নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন মানেই বিশাল কর্মযজ্ঞ, দীর্ঘ সময় ও অনেক মানুষের মানসিক ও কায়িক শ্রম। পৃথিবীর নগর; সভ্যতা সূচিত হয়েছে এ সবকিছুরই সমন¦য়ে। বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়েছে স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণ, নদী-খাল খনন, পাহাড় কাটাসহ প্রভৃতি কাজে। কিন্তু সময় যেমন বদলেছে, বদলেছে নির্মাণ উপকরণও। প্রযুক্তি ও যন্ত্রপ্রকৌশলের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সহজ থেকে সহজতর হয়েছে নির্মাণকাজ। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এমনই এক অনন্য আবিষ্কার এক্সকাভেটর। খননকাজে এ যন্ত্রটি এক ও অদ্বিতীয়। নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রকৌশলের কাজেও এ খনন যন্ত্রটির জুড়ি মেলা ভার।
এক্সকাভেটর ব্যাকহোজ বা ডিগার নামেও পরিচিত। ভূপৃষ্ঠ বা ভূগর্ভ থেকে মাটি খনন, পাহাড় বা মাটির ঢিবি থেকে মাটি সংগ্রহ ও অপসারণে ব্যবহৃত হয় এ যন্ত্রটি। এই খনন যন্ত্রটি অতি অল্প সময়ে প্রচুর পরিমাণে মাটি, পাথর, খনিজ বা অন্যান্য দ্রব্য অপসারণে সক্ষম। বড় প্রকল্প ও ভূগর্ভস্থ খননে এক্সকাভেটর বিকল্পহীন।
খনন যন্ত্রের ব্যবহার
এক্সকাভেটর মাটি খননে অধিক ব্যবহৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে এর ব্যবহার ব্যাপক। নিচে এর ব্যবহার ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরা হলো-
- মাটি খনন ও অপসারণ
- সুড়ঙ্গ, গর্ত খনন
- স্থাপনার ভিত্তি খনন
- পুকুর, খাল, নদী ড্রেজিং/খনন
- ড্রেন, নালা খনন
- ল্যান্ডস্কেপিং
- উন্মুক্ত খনি খনন
- নদী-ঝিরি থেক পাথর সংগ্রহে
- প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম স্থাপনা ধ্বংসে বা ভাঙতে
- বৃক্ষ কাটতে ও জঙ্গল পরিষ্কার করতে
- শিলা ভাঙা ও সংগ্রহ
- তুষার কাটা ও অপসারণ
- বর্জ্যপদার্থ, হোল্ডিং উপকরণ, স্থাপনার ভাঙা অংশ এবং অন্যান্য ভারী সামগ্রী উত্তোলন ও স্থানান্তর।
খননযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য
একটি এক্সকাভেটরে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-
- খনন ক্ষমতা
- গতিশীলতা ও
- বহন সুবিধা।
এই খনন মেশিনগুলো সাধারণত তিনটি ইউনিট নিয়ে গঠিত। যেমন-
১। চলমান ইউনিট (Travel Unit)
২। ঘূর্ণমান ইউনিট (Revolving Unit)
৩। সম্মুখ ও প্রান্ত সংযোগ (Front and End Attachment)
চলমান ইউনিট ক্রাউলার মাউন্ট বা হুইল মাউন্ট আকারের হতে পারে। ঘূর্ণমান ইউনিটে চালকের কেবিন থাকে, যেখান থেকে চালক সহজে আশানুরূপ অবস্থানে ঘোরাতে সক্ষম হন। আর সম্মুখ ও প্রান্ত সংযোগের সাহায্যে বিভিন্নভাবে মাটি খনন করতে সাহায্যে করে। কেবল এ সম্মুখ ও প্রান্ত সংযোগ পরিবর্তন করে একধরনের মাটি খনন মেশিনকে অন্য ধরনের মেশিনে রূপান্তর করা হয়। এতে থাকে একটি হাইড্রোলিক সিলিন্ডার, একটি বুম, আন্ডারক্যারেজ, আর্ম এবং একটি বাকেট। এসব যন্ত্রাংশ একটি ঘূর্ণমান প্ল্যাটফর্ম থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই প্ল্যাটফর্মটিতেই একজন চালক বসে যানটি চালান এবং সব কিছু পরিচালনা করেন। এর সঙ্গে সংযুক্ত লম্বা ধাতব আর্মটির মাথায় বসানো থাকে একধরনের দাঁতযুক্ত বালতি, যা যেকোনো দিকে ঘোরানো যায় এবং মাটি খনন ও তা স্থানান্তর করতে পারে। অধিকাংশ এক্সকাভেটরে হাইড্রোলিক ব্যবহার করা হয়। কারণ, তা স্বল্প উপকরণেই অধিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারে। বুম সেকশন মানুষের হাতের মতোই কাজ করতে পারে। হাইড্রোলিক এক্সকাভেটরের সব কাজ সম্পন্ন হয় হাইড্রোলিক সিলিন্ডারের সঙ্গে হাইড্রোলিক তরল এবং হাইড্রোলিক মোটর ব্যবহার করে।
