সিরিশের ঘষায় মসৃণ ডিজাইন

আকাশ ছোঁয়া ভবন। ভবনের গায়ে নানা রঙের কারুকার্য। চোখ জুড়ানো রঙের খেলা। এমন দৃশ্য কার না ভালো লাগে! তাই তো বিশ্বময় উঁচু উঁচু ভবন দাঁড়িয়ে আছে এমনই সৌন্দর্য গায়ে মেখে। এমন সৌন্দর্যের পেছনে কি শুধু রংই রহস্য? না। রঙের পেছনেও রয়েছে ভিন্ন রঙের খেলা। এ রং ভবনের গায়ে বছরের পর বছর আটকে থাকার পেছনে রয়েছে সিরিশ কাগজেরও রহস্য, যার ঘষায় মসৃণ হয়ে ওঠে ভবনের পিঠ। আর এ মসৃণ পিঠেই লাগানো হয় নানা রঙের মিশ্রণ। ফলে রং হয় দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই।

যেকোনো বস্তু রং করার আগে ভালোভাবে মসৃণ করে নিলে রং হয় দীর্ঘস্থায়ী। সিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষে না নিলে রং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া লোহার আসবাব থেকে জং সরানোর জন্যও সিরিশ কাগজের জুড়ি মেলা ভার। লোহার জং সরানোর জন্য সিরিশ কাগজের বিকল্প নেই। অন্য কোনো উপাদান দিয়ে জং সরানো কঠিন হলেও সিরিশ কাগজে সহজেই তা করা যায়। তাই বলা যায়, রংমিস্ত্রি এবং গাড়ি প্রস্তুতকারকদের জন্য সারা বিশ্বেই সিরিশ কাগজ গুরুত্বপূর্ণ এক উপকরণ। যার প্রয়োজন নিত্যদিনই। 

সিরিশ কাগজের ব্যবহার

বালু ও পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি সিরিশ কাগজ। কাগজ, কাপড় ও প্লাস্টিকের ওপরে লেপানো হয় মিশ্রণটিকে। সিরিশ কাগজ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির আগে ঘষামাজার কাজে ব্যবহৃত হয়। লোহা, দেয়াল, কাঠের আসবাব, গ্রিলসহ বিভিন্ন বস্তু রং করার আগে ময়লা দূর করে মসৃণ ও সমান করার কাজে ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া যানবাহনের চাকার টিউব সারানোর কাজেও সিরিশ কাগজ ব্যবহার করা হয়।

নানা রকম সিরিশ কাগজ

সিরিশ কাগজ মূলত পোল্যান্ড, চীন ও জার্মান থেকে আমদানি করা হয়। যা মূলত এক ফুট বাই এক ফুট আকারের হয়। এ আকারের প্রতিটির দাম ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ৪০ টাকা পর্যন্ত। ধরন অনুযায়ী, এর দাম পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশে পোল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত সিরিশ কাগজের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। চাহিদা বেশি থাকায় চীনা সিরিশ কাগজ থেকে পোল্যান্ডের সিরিজ কাগজের দাম বেশি। পোল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত সিরিশ কাগজের দাম ৩০-৪০ টাকা। আর চীন থেকে আমদানিকৃত কাগজের দাম হয়ে থাকে ১৫-২৫ টাকা। 

সিরিশ কাগজের ধরন

সিরিশ কাগজ মূলত তিন ধরনের। যার মধ্যে রয়েছে- 

  • ওয়াটার পেপার
  • স্যান্ড পেপার ও 
  • আয়রন পেপার।

ওয়াটার পেপার আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে। এগুলো হলো-

  • সাদা ও
  • কালো। 

কাচ, বালু ও পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি ওয়াটার পেপার (সিরিশ কাগজ) ৬টি নাম্বারে নির্ণয় করা হয়। এর মধ্যে সাদা রঙের ওয়াটার পেপার ১০০, ১২০, ১৮০, ২৪০, ৩০০ ও ৩২০-এ ছয়টি নাম্বারের হয়ে থাকে। নাম্বার নির্ভর করে কাচ ও পাথরের আকারের ওপর। পোল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয় সাদা রঙের ওয়াটার পেপার। সব ধরনের ঘষামাজা ও কাঠ বার্নিশের কাজে ব্যবহৃত হয় ওয়াটার পেপার। প্রতি পিস ওয়াটার পেপার বিক্রি হয়   ২০-২৫ টাকায়। সাধারণত ৯ ইঞ্চি বাই ১১ ইঞ্চি মাপের হয় সাদা ওয়াটার পেপার।

