নীল এলইডির অভাবে আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম। স্মার্টফোনের কল্যাণে যে আলো ঘোরে মানুষের পকেটে পকেটে, যে আলো কাজে লাগে কম্পিউটারের পর্দায় কিংবা টিভির পর্দায় ছবি ফটোতে তা আসে নীল এলইডি থেকে। আর তা উৎপাদনের কৌশল আবিষ্কারই এনে দিল পদার্থবিদ্যায় এবারের নোবেল। বাহারি বাতির রোশনাই থেকে শুরু করে সাদা আলো জোগানোর বাতি কিংবা রোজকার জীবনের নানা যন্ত্রপাতির দৌলতে এলইডি (লাইট এমিটিং ডায়োড) এখন অনেকেরই পরিচিত শব্দ। এলইডি থেকে লাল ও সবুজ আলো মিলেছিল বেশ কয়েক দশক আগেই। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছিল না নীল আলো। যেটা ছাড়া সম্ভব হচ্ছিল না তিন রং মিশিয়ে সাদা আলোর সৃষ্টি। কয়েক দশক ধরে গবেষণা চালিয়েও যা পারেনি অনেকেই, সেটাই সম্ভব করে জাপানি তিন বিজ্ঞানী ইসামুআকাসাকি (৮৫), হিরোশি আমানো (৬০) ও শুজিনাকামুরা (৬৪) জিতে নিলেন পদার্থবিজ্ঞানে এবারের নোবেল।
আবিষ্কৃত হলো এলইডি থেকে নীল আলো পাওয়ার কৌশল। আর তাতেই খুলে যায় তিন রঙের মিশেলে সাদা আলো দেওয়ার এলইডি তৈরির রাস্তা। আজ যে পথঘাট, বাড়িঘর উজ্জ্বল হয় সাদা আলোয়, তা ওই সাদা এলইডির কল্যাণে। অনেক কম বিদ্যুৎ পুড়িয়ে ঢের বেশি আলো মেলে এইএলইডি থেকে। বিদ্যুতের সাশ্রয় তো বটেই, আরও অনেক উপযোগিতা রয়েছে এর। পৃথিবীতে দেড় শ কোটি মানুষ, যাঁরা এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পান না, তাঁদের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে এলইডি আলো। কারণ, এই আলো জ্বলে কম শক্তিতে। সস্তার সৌরশক্তিতেও এ বাতি আলো দেবে ঘরে ঘরে। তা ছাড়া বৈদ্যুতিক আলোর ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবেশদূষণের মাত্রাও। বর্তমানে সারা বিশ্বে উৎপাদিত শক্তির ২০ শতাংশই ব্যয় হয় রাতে আলো জ্বালাতে। লাইট এমিটিং ডায়োড (এলইডি) ন্যূনতম শক্তি খরচে একই সঙ্গে উজ্জ্বল আলো উৎপাদন করতে সক্ষম। এর জন্য দূষণের পরিমাণও নামমাত্র।

আলোকচ্ছটার প্রযুক্তিময়তায় কত যে বিবর্তন দেখল মানুষ! প্রথমে পাথরে পাথর ঘষে চকমকি আলো। তারপর তেল পুড়িয়ে, সলতে জ্বালিয়ে প্রদীপ। ২০ হাজার বছর আগেকার কৌশল। উনিশ শতকে লাইট বাল্ব। কৌশল তখনো মোটা দাগের। সরুতার বা ফিলামেন্টে বিদ্যুৎ পাঠিয়ে এমন গরম করে ফেলা, যাতে তা থেকে আলো ঠিকরোয়। বিদ্যুৎ খরচ ঢের। কিন্তু আলো তেমন জোরদার নয়। বিশ শতকে এলটিউব লাইট বা ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব। বিদ্যুতের কিছুটা সাশ্রয়, আলোও তুলনায় বেশি। এতে আলো মেলে নতুন কৌশলে। প্রায় বায়ুশূন্য কাচ নলে ঘটাতে হয় তড়িতের স্পার্ক। ফিলামেন্ট গরম করতে হয় না বলে তাপ তৈরির কারণে বিদ্যুৎশক্তির অপচয় অনেক কম হয় এতে।
এরপর এলইডি বাতি। বিদ্যুৎ থেকে সরাসরি আলো সৃষ্টি। অনেক বেশি দক্ষ কায়দায়। বিদ্যুৎ খরচের হিসেবে আলো তৈরির ক্ষমতায় ফ্লুরোসেন্ট বাতি পুরোনো দিনের বাল্বের তুলনায় চার গুণেরও বেশি দক্ষ। আর এলইডি বাতি ফ্লুরোসেন্টের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি দক্ষ। আয়ুতেও অনেক ফারাক। পুরোনো দিনের বাল্ব যদি টেকে এক হাজার ঘণ্টা। তবে, ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব আলো দেয় ১০ হাজার ঘণ্টা। এলইডি বাতির আয়ু সেখানে এক লাখ ঘণ্টা।

