• Home
  • স্পটলাইট
  • ইলন মাস্কের ‘টেরাফ্যাব’ রূপকথা নাকি কংক্রিটের দানব?
Image

ইলন মাস্কের ‘টেরাফ্যাব’ রূপকথা নাকি কংক্রিটের দানব?

যে মানুষটি মঙ্গলে মানববসতি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন, তার চিন্তাভাবনা যে শহরের সাধারণ চার দেয়ালের কারখানায় আটকে থাকবে না-সেটাই তো স্বাভাবিক! একের পর এক ‘গিগাফ্যাক্টরি’ বানিয়ে যারা ভেবেছিলেন ইলন মাস্ক হয়তো স্থাপত্য ও উৎপাদনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন, তাদের আবারও চমকে দিয়েছে তার নতুন মাস্টারপ্ল্যান ‘টেরাফ্যাব’ (Terafab)।

স্পেস-এক্স (SpaceX) এবং টেসলা (Tesla)-মাস্কের সাম্রাজ্যের এই দুই মূল স্তম্ভকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার এই পরিকল্পনা স্থাপত্যের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়। শুধু আয়তনের দিক থেকেই নয়, এটি হতে যাচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম ভবনগুলোর একটি। কিন্তু এই বিশাল কাঁচ আর স্টিলের কাঠামোর আড়ালে আসলে কোন ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে?

গিগাফ্যাক্টরি থেকে ‘টেরাফ্যাব’: আয়তনের এক পরাবাস্তব রূপকথা

‘টেরাফ্যাব’ নামটি এসেছে ‘টেরা’ (যার অর্থ ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি) এবং ‘ফ্যাব্রিকেশন’ (উৎপাদন) শব্দ দুটি থেকে। এর আগে টেসলার ‘গিগাফ্যাক্টরি’গুলো যখন তৈরি হয়েছিল, তখনই সেগুলোর আয়তন দেখে চমকে উঠেছিল বিশ্ব। কিন্তু ‘টেরাফ্যাব’ সেই স্কেলকেও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কোটি কোটি বর্গফুটের এই দানবীয় অবকাঠামোটির ভেতর অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে কয়েকটি ছোটখাটো শহর বা ডজনখানেক ফুটবল স্টেডিয়াম। তবে এর আসল বিশেষত্ব কেবল আয়তনে নয়, বরং এর ভেতরের ইঞ্জিনিয়ারিং সমন্বয়ে।

একই ছাদের নিচে স্পেস-এক্স ও টেসলা: মাস্টারপ্ল্যানের মূল রসায়ন

  • এতদিন গাড়ি বানানোর কারখানা আর রকেট বানানোর শেড ছিল দুটি ভিন্ন জগতের গল্প। কিন্তু মাস্কের ‘টেরাফ্যাব’ ধারণাটি এই দুই মেরুকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
  • অপটিমাস ও রকেটের মেলবন্ধন: টেসলার হিউম্যানয়েড রোবট ‘অপটিমাস’ (Optimus) শুধু গাড়ি অ্যাসেম্বলি করবে না, স্পেস-এক্সের অতি-ভারী রকেট ‘স্টারশিপ’-এর সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি তৈরিতেও কাজ করবে।
  • ধাতু ও ব্যাটারির যুগলবন্দী: স্টারশিপে ব্যবহৃত অত্যন্ত শক্তিশালী স্টেইনলেস স্টিল ও অ্যালয় মেটালার্জি এবং টেসলার আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তি একই ছাদের নিচে তৈরি ও প্রয়োগ করা হবে।
  • মঙ্গলের মহড়া: ইলন মাস্কের মূল লক্ষ্য কেবল পৃথিবীতে ব্যবসা বাড়ানো নয়। মঙ্গলের বুকে কীভাবে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং বিশাল কারখানা তৈরি করা যায়, পৃথিবীতে ‘টেরাফ্যাব’ বানিয়ে তিনি মূলত তারই এক ট্রায়াল রান দিচ্ছেন।

