পুরস্কার এমনই এক শক্তিশালী মাধ্যম যে মাধ্যমে কৃতিত্ব ও কীর্তিমানদের পুনরুজ্জীবিত করা যায়। জাগানো যায় উন্মাদনা। স্থাপত্যে পুরস্কারের বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম নয়। AIA Gold Medal স্থাপত্যের এক অনন্য পুরস্কার। আমেরিকান স্থাপত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট প্রতি বছর আমেরিকান স্থপতিদের স্থাপত্যে অসাধারণ কীর্তির জন্য এ পুরস্কার প্রদান করেন।
২০২৬ সালের আমেরিকা ও আমেরিকার বাইরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দূরে ঠেলে জাপানি স্থপতিকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। আমেরিকা ও আমেরিকার বাইরের অনেক স্থাপনা ছিলো যেগুলোর স্থপতিদের কেউ একজন AIA Gold Medal পেতে পারতেন। এমন অনেক স্থাপনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থাপনা উল্লেখ করা হলো।

সাগ্রাদা ফামিলিয়ার ভাস্কর্য
নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিলো ১৪৪ আগে। আপাতত এক অর্থে কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া হলেও ২০৩০ সাল নাগাদ চলবে এর অলঙ্করণের কাজ। সাগ্রাদা ফামিলিয়ার ভাস্কর্য, অলংকারমূলক নকশা এবং প্রস্তাবিত প্রধান সিঁড়ির কাজ সমাপ্তির মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়েছে ২০৩০ সালকে।
চলতি বছরই ৫৬৪ ফুট উচ্চতার রোমান ক্যাথলিক পোপের (ব্যাসিলিকা) ১৮তম এবং শেষ চূড়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। এর আগের ১৭টি অপেক্ষাকৃত ছোট চূড়া উৎসর্গ করা হয়েছে খ্রিষ্টধর্মের যিশু প্রেরিত তার ১২ জন অনুসারী, চার জন খ্রিষ্টধর্ম প্রচারক এবং ভার্জিন মেরির প্রতি। জুন মাসে স্থপতি অ্যান্থনি গাউদি (Antoni Gaudí)’র মৃত্যুর শতবার্ষিকী উপলক্ষে একই সময় চূড়া সম্পন্নেরও আনুষ্ঠানিকতা উদযান করার কথা রয়েছে।
অ্যান্থনি গাউদি ছিলেন এ স্থাপত্যের নকশাকারক। তার জীবদ্দশায় কেবল প্রথম টাওয়ারটির সমাপ্তি দেখেছিলেন। তাঁর নকশার অসাধারণ জটিলতা এবং অলংকারসমৃদ্ধ সূক্ষ্মতা অত্যন্ত জটিল ও নান্দনিক। যেখানে গথিক, নুভো আর্ট এবং প্রকৃতি-প্রাণিত নকশার এক স্বপ্নময় সংমিশ্রণ দেখা যায়। এ বিস্ময়কর নকশা-ই দীর্ঘ নির্মাণসময়ের অন্যতম কারণ। তবে অর্থের ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কোভিড-১৯ মহামারিও এই বিলম্বের কারণ।
সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ১৯৩৬ সালে গাউদির অঙ্কন ও প্লাস্টারের মডেল ধ্বংস হয়ে যাওয়া। যখন স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় তাঁর কর্মশালায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী প্রজন্মের স্থপতিরা তাঁর পরিকল্পনার যে সর্বোত্তম অনুমানভিত্তিক রূপ তৈরি করেছেন, তা গাউদি নিজে অনুমোদন করতেন কি না, তা আর কখনও জানা যাবে না। যদিও এত দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে তিনি হয়তো আপত্তি করতেন না। গাউদি একবার বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন, “আমার ক্লায়েন্টের কোনো তাড়া নেই।” তিনি অবশ্যই ঈশ্বরের কথাই বলছিলেন।

উইন্টার অলিম্পিক ভিলেজ
ফেব্রুয়ারির কয়েক সপ্তাহের জন্য, মিলানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ১১.৫ একরজুড়ে এই স্থানটি হবে ২০২৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী হাজারো ক্রীড়াবিদের আবাসস্থল।
সাম্প্রতিক গ্রীষ্ম ও শীতকালীন অলিম্পিকের ইতিহাসে দেখা গেছে অপচয়মূলক অস্থায়ী আবাসন কিংবা এমন দীর্ঘমেয়াদি বাসস্থান, যা পরে বিক্রি করা কঠিন ছিল। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব অথবা নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়সাধ্যের বাইরে ছিলো বলে আগের বাসস্থানগুলো সহজেই বিক্রি করা যায়নি।
ইতালির সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভাড়ার বাজার মিলান। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর (Skidmore), ওয়িংস (Owings) এবং মেরিল (Merrill (SOM)) এমন একটি অলিম্পিক ভিলেজ নকশা করেছে, যা সমাপনী অনুষ্ঠানের কয়েক মাসের মধ্যেই ১,৭০০ শয্যার সাশ্রয়ী ছাত্রাবাসে রূপান্তর করা যাবে।
স্থাপনাটি বিক্রির সহায়ক বিষয় হলো, ক্রীড়াবিদদের জন্য তৈরি অনেক ব্যবস্থা, যেমন সামাজিকতা, বিনোদন ও ফিটনেসের স্থান যা শিক্ষার্থীদেরও প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে, এই দুই ব্যবহারের মধ্যে এতটাই মিল রয়েছে যে ইতালীয় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কইমা (Coima) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এটি ২০২৬ সালের শরৎকালীন সেমিস্টারের আগেই প্রস্তুত হবে।
এই প্রকল্পটি নগর পুনর্জাগরণেরও একটি সুযোগ তৈরি করেছে। ছয়টি নতুন ভবনের নকশার পাশাপাশি, স্থপতিরা সাইটে থাকা দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনাও পুনরুদ্ধার করেছেন। স্থানটি আগে একটি রেলইয়ার্ড ছিল বলে জানা যায়। আর “ভিলেজ” শব্দটি জনপদে ঘেরা ও বিচ্ছিন্ন একটি সম্প্রদায়ের ধারণা দেয়। অথচ SOM এটিকে দেখছে এমন এক নগরীর ব্লক হিসেবে যা আশপাশের Porta Romana এলাকার সঙ্গে জনসাধারণের পথ ও সবুজ খোলা জায়গার মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতের অলিম্পিক আয়োজনকারী ও পরিকল্পনাকারীরা বিষয়টি গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করবেন।

লুকাস মিউজিয়াম
যদি কোনো ভবনকে মহাকাশযানের মতো দেখানো যায় তবে সেটি নিশ্চয়ই জর্জ লুকাস (George Lucas) এর নতুন জাদুঘর হওয়া উচিত।“Star Wars”-এর নির্মাতার ১ বিলিয়ন ডলারের এই ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং-নির্ভর জাদুঘর সেপ্টেম্বরে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। “ন্যারেটিভ আর্ট”-কে উৎসর্গ করা একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা তিনি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন এক দশকেরও বেশি আগে।
গত সাত বছর ধরে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দারা চীনা স্থপতি ম্যা ইয়ানসঙ (Ma Yansong)-এর ভবিষ্যতমুখী নকশাটিকে ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে দেখেছেন। দক্ষিণ লস অ্যাঞ্জেলেসের এক্সপোজিশন পার্কের ১১ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ভবনটির বাঁকানো ও দীর্ঘায়িত আকৃতি যেন মাটির ওপরে ভেসে আছে।
তার নকশা যদিও ভিনগ্রহের কিছু মনে হয়, তাঁর দর্শনের ভিত্তি প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত। তার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো সোজা রেখা ও সমকোণ থেকে দূরে থাকা। তাঁর মতে, বাক্সের মতো আকৃতির ভবন শহরগুলোকে “কৃত্রিম” অনুভব করায়। তার ধারণাটি চীনা “শানশুই সিটি” ’র ল্যান্ডস্কেপ চিত্রকলা থেকে অনুপ্রাণিত।
তবে ১ লক্ষ বর্গফুটেরও বেশি প্রদর্শনী স্থান নিয়ে, এটি নিঃসন্দেহে মার্কিন মাটিতে কোনো চীনা বংশোদ্ভূত স্থপতির নির্মিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবন। এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম প্রয়াত M. Pei, যিনি গুয়াংজুতে জন্মগ্রহণ করলেও কর্মজীবনের শুরুতেই মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

টাওয়ার এফ
আফ্রিকা শিগগিরই তার নতুন সর্বোচ্চ ভবনকে উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে সারা বিশ্বে। আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টের আবিদজানে নির্মিত ১,৩৮১ ফুট উচ্চতার “ট্যুর এফ” বা “টাওয়ার এফ”হলো সেই কাঙ্খিত স্থাপত্য। লেবানিজ-আইভরিয়ান স্থপতি পিয়েরে ফাকোরির (Pierre Fakhoury) নকশায় তৈরি ৬৪ তলা এই আকাশচুম্বী ভবনটি বর্তমান রেকর্ডধারী আইকনি টাওয়ারকে প্রায় ১০০ ফুটের ব্যবধানে ছাড়িয়ে যাবে।
আবিদজানের প্রশাসনিক জেলার এই ষষ্ঠ টাওয়ারটি শহরের নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিবেচনায় রয়েছে। তবে এই কয়েক দশকে আইভরি কোস্ট উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে, যার মধ্যে ২০০২ ও ২০১০ সালের গৃহযুদ্ধও রয়েছে। তাই ভবনটির কাঁচের তৈরি কৌণিক নকশা যদিও শৈল্পিক আফ্রিকান মুখোশের প্রতীক হিসেবে তৈরি, তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব আরও গভীর।
যে শহরের জনঘনত্ব নিউ ইয়র্কের প্রায় এক-চতুর্থাংশ, সেখানে “সুপারটল” আকাশচুম্বী ভবনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, সেটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। কিন্তু আকাশচুম্বী ভবন শুধু ফ্লোর স্পেসের বিষয় নয়। এই ভবনটি বিনিয়োগকারী ও বাইরের বিশ্বের কাছে স্থিতিশীলতার বার্তাও পৌঁছে দেয়। এই টাওয়ারটি শিগগিরই সাড়া ফেলবে সারা দুনিয়ায়।

সাংহাই অপেরা হাউস
একটি দৃষ্টিনন্দন অপেরা হাউসের মতো স্থাপনা শহরকে স্থাপত্যগতভাবে পরিশীলিত হিসেবে পরিচিত করে তুলতে পারে। সিডনীর অপেরা হাউসটি এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। গত দুই দশকে চীনরে গুয়াংজু, হংজু এবং হারবিন শহরগুলো তাদের অপেরা ভেন্যুর নকশার জন্য বিশ্বখ্যাত স্থপতিদের নিয়োগ দিয়েছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হচ্ছে সাংহাই।
এই দায়িত্ব পড়েছে নরওয়েজিয়ান স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্নোহেতা-এর ওপর। তারা ২০০৮ সালে নিজ দেশের রাজধানী অসলোতে প্রশংসিত একটি অপেরা হাউস নির্মাণের পর থেকে এ ধরনের প্রকল্পে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান, সৌদি আরবের দিরিয়াহ এবং জার্মানির ডুসেলড্রফেও ভবিষ্যৎ ভেন্যু নির্মাণাধীন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সাংহাই গ্র্যান্ড অপেরা হাউসের নকশায় অসলোর সেই অপেরা হাউসের সঙ্গে বেশ কিছু মিল রয়েছে।
অপেরা হাউসটির নদীতীরবর্তী অবস্থান, সাদা পরিষ্কার পৃষ্ঠের আধিক্য এবং এমন একটি নিচু বিস্তৃত অবয়ব, যা মাটি থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে বলে মনে হয়।
তবে এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করা এক সর্পিল সিঁড়ি। এটি দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় বিশাল একটি ছাদচত্বরে, যা অসলোর মতোই সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
অ্যামোনাইট জীবাশ্মের মতো দেখতে এই সিঁড়িটি নান্দনিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি রেডিয়াল নকশার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যেনো তা পাখার মতো চারদিকে বিস্তৃত হয়েছে।

ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক
জাহা হাদিদের জন্য ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সদরদপ্তর যেন এক বেদনাময় প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। এটি প্রয়াত ব্রিটিশ-ইরাকি স্থপতির বাগদাদে বাস্তবায়িত একমাত্র ভবন। সেই শহরেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা, যদিও ১৯৬০ এর দশকে ইউরোপের বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনার জন্য তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।
হাদিদ ২০১১ সালে প্রথম উন্মোচিত এই নকশার তত্ত্বাবধান করলেও, পাঁচ বছর পর তাঁর অকালমৃত্যুর কারণে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হওয়া তো দূরের কথা, উদ্বোধনও তিনি দেখে যেতে পারেননি।
এই টাওয়ারটি ইরাকের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রতীক। একসময় একনায়ক সাদ্দাম হোসেনের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকটির সাম্প্রতিক অস্থির ইতিহাস দেশটির নিজের ইতিহাসেরই প্রতিফলন।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে বোমা হামলা শুরু করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, হুসেইন ও তাঁর পরিবার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার চুরি করে নিয়ে যায়। ঘটনাটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ডাকাতিগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এরপর পুনর্গঠন পরবর্তী ইরাকে ব্যাংকটির ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রেও ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
শ্যাম্পেন গ্লাসের মতো সরু ভিত্তি থেকে প্রস্ফুটিত এক বহির্মুখী কাঠামো বা এক্সোস্কেলেটনসহ ৫৫৮ ফুট উঁচু এই টাওয়ারটি বাগাদাদের তুলনামূলক নিচু স্কাইলাইনে একটি দৃষ্টিনন্দন সংযোজন।
উল্লেখিত স্থাপনাগুলো দেশে দেশে আলোচিত। এছাড়া নিজ নিজ দেশের জন্য স্থাপনাগুলো আইকনিক। মার্কিন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের সোনার মেডেলটি এগুলোর কোন একটি স্থাপত্যের জন্য হলেও হতে পারতো। এক দশকের রেওয়াজ ভেঙ্গে জাপানি স্থপতিকে পুরস্কার দেয়ায় অনেক সমালোচনার মুখেও পরতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। তবে এর ব্যাখ্যা খুব শিগগিরই পাওয়া যেতে পারে বলে আশাবাদী সকলেই।
সূত্র: সিএনএন


















