আমাদের আশপাশে অনেক জায়গার স্বল্পতা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এমন অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে কংক্রিটের মতো স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব নয়। আবার অনেক সময় যথেষ্ট জায়গা থাকলেও ব্যবহারের কারণে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। যেমন ধরুন, বাণিজ্য মেলার স্টল বা অন্য কোনো উন্মুক্ত স্থানে খেলাধুলা প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে, যেখানে স্বল্প বা মধ্য মেয়াদে বিভিন্ন ধরনের শেড বা ছাউনির প্রয়োজন হয়। আমরা এখনো এ ধরনের অবকাঠামো তৈরিতে শামিয়ানা, ত্রিপল বা পলিথিনের ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এগুলোর স্থায়িত্ব একেবারেই কম। আবার দেখতেও ভালো লাগে না খুব একটা। মধ্য কিংবা স্বল্পমেয়াদি অবকাঠামো নির্মাণের যতগুলো সমাধান রয়েছে, তার মধ্যে টেনসাইল মেমব্রেন স্ট্রাকচারই (Tensile Membrane Structure) সবচেয়ে কার্যকরী।
স্টিল ফ্রেমের সঙ্গে কলাম ও কেব্ল দিয়ে অনেকেই টান সহনশীল পাতলা পর্দা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এ ধরনের অবকাঠামো। এসব স্থাপনা একদিকে যেমন হালকা, তেমনি মজবুত ও আলোক পরিবাহী। অল্প সময়ে সহজেই নির্মাণ করা যায়। তাই এগুলোকে বিশেষত বাড়ির ছাদ, বাড়ির পাশে খোলা জায়গা, সিকিউরিটি পোস্টের ছাউনিতে ব্যবহার করা যেতে পারে অনায়াসে। এ ছাড়া পার্ক, এয়ারপোর্ট, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনে যাত্রী ছাউনি বা অন্য কোনো ছাউনির জন্য এটি হতে পারে কার্যকরী সমাধান।
টেনসাইল মেমব্রেনের ব্যবহার কিন্তু একেবারেই নতুন নয়। আগে থেকেই তাঁবুর কাজে এর ব্যবহার সুপ্রচলিত। প্রায় ১২০ বছর আগে ১৮৯৬ সালে রাশিয়ান প্রকৌশলী ভ্রাদিমির সুখভ আর্কিটেকচার ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চমৎকার সমন্বয়ে প্রথম এর কার্যকর ব্যবহার শুরু করেন। তিনিই প্রথম স্ট্রেস ও ডিফর্মেশন পরিমাপ করে ২৭০০ বর্গমিটারের অবকাঠামো নির্মাণ করেন। এরপর তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিবর্তিত উপায়ে পরে আরও অনেক অবকাঠামো নির্মিত হয়। এ প্রসঙ্গে ১৯৫৮ সালে সিডনি মারার মিউজিক বৌলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ছাড়া আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ার ফ্রেইয়ট্টো (Freiotto) পশ্চিম জার্মানির প্যাভিলিয়ন এবং ১৯৭২ সালের সামার অলিম্পিকের জন্য মিউনিখে অলিম্পিক স্টেডিয়ামের ছাদে এ ধরনের নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
টেনসাইল মেমব্রেন স্ট্রাকচার মূলত ফেব্রিকের ডাবল কার্ভেচারকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে এর ওপর প্রদত্ত চাপকে প্রতিহত করে। একটি Paraboloid বা Anticlastic Shape-এর ফেব্রিক মেমব্রেনের ভেতরের দিকের যেকোনো পয়েন্ট তার কর্নার পয়েন্টের সঙ্গে সংযুক্ত। উঁচু কর্নার দুটি যেমনভাবে ওপরের চাপকে অর্থাৎ বৃষ্টি, তুষার ইত্যাদিকে প্রতিহত করে তেমনি নিচের কর্নার পয়েন্ট দুটি নিচ থেকে দেওয়া চাপ প্রতিহত করে। অর্থাৎ বাতাসে উড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন আকৃতিতে টেনসাইল মেমব্রেন ব্যবহার করা যায়। যেমন, হাইপার, কনিক্যাল, ওয়েভ ফর্ম, আর্ক ফর্ম, নিউমেটিক বা কুশন টাইপ।
