতলা পুল
  • বাড়িউড়া প্রাচীন পুল, হাতিরপুল, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া

প্রাচীন সেতু বা পুলের নির্মাণ উপকরন

সুলতানি, মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলের এই সেতু বা পুল স্থাপনাসমূহ প্রধানত ইটের তৈরি। বিশেষত পোড়ামাটির তৈরি ইট এবং চুন মর্টার ইট ব্যবহৃত হতো। যেসব রাজমিস্ত্রি এই স্থাপনা তৈরি করত, তাদের বেশির ভাগই আগ্রা, দিল্লি, ঝাড়খন্ড, রাজমহল থেকে আনা। শুধু সেতু বা পুল নির্মাণে ইটের এই ব্যবহার যে প্রকট ছিল তা নয়। বরং, প্রাচীন পথঘাট তথা রাস্তা নির্মাণ, ইমারত ও মসজিদ নির্মাণের স্থাপত্যশৈলীর প্রধান উপকরণ ছিল এই ইট। যেমন,

  • প্রাচীন বাংলার রাজধানী ‘পুন্ড্রুবর্ধন’ বা, ‘পুন্ড্রুনগর’-এর উৎখননে প্রাপ্ত পথঘাট, সোপান ও ভিটিÑ সবই ইটের তৈরি।
  • আবার, ৩০০০ বছর আগের স্থাপনা ‘ওয়ারী-বটেশ্বরে’ খননে প্রাপ্ত পথ, ঘাট, দেয়ালÑ সবই লাল ইটের তৈরি
  • ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর ‘পানাম নগরী’-এর স্থাপনাসমূহ ইটের তৈরি।

প্রাচীন এই ইটের জোগানে

এই বাংলায় ইটভাটার ব্যবহার অনেক পরে এসেছে। শুরুতে ইটভাটার অস্তিত্ব ছিল না, তাহলে এত ইট এল কোথা থেকে? প্রাচীন এই স্থাপনাসমূহের ইট নির্মিত হতো মাটি দিয়ে। এত মাটির জোগানই-বা হতো কীভাবে? তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ, খাল, পুকুর বা নালা খনন করে মাটির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা ও পানিভর্তি দিঘি করে জলযোগের সুব্যবস্থা করা। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মীয় শাসক খানজাহান আলী এই বাংলায় মসজিদের শহর ‘খলিফাতাবাদ’ গড়ে তোলেন। তিনি এই শহরে গড়ে তোলেন অসংখ্য মসজিদ স্থাপনা। প্রতিটা মসজিদসংলগ্ন স্থানে তিনি এক-একটি পুকুর বা দিঘি খনন করেন। ওসব দিঘি থেকে প্রাপ্ত মাটি আহরণ করে প্রক্রিয়াজাত করে ইট নির্মাণ করা হতো এবং এসব স্থাপনায় ব্যবহার করা হতো।

তেমনি মোগল আমলে এই যে বড় বড় কেল্লা বা দুর্গ গড়ে উঠত, এগুলোর প্রতিটির সংলগ্ন স্থানে রয়েছে একেকটি জলাধার। এসব জলাধার থেকে প্রাপ্ত মাটি দিয়ে তৈরি হতো কেল্লার একেকটি দেয়ালের গাঁথুনি। সুতরাং, প্রাচীন বাংলার স্থাপনা নির্মাণে ইটের কোনো বিকল্প নেই। যেমন, ‘সোনাকান্দা দুর্গ’সমেত স্থানে ‘ত্রিবেণী খাল’, ‘হাজীগঞ্জ দুর্গ’সমেত স্থানে ‘কেল্লার পুল খাল’, ‘টঙ্গী সেতু’সমেত স্থানে ‘টঙ্গী খাল’ ইত্যাদি। তা ছাড়া, সুলতানি আমলের স্থাপত্য নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার ছিল এই ইট। যদিও মোগল আমলে পলেস্তারা বা আস্তরণের ব্যবহার সর্বাধিক হয়। আমরা, প্রাচীন বাংলার সেতু বা পুল স্থাপনায় দুই রকম ব্যবহার দেখতে পাই। প্রাথমিক অবস্থায় ইটের ব্যবহার ও পরবর্তী সময়ে পলেস্তারা আস্তরণের।

