ভবিষ্যতের আকাশচুম্বী যত ভবন

অধুনা প্রযুক্তি ব্যাপক প্রসার লাভ করায় এর ব্যবহার করে সম্ভব হচ্ছে উঁচু উঁচু সব ভবন নির্মাণ। আগে  যা ছিল মানুষের কল্পনায়। বহুতল ভবনগুলো এখন শুধু যে আকাশচুম্বী হচ্ছে, তা নয়; এটা ধারণ করছে কাঠামোটির দৃঢ় অবয়ব। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে বিশ্বের আকাশচুম্বী ভবন নির্বাচনের প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় আকাশচুম্বী ভবনের নকশা ও নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কে সবার সামনে নতুন নতুন ধারণা উন্মুক্ত করা হয়। প্রতিযোগিতার প্রধান প্রধান বিবেচ্য বিষয়, অংশগ্রহণকারী ভবনগুলোর সৌন্দর্যের নান্দনিকতা, পরিবেশের সঙ্গে সখ্য ও ভবনে বসবাসরত অধিবাসীদের ব্যবহার উপযুক্ততা।

হিমালয় ওয়াটার টাওয়ার, চীন

হিমালয় ওয়াটার টাওয়ারটি নির্মিত হিমালয় পর্বতশ্রেণীর ৫৫ হাজার হিমবাহ বা তুষারস্রোতের মধ্যে, যা সমগ্র পৃথিবীর শতকরা ৪০ ভাগ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির উৎস হিসেবে পরিচিত। স্থাপনাটি ২০১২ সালের Skyscraper প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে। এটা চীনের Zhi Zheng, Hongchuan Zhao, Dongbai Song-এ অবস্থিত। বিশাল এবং বৃহৎ আকারের বরফের শেলগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দরুন আগের তুলনায় দ্রুত গলতে শুরু করেছে, যা এশিয়ায় জন্য বয়ে আনতে পারে ভয়াবহ ও মারাত্মক পরিণাম। সারা বিশ্বের অস্তিত্বের জন্যও এটি বড় ধরনের হুমকি। তদুপরি, হিমালয়ের পানিপ্রবাহে সৃষ্ট সাতটি নদীর তীরে অবস্থিত গ্রাম ও শহরগুলো বন্যা বা খরার সম্মুখীন হওয়ায় ঘটতে পারে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়।

অকিউপাই স্কাইস্কাপার, যুক্তরাষ্ট্র

হিমালয় ওয়াটার টাওয়ার পর্বতের ওপরে অবস্থিত আকাশচুম্বী এক ইমারত। সাধারণত যা পানি সংরক্ষণ এবং সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। হিমালয়ের পাদদেশের সমতলভূমিতে যখন প্রাকৃতিক পানির সরবরাহ কমে কিংবা বন্ধ হয়ে যায়, তখন এর মাধ্যমে ঠিক রাখা হয় পানি সরবরাহব্যবস্থা। হিমালয় ওয়াটার টাওয়ারে বর্ষার সময় পানি সংগ্রহ ও পরিশোধন করে Freeze করে সংরক্ষণ করা হয় পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য। পানি সরবরাহের সিডিউল সাধারণত টাওয়ারটির নিচে বসবাসরত বাসিন্দাদের চাহিদা অনুযায়ী ঠিক করা হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি পানি সংরক্ষণের দারুণ এক ব্যবস্থাও বটে।

মাউনটেন ব্যান্ড এইড, চীন

ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও খনি থেকে খনিজ পদার্থের উত্তোলন চীনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধ্বংস করছে; এর সহজ শিকার হচ্ছে চীনের পর্বতগুলো। পর্বত খনন করে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ আহরণের ফলে এগুলো এখন ধ্বংসের সম্মুখীন। ভূগর্ভস্থ খনি আহরণের ফলে শুধু ওই স্থানের বাস্তুসংস্থানে সমস্যা হচ্ছে তা কিন্তু নয়; এর ফলে ওই স্থানে বসবাসকারী মানুষ হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। বসবাসের জন্য বাধ্য হচ্ছে অন্যত্র সরে যেতে। এদের অধিকাংশই কৃষক যারা তাদের চাষাবাদকৃত জমি হারিয়ে হয়ে পড়ছে বেকার। মাউনটেন ব্যান্ড এইড প্রজেক্ট নিশ্চিত করছে পাহাড়ি এ আদিবাসীদের প্রতিনিয়ত একত্র করে তাদের বসবাস ও কাজের পরিবেশ। এই প্রজেক্ট ইওনান পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ ভারসাম্য বজায় রাখতে কাজ করছে নিরলসভাবে। 

