‘কাঠের ফার্নিচারের চাইতে স্টিলের ফার্নিচারের দাম তুলনামূলক কিছুটা কম। আবার নাগরিক ব্যস্ত জীবনে কিছুদিন পরপরই বাসা বদলের ঝামেলায় স্টিলের ফার্নিচার কাঠের ফার্নিচারের তুলনায় অধিক উপযোগী। যারা ঘন ঘন বাসা বদল করেন তাদের বাসার ফার্নিচারগুলো রড স্টিলের হলে ফার্নিচারের খুব একটা ক্ষতি হয় না। আবার এ ক্ষেত্রে দুর্র্ভোগও খুব একটা পোহাতে হয় না বলে ফার্নিচারের ক্ষতিও তেমন একটা হয় না।’ এভাবেই স্টিলের ফার্নিচার কিনতে আসার কারণ জানালেন ধানমন্ডির কলাবাগান লেকসার্কাস এলাকার রেজোয়ান সিদ্দিকী। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন অল্প কিছুদিন আগে। তাই নতুন সংসারটাকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিতে ফার্নিচার কিনতে এসেছেন পান্থপথ এলাকার ফার্নিচারের শোরুমে।
শুধু পোশাকেই নয়, ঘরের সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও নতুন নতুন অনুষঙ্গের ছোঁয়ায় ঘরকে চাকচিক্য করে তোলা হচ্ছে এখন। একসময় ফার্নিচার বলতে শুধু কাঠের তৈরি খাট-পালং, সোফা সেট, আলমারি, চেয়ার-টেবিলই বোঝাত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত জীবনধারার আবেশে কাঠের ফার্নিচারের সুপ্রতিষ্ঠিত জায়গাটুকু স্টিলের ফার্নিচার দখল করে নিচ্ছে সহজেই।
কাঠের পুরনো ফার্নিচার কম দামে বিক্রি করে স্টিলের চকচকে ফার্নিচার দিয়ে ড্রইংরুম থেকে শুরু করে বাসার প্রতিটি রুম সাজিয়ে তুলছেন অনেকেই। পান্থপথের স্টিল-কাঠের নতুন-পুরনো ফার্নিচারের দোকানে ঘোরাঘুরি করে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে তারই একটি চমৎকার চিত্র পাওয়া গেল।
স্টিল ফার্নিচারের এত জনপ্রিয়তার কারণ কী? জানতে চাইলে পান্থপথের খাজা মেটাল ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী হাজী দ্বীনূল ইসলাম জানান, ‘স্টিলের ফার্নিচার দীর্ঘস্থায়ী, চকচকে, দাম কম, হালকা-পাতলা, ভাঙে না, কাঠের ফার্নিচারের মতো ঘন ঘন রিপেয়ারিং দরকার হয় না। তাই ক্রেতারা বেশি পছন্দ করে।’
কাঠের ফার্নিচারের সাথে তুলনা করে স্টিলের ফার্নিচারের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, স্টিলের একটি খাট আপনি ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকায় কিনতে পারবেন। কিন্তু কাঠের তৈরি একই লেভেলের খাট কিনতে লাগবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। স্টিলের সোফা ৬ থেকে ১২ হাজার টাকায় কেনা যায়, সেখানে একই ফার্নিচার কাঠ দিয়ে তৈরি করলে লাগবে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
পান্থপথের স্টিলের ফার্নিচার দোকানে কথা হয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈয়দা সাদিয়া সাহ্রিন ঝিলের সাথে। স্টিলের ফার্নিচার কেনার কারণ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘আমরা বান্ধবীরা মিলে শুক্রাবাদে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। ভাবলাম সবাই এখন স্টিলের খাট-পালং, সোফা দিয়েই ঘর সাজাচ্ছে, যেহেতু নতুন ফ্ল্যাট আর স্টিলের ফার্নিচারগুলো দেখতেও চকচকে তাই সবার সঙ্গে মিল রেখেই স্টিলের ফার্নিচার দিয়েই আমাদের ফ্ল্যাটটি সাজাতে চাই। লক্ষণীয় হলো, এটি দামে সাশ্রয়ী এবং ঝামেলাহীনভাবে স্থানান্তর করা যায়।’
স্টিলের খাট ব্যবহারে কোনো ধরনের শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা জানতে চাইলে হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. হাসান-আল-আরাফাত বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ ধরেনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। তবে খাটের তোষক পুরু করে ব্যবহার করা ভালো।’
ম্যাটারিয়াল এবং ম্যাটালিউরজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেয়ারম্যান ড. মোহম্মদ আমিনুল ইসলামের সঙ্গে স্টিলের ফার্নিচারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনায় তিনি বললেন, ‘স্টিলের ফার্নিচার ব্যবহারকারীর কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয় কিনা তা আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। স্টিলের ফার্নিচার তৈরিতে যে রঙের আস্তর ব্যবহার করা হয় তা বেশ পুরু এবং ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হলেও হতে পারে, তবে তা পরীক্ষিত নয়।’