প্রাচীন সেতুর গাঠনিক বৈশিষ্ট্য ও স্ট্রাকচার-ভাবনা

সেতুর নকশা

  • প্রতিটা সেতুর প্ল্যান বা নকশা সরলরৈখিক আকৃতির
  • প্রতি সেতুর প্ল্যান বা নকশা লম্বাটে, দীর্ঘ আকৃতির
  • প্রতি সেতুর প্রস্থ অপেক্ষাকৃত কম, দৈর্ঘ্য অনেক বেশি
  • প্রতি সেতুর মধ্যবিন্দু’তে অর্থাৎ কেন্দ্রস্থল একটু উঁচু
  • সেতুর উপরিভাগ থেকে ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে
  • সেতুর প্ল্যান বা নকশাতে খিলানের পিলারের অস্তিত্ব দেখা যায়।

সেতুর এলিভেশন

  • বেশির ভাগ সেতু ত্রি-খিলানযুক্ত। আবার, কতক সেতু একটি মাত্র খিলানবিশিষ্ট হয়।
  • ত্রি-খিলানযুক্ত সেতুতে মধ্যবর্তী খিলানটি অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতির হয়। একটিমাত্র খিলানযুক্ত সেতুতে খিলান সর্বাধিক বড় আকৃতির হয়। জলপথে এই খিলানের মধ্য দিয়ে জলযান তথা নৌকা, ডিঙি, পানশি যাতায়াত করে। পার্শ্ববর্তী খিলান দুটো অন্ধকারাচ্ছন্ন সরু গলিময়, যা দিয়ে সর্বোচ্চ মাছেরা এপার থেকে ওপারে যেতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী খিলানের আকৃতি অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতির হয়, তবে তা মধ্যবর্তী খিলান থেকে অনেক ছোট।
  • প্রতিটা খিলানসংবলিত সেতু প্রাচীরের পুরুত্ব ও ঘনত্ব অনেক বেশি। বিশেষত সেই সময়ে কলাম স্ট্রাকচারের ব্যবহার এতটা আমুদে হয়নি বলেই এই পুরু দেয়ালের আবির্ভাব।
  • সেতু বা পুলের শেষ থেকে শুরু পুরোটাই ইট নির্মিত।
  • সেতু বা পুলের জ্যামিতিক কনফিগারেশন অনুযায়ী এতটাই বক্রভাবে লাভ করে যে অনেক ক্ষেত্রে ভারী যানবাহন ওপর দিয়ে চলাটা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে পায়ে হেঁটে সেতুপথ পাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি চলাচলের বিকল্প নেই। আর এই পয়েন্টটিতেই প্রাচীন সময় ও বর্তমান সময়ের যানবাহনের একটা বিস্তীর্ণ ফারাক দেখা যায়।
  • সেতু বা পুলগুলো সব সমসাময়িক গোত্রের। কোনোটাই কারও চেয়ে বড় বা ছোট মনে হয় না। যেহেতু খুব বেশি দীর্ঘ পরিমাণ স্ট্রেইট নিতে অক্ষম, তাই সেতুর দৈর্ঘ্যও খুব কম।
  • সেতুর উপরিভাগের কেন্দ্রস্থল মধ্যবর্তী স্থান থেকে দুই পাশে ক্রমেই ঢালু হয়ে নেমে গেছে।
  • সেতুর দুই পাশে যে রেলিংয়ের ব্যবহার, তার উচ্চতা খুব কম। উচ্চতা অনুযায়ী রেলিংয়ের উপরিভাগে কোনাকৃতি তৈরি হয়, যা দেখতে একটা ত্রিভুজের মতো।
  • কতিপয় সেতুতে চারপাশে অক্টাগোনাল টরেন্ট বা বুরুজ দেখা যায়।  যার উচ্চতা উপরিভাগে পৌঁছায় না।
  • কখনো কখনো মূল খিলান ছাড়াও অতিরিক্ত খিলানের দেখা মেলে। যেমন, পাগলা সেতু।
  • আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেতুর চারপাশে মিনার দেখা যায়। এদের সংখ্যা একের অধিক হয়। যেমন, পাগলা সেতু। পাগলা সেতুতে প্রতিটি কোনায় চারটি মিনার দেখা যায়। যাদের আকার অষ্টভুজাকার।
  • কখনো কখনো টিউডার গথিক স্থাপত্যের পরিচয় মেলে।
  • প্রতিটা সেতু একেকটা ইতিহাস, সেতুসংলগ্ন খাল বা পরিখা ও একেকটা ইতিহাসের সাক্ষী। আবার অনেক স্থানে সেতুসমেত স্থানজুড়ে আছে দুর্গ বা কেল্লা।

