কোকেনহফে টিউলিপের দুনিয়ায় স্বাগত

কোকেনহফ। আক্ষরিক অনুবাদ করলে বলা যেতে পারে সবজির বাগান, প্রচলিত ভাষায় যেটা ‘কিচেন গার্ডেন’। আর যদি চাক্ষুষ অনুবাদ করি? পুষ্পস্বর্গ! আপনি বলতেই পারেন অনুবাদ আবার চাক্ষুষ হয় নাকি? তা না হোক, কোকেনহফকে যদি আপনি স্বচক্ষে নাও দেখে থাকেন, শুধু গুগলে সার্চ করে পাওয়া ছবি দেখেও আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন ওটা আসলেই পুষ্পস্বর্গ। পৃথিবীর সব থেকে বড় ফুলের বাগান, যাকে হরহামেশা লোকে ‘গার্ডেন অব ইউরোপ’ বলে থাকে। এই কোকেনহফের অবস্থান ইউরোপের নেদারল্যান্ডে। প্রতিবছর নিত্যনতুন থিমে এই বাগানটিতে ৭০ লাখের অধিক ফুল প্রস্ফুটিত হয়। জি, ঠিকই পড়েছেন, ৭০ লাখ! আর বাগানের আয়তন? সেটিও আপনার চোখ ছানাবড়া করতে বাধ্য। আয়তন যার ৩২ হেক্টর (প্রায় ২৩৯ বিঘা)। প্রতিবছরই এখানে রোপিত হচ্ছে নতুন নতুন ফুলের চারা।

পনেরো শতকের গোড়ার দিকে জায়গাটা ছিল শিকারিদের দখলে। জংলা জায়গাটিতে প্রচুর ভেষজ, ঔষধি বৃক্ষও জন্মাত। হেনট প্রাসাদের তৎকালীন কাউন্টেস জ্যাকুলিনের রান্নার জন্য এখান থেকে প্রায়ই সেসব ভেজষের চালান আসত। সম্ভবত ওখান থেকেই এই জায়গাটির নাম কোকেনহফ, ডাচ্্ ভাষার যেটির ইংরেজি অনুবাদ ‘কিচেন গার্ডেন’। ১৯৪৯ সালে শহরের মেয়র জায়গাটি পুনর্নির্মাণ করেন। মূলত শহরে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ আর স্থানীয় হাইব্রিড ফুল ব্যবসায়ীদের জন্য সুন্দর গোছালো একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেই মেয়রের এই মহতী উদ্যোগ।

মেয়রের সেই উদ্যোগ সফল বৈকি। প্রতিবছর গড়ে বিশে^র প্রায় ১৪ লাখ দর্শনার্থী এটা দেখতে আসেন। কোকেনহফ বছরে খোলা থাকে মাত্র আট সপ্তাহের জন্য। সময়টা ইউরোপের বসন্তকাল (মার্চ-মে)। প্রতিবছর এই তারিখ অবশ্য এক থাকে না। কারণটা আবহাওয়া, প্রতিবছরই আবহাওয়ার পরিবর্তন ফুল ফোটার মৌসুমকে প্রভাবিত করে। তবে মোটামুটি এপ্রিল মাস হচ্ছে কোকেনহফ দেখতে যাওয়ার সেরা সময়। তখন টিউলিপ ফোটার পরিপূর্ণ সময়। ডাচ্্ টিউলিপের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। আর এখানে আপনি দেখতে পাবেন আট হাজার জাতের ভিন্ন ভিন্ন টিউলিপ। যদিও টিউলিপ কোকেনহফের প্রধান আকর্ষণ, এখানে ড্যাফোডিল (নার্গিস), লিলি, গোলাপ আর আইরিসের দেখাও মিলবে।

কল্পনা করুন, ৩২ হেক্টর আয়তনের ফুল বাগানে আট হাজার জাতের ভীষণ উজ্জ্বল আর আকর্ষণীয় রঙের ৭০ লাখ সতেজ টিউলিপ আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে। দারুণ না ব্যাপারটা? স্বর্গের একটা টুকরো দেখে ফেলার মতো অনুভূতি। প্রতিবছর এই টিউলিপের সারি নিত্যনতুন থিমে সাজানো হয়। যেমন ২০১৫ সালে ছিল ‘ইয়ার অব ভ্যান গঘ’, ২০১৬ সালে ‘গোল্ডেন এজ’, ২০১৭ সালে ‘ডাচ্্ ডিজাইন’, ২০১৮ সালে ‘রোমান্স ইন ফ্লাওয়ার্স’ আর এ বছর ২০১৯ সালে ‘ফ্লাওয়ার পাওয়ার’। পরের বছর ২০২০ সালে কোকেনহফের জন্য নির্বাচিত থিম হচ্ছে ‘এ ওয়ার্ল্ড অব কালার’।

উইকিপিডিয়া

কোকেনহফ কেবল ফুলের বাগান বললে যথেষ্ট বলা হয় না। এখানে আছে হাইকিং, বাইকিংয়ের সুবিধা। হেঁটে হেঁটেও দেখতে পারেন। হাইকিং ট্রেইলটা লম্বায় প্রায় ১৫ কিলোমিটারের মতো। প্রতি সপ্তাহেই রূপ বদলানো টিউলিপের সারি ছাড়াও আছে জগদ্বিখ্যাত সব শিল্পীর তৈরি স্ট্যাচু। কোকেনহফ হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডের সব থেকে বড় স্ট্যাচুর সংগ্রহশালাও।

কোকেনহফ আমস্টার্ডাম আর হেগ শহরের মাঝামাঝি লিসিতে অবস্থিত। টিকিট কিংবা বাইক ট্যুরের জন্য অনলাইন বুকিং সেরা। তাহলে আপনাকে আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। একবার টিকিট কাটলে পুরো দিনের জন্য কোকেনহফ ঘুরে দেখতে পারবেন। কোকেনহফে সব বয়সী বাচ্চাদের জন্য খেলা আর বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই বাচ্চাকে সঙ্গে নিতে পারেন নিশ্চিন্তে। টিউলিপ ফোটার মৌসুম মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মের মধ্যে। তাই কোকেনহফ দেখার ইচ্ছে থাকলে হল্যান্ড বেড়ানোর সময়টুকু এই সময়ের মধ্যে নির্ধারণ করাটাই ভালো। আর ঠিক কোন তারিখ থেকে কোকেনহফ দর্শকদের জন্য খোলা হবে সেটি যাওয়ার আগে একটু দেখে যাওয়াই ভালো। কারণটা তো আগেই বলেছি, আবহাওয়। ফুল এখনো মানুষের নয়, প্রকৃতির ইচ্ছেই ফোটে।

উইকিপিডিয়া

কোকেনহফের টিউলিপেরা জাতে আট হাজার রকমের, আর রঙে? কোকেনহফে কমবেশি তিন হাজার রঙের টিউলিপ ফোটে। তার সহজ মানে হচ্ছে, আপনি যতগুলো রং কল্পনা করতে পারেন, তার থেকেও আরও অনেক বেশি রঙের টিউলিপ নিয়ে কোকেনহফ অপেক্ষায় থাকে। যত দূর চোখ যাবে সব রঙের টিউলিপ পরপর ঢেউ তুলে সেজে আছে। একে কী বলা যায়? টিউলিপের সমুদ্র? তাহলে আপনাকে টিউলিপের সমুদ্রে স্বাগত। আর ২০২০ সালে টিউলিপ তো সাজবেই রঙের দুনিয়া (এ ওয়ার্ল্ড অব কালার) নিয়ে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।

মহুয়া ফেরদৌসী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top