সৌরশক্তি ও পরাবাস্তব স্থাপত্য

স্থাপত্যের দিক থেকে ‘টেরাফ্যাব’-কে বলা যায় একুশ শতকের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিস্ময়’। ভবনটির পুরো ছাদ জুড়ে সাজানো থাকবে বিশাল আয়তনের সোলার প্যানেল। নিজস্ব গিগাওয়াট-স্কেলের সোলার এনার্জি এবং টেসলা মেগাপ্যাক ব্যাটারির মাধ্যমে এই ভবনটি বাইরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করেই ২৪ ঘণ্টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, নির্জন কোনো মরুভূমি বা খোলা প্রান্তরে আকাশ ছুয়ে নেমে এসেছে এক বিশালাকার ভিনগ্রহী মহাকাশযান।

স্থাপত্যের দিক থেকে ‘টেরাফ্যাব’-কে বলা যায় একুশ শতকের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিস্ময়’ ছবি: ডিজেইন

যান্ত্রিক জয়জয়কার নাকি মানুষের নির্বাসন? 

ইলন মাস্কের এই স্বপ্নের প্রজেক্ট যেমন বিশ্বকে আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি আধুনিক নগর পরিকল্পনাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরছে:

১. রক্ত-মাংসের মানুষের স্থান কোথায়?

টেরাফ্যাবের প্রধান চালিকাশক্তি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং হাজার হাজার অপটিমাস রোবট। তবে কি এই মেগা-বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে এমন এক পৃথিবীর জন্য, যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের ভূমিকা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে?

২. কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও টেকসই অবকাঠামো:

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভবন তৈরি করতে যে বিশাল পরিমাণ কংক্রিট, স্টিল এবং বিরল মৃত্তিকা ধাতু (rare earth metals) প্রয়োজন, পরিবেশগতভাবে তা কতটা টেকসই? যদিও কারখানাটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে চলবে, কিন্তু এর বিশাল নির্মাণের প্রাথমিক পরিবেশগত মূল্য অনেক বেশি।

টেরাফ্যাবের প্রথম ধাপের নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৬.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কারখানাটির শিল্প উৎপাদন সংক্রান্ত কাজের জন্য ‘গিবন্স ক্রিক রিজার্ভার’ বা জলাধার থেকে পানি ব্যবহার করা হবে।

প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলে এই কারখানায় প্রায় ৩,০০০ কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশা করছে স্পেস-এক্স ও টেসলা। এই কর্মীদের বড় একটি অংশই নিয়োগ দেওয়া হবে স্থানীয় এলাকা থেকে।

স্পেস-এক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “আমরা মনে করি মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং উন্নত প্রযুক্তি উৎপাদনে নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখা ও এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করবে দেশের ভেতরেই এসব জটিল ও জরুরি প্রযুক্তি তৈরি করার ক্ষমতার ওপর।”

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, “পৃথিবীর বুকে সর্ববৃহৎ চিপ তৈরির কারখানা গড়ে তোলা ও তা পরিচালনার মাধ্যমে আমরা এমন এক পথের সূচনা করছি, যা ধরে হেঁটে ভবিষ্যতের মানুষ একদিন পুরো সৌরজগৎ- এমনকি পুরো ছায়াপথজুড়ে সবচেয়ে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামবে।”

উল্লেখ্য, গত বছর ইলন মাস্কের অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘দ্য বোরিং কোম্পানি’ দুবাইয়ের মাটির নিচে ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ বা টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিল। দুবাই শহরের বিভিন্ন প্রান্তকে সংযুক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি এই টানেলে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১০০ মাইল গতিতে যানবাহন চলাচল করতে পারবে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মিসরের পিরামিড থেকে শুরু করে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার-মানুষ সবসময় তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষমতাকে জাহির করতে বিশাল বিশাল অবকাঠামো তৈরি করেছে।

ইলন মাস্কের ‘টেরাফ্যাব’ হয়তো একুশ শতকের আধুনিক পিরামিড। এটি কেবল গাড়ি বা রকেট তৈরির কারখানা নয়; এটি প্রমাণ করে যে মানুষের কল্পনা এখন আর কেবল এক গ্রহের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ইলন মাস্কের ‘টেরাফ্যাব’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভবিষ্যৎ কেবল ধীরে ধীরে আসে না, কখনো কখনো তা এক লাফে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে।