সোনারগাঁয়ে অবস্থিত প্রাচীন বাংলার সেতু স্থাপনা

প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ (১২৮১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ)। অধ্যাপক স্বরূপচন্দ্র রায় তাঁর বইতে এই স্থানকে ‘সুবর্ণগ্রাম’ নামে অভিহিত করেছেন। বাংলার বার ভূঁইয়াখ্যাত ‘ঈশা খান’-এর সাম্রাজ্য। আর পানাম নগরী হলো এই প্রাচীন সোনারগাঁয়ের অন্তর্গত পরিত্যক্ত এক নগরী। মোগল শাসনামলে নগরায়ণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই স্থানগুলোতে গড়ে উঠেছে হরেক রকম স্থাপনা। সোনারগাঁয়ের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহের মধ্যে রয়েছে। প্রাচীন ইমারত, ক্রোড়ী বাড়ি, সেতু, ঘাট, মসজিদ, পরিখা, মঠ, নীলকুঠি, কুঠিবাড়ি, দরবার হল, রংমহল, টাঁকশাল ও মাদ্রাসা। মোগলরা এই বাংলায় যে কয়টি নান্দনিক সেতু স্থাপনা তথা পুল নির্মাণ করেছে, তার মধ্যে এই স্থাপনাটি অন্যতম।

মোগলরা সোনারগাঁ অধিকার করার পরে ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন সোনারগাঁয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য পানাম নগরীর আশপাশে অনেক মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করেন। এদের মধ্যে যা কিছু অবশিষ্ট তা এখনো পর্যটক ও পুরাতত্ত্ববিদগণের মনে বিষ্ময়ের উদ্রেক করে। এখানে সেতুর মধ্যে রয়েছে-

  • পানাম সেতু
  • দালালপুর পুল
  • পানাম নগর সেতু
  • পিঠাওয়ালীর পুল।

পানাম সেতু বা পানাম পুল

মোগল আমলের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পানাম সেতু। এই সেতুর অপর নাম ‘কোম্পানীগঞ্জ কা পুল’ বা ‘কোম্পানীগঞ্জের সেতু’ তবে স্থানীয় লোকজন এই সেতুকে পঙ্খীরাজ পুল নামেই চেনে-জানে। ঐতিহাসিক এই পানাম সেতু নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার পানাম নগরীতে অবস্থিত। সেতুটি সুপ্রাচীনকাল থেকে যে খালের ওপরে স্থাপিত তার নাম ‘পঙ্খীরাজ খাল’। প্রাচীন এই খালটি ঐতিহাসিক পানাম নগরী ও বৈদ্যের বাজারের সংযোজক রেখায় অবস্থিত।

পানাম সেতুর ইতিহাস

ঐতিহাসিকগণের মতে, সপ্তদশ শতকের দিকে নির্মিত হয় এই ঐতিহাসিক মোগল স্থাপনা। সেতুটির প্রকৃত নির্মাণকাল সম্পর্কিত প্রামাণ্য শিলালিপি না থাকলেও স্থাপত্যরীতি বিবেচনা করে ঐতিহাসিকেরা এটিকে মোগল আমলে অর্থাৎ সপ্তদশ শতকে নির্মিত স্থাপনা হিসেবে একমত হয়েছেন। বর্তমানে এই স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।