স্টিলের ফার্নিচার ব্যবহার করেন এমন একজন গৃহিণী ফারজানা খান এ ফার্নিচারের গুণাগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ‘সাত-আট বছর ধরে আমি স্টিলের খাট, সোফা সেট ব্যবহার করছি আজও তা নতুনই আছে। এখনও চকচক করে। একটুও স্পট পড়েনি। আগে কাঠের ফার্নিচার ছিল। বাসা বদলাতে গিয়ে টানাটানিতে ভেঙে যায়, ফেটে যায়। ওঠা-বসায় বিশ্রী আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়। রঙ, বার্নিশ নষ্ট হয়ে অত্যন্ত বিশ্রী দেখায় আর কাঠের ফার্নিচারের ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর ছারপোকা লুকিয়ে থাকে যার জন্য ঘুমান অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু স্টিলের খাট ব্যবহার করায় আমাকে এখন আর ছারপোকার আতঙ্কে ভুগতে হয় না। স্টিলের ফার্নিচার হালকা হওয়ায় বাসা বদলানও অনেক সহজ।’
স্টিলের ফার্নিচারসমূহ
মানুষের আধুনিক জীবনযাত্রায় যত ধরনের আসবাবপত্র প্রয়োজন তার প্রায় সব রকমই পাওয়া যাচ্ছে স্টিলে। স্টিলের তৈরি এসব ফার্নিচারের মধ্যে রয়েছে ঘুমানোর অনুষঙ্গ খাট, অতিথি অভ্যর্থনার সোফা, ডাইনিং টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, টিভিস্ট্যান্ড, হ্যাঙ্গার, আলনা, রকিং চেয়ার, ইজি চেয়ার, বিভিন্ন ধরনের বসার চেয়ার ও ডাইনিং চেয়ার টেবিলসহ আরো হরেক রকম ফার্নিচার। স্টিলের এসব ফার্নিচারের মধ্যে খাট, সোফা ও চেয়ার-টেবিলের বিক্রি বেশ ভালো বলে জানালেন বিভিন্ন স্টিল ফার্নিচার ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে ঢাকা নগরীর মানুষ খুবই ফ্যাশন সচেতন। তাই ফ্যাশনপ্রিয় এ মানুষদের রুচিবোধের ওপর ভর করে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্টিল ফার্নিচারের ব্যবহার।
ব্যবহারে সুবিধা
স্টিল ফার্নিচার গাঠনিকভাবে খুব মজবুত ও শক্তিশালী। তাই অতি সহজেই নষ্ট হয় না।
এ ধরনের ফার্নিচারের রঙ খুব গাঢ় ও পুরু হওয়ায় সহজেই রঙ জ্বলে যায় না। ব্যবহারের পরও রঙ টিকে থাকে দীর্ঘদিন।
ফার্নিচারের সবচেয়ে বড় শত্রু পানি ও বৈরী আবহাওয়া। স্টিল ফার্নিচারের মূল কাঠামো স্টিলের হওয়ায় পানি ও বৈরী আবহাওয়া এ ধরনের ফার্নিচারের কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
ফার্নিচারের আরেকটি বড় শত্রু হলো পোকামাকড়। কিন্তু স্টিলের ফার্নিচারে পোকামাকড় কোনো ধরনের ক্ষতি করতে পারবে না।
স্টিলের ফার্নিচারের গাঠনিক সুবিধার কারণে এ ধরনের ফার্নিচার স্থানান্তর করা খুব সহজ ও কম ব্যয়বহুল।
স্টিলের ফার্নিচার কাঠের ফার্নিচারের মতো প্রতিবছর বার্নিশ করার ঝামেলা নেই।
স্টিলের ফার্নিচার তুলনামূলকভাবে অধিক দীর্ঘস্থায়ী।
স্টিলের ফার্নিচারের দাম অন্যান্য ফার্নিচারের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম।
অসুবিধা
এ ধরনের ফার্নিচারের রঙের প্রলেপ যদি দুর্বল ও কম দামী হয় তাহলে ব্যবহারকারীর ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ফার্নিচারের স্টিল কাঠামো যদি ফাঁপা ও কম পুরু হয় তাহলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কেনার সময় যা মনে রাখবেন
স্টিল ফার্নিচার কেনার সময় এর মূল কাঠামো স্টিলের পুরুত্ব দেখে নিতে হবে। কারণ কম পুরুত্বের স্টিল ফার্নিচার বেশি স্থায়ী হয় না।
স্টিল ফার্নিচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এর উপরের রঙের প্রলেপ বা গ্যালভানাইজিং। তাই স্টিল ফার্নিচার কেনার আগে এর রঙের প্রলেপ বা গ্যালভানাইজিংয়ের মান কেমন তা দেখে নিতে হবে।
দরদাম
বাজারে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের স্টিলের ফার্নিচার পাওয়া যাচ্ছে। এসব ফার্নিচারের দাম অন্যান্য ফার্নিচারের তুলনায় কিছুটা কম। এগুলোর মধ্যে বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও নকশার খাট পাওয়া যাচ্ছে ৫০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০০ টাকার মধ্যে। সিরামিক ও ইশকা মডেলের বিভিন্ন ধরনের সোফার দাম ৯০০০ টাকা থেকে ২৬০০০ টাকা। নান্দনিক নকশা ও আকৃতির মনকাড়া সব ডাইনিং টেবিল পাওয়া যাবে ১০০০০ টাকা থেকে ১৮০০০ টাকার মধ্যে। ছোট-বড় ও মাঝারি নানা ধরনের টিভিস্ট্যান্ড পাওয়া যাবে ৫০০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকায়। কাপড়-চোপড় ও পোশাক-আশাক রাখার জন্য নানা ধরনের হ্যাঙ্গার ও আলনা পাবেন ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকায়। বিভিন্ন ধরনের অফিসিয়াল ও ঘরে ব্যবহার্য ডাইনিং, ইজি ও রকিং নানা ধরনের চেয়ার পাবেন ৮০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকায়।
যেখানে পাবেন
স্টিলের নানা ধরনের এসব ফার্নিচার পাওয়া যাবে রাজধানী ঢাকার পান্থপথ, গ্রীন রোড, নিউমার্কেট, মৌচাক মার্কেট, গুলিস্তান, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কল্যাণপুরসহ সারা বাংলাদেশের সব বড় বড় মার্কেটে।
জিয়াউর রহমান চৌধুরী
প্রকাশকাল: বন্ধন ২২ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১২