খননযন্ত্রের কার্যপ্রণালি
ধাপভিত্তিক খননযন্ত্রের কার্যাবলি:
- প্রথমে পাওয়ার শোভেলকে চালিয়ে প্রয়োজনীয় অবস্থানে নিয়ে মাটির সামনে আনা হয়।
- পিটের নিচ সমতলে ডিপার স্টিককে নামানো হয় এবং দাঁতগুলোকে সম্মুখে আনা হয়।
- এবার ডিপার স্টিকে বল প্রয়োগ করা হয়। অপর দিকে একই সঙ্গে হোয়েস্টিং লাইনে টানা বল প্রয়োগ করা হয় এবং ডিপারকে টেনে তোলা হয়।
- সম্মুখ সংযোগসহ ঘূর্ণমান ইউনিটকে সম্পূর্ণরূপে ঘোরানো হয় এবং খননকৃত মাটি ওয়াগনের মধ্যে ফেলা হয়।
- ইউিনিটটিকে দুলিয়ে পেছনে নিয়ে খননের সামনে নেওয়া হয়।
এক্সকাভেটরের রকমফের
কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের এক্সকাভেটর বাজারে পাওয়া যায়। কাজের ভিন্নতার কারণেই উদ্ভাবিত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের এক্সকাভেটর। যদিও সেগুলোর আকৃতি, আকার বা কার্যকারিতার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য, তবে উদ্দেশ্য অভিন্ন। শিল্পকারখানা, নির্মাণ প্রকল্প, খনিসহ বিভিন্ন খনন প্রকল্পে ভিন্ন ধরনের এক্সকাভেটর ব্যবহৃত হয়। মাটি খননকাজে ছোট আকারের এক্সকাভেটর দিয়ে কাজ চললেও শিলাসমৃৃদ্ধ মাটি খননে বড় আকারের হেভি ডিউটি এক্সকাভেটর প্রয়োজন। সে হিসাবে আধুনিককালে নির্মাণে প্রধানত দুই ধরনের এক্সকাভেটর ব্যবহৃত হয়। সেগুলো হচ্ছে-
১। ব্যাক হো এক্সকাভেটর
২। ড্রাগলাইন এক্সকাভেটর।
ব্যাক হো এক্সকাভেটর
ব্যাক হো সম্প্রতি বহুল ব্যবহৃত সাধারণ খননযন্ত্র। খননের সব ক্ষেত্রেই এই বৈশিষ্ট্যের যন্ত্রটির ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। প্রায় সব নির্মাণ প্রকল্পেই দেখা যায়। এই খননযন্ত্রের সম্মুখভাগে একটি খননকারী বালতি থাকে। বালতিটি একটি বুমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে চালক বা নিয়ন্ত্রণকারী সবকিছু ভালোভাবে দেখতে পান। ক্যাবকে সহজেই ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘোরানো যায়। এটি পরিবহন বা ডাম্পিং ট্রাক থেকে খননসামগ্রী লোড করার সুবিধা দেয়। এই খননযন্ত্র নির্মাণ এবং খনির মাটি খনন বা ডাম্পিং জোনের বর্জ্য বহনে সাহায্য করে। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের মাটি, বরফ বা অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ অপসারণে ব্যবহৃত হয়। এই খননযন্ত্রটি অন্যান্য খননযন্ত্রের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট হওয়ায় ছোট থেকে মাঝারি প্রকল্পেই এ খননযন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়।
ড্র্যাগলাইন এক্সকাভেটর