২০১২ সালের আকাশচুম্বী ইমারত প্রতিযোগিতায় প্রজেক্টটি লাভ করেছে দ্বিতীয় স্থান। এই প্রজেক্টটি দুই লেয়ারবিশিষ্ট নির্মাণকাজের সফল দৃষ্টান্ত। যার বাইরের দিকের লেয়ারটি আকাশচুম্বী ইমারত। যার নির্মাণ ও প্রসার ঘটেছে পর্বতের গা ঘেঁষে। পর্বতের মধ্যে এবং পর্বতের একটি অংশ হিসেবে প্রজেক্টের ইমারতটি নির্মাণের ফলে Hmong-এর আদিবাসীদের তাদের নিজস্ব জীবনব্যবস্থা সচল ও পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করছে। পাহাড়ের অদিবাসীরা এখান থেকে উচ্ছেদের আগে যে ধরনের জীবনব্যবস্থায় অভ্যস্ত ছিল, ফিরে আসছে সেই জীবনাচরণে। যেহেতু ইমারতটি পর্বতের মধ্যে অবস্থিত, তাই এর উচ্চতাকে শুধু পর্বত হিসেবেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এই প্রজেক্ট চালুর ফলে Hmong-এ বসবাসকারী পাহাড়ি বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়গুলোয় বসবাস করায় পাহাড়গুলো ভবিষ্যতে রক্ষা পেয়েছে ধ্বংস বা ক্ষতির হাত থেকে। তা ছাড়া এখানে আর শ্রমিক হিসেবে কাজ না করায় পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তারা সাহায্য করছে। তা ছাড়া গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত পানির পুনর্ব্যবহার করে পাহাড়ে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা হলো সেই সেচব্যবস্থা, যা প্রজেক্টের ভেতরের লেয়ারের অন্তর্ভুক্ত। এই সেচব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের মাটিকে দৃঢ় করে পাহাড়ে নতুন পরিবেশ সৃষ্টি করতে।

সিটাডেল স্কাইস্কাইপার, ইউক্রেন

মুনমেন্ট টু সিভিলাইজেশন, তাইওয়ান 

বড় বড় শহরতলিতে আকাশচুম্বী ইমারত সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করে। তাইওয়ানের মনুমেন্ট টু সিভিলাইজেশন ২০১২ সালের আকাশচুম্বী ইমারত প্রতিযোগিতায় অর্জন করেছে তৃতীয় স্থান। বড় শহরগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়ে। শহরগুলোর দ্রুত বৃদ্ধির ফলে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে বর্জ্য নিষ্কাশন বা অপসারণের জায়গাগুলো। অর্থ মূল্যে মূল্যহীন দ্রব্যের পুনর্ব্যবহার একান্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন বর্জ্য দ্রব্যের পচনের ফলে যে গ্যাস পাওয়া যায়, তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মনুমেন্ট টু সিভিলাইজেশন প্রজেক্টটি বিশেষ এ উদ্দেশ্যে নির্মিত। এটা শহরে সৃষ্ট মূল্যহীন বর্জ্য পণ্যকে একটি টাওয়ারে চাপ প্রয়োগে পচনশীল করে এর থেকে নির্গত বা উৎপন্ন শক্তি সংগ্রহ করে  আশপাশের শহরে সরবরাহ করে। যেহেতু টাওয়ারটির অবস্থান শহরের একদম মধ্যখানে, তাই শক্তি উৎপন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সরবরাহ করা সম্ভব। তা ছাড়া এটা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাঁচায় পরিবহন খরচও।

সিটাডেল স্কাইস্কাইপার, ইউক্রেন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত বিপর্যয় কিংবা সৌরজগতের আকস্মিক বিপর্যয় রোধে নিজস্ব সুরক্ষার জন্য সঠিক কাঠামো থাকাটা একান্ত জরুরি, যা হঠাৎ ঘটা বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখবে। সিটাডেল স্কাইস্কাইপার ইউক্রেনে অবস্থিত। ২০১২ সালে আকাশচুম্বী ইমারত প্রতিযোগিতায় ‘সিটাডেল স্কাইস্কাপার’-এর নাম উচ্চারিত হয় সম্মানের সঙ্গে। প্রজেক্টটির ভাবনা প্রথম ভাবা হয়েছিল জাপানের জন্য। কেননা সম্প্রতি প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কারণে জাপান ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রজেক্টটি তিনটি অংশে নতুন ভবনের প্রস্তাবনা করে, যার উদ্দেশ্য আইল্যান্ডকে প্রতিরক্ষা শিল্ড হিসেবে কাজ করানো। যার প্রথম অংশে দেশের প্রধান শহরগুলো যুক্ত হবে, যাতে শহরে বসবাসরত বাসিন্দারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করতে পারে দ্রুততার সঙ্গে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অবশ্যই শহরের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু শহরবাসীর বাস হবে Sell-Supporting আকাশচুম্বী বা বহুতল ভবনে। দ্বিতীয় অংশ নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত করবে এই সব আকাশচুম্বী ইমারতকে। যাদের অবস্থান হবে সমান্তরালে; এক লাইনে, যা একটি শিটের বেরিয়ার তৈরি করবে। যার দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ২-৩ কিলোমিটার, যা মূল ভূখণ্ডে সুনামির রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করবে। আকাশচুম্বী ইমারতগুলো একটা বাঁধ হিসেবে কাজ করবে, যা প্রায় ৫০ মিটার পানির ঢেউ প্রতিহত করতে সক্ষম।

