ইতিহাস অনেক কিছু শেখায়। ইতিহাস আমাদের অতীত ও পূর্বপুরুষদের জীবনগাথা তুলে ধরে চোখের সামনে। একেকটি প্রাচীন সভ্যতা পৃথিবীর বিবর্তনের একেকটি অধ্যায়। দিলমুন সভ্যতা এমনই এক সভ্যতার নাম। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপে অবস্থান হওয়ায় তৎকালীন বণিকদের স্বর্গরাজ্য ছিল এই সভ্যতা। হাজার হাজার বছর আগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ সাল) পারস্য উপসাগরে গোড়াপত্তন হয় এই সভ্যতার। মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু সভ্যতার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত প্রাচীন এই সভ্যতা। মধ্যপ্রাচ্যের যত প্রাচীন সভ্যতা ছিল, তার মধ্যে দিলমুন একটি উল্লেখযোগ্য সভ্যতা। পারস্য উপসাগরে এটি ছিল তৎকালীন একমাত্র এবং ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ের একটি সভ্যতা। সে সময় দিলমুন, উপসাগরীয় বাণিজ্য রুটও নিয়ন্ত্রণ করত। বর্তমান বাহরাইন ছিল এই সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু।
দিলমুনকে পবিত্র ভূমি হিসেবে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ। সুমেরীয় গিলগামেশের মহাকাব্যে স্বর্গের বাগান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে দিলমুনকে। সুমেরীয় কিউনিফর্ম লিপিতে এই সভ্যতা সম্পর্কে প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। যাতে পূর্ব আরবের প্রাচীন ‘সেমিটিক’ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। সেসব লিপি মাটির ট্যাবলেটে চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষের দিকে উরুক শহরের দেবী ইনানার মন্দিরে পাওয়া যায়।
চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত দিলমুন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম ৩০০ বছরে দিলমুন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ২০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বের মধ্যে দিলমুনের বাণিজ্যিক শক্তি কমতে শুরু করে। মূলত পারস্য উপসাগরে জলদস্যুদের বিকাশ লাভই এর কারণ। তবে পরবর্তী সময়ে ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে ব্যাবিলনীয়রা এবং এরপরে পারস্যরা তাদের সাম্রাজ্যে দিলমুনকে যুক্ত করে নিয়েছিল। দিলমুন সভ্যতা বাণিজ্যিকভাবে কৃষিকে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সামুদ্রিক পথে যুক্ত করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিন্ধু উপত্যকা আর মেসোপটেমিয়া এবং পরবর্তী সময়ে চীন ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল (খ্রিষ্টীয় তৃতীয় থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত)। এই অঞ্চল থেকে কৃষিপণ্যের বিনিময়ে তামা, পাথরের পুঁতি, মূল্যবান পাথর, মুক্তা, খেজুর, শাকসবজিসহ অন্যান্য বিভিন্ন পণ্য সুমের এবং ব্যাবিলনিয়াতে পাঠানো হতো।
এ ছাড়া বিভিন্ন দাম ও মানের মূল্যবান কাঠ, হাতির দাঁত, নীলকান্তমণি, সোনা, পাথরের পুঁতি, পার্সিয়ান উপসাগরের মুক্তো, শেল, হাড়ের খাঁজ ইত্যাদি বিলাসবহুল পণ্য মেসোপটেমিয়ায় পাঠানো সামগ্রীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। রৌপ্য, টিন, উলের কাপড়, জলপাইয়ের তেল এবং শস্যের বিনিময়ে এসব বাণিজ্যিক লেনদেন করা হতো। উল্লেখ্য তৎকালীন বাণিজ্যে বিনিময় প্রথা চালু ছিল।