পানাম সেতুর গাঠনিক বৈশিষ্ট্য

ইট নির্মিত পানাম সেতু দেখতে অবিকল নগর কসবার ‘মীর কাদিমের সেতুর’ মতো। সেতুর উপরিভাগের কেন্দ্রস্থল থেকে ক্রমশ ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। সেতুটি বহুল পুরুত্ববিশিষ্ট। ত্রি-খিলানযুক্ত এই সেতুর পরিধি অনেকটাই কম। দৈর্ঘ্য ১৭৩ ফুটবিশিষ্ট এবং প্রস্থ ১৪ ফুটবিশিষ্ট। সেতুর মধ্যবর্তী খিলান, খিলান দুইটি থেকে আকারে বড়। মধ্যবর্তী খিলানের উচ্চতা প্রায়। পার্শ্ববর্তী খিলান ৪.২৪ মিটার উঁচু। সেতুর মধ্যবর্তী স্তম্ভগুলো ২.২১ মিটার করে পুরু। সেতুটির নিচে দিয়ে এখনো জলধারা প্রবহমান ও নৌকা চলাচলের সুব্যবস্থা বিদ্যমান। বর্ষাকালে সেতুর নিচে জলে কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকে। খরার  মৌসুমে আবার সেতুর নিচের ভাগ শুষ্ক হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থা হয়ে যায়।

বর্তমানে সেতুর অবস্থা ও ব্যবহার

পানাম সেতু বর্তমানে একরকম অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

  • এই সেতুর নেই কোনো ব্যবহার। পার্শ্ববর্তী নতুন সড়ক নির্মিত হওয়ায় ওই সড়কেই যানবাহন চলাচল করে। যানবাহন চলাচল একেবারে বন্ধ, লোকজন চলাচলও সাময়িক।
  • সেতুর কোথাও কোথাও ফাটল দেখা গেছে।
  • সেতুর ভাঙা ও ফাটল অংশে সবুজ ঘাস জন্মেছে। ঘাস ও আগাছার ভাগাড় এই সেতু। সবুজ ঘাস জন্মেছে বলে সেতুর অবস্থা এখন গো-চারণভূমি।
  • স্থানীয় লোকজন ভেজা কাপড় ও জাল শুকাতে এই সেতুর দেয়াল ব্যবহার করে।
  • সেতুর নিচভাগ যেন ময়লার স্তূপ ও ভাগাড়।
  • পঙ্খীরাজ খালের অবস্থায় নাজুক, খালের পানি দূষিত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও খালের পানির সংযোগ রেখাও বাধা সৃষ্টি হয়েছে। কচুরিপানায় পরিপূর্ণ খাল।
  • সেতুটি রিকশা ও ভ্যানের গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে
  • সেতুর দুই পাশ ময়লার স্তূপে পরিপূর্ণ। 
  • তবে দুই-তিন রকমের গুইসাপ ও তক্ষকের দেখা মেলে এই সেতুতে। পানাম নগরীতে আগত দর্শনার্থী ও পর্যটকদের এই সেতু ভ্রমণ করতে কখনো ভুল হয় না।

একটা কথা স্বীকার করতে সমস্যা নেই যে পানাম সেতু বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত আর সব মোগল সেতুর চেয়ে শক্ত, মজবুত ও পরিপোক্ত।

চলবে…..

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।

Related Posts

অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান এখনকার অবকাঠামো জলবায়ুসহিষ্ণু হতে হবে

দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথটি চলতি বছরের অক্টোবরে উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে স্বল্প খরচ ও ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকা…

অটোমেশন সিস্টেমে স্মার্ট হোম

আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি চমৎকার এক আবাসের। বসবাসের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একটি গৃহ আমাদের ধারণ করে। এই বসবাস ও…

ভবন ‘নির্মাণ’ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৭)

আজকের আলোচ্য বিষয় নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃতব্য স্টিলসামগ্রী (এমএস রড, অ্যাঙ্গেল ও ফ্ল্যাট বার)। এমএস রড একটি ভবন নির্মাণ…

মিথেনে নতুন বিপদ

গ্রামে প্রায়ই রাতের আঁধারে কৃষিখেত বা ডোবা-নালায় দেখা যায় হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুন, গোলা হয়ে উড়তে থাকে এক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *