বৈশাখী আমেজে ঘর সাজানোর সহজ উপায়

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। নতুন বছরের প্রথম দিনে ঘরের ভেতরেও যদি লেগে থাকে লাল-সাদা রঙের উচ্ছ্বাস, লোকজ শিল্পের আবহ, ফুলের সুবাস আর আলোর কোমল ছটা, তবে উৎসবের আনন্দ যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অন্দরসজ্জা কেবল সৌন্দর্যের পাশাপাশি আমাদের সংস্কৃতি, রুচি ও আবেগেরও প্রকাশ। তাই বৈশাখের সাজে এমন কিছু উপাদান রাখা জরুরি যা বাংলা নববর্ষের উজ্জ্বল উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

ঘরের কোণে এক টুকরো বৈশাখ

ঘরের একটি কোণ আলাদা করে বৈশাখী কর্নার তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে একটি মাটির কলস, ছোট পটচিত্র, মুখোশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, বই, ফুল এবং আলপনা দিয়ে একটি সাজানো কোণ বানানো যায়। এটি যেমন নান্দনিক, তেমনি ছবি তোলার জন্যও হতে পারে আকর্ষণীয় একটি স্থান যেখানে সবাই ছবিও তুলতে পারবে। বন্ধুরা একসাথে হলে এই জায়গাটিই হয়ে উঠতে পারে আপনার বাসার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রঙে ঐতিহ্যে ফুটে উঠুক বৈশাখের প্রাণ

পহেলা বৈশাখের অন্দরসজ্জায় লাল ও সাদা রঙ সবচেয়ে বেশি মানানসই। পর্দা, কুশন, টেবিল রানার, বিছানার চাদর কিংবা আসনে এই দুই রঙের ব্যবহার ঘরকে মুহূর্তেই উৎসবমুখর করে তুলবে। এর সঙ্গে হালকা হলুদ, কমলা বা সবুজ যোগ করলে বৈশাখের প্রকৃতির রঙও ধরা পড়বে। চাইলে জামদানি বা নকশিকাঁথার মোটিফ ব্যবহার করে ঐতিহ্যের স্পর্শও আনা যায়।

বৈশাখের সাজে এমন কিছু উপাদান রাখা জরুরি যা বাংলা নববর্ষের উজ্জ্বল উপস্থিতি অনুভব করা যায়। ছবি: বন্ধন

আয়নায় দেয়ালসজ্জা ও আলপনায় বাঙালিয়ানা

দেয়ালের একটি অংশে বা আয়নার চারপাশে আলপনা মোটিফ ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়াও দেয়ালে বাংলার চিরায়াত পটচিত্র, মুখোশ, লোকজ মোটিফ, পেঁচা, মাছ, পাখি বা ফুলের নকশা ব্যবহার করলে বৈশাখের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বৈশাখী শোভাযাত্রার অনুপ্রেরণায় ছোট ছোট মুখোশ বা শোলার কারুকাজও সাজে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ঘরের প্রবেশপথে বা মেঝেতে সাদা আলপনা আঁকলে উৎসবের সৌন্দর্য অনেকগুণ বেড়ে যায়। 

ফুল, মাটি ও প্রকৃতির ছোঁয়া

বৈশাখ মানেই ফুলের রঙিন উপস্থিতি। গাঁদা, কৃষ্ণচূড়া, জবা, রজনীগন্ধা বা বেলি ফুল ছোট ছোট ফুলদানিতে সাজিয়ে টেবিল, জানালার ধারে বা শেলফে রাখা যেতে পারে। মাটির কলস, শোপিস, বাঁশের ঝুড়ি, পাটের ম্যাট বা বেতের ঝুল ব্যবহার করলে ঘরে দেশীয় ঐতিহ্যের স্বাদ ফুটে ওঠে। 

আসবাব ও কাপড়ে লোকজ শৈলী

সোফা বা চেয়ার ঢাকতে হাতের কাজের কাপড়, নকশিকাঁথা বা ব্লক প্রিন্টের কাপড় ব্যবহার করা যেতে পারে। ডাইনিং টেবিলে মাটির থালা, কলাপাতা, শীতলপাটি বা বেতের প্লেসম্যাট রাখলে অতিথিরাও সহজে বৈশাখী আবহ অনুভব করবেন। ছোট ছোট লোকজ শোপিস বা বইয়ের পাশে একটি মাটির ফুলদানি রাখলেও ঘরের সৌন্দর্য অনেকগুণ বেড়ে যায়। সেইসাথে প্রাকৃতিক উপাদের বানানো পাত্রে চলতি ঋতুর ফলের প্রদর্শনীও করতে পারেন।

ফুলের সুবাসে ও রঙে রাঙিয়ে উঠুক এবারের বৈশাক। ছবি: বন্ধন

উষ্ণ আলোয় সান্ধ্য বৈশাখ

সন্ধ্যার বৈশাখী আমেজ ফুটিয়ে তুলতে নরম হলুদ আলো খুব সুন্দর কাজ করে। ফেয়ারি লাইট, মাটির প্রদীপ, লণ্ঠন বা ছোট বাতি ব্যবহার করলে ঘরে একটি উৎসবময় কিন্তু আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। আলো যেন খুব তীব্র না হয়, বরং কোমল উষ্ণতা থাকলে পুরো ঘরটাই হয়ে উঠবে আনন্দের এক শান্ত আশ্রয়।

লোকগানের সাউন্ডস্কেপ

ঘর সাজানো কেবল চোখে দেখার নয়, অনুভবেরও বিষয়। মৃদু শব্দে বেজে চলুক রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাউল বা লোকসংগীত। পুরো ঘরে বৈশাখের আবহ তৈরি হবে। এই সাউন্ডস্কেপ আপনার ঘরের মুডকে আরো জাগিয়ে তুলবে।

বারান্দায় ছোট্ট বৈশাখী বসার আয়োজন

যদি বারান্দা থাকে, সেখানে ছোট্ট চা-আড্ডার স্পেস বানিয়ে ফেলতে পারেন। মাটির কাপ, লাল-সাদা কুশন, ছোট পটেড গাছ, আর সন্ধ্যায় ফেয়ারি লাইট। সকালে পান্তা-ইলিশ বা বিকেলে চা দুটোর জন্যই দারুন হবে।

মাটির তৈজসপত্র আপনার অন্দরসজ্জায় নিয়ে আসবে বৈশাখী ছোঁয়া। ছবি: বন্ধন

চটের ব্যাগে উপহার সামগ্রী

বাসায় আগত অতিথিদের জন্য বিদায়বেলায় রাখতে পারেন একটি চটের ব্যাগ ও তাতে কিছু দেশজ উপহার। একটা বাংলা ক্যালেন্ডার, একটা গামছা, মাটির প্রদীপ, ছোট মাটির ফ্রেমের আয়না, আলতা, চুল বাঁধার রঙ্গিন ফিতা এমন নানান মনোহারি উপহারে আপনার পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে করে তুলুন আরো আনন্দময়।

পহেলা বৈশাখের অন্দরসজ্জা এমন হওয়া উচিত, যাতে ঘরের প্রতিটি কোণ নতুন বছরের আনন্দ, বাঙালিয়ানা ও ঐতিহ্যের কথা বলে। কিছু দেশীয় উপকরণ, রঙের সঠিক ব্যবহার, ফুল ও আলোর মেলবন্ধনে একটি সাধারণ ঘরও হয়ে উঠতে পারে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র।

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top