টেনসাইল মেমব্রেনের বেশ কিছু কার্যকরী সুবিধা ও উপযোগিতা রয়েছে। এটি অনেক নমনীয় হওয়ায় বিভিন্ন আকৃতিতে নান্দনিকভাবে এর ব্যবহার করা সম্ভব। যেকোনো আকৃতি দেওয়া সম্ভব বলে যেকোনো স্থানে প্রয়োজনমতো আকার দিয়ে এর ব্যবহার করা যায়। মেমব্রেন সাধারণত আলোক পরিবাহী হয়। সাদা রঙের মেমব্রেনে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ আলো চলাচল করতে পারে। ফলে দিনের বেলায় যেহেতু নিচের দিকে বেশ সুন্দর স্নিগ্ধ প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যায়, সেহেতু কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন হয় অনেক কম। এসব বিবেচনায় এটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ীও বটে। অন্যদিকে রাতের বেলায় ভেতরের আলো বাইরে বেরিয়ে এসে সুন্দর ও হালকা আলোর স্থানটিকে দূর থেকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে।
টেনসাইল মেমব্রেন সাধারণত Polytetrafluoroethylene (PTFE) ফাইবার গ্লাস, Ethylene Tetrafluoroethylene (ETFE), Polyvinyl Chloride (PVC), Expanded PTFE (EPTFE) ধরনের মিশ্র উপাদানে তৈরি। এসব উপাদান একদিকে যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনি যেকোনো পরিবেশে সহনশীল। মরুভূমির প্রখর তাপে এদের গুণগতমানে বিশেষ ধরনের পরিবর্তন হয় না, তেমনি মেরু অঞ্চলের কঠিন ঠান্ডায় এদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। এসব উপাদান যেকোনো ধরনের আবহাওয়ায় দারুণ টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী।
বেশির ভাগ টেনসাইল মেমব্রেনের বিশেষ কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। কিছু কিছু মেমব্রেন পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললেই চলে। আবার PTFE বা টেফলন-জাতীয় মেমব্রেনের ফ্রিকশন রেট এত কম যে এতে ধুলোবালু আটকাতে পারে না। যেটুকু ধুলো জমা হয় তা সাধারণত বাতাসেই ঝরে পড়ে। এসব বস্তু যেহেতু কম তাপ শোষণ করে ও অধিক আলোর প্রতিফলন ঘটায়, সেহেতু এর নিচে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচ হয়। এদিক থেকে অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে এটি অনেক বিদ্যুৎসাশ্রয়ী। মেমব্রেনের ধরন অনুযায়ী এগুলো ১০ বছর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
বাংলাদেশে এ ধরনের অবকাঠামো তৈরির প্রচলন হয় এ দশকের শুরুর দিকে। যতটুকু জানা যায়, বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বাংলাদেশে প্রথম ব্যাপকভাবে টেনসাইল স্ট্রাকচারের কাজ শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রধান গেটের ছাউনি (সম্প্রতি ছাউনিটি অপসারিত হয়েছে) নির্মাণ ছিল তাঁর প্রথম কাজ। পরে তাঁর উত্তরসূরি স্থপতি গোলাম মুরশালিন চৌধুরী জার্মানির ওগঝ থেকে টেনসাইল মেমব্রেন স্ট্রাকচার ডিজাইন ও নির্মাণের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে ২০১৪ সালে ‘র্যাডিসন ব্লু, চিটাগাং’-এর অ্যান্ট্রি ক্যানোপি নির্মাণে কাজ করেন। আট কোণবিশিষ্ট এই অবাকাঠামোটি ২৬০ কিলোমিটার গতির বাতাস মোকাবিলায় সক্ষম।
