স্থপতি, সাইদা আক্তার মুমু, বর্তমানে তিনি “মাত্রিক” নামক একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান স্থপতি। তার নেতৃত্বে শিল্প কারখানা, রিসোর্ট, আবাসিক প্রকল্পসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকর্ম বাস্তবায়িত হয়েছে। সৃজনশীলতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে “JK AYA Young Architect Award”-এ সম্মানিত হয়েছেন। এ ছাড়াও, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিস্তম্ভের নকশার জন্য কানাডার উইন্ডসর থেকে অর্জন করেছেন বিশেষ প্রশংসাপত্র, যা তাঁর কর্মজীবনের এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
বিশ্ব শ্রমিক দিবসে বন্ধন-এর বিশেষ আয়োজনে মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশের অন্যতম সৃজনশীল স্থপতি, সাইদা আক্তার মুমু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্থপতি সুপ্রভা জুঁই।
মে দিবস আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে, এবং রানা প্লাজা ধ্বসের মতো ঘটনার পর আমরা কি সত্যিই বদলাতে পেরেছি বলে আপনি মনে করেন?
স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু: কৃষির পাশাপাশি বাংলাদেশ একটি শ্রমিক নির্ভর দেশ। পোশাক শ্রমিক কিংবা প্রবাসী শ্রমিক, আমাদের দেশের একটা বড় চালিকাশক্তি তারা। একজন স্থপতি হিসেবে আমার বেশিরভাগ কাজ হয়েছে পরিবেশ ও মানববান্ধব পোশাকশিল্পের কারখানা ডিজাইন করা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আমার মূল ক্লায়েন্ট আসলে শ্রমিক। এজন্য মে দিবস আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা দখল করে আছে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্থাপত্যে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এর আগে বড়সড় একধরনের অবহেলা ছিল। একজন স্থপতি, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা আসলে নিয়ম মেনেই নির্মাণ করবেন এটা জানা কথা। কিন্তু এই অবহেলার একটা ভয়াবহ খেসারত ছিল রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। তবে এরপরে নিরাপত্তার গুরুত্ব নিয়ে এতটাই ভাবা হয়েছে যে বাংলদেশের প্রায় আড়াই হাজার পোশাক শিল্পের কারখানাকে রেট্রোফিটিং (retrofitting) করিয়ে কাঠামোগতভাবে এর সহ্যক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
ক্রেতাদের একটা বড় অংশ এই ঘটনার পরপর শতভাগ কমপ্লায়েন্স বিল্ডিং বানানোর প্রতি সতর্ক থেকেছে। তবে নজরদারির বিকল্প নেই।
“গ্রিন ফ্যাক্টরি” ধারণাটি কী, এটি কীভাবে শ্রমিকদের আরাম, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে?
স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু: গ্রিন ফ্যাক্টরি, বহুল আলোচিত একটি শব্দ। ২৫০-এর উপরে লিড সার্টিফাইড গ্রিন বিল্ডিং আছে বাংলাদেশে। যার বেশিরভাগই পোশাকশিল্প। টেকসই নিয়ম মেনে পরিবেশবান্ধব কারখানার শর্তগুলো পূরণ করছে যেসব কারখানা তারা এই গ্রিন বিল্ডিং এর সার্টিফিকেট অর্জন করেছে।
এই প্রক্রিয়াটা বিল্ডিং ইউজারদের কীভাবে উপকৃত করছে সে প্রসঙ্গে একটু বলি। সারাদিন এখানে শ্রমিকরা কাজ করছেন। গ্রিন বিল্ডিং এর অনেকগুলো মাত্রা আছে যার মাঝে অন্যতম হলো যথাযথভাবে ভবনের অভ্যন্তরীণ কর্ম পরিবেশ গড়ে তোলা। সেক্ষেত্রে একটা কৌশল হলো প্যাসিভ আর্কিটেকচারাল সল্যুশন। যেমন পশ্চিমে কতটা রোদ নেওয়া হচ্ছে, মুক্ত বাতাস পাচ্ছে কিনা, বাতাসের প্রবাহ কেমন, যথেষ্ট আলো আছে কিনা ইত্যাদি। মোটকথা শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত একটি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। এরকম আরো অনেকগুলো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলে তার ভিত্তিতে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
আমেরিকা এমনকি ভারতেও গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশনের প্রক্রিয়া আছে। বাংলাদেশেও HBRI (হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট) এর তরফ থেকে এমন সার্টিফিকেশনের কাজ চলছে যেটা আমাদের জন্য একটা আনন্দের খবর।

