মৃদু বাতাসেই ঘুরবে পাখা

গ্রীন উইন্ড এনার্জি

বিদ্যুৎ দেশের একটি অন্যতম বড় সমস্যা। দিনে দিনে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন ঢাকাসহ সারা দেশে গড়ে উঠছে শত শত ভবন। কিন্তু সে হারে বাড়ছে না বিদ্যুৎ উৎপাদন। নব নির্মিত সব ধরনের স্থাপনায় ঘাটতির কারণে সরকার বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছে আবাসনসহ নানান নির্মাণ শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ মানুষ। চাহিদানুযায়ী দেশে কোনো নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। তাই পণ্য উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়েছে। সোলার প্যানেল এনার্জির সাহায্যে এ সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। তা ছাড়া বর্ষা ও শীতের সময় সূর্যতাপ যথাযথভাবে পাওয়া যায় না। ফলে এটি যথেষ্ট বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে মোঃ শাহরিয়ার হোসেনের উদ্ভাবিত উইন্ড এনার্জি মেশিন। দীর্ঘ এক বছরের গবেষণা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি করেছেন বিশেষ ধরনের মেশিন, যা কিনা ন্যূনতম বাতাসেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। 

এ যন্ত্রে রয়েছে ড্রাইভিংড, জেনারেটর, ডিভাইস (চার্জ হতে সাহায্য করে) এবং ব্যাটারি। একটি দন্ডের দু’প্রান্তে দুটি পাখা লাগানো হয়েছে। ফলে যে কোনো দিক থেকে বাতাস বয়ে গেলেই তা ঘুরতে শুরু করে। বাতাস যত বৃদ্ধি পেতে থাকবে পাখাটি তত ঘুরবে এবং অধিক পরিমাণে এনার্জি সঞ্চিত হবে। ঝড়ের সময় যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য পাখাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাঁজ হয়ে যাবে। ঘূর্ণনের ফলে উৎপন্ন বিদ্যুৎ জেনারেটরের মাধ্যমে বিশেষ ডিভাইসের সাহায্যে ব্যাটারিতে জমা হয়। তা দিয়ে বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, টিভিসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র চালানো সম্ভব। তা ছাড়া বাংলাদেশে এই নব উদ্ভাবিত মেশিনের সব ধরনের ডিভাইস বা যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পাখা ও লাইট

রাজশাহী জেলায় জন্ম কাজপাগল এ মানুষটির পিতা আবুল হোসেন ছিলেন পাওয়ার বোর্ডের চীফ ইঞ্জিনিয়ার। বিএসসি ডিগ্রির পর বুয়েট থেকে এমএসআই করেছেন। ১৯৯৩ সালে ইউনিভার্সাল ট্রেডার্সে কর্মজীবন শুরু করেন। লিডস কর্পোরেশনে কার্ড প্রডাকশন মেশিন এবং সব ধরনের ডিভাইসের প্রধান পদে ১৩ বছর চাকরি করেছেন। এ ছাড়াও টেকনো লিঃ-এ এটিএম টেকনিক্যাল সাপোর্ট ডিভিশনে সিনিয়র ম্যানেজার পদেও কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিখানোর সাথে যুক্ত। ছোটবেলায় উড়তে সক্ষম এয়ার ক্রাফ্টের নকশা করে সবাইকে তা আকাশে উড়িয়ে দেখিয়ে অবাক করেছিলেন। তখন এ দেশে এয়ার ক্রাফ্টের বই আসেনি। তখন বাবা বাইরে থেকে বিভিন্ন বই এনে দিতেন। সেগুলো পড়ে তিনি নানা রকম বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করতেন। তার মায়ের প্রেরণায় এবং নিজ আত্মবিশ্বাসেই উইন্ড এনার্জি মেশিনটি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বাবাও ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। চাকরির পাশাপাশি চিন্তা করতেন নিজের জ্ঞান ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে বিদেশী প্রযুক্তির ব্যবহার কমানো যায়। প্রথম সফলতা এলো বিশেষ ধরনের পাখা উদ্ভাবনে। যেটা অত্যন্ত হালকা, নিরাপদ এবং আয়তনেও ছোট। একটি দন্ডে একাধিক পাখা সংযোজন করা যায়। ফলে হাসপাতাল, বাসা, অডিটোরিয়াম, মসজিদ যে কোনো জায়গায় এটি সহজে ব্যবহার করা যাবে।

শাহরিয়ার হোসেন জানান, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই বিদ্যুৎ ঘাটতির সংকটে ভুগছে। বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যও প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এ সমস্যাকে মাথায় রেখেই আমি আমার গবেষণা কাজ শুরু করি। নিজের শত প্রচেষ্টা আর ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ও অ্যারোডাইনামিক বিষয়গুলোর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ছোট একটি মেশিন প্রস্তুত করতে সক্ষম হই। যেটিকে বারান্দার কয়েক ফুট বাইরে স্থাপন করি, যা আমাকে তিনটি বাতি ও একটি বৈদ্যুতিক পাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে। আর এটার উৎস প্রাকৃতিক বাতাস। এই মেশিনটির সুবিধা হচ্ছে দিনে রাতে যে কোনো সময় মাত্র ০.৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস হলেই বেøডটি ঘুরতে সক্ষম। ঘূর্ণনের ফলে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ছোট একটি ব্যাটারিতে জমা হয়। ঢাকা শহরের সংকীর্ণ ভবনগুলোর সীমিত জায়গা এবং ছোট আয়তন ছাদের বিষয়টা মাথায় রেখেই মেশিনটির নকশা করা হয়েছে। একটি ভবনের জন্য পরিমিত বিদ্যুৎ পেতে সোলার প্যানেল অনেক ব্যয়বহুল এবং তা স্থাপন করতে যথেষ্ট জায়গার প্রয়োজন। যেটা পুরোটাই সূর্যালোক প্রাপ্তির উপর নির্ভর করে। কিন্তু বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই মেশিনের জন্য প্রয়োজন মাত্র ৪ ফুট x ৪ ফুট জায়গা। তাছাড়া এটি স্থাপন করতে জটিল কোনো কাঠামো প্রয়োজন পড়বে না। দেশের মধ্যবিত্তরা সহজেই এটার ব্যয় নির্বাহ করতে পারবে।