হাউস অব বাইবেল, রাশিয়া

অকিউপাই স্কাইস্কাপার, যুক্তরাষ্ট্র

২০১১ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র ‘অকিউপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট’ প্রজেক্টটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে। অকিউপাই স্কাইস্কাপারের ডিজাইনাররা এমন একটি ভবন বা বহুতল ইমারত নির্মাণের প্রস্তাব করেন, যা অর্থনৈতিক মন্দা প্রতিরোধে হবে সহায়ক শক্তি। এ ছাড়া ত্বরান্বিত করবে ভবনে বসবাসকারী বাসিন্দাদের উন্নত যোগাযোগকে। 

অকিউপাই স্কাইস্কাপারের নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই তীব্র হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। চলতে থাকে ভার বহন করার জন্য নেট লাগানো অবধি। ক্যানভাস যুক্ত করার মাধ্যমে ভবনের ভেতরের জায়গাকে ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভাগ করা হয়। ভবনের বিভিন্ন জায়গার নাম ও কাজ নির্দিষ্ট করে দেন ডিজাইনাররা। যেমন- ওরিয়েন্টেশন ফোম বা ফ্ল্যাট যেখানে ঘুমানো, বিনোদন, শোভাযাত্রা এবং বড় ধরনের মিটিং আয়োজন করা যায়।

ফোল্ডেড সিটি, ফ্রান্স

উঁচু থেকে আরও উঁচু ভবন নির্মাণ মনে হয় না আমাদের বহুতল ভবনে বসবাসের রীতিনীতিকে বদলে দিতে সক্ষম। বেশির ভাগ মানুষেরই আশা, তারা তাদের পরিবারকে নিয়ে নিজের মনের মতো করে নির্মিত ছোট ভবনে বাস করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা বৈচিত্র্যের অভাব আর জনসংখ্যার ঘনত্ব। আকাশচুম্বী ইমারত নির্মাণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯ শতকে ইলিসা ওটিস এলিভেটর আবিষ্কার করেন। এই অভূতপূর্ব আবিষ্কার আকাশচুম্বী ইমারতের আকার-আকৃতিকে ব্যাপকতা দান করে। বহুতল ভবনে ব্যবহৃত এ প্রযুক্তি ভবনকে করে তোলে আরও আধুনিক ও অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধাসমৃদ্ধ। 

ফোল্ডেড সিটি টাওয়ারটির অবস্থান ফ্রান্সে। ২০১২ সালে আকাশচুম্বী ইমারত প্রতিযোগিতায় বিশেষভাবে উল্লেখ আছে এটির কথা। এমন একটি টাওয়ার অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধার সমষ্টি। আর এ ধরনের সুউচ্চ টাওয়ার বড় বড় শহরের প্রাণ কিংবা অন্য কথায় বললে এই টাওয়ারগুলো একটি শহরের মধ্যে আর একটি শহর।

মাউনটেন ব্যান্ড এইড, চীন

হাউস অব বাইবেল, রাশিয়া

আকাশচুম্বী ইমারত নির্মাণ যেমন শক্তি ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ, তেমনি এটি বড় বড় শহরের মধ্যে অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটাতে সাহায্য করে। সৃষ্টি করছে প্রতিযোগিতার। আকাশচুম্বী নামকরা ইমারতের মধ্যে হাউস অব বাইবেল অন্যতম। ইমারতটি রাশিয়ায় অবস্থিত। ২০১২ সালের আকাশচুম্বী ইমারত প্রতিযোগিতায় এর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। হাউস অব বাইবেল প্রথাগত বহুতল ভবন নির্মাণের পদ্ধতির একটা রিভিশন মাত্র। Aerostation নির্মাণপদ্ধতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ফ্লোর বাদ দিয়ে ভবনকে যেকোনো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব, এ ভবনটি যার বড় উদাহরণ। 

প্রকৌশলী সনজিত সাহা

sonjit7022@gmail.com

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪২ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৩

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top