এই খননযন্ত্রগুলো আকারে অনেক বড় এবং গঠনগত দিক থেকেও ভিন্ন। বড় প্রকল্পের কাজে এই ড্র্যাগলাইন এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হয়। যেমন- ভূপৃষ্ঠ খনি খনন, নদী-খাল খনন প্রভৃতি। এই খননযন্ত্রগুলো এতই ভারী যে বহনের সময় বা চালনার সময়ে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই কারণে, এই খননযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদাভাবে প্রকল্পে স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সাইটে একত্র হয়। এ ছাড়া বড় লরি বা ট্রাকে বহন করেও প্রকল্প স্থানে আনা-নেওয়া করা হয়।
কার্যকারিতা, প্রকৃতি এবং মেশিনের আকারের ওপর ভিত্তি করে এই ড্র্যাগলাইন এক্সকাভেটরেও রয়েছে ভিন্নতা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- সাকশন এক্সকাভেটর
- লং রিচ/আর্ম এক্সকাভেটর
- ক্রাউলারস অ্যান্ড কমপ্যাক্ট এক্সকাভেটর
- পাওয়ার শোভেল।
সাকশন এক্সকাভেটর
সাকশন এক্সকাভেটর ভ্যাকুয়াম এক্সকাভেটর নামেও পরিচিত। এতে সাকশন পাইপ ব্যবহার করে আলগা মাটি এবং ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ করা হয়। পাইপের প্রান্তে থাকা ধারালো দাঁত মাটি কাটতে সাহায্য করে। খনন শুরু হওয়ার আগে সাধারণত একটি ওয়াটার জেট ব্যবহৃত হয় মাটি আলগা করতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই খননযন্ত্রটি ব্যবহৃত হয় ভূগর্ভস্থ উপাদানগুলোকে যত্ন ও নিরাপত্তার সঙ্গে অপসারণে।
লং রিচ/আর্ম এক্সকাভেটর
নামকরণ থেকেই বোঝা যায় এ ধরনের খননযন্ত্রগুলোর হাত হয় দীর্ঘ এবং বুম সেকশনও আকারে বড়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই খননযন্ত্র ব্যবহৃত হয় ধ্বংসের কাজে, যেমন, ভবন বা প্রাচীর ভাঙা ইত্যাদি।
ক্রাউলারস অ্যান্ড কমপ্যাক্ট এক্সকাভেটর
এ ধরনের খননযন্ত্রগুলোর অতি উচ্চ অশ্বশক্তিসম্পন্ন। সাধারণত এই খননযন্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয় খনিতে এবং অন্যান্য ভারী কাজে। কম্প্যাক্ট এক্সকাভেটর মাটি উত্তোলন করতে ব্যবহৃত হয়।
পাওয়ার শোভেল
স্ট্রাইভিং বা ফ্রন্ট শোভেল নামেও পরিচিত এ খননযন্ত্রটি। খুবই শক্তিমানসম্পন্ন এ খননযন্ত্রটি খনি ও খননে ব্যবহৃত হয়। একটি ঘূর্ণমান ডিভাইস, লিফটিং আর্মযুক্ত ক্রেন ও বালতি, কাউন্টার ওয়েট এবং নিয়ন্ত্রক ইউনিট একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
রক্ষণাবেক্ষণ
খননযন্ত্র অন্যান্য যানবাহন ও যন্ত্রের মতোই নিয়মিতভাবে পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এ ব্যাপারে যা যা করতে হবে-
- নিয়মিত বিরতিতে লুব্রিকেন্ট দেওয়া।
- পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং বেশি ক্ষয়প্রান্ত অংশসমূহ প্রতিস্থাপন করা।
- ক্ষয়প্রাপ্ত তারের দড়ি পরিবর্তন করা।
- ডিপারের খারাপ দাঁতগুলো পরিবর্তন করা।
- দোলানো কোণ (ঝরিহম অহমষব) হ্রাস এবং ট্রাককে ভালোভাবে আটকানোর জন্য পিটের নিচ তল পরিষ্কার রাখতে হবে।
- চলমান ইউনিটের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা।
এক্সকাভেটর নির্মাণকাজে অত্যন্ত দরকারি একটি যন্ত্র এবং দিনে দিনে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দ্রুত খননের জন্য। তবে এর উচ্চমূল্যের কারণে লোকজন কেনার বদলে ভাড়া করে কাজ সারতেই পছন্দ করে। কেনার ক্ষেত্রে ভালো মানের ও প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পণ্য কেনা উচিত। যেহেতু এই যন্ত্র মেরামত বিশেষজ্ঞ ছাড়া করতে পারেন না, সেক্ষেত্রে বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৮