“গ্রিন” শব্দটি অনেক সময় মার্কেটিং টার্ম হয়ে যাচ্ছে- এই প্রবণতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু: ঠিক তাই। এজন্য আমি ‘গ্রিন বিল্ডিং’ বলার চেয়ে ‘সাস্টেনেইবল’ বা ‘টেকসই ভবন’ বলতে বেশি পছন্দ করি। একটা ভবন পরিবেশবান্ধব হবে সেটাই আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিখে থাকি। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তা পেরে উঠি না। ২০১১ সালে আমি প্রথম গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন করি। আমি শুরু থেকেই চেয়েছিলাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে কাজ করতে। প্রথম প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে টের পাই আমি আসলে অসংখ্য মানুষের জন্য কাজ করছি। এটা সত্যিই অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা!
আমি দাবি করছি যে পরিবেশবান্ধব ভবন বানাচ্ছি, কিন্তু সেটা কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছে সেখান থেকেই আসলে গ্রিন সার্টিফিকেটের প্রসঙ্গটা এসেছে। তাই আমি টেকসই ভবন এই কথাটা ব্যবহার করতে আগ্রহী। এবং আমি মনে করি, যেকোনো ভবনেরই এরকম সার্টিফিকেশন থাকা উচিত।

আপনি কি মনে করেন, স্থাপত্যে নারী নেতৃত্ব কোনো ভিন্ন সংবেদনশীলতা যোগ করে, এবং এই প্রেক্ষাপটে তরুণী স্থপতিদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে?
স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু: স্থাপত্য একটা বৈশ্বিক ব্যাপার। তাই এখানে নারী বা পুরুষের সম্পৃক্ততা নেই। তবে নিশ্চিতভাবেই, যখন আমি পোশাক কারাখানা ডিজাইন করছি তখন নিজে নারী বলে এবং কারখানার বেশিরভাগ শ্রমিক নারী হওয়ায় আমার মাঝে একটা আলাদা মায়া কাজ করে। হয়তো আমি ভালো বুঝিও।
তবে আমার প্রথম পরিচয় আমি একজন স্থপতি। এবং আমার কাজের প্রথম শর্ত হলো, আমি পরিবেশবান্ধব ভবন করবো। সেইসাথে যেকারণে ভবনটি নির্মিত হচ্ছে সেটিও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটা ব্যবসার ফাংশনালিটি এবং সেইসাথে পরিবেশ দুটো বিষয় এখানে বিবেচনায় থাকে।
স্থাপত্যবিদ্যাকে পুরুষতান্ত্রিক পেশা বলা হলেও এখানে যারাই পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে আসবেন তাদের এটা জেনেই আসতে হবে যে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে আর কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আসলে যখন আমাদের মেয়েরা পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন ঠিক তখনই তাদের পারিবারিক জীবনও শুরু হয়। এই দুটি জায়গায় ভারসাম্য রাখা খুব কঠিন। এক্ষেত্রে আমি ভাগ্যবতী, কিন্তু পরিশ্রমীও বলতে হবে।
কিন্তু স্থাপত্য নারী বা পুরুষ মুখাপেক্ষী নয়। কাজটাকে ভালোবাসা গেলে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে ভারসাম্যটা গড়ে তোলা সম্ভব সেটাই আমার পরামর্শ। কেননা আমার অভিজ্ঞতা বলে আমাদের কর্মক্ষেত্রের মান যথেষ্ট ভালো।

যে শ্রমিক প্রতিদিন আপনার ডিজাইন করা ভবনে কাজ করেন তার জীবনে আপনি কী পরিবর্তন দেখতে চান?
স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু: আমি তো শ্রমিকদের জন্যই স্পেস ডিজাইন করছি। ওদের বাচ্চাদের জন্য ডে-কেয়ার বানাচ্ছি। চলাচলের জন্য সুন্দর হাঁটার জায়গা ডিজাইন করছি। বাতাস চলাচল নিশ্চিত করছি। ওদের কাজের জায়গাটা যেন ওদের আনন্দের জায়গা হয়ে ওঠে সেটা ডিজাইন করছি।
আমাকে শ্রমিকেরা যখন বলে যে কারখানাতেই ওদের ভালো লাগে, বাসায় যেতে ইচ্ছে করা না সেটা আমার কাছে এক বিরাট প্রাপ্তি। কারণ সে হয়তো আশেপাশে কোনো স্লাম এরিয়াতে থাকছে কিন্তু তার কাজের জায়গাটা তার জন্য সুখকর। আমি আসলে এটাই চেয়েছিলাম। এবং এই অবস্থাটাই উত্তরোত্তর আরো ভালো হবে সেটাই চাওয়া।
আপনাকে ধন্যবাদ।
স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু: বন্ধনকেও অনেক ধন্যবাদ।



