অপর দিকে কালো রঙের ওয়াটার পেপার ১০ নাম্বার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এগুলো হলো-১২০, ২২০, ৩২০, ৪০০, ৬০০, ৮০০, ১০০০, ১২০০, ১৫০০, ২০০০, ২৪০০। প্রতি পিস কালো ওয়াটার পেপার ১৫-২০ টাকায় বিক্রি হয় দেশীয় বাজারে। কালো রঙের ওয়াটার পেপার চীন থেকে আমদানি করা হয়। গাড়ির রং করার কাজে এ পেপারের রয়েছে বহুল ব্যবহৃত। 

একাত্তর

স্যান্ড পেপার হয় তিনটি নাম্বারের। এগুলো হলো ০, ১, ১.৫। স্যান্ড পেপার কাঠের পলিশের কাজে বহুল ব্যবহৃত হয়। স্যান্ড পেপার পানিগ্রাহী। এই পেপার পানির স্পর্শ পেলেই নেতিয়ে পড়ে। রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করতে হয়। এ পেপার পিস প্রতি ৫-১০ টাকায় বিক্রি হয়। ৯ ইঞ্চি বাই ১১ ইঞ্চি মাপের হয় এটি, যা মূলত চীন থেকে আমদানি করা হয়।

আয়রন পেপার বা এমআরই পেপার ৬ প্রকার সাইজের বা ধরনের হয়। এগুলো হলো-০, ১, ১.৫, ২, ২.৫ ও ৩। প্রতি পিস এমআরই পেপার ১২-১৫ টাকায় বিক্রি হয়। এই পেপারও আমদানি করা হয় চীন থেকে। লোহা ঘষা ও লোহার জং সরানো হয় এই পেপারের সাহায্যে।

সিরিশ কাগজের রঙের রকমফের

বাংলাদেশের বাইরে বেগুনি, সুবজ, হলুদ, গোলাপি, আকাশিসহ বাহারি রঙের সিরিশ কাগজের ব্যবহার হয় কাঠ ও লোহার পলিশ ও রং করার কাজে। তবে বাংলাদেশে সাধারণ সাদা ও কালো এই দুই রঙের সিরিশ কাগজের ব্যবহার বেশি। 

পরিমাপ ও বেচাকেনা

সিরিশ কাগজ কারখানায় অনেক লম্বাভাবে উৎপাদন করা হলেও ব্যবহারের সুবিধায় এগুলোকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করা হয়। ১০ ফুট থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে এর মাপ। পোল্যান্ড থেকে আমদানি করা সিরিশ কাগজ ৯ ইঞ্চি থেকে ১১ ইঞ্চি মাপে বিক্রি করা হয়। আর চীন থেকে আমদানি করা কাগজগুলো আরও ছোট টুকরো করে বিক্রি করা হয়। চীনের সিরিশ কাগজগুলো ৮ ইঞ্চি বাই ১০ ইঞ্চি মাপে বিক্রি করা হয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, পোল্যান্ড, জার্মান ও ব্রিটেনে সিরিশ কাগজ তৈরি হয়। তবে চীন ও পোল্যান্ডের বাইরে জার্মানির সিরিশ কাগজ বাংলাদেশে সামান্য হলেও ব্যবহার করা হয়। চীন ও পোল্যান্ডের সিরিশ কাগজই বাংলাদেশের সর্বত্র নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

বিডি২৪ভিউজ

ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি

এগুলোর কোনো ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি নেই। তবে দীর্ঘদিন ঠান্ডা কোনো স্থানে রাখলে রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করা ভালো। তাতে কার্যকারিতা বাড়ে। ব্যবহার না করলে এগুলো নষ্ট হয় খুবই কম। সিরিশ কাগজে পানি লাগলে এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া অনেক দিন বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখলেও এর কার্যকারিতা কিছুটা হলেও নষ্ট হয়। তবে ভালোভাবে ব্যবহারের জন্য রোদে শুকিয়ে নেওয়াটাই উত্তম।

নানাবিধ ব্যবহার

  • দেয়ালে মসৃণভাবে রং করার আগে
  • লোহায় রং করার আগে
  • লোহার জং ওঠাতে
  • কাঠে রং করার আগে
  • যানবাহনের চাকার টিউব সারাতে সিরিশ কাগজের ব্যবহার প্রচলিত।

যেখানে পাবেন

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নবাবপুর, উত্তরা, রায়সাহেব বাজারে সিরিশ কাগজ পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের যেকোনো জায়গার হার্ডওয়্যারের দোকানেই মিলবে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ উপকরণটি।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top