লাল এলইডি আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। তা কাজে লেগেছিল ডিজিটাল ঘড়িতে, ক্যালকুলেটরে কিংবা বৈদ্যুতিন যন্ত্রের অন-অফ দশা বোঝাতে। সবুজ এলইডির আবিষ্কার এর কিছু পরে। কিন্তু বেগ দিচ্ছিল নীল এলইডি। অথচ এটা না পেলে যে তিন রং মিশিয়ে তৈরি হবে না সাদা আলো! বিপ্লব আসবে না রোশনাই জগতে! তার ওপর হাজার হাজার কোটি ডলার মুনাফার প্রলোভন তো আছেই। নীল এলইডি আবিষ্কারের লক্ষ্যে তাই দৌড় শুরু করে বহু বহুজাতিক সংস্থা। এবং অনেক নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়। তিন দশকের তীব্র প্রতিযোগিতা। সবাই যখন ব্যর্থ এবং প্রায় নিশ্চিত যে নীল এলইডি আর মিলবে না কখনো, তখনো হাল ছাড়েননি আকাসাকি, আমানো ও নাকামুরা। ১৯৯০-এর দশকে এসে এই তিন বিজ্ঞানী সফল হন নীল এলইডি তৈরিতে। আকাসাকি ও আমানো তখন গবেষণা করছিলেন নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর নাকামুরা ছিলেন জাপানের বেসরকারি সংস্থা নিচিয়া কেমিক্যালসের কর্মী। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এত দিন লাল ও সবুজ রঙের এলইডি তৈরি করা গেলেও নীল এলইডি বহু চেষ্টার পরও মানুষের কাছে অধরাই রয়ে গিয়েছিল। ফলে, লাল, নীল ও সবুজ- এই তিন মৌলিক রঙের একটি রং না মেলায় সাদা আলোর এলইডি বানানো যায়নি। সেই অসাধ্য সাধন করায় এই তিন বিজ্ঞানীর হাতেই গেল এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল।
ওরা তিনজন
ইসামুআকাসাকি
জন্ম: ৩০ জানুয়ারি ১৯২৯, চিরান, জাপান।
বর্তমানে জাপানের নাগোয়ার মেইজো বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত।
কাজের ক্ষেত্র: সেমি কন্ডাক্টর শিল্প।
পুরস্কার: আসাহি প্রাইজ (২০০১), তাকেদা অ্যাওয়ার্ড (২০০২), আইইইই অ্যাডিসন পদক (২০১১) ও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার (২০১৪)।
হিরোশি আমানো হিরোশি আমানো
জন্ম: ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬০, হামামাৎসু, জাপান।
বর্তমানে জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত।
কাজের ক্ষেত্র: সেমি কন্ডাক্টর শিল্প।
পুরস্কার: পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার (২০১৪)।

শুজিনাকামুরা শুজিনাকামুরা
জন্ম: ২২ মে ১৯৫৪, ইকাতা, জাপান।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
কাজের ক্ষেত্র: সেমিকন্ডাক্টর শিল্প।
পুরস্কার: মিলেনিয়াম টেকনোলজি প্রাইজ (২০০৬), হারভে প্রাইজ (২০০৯) ও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার (২০১৪)
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৫ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪




















