সীমানাপ্রাচীর নিয়ে আমাদের সবারই কিছু অভিজ্ঞতা আছে। এই যেমন ধরুন, সীমানাপ্রাচীর না থাকলে চুরি হওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। আবার সীমানাপ্রাচীর থাকলেও সমস্যাÑউটকো ছেলেপেলে এসে প্রাচীরের গায়ে এসে চিকা মেরে দেয়। গল্পকার ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের সেই গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল। বাড়ির মালিক কতগুলো লোকের চিকা মারতে দেখে চিৎকার করে প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু তার নিজেরই যখন চাকরি চলে গেল, সে নিজেই এসে চিকা মারতে শুরু করল। দেয়াল যেন এখানে কথা বলছে। মানুষের কথা বলছে। জীবনের কথা বলছে। চাহিদার কথা বলছে। আজকে ও আজ থেকে পঞ্চাশ বছর বা পাঁচ শ বছর আগেÑসব চিত্রই এক। দেয়াল মানুষের মনের কথা বলে। আমরা দেখেছি, ১৯৭১ বা ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে দেয়াললিখনের ভূমিকা। এই দেয়াল কি সরকার বানিয়েছিল? নাকি কেউ নিজে দেয়াল বানিয়ে তারপর লিখেছিল? কোনোটাই না। এই দেয়াল মানুষের সীমানাপ্রাচীরের দেয়াল। আমাদের ব্যক্তিগত সম্পদ রক্ষা করার যে দেয়াল আমরা নির্মাণ করেছিলাম, সেই দেয়ালই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার।
আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে দেয়াললিখনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এককালে দেয়াললিখন যখন নিষিদ্ধ হয়ে গেল, তখন সাধারণত ঘুমিয়ে গেলে রাতের অন্ধকারে দেয়াললিখন চলত। চিকা মারা-দেয়াললিখন আর পেইন্টিং হয়ে ওঠে প্রতিবাদ প্রকাশের ভাষা। সীমানাপ্রাচীরের ওপর দেয়াল লেখকেরা যেন লিখতে না পাওে, এ জন্য নানা রকম ট্রিটমেন্ট চলত। এখনো চলে সেসব। কিন্তু দেয়াল লেখকদের কি আটকে রাখা যায়? কেউ কেউ কংক্রিট ফেয়ারফেস দিয়ে দেন। যাতে লেখকের কলম না চলে। আবার কেউ প্রি-কাস্ট কংক্রিট ব্যবহার করে এবড়োখেবড়ো সারফেস তৈরি করেন যেন এতে কোনোভাবেই স্প্রে করেও লেখা না যায়।
প্রি-কাস্ট কংক্রিটের প্রাচীর সাধারণত ইটের তৈরি প্রাচীরের মতোই ৮ ফুট পরপর পোস্ট ব্যবহার করে শক্ত করে ধরে রাখা হয়। মাটির নিচে একটা ঢালাই দিতে হয়। সাধারণত পাঁচ ফুট গভীরে গেলেই হয়। এরপর মাটির নিচের ঢালাই শেষ করে একটা গ্রেট বিম তৈরি করে তার ওপর দেয়াল তোলা হয়। দেয়াল বানানোর মূলনীতি মূলত ইটের দেয়ালের মতোই। তবে বাইরে প্লাস্টার করা হয় না।
কোনো কোনো আর্কিটেক্টকে দেখা যায় ফেয়ারফেস কংক্রিটের বদলে লাইমস্টোন ব্যবহার করতে। এখানে ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যেন এর ওপর কোনো কিছু পেস্ট করে দেওয়া যায় না। অনেকেই রাতের অন্ধকারে পোস্টারিং করেন। সেসব পোস্টার এসব দেয়ালে সাঁটানো যায় না। গেলেও দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলা যায়। আবার অনেকেই এমন ব্যবস্থা করেন যে যারা দেয়াল লেখক বা চিকা মারে, তাদের যেন কোনোভাবেই দেয়ালে দাগ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকে। এ জন্য বলা যায়, একটা রিসার্চ হয়ে গেছে। কেউ কেউ তৈরি করেছে সবুজ দেয়াল। সবুজ দেয়াল মানে সবুজ গাছ লাগিয়ে দেওয়া দেয়াল। এই দেয়ালে কিছু লেখা তো দূরের, গাছের সৌন্দর্য দেখে মন স্নিগ্ধ হয়ে ঘরে ফিরে গিয়ে দেয়াল লেখাই ছেড়ে দেওয়ার কথা যে কারও। এসব গাছ নিয়ে হয়েছে নানা পরীক্ষা। কারণ, গাছ তো দেয়াল নষ্ট করে দেয়। তাহলে কী লাগানো যায়? কেউ কেউ চিন্তা করলেন ফার্ন লাগাবেন। কিন্তু ফার্ন তো খাড়া দেয়ালে বাঁচে না। বাঁচে তবে ভালো দেয়ালে বাঁচে না। যেসব নোনাধরা দেয়াল আছে, যেগুলোতে পানি আটকে থাকে অনেকক্ষণ, সেসব দেয়াল ফার্নের জন্যে উপযুক্ত। কিন্তু আমাদের দেশে বা বিদেশে যেসব দেয়াল একেবারে শুকনো খটখটে, সেসব দেয়াল তো ফার্নের জন্য উপযুক্ত নয়। তাহলে উপায়?
