চারদিকে শব্দ, বদ্ধ পরিবেশ। এমনি ফ্ল্যাটসর্বস্ব কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পড়াশোনার পরিবেশ নিয়েই আছে নানা প্রশ্ন। ঢাকা শহরেই গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন এক ক্যাম্পাস যেখানে খোলা আকাশের নিচে না বসেও সূর্যের আলোয়, চার দেয়ালের ভেতরে বসেও প্রকৃতির মাঝে থেকে উন্মুক্ত পরিবেশে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। এমনই এক ক্যাম্পাস রয়েছে ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে।
নির্মাণশৈলীর গুণে এ ভবনের টপ ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত সূর্যের আলো অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। এর প্রত্যেকটি ফ্লোর ও রুমের রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। ভবনটিতে রয়েছে কয়েকটি স্তর। সাড়ে ৯ বিঘা জমির উপরে ৭ লাখ বর্গফুট আয়তনের ১০ তলা, ৬ তলা ও ৪ তলাবিশিষ্ট ভবনটি কোর্ড ইয়ার্ড দিয়ে একসঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছে। এ ভবনের অবস্থান প্লট ১৬, ব্লক-বি, বসুন্ধরা, ঢাকায়। এ ভবনের নান্দনিকতা নিয়ে কথা হয় স্থপতি তারিক হাসান ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপ-পরিচালক হামিদুর রহমানের সঙ্গে।
স্থপতি তারিক হাসান জানালেন, সূর্যের আলো যাতে সহজেই টপ ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত পৌঁছায়, এ জন্য ছাদের উপরে আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ভবনের ওয়ালগুলো করিডর থেকে সাড়ে ৩ ফুট দূরত্বে রাখা হয়েছে। এতে সূর্যের আলো খুব সহজেই টপ ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে যাবে। এ সূর্যের আলো প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে পৌঁছে যাবে। এখানে লাইটের ব্যবহার না করলেও চলবে। এ ভবন নির্মাণের সময় মাথায় রাখতে হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা উন্মুক্ত পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারে। তিনি জানান, এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ফ্লোরে গাছ দেওয়া হয়েছে। ফলে ভবনে কার্বনের পরিমাণ কমে আসবে। তারিক হাসান আরো জানান, ভবনটির স্থাপত্যশৈলীতে এমন কিছু বিষয় রাখা হয়েছে যাতে বাইরে থেকেও মনে হয় এটি একটি ক্যাম্পাস। এ ছাড়াও বড় বড় ওপেন স্পেস এবং ডাবল হাইট স্পেস দিয়ে ভবনগুলো যুক্ত করা হয়েছে। ভবনটি ফোকাস করার চেষ্টা করেছি ইন্টারনাল কোর্ড ইয়ার্ড এবং ওপেন এয়ার এমপি থিয়েটার দিয়ে। এখানে বিভিন্ন ধরনের কালচারাল প্রোগ্রাম করা যাবে। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা উন্মুক্তভাবে আড্ডা দিতে পারবে। ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে রাখা হয়েছে ক্যাফেটেরিয়া। কারণ বাইরে থেকে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবক বা যে কেউ এলে জটলা না জমিয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় বসতে পারেন। রাখা হয়েছে ৩০ হাজার বর্গফুটের একটি লাইব্রেরি। যা অন্য সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বড়। তিনটি ফ্লোরকে ব্যবহার করা হয়েছে এ লাইব্রেরি তৈরিতে। বিশ্ব মান রক্ষা করে লাইব্রেরির ডিজাইন করা হয়েছে। লাইব্রেরির প্রাইভেসি রক্ষার জন্য এর ভেতরে রয়েছে একটি সিঁড়ির ব্যবস্থা। ছাত্রছাত্রীরা যাতে লাইব্রেরিতে এসে লেখাপড়া করতে আগ্রহী হয় তার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা। এ ভবনে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক অডিটরিয়াম। যেখানে লাইটিং এবং সাউন্ড সিস্টেমে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। অডিটরিয়ামটিতে ৭৫০ জন লোকের বসার ব্যবস্থা আছে।
মাঝখানের উন্মুক্ত স্থানগুলো সম্পর্কে স্থপতি বলেন, মাঝখানে যে উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়েছে সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আড্ডা দিতে পারবে। এ ছাড়াও প্রকৃতির সঙ্গে যেন খুব সহজেই নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয় সে বিষয়গুলো চিন্তা করা হয়েছে। এ ভবনে একঘেয়েমি মনে হওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। এর স্থাপত্যের মধ্যেই সব নান্দনিকতা আনা হয়েছে। সেন্ট্রাল স্পেসটা সম্পূর্ণ এলাকাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে; যা নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ছাড়াও কার্যকারিতার দিক থেকে যথেষ্ট প্রভাবক। এখানে আধুনিক স্থাপত্যের নকশার জিওমেট্রিক আকার প্রদান করা হয়েছে।
ভবনে বেশিরভাগ জায়গায় দেয়ালের পরিবর্তে গ্লাস ব্যবহার করা প্রসঙ্গে তারিক হাসান বলেন, এ ভবনে বাইরের দিকে কোনো দেয়াল ব্যবহার করা হয়নি। পুরোটাই গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। আর উত্তর দিকে গ্লাসের ব্যবহারটা বেশি। কেননা উত্তর দিকে সাধারণত ঠান্ডার পরিমাণটা বেশি থাকে। ছাত্রছাত্রীদের যেন ঠান্ডা অনুভব করতে না হয় সে কথা বিবেচনা করেই গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। এতে গ্লাসের ভেতর দিয়ে গরমের আভা আসবে এবং ঠান্ডা অনুভব না করে গরম অনুভূত হবে। এ ছাড়াও গ্লাস ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হলো উত্তর দিকে ইন্টারনাল কোর্ড রয়েছে। এসব কারণেই সর্বোচ্চ এক্সপোজার পাওয়ার জন্য গ্লাস ব্যবহারের বিশেষত্ব আনা হয়েছে। আর দক্ষিণ এবং পশ্চিমে খোলা জায়গা কম রাখা হয়েছে। ফলে গরম কম অনুভূত হবে। এ ছাড়াও কোর্ড ইয়ার্ডে টেরাকোটা ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কখনই এ ভবনে গরম অনুভূত হবে না।