‘র্যাডিসন ব্লু’-এর অ্যান্ট্রি ক্যানোপি এর প্রধান স্থপতি মোস্তফা খালিদ পলাশ ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম। আর্কিনিয়ার (আর্কিটেক্ট + ইঞ্জিনিয়ার) মুরশালিন প্রকল্প স্থপতি হিসেবে প্যারাডাইম-এর সঙ্গে যুক্ত হন। প্রকল্পটির ইস্পাতের সাব-কন্ট্রাকটর ছিল ALM Steel Building Technology. কাজটি সার্থকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ALM Steel Building Technology-এর সিস্টার কনসার্ন হিসেবে আর্কিনিয়ার মুরশালিনের নেতৃত্বে ও ইঞ্জি. এইচ এম জাহিদুল ইসলামের সহযোগিতায় ২০১৫ সালে ALM Tensile Membrane Structure Ltd. বাংলাদেশের প্রথম টেনসাইল মেমব্রেন অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
তাদের কার্যক্রম শুরু করার পর গত এক বছরের মধ্যে ডজন খানেক টেনসাইল মেমব্রেন অবকাঠামোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১২১ বর্গমিটারের ২১০ কিলোমিটার গতির বায়ুপ্রবাহে টিকে থাকার সক্ষমতা সম্পন্ন চার কোণবিশিষ্ট হোটেল ম্যাপল লিফের রুফটপ স্ট্রাকচার, মাইসা প্রপার্টিজের ৬৬২ বর্গমিটারের স্ট্রাকচার, চিটাগাং ক্লাবের ক্রিকেট মাঠের ১৩২ বর্গমিটারের স্ট্রাকচার, সেনা মালঞ্চের স্ট্রাকচার ও নারায়ণগঞ্জ শিশু পার্কের ফানেল টাইপ স্ট্রাকচার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নারায়ণগঞ্জ শিশু পার্কের অবকাঠামোটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, একটি মাত্র কলামের ওপর ৪০ মি. ব্যাস বিশিষ্ট আকৃতির অবকাঠামো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে করে এর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। এটা আমাদের নাগরিক জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এ ধরনের অবকাঠামো রয়েছে চারটি।
ALM কোম্পানি তাদের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করে সাদা রঙের PVDF ফেব্রিক। এর কারণ জানিয়ে স্থপতি আকর্ষণীয় মুরশালিন বলেন, ‘PVDF বোর্ডের ফেব্রিক PTFE-এর তুলনায় দামে সস্তা। এতে কোনো কারণে আগুন ধরলে তা ছড়িয়ে না পড়ে গলে গিয়ে এক জায়গায় জমা হয়। তা ছাড়া এর ফ্রিকশন PTFE-এর চেয়ে বেশি হলেও PVC-এর চেয়ে অনেক কম। ওজনে হালকা, মাত্র ৯৫০ থেকে ১০০০ গ্রাম প্রতি বর্গমিটার ফেব্রিকের ওজন। সহজেই সাবান বা শ্যাম্পুর পানি দিয়ে পরিষ্কার করা যায়।
অন্য দিকে PTFE-এর ফ্রিকশন অনেক কম হলেও তুলনামূলকভাবে এর দাম বেশি। তা ছাড়া এটি যেহেতু আগুনে পোড়ে না, সেহেতু অগ্নিকান্ডের সময়ে এ ধরনের স্ট্রাকচারে স্মোক ট্র্যাপ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই বেশি ব্যবহার করা হয় PVDF কোটেড ফেব্রিক।
বাংলাদেশে এ ধরনের অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ অনেক। যেখানে ১০-১৫ বছর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন হয়, সেখানে টেনসাইল মেমব্রেন হতে পারে একটি ভালো সমাধান। যেমন, খোলা জায়গায় শেড, ওয়্যার হাউস, বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীর জন্য স্টল বা প্যাভিলিয়ন, বাড়ির ছাদে, কল-কারখানার ছাদ, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, যাত্রী ছাউনি বা টোল প্লাজাসহ ইনডোর ও আউটডোরে শৈল্পিক ও নান্দনিকভাবে টেনসাইল মেমব্রেন স্ট্র্যাকচার ব্যবহার করা যেতে পারে এখনই।
আবু সুফিয়ান
sufiun@gmail.com
প্রকাশকাল: বন্ধন ৭৩ তম সংখ্যা, মে ২০১৬