দিলমুন সভ্যতার অবস্থান
দিলমুন সভ্যতা বাহরাইনে অবস্থিত। মিসরীয়, সিন্ধু কিংবা মেসোপটেমীয় সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলে গড়ে উঠলেও দিলমুন সভ্যতার ক্ষেত্রে তা ছিল ব্যতিক্রম। বাহরাইনে এক বৃহৎ দ্বীপে গোড়াপত্তন হয়েছিল দিলমুন সভ্যতার। দ্বীপ অঞ্চলে এর অবস্থান হওয়ায় নৌ-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে এই সভ্যতা। শুধু তাই ৯ মেসোপটেমীয় ও সিন্ধু সভ্যতার দীর্ঘকালীন বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষায়ও দিলমুন সভ্যতার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি।
দিলমুন সভ্যতা নিয়ে যত কথা
পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্যকর্মের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গিলগামেশের মহাকাব্য। এর আগে মেসোপটেমীয় সভ্যতা নিয়ে অনেক উপকথা প্রচলিত ছিল, যার পরেই স্থান দখল করে নিয়েছিল দিলমুন সভ্যতা। মহাকাব্যের দ্বিতীয় অংশ বীর গিলগামেশ তাঁর প্রিয় বন্ধু এনকিদুর মৃত্যুতে অমরত্বের খোঁজে বের হন। এ জন্য গিলগামেশকে প্রথমেই একমাত্র মানুষ হিসেবে অমরত্ব লাভ করা সাধু উত-নাপিশতিমকে খুঁজে বের করতে হয়। এই উত-নাপিশতিম হলেন মেসোপটেমীয় মহাপ্লাবন উপাখ্যানে দেবতা এনকি নির্বাচিত নিষ্পাপ এক প্রতিনিধি। তিনি পৃথিবীর প্রাণিকুলকে রক্ষা করার জন্য বিরাট আকৃতির নৌকা বানিয়ে সব নিয়ে প্লাবনে ভেসেছিল।
উত-নাপিশতিম গিলগামেশকে বলেন, অমরত্ব লাভের জন্য পাড়ি দিতে হবে বিশাল সমুদ্র। এই সমুদ্র পাড়ি দেওয়া অতটা সহজ নয়, কেবল সূর্যদেবতা ছাড়া আর কেউ ওখানে যেতে পারেন না বলে হুঁশিয়ারিও দেন উত-নাপিশতিম। তবে সাগর পাড়ি দিলেই গিলগামেশ পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ভূমি, যা পৃথিবীর স্বর্গ হিসেবেও পরিচিত, সেখানে পৌঁছাতে পারবেন। সেই পবিত্র ভূমির নামই হলো দিলমুন। যেখানে কোনো শিকারি জন্তু, দুঃখ-দুর্দশা কিংবা জরা-ব্যাধির অস্তিত্ব নেই। বার্ধক্যও কাউকে ছুঁতে পারে না।
গিলগামেশের মহাকাব্যের একটি পদে দিলমুন সম্পর্কে একটি কাব্যে পাওয়া যায়,
শহরগুলো পবিত্র,
আপনাকে দেওয়া হয়েছে সেই শহরগুলো।
পবিত্র দিলমুনের ভূমি।
পবিত্র সুমেরের ভূমি,
আপনাকে দেওয়া হয়েছে সুমেরের পবিত্র ভূমি।
পবিত্র দিলমুনের ভূমি।
পবিত্র দিলমুনের ভূমি।
দিলমুনের ভূমি কুমারীর ন্যায় পবিত্র।
দিলমুনের ভূমি কুমারীর ন্যায় পবিত্র।
পৃথিবীর আদিতে সৃষ্ট ভূমি হলো দিলমুন…
সভ্যতার বাণিজ্যিক গুরুত্ব
দিলমুন সভ্যতার বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের আরব্য সভ্যতাগুলোর বাণিজ্যিক হাব ছিল এই সভ্যতা। সুমেরীয় ও ব্যবিলনীয় বিভিন্ন পুরোনো নথিতে এ সভ্যতার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। মেসোপটেমীয় এক শিলালিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ তাদের প্রথম সম্রাটকে দিলমুন থেকে কাঠবোঝাই জাহাজ উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। দিলমুনের আগাদ নগরীর বন্দরঘাটে সব বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর করা হতো। এখান থেকেই মেসোপটেমীয় ও সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করত দিলমুনবাসী।