বিশেষ ডিভাইস ও ব্যাটারি

তার নকশাকৃত বিশেষ বৈদ্যুতিক পাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, গতানুগতিক বৈদ্যুতিক পাখাগুলো যেখানে ৮৬-১০০+ ওয়াট শক্তি ক্ষয় করে, সেখানে এটি মাত্র ২০ ওয়াট শক্তি ক্ষয় করবে। যেহেতু আমাদের দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহার করে। সে ক্ষেত্রে এই পাখাগুলো ব্যবহারে বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

আমরা যদি দেশের পুরো দৃশ্যপট নিয়ে চিন্তা করে দেখি, দেশের প্রতিটি মানুষ চায় নিরবচ্ছিন্ন আলো ও বাতাস। এই মেশিনটি ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধান করা সম্ভব। তা ছাড়া কোনো বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার ঝামেলাও থাকবে না। মেইন্টেন্যান্স খরচও নামমাত্র।

আমাদের দেশে বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় বিভিন্ন ফুয়েল থেকে এবং তা সংরক্ষণে অনেক উপকরণ ব্যবহৃত হয়। এই বাধা অতিক্রম করতে আমি সফল হয়েছি। এই মেশিনটি ছাদের উপর অথবা বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক ভবন বা বসতবাড়ির বারান্দায় স্থাপন করা সম্ভব। এই প্রযুক্তির ফলে প্রচুর বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। ফলে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমবে। কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতিতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। জ্বালানির অভাবে সেচ চরমভাবে ব্যাহত হয়। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে প্রচুর বাতাস হয়। এটার মাধ্যমে সেচের সমস্যা সমাধান সম্ভব। নদী বা সমুদ্র জাহাজ, লঞ্চ, ফেরিতেও এটা স্থাপন করা যাবে।

যেকোন একটি পাখা ঘুরলেই উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ

এ কাজের শুরুতে প্রথমে তিনি একটি প্রটোটাইপ মডেল তৈরি করেন। দীর্ঘদিন এটা পর্যবেক্ষণ করে ত্রুটিমুক্ত করতে সক্ষম হন। তিনি চান যত দ্রুত সম্ভব এটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। এ কাজে তার সহায়তায় এগিয়ে এসেছে পরিচিত মহল, বাড়িয়ে দিয়েছে সহযোগিতার হাত। তিনি এ দেশের তরুণ মেধাবী বিজ্ঞান মনস্ক শিক্ষার্থীসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। সাধারণ মানুষের যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৌলিক প্রয়োজন এবং সমস্যা রয়েছে তা সমাধানের উপায় বের করতে কাজ শুরু করার পরামর্শ দেন। তিনি মনে করেন ট্রাফিক জ্যাম, বিদ্যুৎ, গৃহায়ন ইত্যাদিতে নানা রকম সমস্যা রয়েছে যেগুলো একটু চেষ্টা করলেই সমাধান করা যেতে পারে।

মাহফুজ ফারুক

mahfuzfaruk@gmail.com

প্রকাশকাল: বন্ধন ২২ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১২

Related Posts

মন্ট্রিলে বাড়ি বানাতে যত জটিলতা

মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে জীবনের বৈচিত্রতা। মানুষের জন্য আবাসন বাড়ছে, বাড়ছে আবাসনেরও জটিলতা। কোথায় বানাবেন বাড়ি? প্রতিবেশির বাড়ির সাথে…

হাটসন ভ্যালি শেক্সপিয়ারের স্থায়ী থিয়েটার মঞ্চ

যুক্তরাষ্ট্রের হাটসন ভ্যালি শেক্সপিয়ার একটি নামিদামি থিয়েটার কোম্পানী। দীর্ঘদিন তারা মুক্তমঞ্চে নাটক প্রদর্শনী করে আসছিলো। এটি স্যামুয়েল এইচ.…

সীমাবদ্ধতা যখন স্থাপত্যের শক্তি হয় তখনও মিলে পুরস্কার

স্থপতিদের গুণের শেষ নেই, মননশীলতারও শেষ নেই। তারা অসম্ভবকে সম্ভব এবং সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারে চিন্তা ও কর্মে।…

ByBySarwar Alam Apr 23, 2026

তাপসহনীয় নগর পরিকল্পায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বুয়েট

তাপসহনীয় নগর পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে বুয়েট ও তার একদল শিক্ষার্থী। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা তাপ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

শহরের শরীরে খোদাই করা এক গৃহকাব্য
AI
প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানে টানাটাপ ক্যানোপি গার্ডেন ক্যাফে
স্থাপত্য ও নৈতিকতা: পুনরুদ্ধারমূলক চিন্তার দার্শনিক ভিত্তি অনুসন্ধান
environment
ভুটানের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি
কংক্রিট ও কাচে পিটার জুমথরের নতুন গ্যালারি
stone house
রাস্তা থেকে রেস্তোরাঁ: কাপ-পিরিচে মন হাল্কা করার স্থাপত্যের গল্প