সূত্রঃ ডিজেইন

Related Posts

নতুন করে রূপান্তরের পথে যুক্তরাষ্ট্রের বেলভেডের

যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি অঙ্গরাজ্যের লুইসভিল শহরের অন্যতম পরিচিত জনপরিসর বেলভেডের। আধুনিক স্থাপত্যের কল্যাণে শহরটি নতুন করে রূপান্তরের পথে। দীর্ঘদিন…

হাতির বর্জ্য দিয়ে গড়া থাইল্যান্ডের ‘গোয়া টাওয়ার’

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে, ফাং-এনগা প্রদেশের মাতালাই প্রকল্পের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বাভাবিক স্থাপনা যার নাম, গোয়া টাওয়ার। ইট, কংক্রিট…

শেনজেনে স্তুপাকার স্থাপত্যে গড়া এমভিআরডিভি-র রঙিন গ্রাম

চীনের শেনজেন শহরে একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সের জন্য নতুন ডিজাইন প্রকাশ করেছে ডাচ স্থাপত্য সংস্থা এমভিআরডিভি (MVRDV)। “বিহাইলু আর্ট…

লস অ্যাঞ্জেলেসের রাফি লেয়ারার রঙিন অফিস

লস অ্যাঞ্জেলেসের হাইপেরিয়ন অ্যাভিনিউতে অবস্থিত পাবলিক আর্ট কোম্পানির নিজস্ব স্টুডিওটি একটি রঙিন, বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।…

সুইডেনের দূষিত জমিতে গোলাপি স্ফটিকের “লিথিয়াম ক্রিস্টাল সনা”

সুইডেনের উত্তরের শহর স্কেলেফটিওতে একটি নতুন স্থাপনা তৈরি হয়েছে। স্টকহোমের শিল্পী জুটি বিগার্ট ও বার্গস্ট্রম এই কাঠামোর নাম…

ফেলথাম কেবিন যেনো আধুনিক স্থাপত্যের নতুন এক ভাষা

স্থাপত্য আর স্থাপনার কথা বলতেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে বিশাল আকৃতি, দামী উপকরণ এবং ল্যান্ডস্কেপের সাইজ। এটি সমূহ…

স্নোহেটা-র নতুন মাস্টারপিস: অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম পারফর্মিং আর্টস সেন্টার

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরের কুইন্সল্যান্ড পারফর্মিং আর্টস সেন্টার (QPAC)-এ যুক্ত হয়েছে এক নতুন থিয়েটার, গ্লাসহাউজ থিয়েটার। এই ডিজাইনের দায়িত্ব…

শেনজেনের সবুজ ছাদের নিচে লুকানো এক পাথুরে জাদুঘর

চীনের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ম্যাড (MAD) সম্প্রতি উন্মোচন করেছে “শেনজেন বে কালচার স্কয়ার” নামের একটি নতুন জাদুঘর। এটি শেনজেন…

সুনীল শেঠির ছাদ ভেদ করে উঠেছে প্রাচীন গাছ

ভেবে দেখুন তো, আপনি নিজের ড্রয়িংরুমে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। মাথার ওপরের দিকে তাকাতেই…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Belvedere
আবার কি ফিরবে ‘সোনালী আঁশের’ সোনালী দিন?
হাতির বর্জ্য দিয়ে গড়া থাইল্যান্ডের ‘গোয়া টাওয়ার’
শেনজেনে স্তুপাকার স্থাপত্যে গড়া এমভিআরডিভি-র রঙিন গ্রাম
লস অ্যাঞ্জেলেসের রাফি লেয়ারার রঙিন অফিস
সুইডেনের দূষিত জমিতে গোলাপি স্ফটিকের “লিথিয়াম ক্রিস্টাল সনা”
Feltham Cabin
স্নোহেটা-র নতুন মাস্টারপিস: অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম পারফর্মিং আর্টস সেন্টার
শেনজেনের সবুজ ছাদের নিচে লুকানো এক পাথুরে জাদুঘর