মেসোপটেমীয় অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মেসোপটেমীয় সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু হিসেবে সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন মোহর আবিষ্কার করেছেন। অপর দিকে পারস্য উপসাগরীয় অনেক বৃত্তাকার মোহরের সন্ধান মিলেছে সিন্ধু এবং মেসোপটেমীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে। এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ দেয় এই তিন সভ্যতার বাণিজ্যিক সম্পর্কের। অপর দুই সভ্যতার বাণিজ্যের বিনিময়ের মূল পণ্য ছিল তামা। তামা ছিল তৎকালীন অনেক মূল্যবান ধাতু। দিলমুন থেকে তামাবোঝাই জাহাজ মেসোপটেমীয় সভ্যতার বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হতো। সে সময় দিলমুনের বণিকেরা একচেটিয়া বাণিজ্য করত।
দিলমুন সভ্যতার প্রত্নসম্পদ
দিলমুন সভ্যতার প্রত্নসম্পদ বলতে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। আনুমানিক ৪ হাজার বছর আগের হওয়ায় এই সভ্যতার অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মাটির সঙ্গেই মিশে গেছে। তবে যে নিদর্শনগুলোর দৃশ্যমান অস্তিত্ব আজও খুঁজে পাওয়া যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সে সময়ের মানুষের সমাধি।
এখানে মোট সাতটি ধাপে মানববসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। পঞ্জিকার হিসাবে তা প্রায় ২৩০০ খ্রিষ্টপূর্বের। পুরোনো এই বাসস্থান ছাড়াও কাল’আত আল-বাহরাইনে অসংখ্য সমাধির সন্ধান পাওয়া গেছে। এখানে প্রায় ৩০ বর্গ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার সমাধির স্তূপ বিদ্যমান, যা দ্বীপের পুরো আয়তনের ৫%। এর মধ্য অধিকাংশ সমাধির স্তূপ খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের এবং কোনো সন্দেহ ছাড়াই সেগুলো দিলমুন সভ্যতারই অংশ। তাই অনেকে মনে করেন, এই দ্বীপকে প্রাচীন আরবের বাসিন্দারা গোরস্থান হিসেবে ব্যবহার করত।
দিলমুন সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যতটা কঠিন, তার চেয়ে কঠিন এই সভ্যতার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা। এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। কেউ কেউ মনে করেন বাহরাইন ছাড়াও দিলমুন কুয়েত, উত্তর-পূর্ব সৌদি আরব, ইরাকের আল-কারনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমনকি একজন ইতিহাসবিদ মনে করতেন, প্রাচীনকালে দিলমুন দিয়ে মূলত সিন্ধু সভ্যতাকেই বোঝানো হতো। ১৯৫০-এর দশকে কাল’আত আল-বাহরাইনে আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে খননকার্য চালানো হলে অবসান ঘটে সব জল্পনা-কল্পনা এবং বিতর্কের। বর্তমানে এই স্থানকে প্রাচীন দিলমুনের পোতাশ্রয় এবং রাজধানী হিসেবে ধরা হয়। বর্তমান দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমের সার গ্রামে এর অবস্থান।
অস্তিত্বের সংকট থাকলেও সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বাহরাইন। বিলীন হয়ে যাওয়া ইতিহাস-ঐতিহ্য যত্নের অভাবেই এভাবে হারিয়ে গেলেও এসব সভ্যতার বিভিন্ন শিক্ষা আধুনিক জীবনের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শুধু দিলমুন সভ্যতাই নয়, সব ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষা করা সবার কর্তব্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৫৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৩।