তারিক হাসান জানান, রাজধানী ঢাকায় কার্বনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ কারণে লেসমাস এরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ভেতরে খোলা জায়গা বেশি পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ভেতরে এবং বাইরে এলিভিশনগুলোকে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ফ্লোরের শ্রেণীকক্ষগুলো ডিপার্টমেন্টওয়াইজ সাজানো হয়েছে। যাতে শিক্ষার্থীরা এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে সহজেই প্রবেশ করতে পারে। এতে এক শ্রেণীকক্ষের সঙ্গে অন্য শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে। এ ভবনটি ৩টি জোনে ভাগ করা হয়েছে- অফিস, শ্রেণীকক্ষ ও লেকচার গ্যালারি। যেখানে অনেক স্পেস রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়াও এর মধ্যে বিশেষ আরবান উইনডো ব্যবহার করে ভবনের ভেরিয়েশন আনা হয়েছে। তিনি জানান, এ ভবনের প্রতিটি ধাপে সেকশন রাখা হয়েছে। তবে পুরো ভবনকে বিভিন্নভাবে ট্রিট করা হয়েছে। এর যে কোনো একটি অংশকে পৃথকভাবে দেখলেও যেন বোঝা যায় এটি এ ভবনেরই একটি অংশ।
তারিক হাসান আরও বলেন, ভবনটি কোর্ড দিয়ে একসঙ্গে করা হলেও এর চারপাশে ভবনের উচ্চতা এক নয়। ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণীকক্ষের ইউনিটটি ১০ তলা, লাইব্রেরি ভবন ৬ তলা, প্রশাসন ও রেজিস্ট্রার অফিস ৪ তলাবিশিষ্ট করা হয়েছে। ভবনের ডিজাইনে ইট-পাথরের দেয়াল ব্যবহার না করে গ্লাস ব্যবহার করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের দেশে গরম ও ঠান্ডা দুটোই অনুভূত হয় তাই এসব দিক মাথায় রেখেই ভবনে বাইরের দিকে কোনো দেয়াল ব্যবহার করিনি।
পুরোটাই গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। আর উত্তর দিকে গ্লাসের ব্যবহারটা বেশি করা হয়েছে। কারণ উত্তর দিকে সাধারণত ঠান্ডার পরিমাণটা বেশি থাকে। এতে গ্লাসের ভেতর দিয়ে গরমের আভা আসবে এবং ঠান্ডা অনুভব না করে গরম অনুভূত হবে। এ ছাড়াও গ্লাস ব্যবহার করার আরেকটি কারণ হলো নর্থ এরিয়ায় ইন্টারনাল কোর্ড রয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপ-পরিচালক হামিদুর রহমান এ ভবন সম্পর্কে বলেন, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির বিল্ডিং দেশের অন্যসব ভবনের চেয়ে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। এ ইউনিভার্সিটির ভবন যেভাবে করা হয়েছে তাতে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করার ক্ষেত্রে পাবে উন্মুক্ত পরিবেশ। যে পরিবেশে থাকবে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। যেন শহরের কোলাহল এখানে স্পর্শ না করে, ছাত্রছাত্রীরা ইউনিভার্সিটিতে এসে স্বস্তিতে ক্লাস করতে পারে। ভবনটি উত্তর-পূর্ব দিকে মুখ করে করা। কারণ এর সামনে ৬০ ফুটের রাস্তা রয়েছে। এ ভবনে ছাত্রছাত্রীদের জন্য শ্রেণীকক্ষ করা হয়েছে ৪৬টি। অডিটরিয়াম ১টি। যাতে ৭৫০ জনের মতো লোকের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মাল্টিপারপাস হলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেখানে ৩০০ লোক বসতে পারবে। যাতে বিভিন্ন ফাংশন করা হয়েছে। এ ছাড়াও সুপরিসর একটি লাইব্রেরি করা হয়েছে। তা ছাড়াও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সামনের ওপেন স্পেস রয়েছে। যেখানে লাগানো হয়েছে ফুল, ঔষধি, পাতাবাহারসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছালি। এ ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। এ ভবনে একসঙ্গে সাড়ে ৩ হাজার ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করতে পারবে।

স্থপতির সংক্ষিপ্ত জীবনী
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির নকশা করেছেন স্বনামধন্য স্থপতি তারিক হাসান। স্থপতি তারিক হাসান ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল তার। ভালো ছবি আঁকার স্বীকৃতিসরূপ পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ও মা ছিলেন গৃহিণী। বাবার চাকরির সুবাদে বেশিরভাগ সময় কেটেছে দেশের নানান জায়গায়। তার প্রিয় বিষয় স্থাপত্যের বই পড়া। একেবারেই সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী। প্রায় দেড় দশক ধরে কর্মজীবনে তিনি চার শতাধিক স্থাপনার ডিজাইন করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য নির্মাণ স্থাপনার মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, অফিস ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও সিভিল অ্যাভিয়েশন ভবন।
সমিরন রায়
প্রকাশকাল: বন্ধন ২২ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১২




