এমন কোনো গাছ বের করতে হবে, যে গাছ খাড়া দেয়ালে বাঁচবে আবার দেয়াল নষ্ট করবে না; দেয়ালের প্লাস্টার নষ্ট হবে না, রংও নষ্ট হবে না; আবার পানি দিতেও হবে না তেমন। কিন্তু এমন গাছ কীভাবে পাওয়া যাবে?।
এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এলেন ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্টরা। খুঁজে খুঁজে বের করা হল সেসব গাছ যেগুলো কম পানিতেই বাঁচে। আবার সেসব গাছ যেগুলোর শিকড় খুব হালকা হয়। এ ক্ষেত্রে সব সময় সবুজ থাকবে এমন গাছ বেছে নেওয়ার জন্য বেশ বেগ পেতে হলো। কিছু গাছ সবুজ ও সুন্দও কিন্তু শীতকাল এলেই একেবারেই কালচে বা লালচে হয়ে যায়। পাতা ঝরে যায়। আবার কিছু গাছ সব ভালো, শুধু শিকড় একবার দেয়ালে বসে যেতেই নিজেই সেই দেয়াল ভাঙার পাঁয়তারা শুরু করে। সবাই জানার চেষ্টা করলেন প্রাচীনকালে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানে কীভাবে প্ল্যান্টেশন করা হয়েছিল। খ্রিষ্টজন্মের ৩০০০ বছর আগে ইজিপ্টে এমন ঝুলন্ত বাগান তৈরি হতো। প্রাচীন পারস্য সেই ঝুলন্ত বাগানের ধারণাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে এই ঝুলন্ত বাগানের চর্চা শুরু হয়। যেসব গাছ মাটি থেকে দেয়াল বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে পারে, সেসব গাছের কদর সে সময় অনেক বেশি ছিল। আগাছাকে কীভাবে কাজে লাগিয়ে ফেন্সিং বা সীমানাপ্রাচীরে কাজে লাগানো যায়, এটা প্রথম শিখিয়েছিল তো সেই মিসরীয়রাই। তাই তাদের সেই জ্ঞানকে নতুন করে কাজে লাগানো হলো। প্রয়োগ করা হলো আধুনিক সীমানাপ্রাচীরের ক্ষেত্রে। আসুন জানা যাক সেসব ব্যবহারের বিস্তারিত।
ওয়াল পকেট সিস্টেম
ওয়াল পকেট নামটাই এই পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রে সর্বময়। দেয়ালে ছোট ছোট পকেট করে একের পর এক চারা রোপণ পদ্ধতির নাম ওয়াল পকেট সিস্টেম। এই সিস্টেমে অনেক গাছ লাগানো যায় ছোট্ট পরিসরেও। যেহেতু এটা খুব কম স্থানে বেশি গাছ লাগানো যায়, তাই এটা থেকে খুব কম সময়ে বেশি ফল পাওয়া যায়। দ্রুত গাছের বৃদ্ধি হয়। দৈনিক একবার পানি দিলেই কাজ হয়। ওপরের পকেটে ভালোমতো পানি দিলে সেই পানি ওপরের পকেট থেকে মাঝের পকেটে পড়ে। সেই মাঝের পকেটের প্রয়োজন শেষ করে পানি নিচের পকেটে এসে জমা হয়, যার ফলে পানির অপচয় হয় না। মোটকথা এই পদ্ধতির ফলে খুব দ্রুততার সঙ্গে দেয়ালে সবুজ ছাউনি তৈরি করা যায়।
সরস গাছ পদ্ধতি
কিছু গাছ আছে, যেগুলোকে বছরে একবার পানি দিলেই হয়, সেগুলো নিজে থেকে বাতাসের জলবায়ু থেকে পানি শোষণ করে বেঁচে থাকতে পারে। এসব গাছ মূলত পাওয়া যায় মরু অঞ্চলে। আর সেই গাছগুলোকে যদি আমাদের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে লাগানো হয় দেয়ালজুড়ে, তাহলে তো এদের জন্য পোয়াবারো। বছরে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, সেই পরিমাণ বৃষ্টিই এদের বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট। এদের দিকে আলাদা করে যত্ন নেওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় না। কিছুদিন পরপর ডাল ও পাতা ছেটে সুন্দর করে রাখলেই এদের চলে। আর আমাদের দেশের যে বৃষ্টিপাত, তাতেই এদের অনেক দিন বেঁচে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়।
ওয়াল প্লান্টার পদ্ধতি
যেসব গাছ পানি ছাড়া মোটেও বাঁচে না কিন্তু দেখতে সুন্দর, সেসব গাছকে প্লান্টার বক্স বা টবে লাগিয়ে সেই সব টব দেয়ালের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে সবুজ তৈরির নাম ওয়াল প্লান্টার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে পানির অপচয় হয় বেশি। প্রতিটি গাছের গোড়ায় আলাদা আলাদা করে পানি দিতে হয় প্রতিদিন। নইলে কদিন পরেই গাছ মরে যায়। তবে বছর খানেক পর এসব গাছ যখন একটু বয়স্ক হয় তখন কম পানি দিলেও চলে।
ঝুলন্ত বৃক্ষ পদ্ধতি
গাছ ঝুলিয়ে দিয়ে একের পর এক সাজিয়ে দেওয়ার নাম হলো ঝুলন্ত বৃক্ষ পদ্ধতি। এখানে যে সাধারণ গাছই লাগাতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আগাছাও লাগানো যেতে পারে। সবুজ দেয়াল তৈরিই আসল উদ্দেশ্য। সাধারণত টেনসাইল কেব্্ল ব্যবহার করে একের পর এক সাজিয়ে দেওয়া হয় গাছের চারা। এ ক্ষেত্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে মাটির পাত্র অথবা চীনামাটির প্লান্টার যেকোনো কিছু ব্যবহৃত হতে পারে।
স্তরীভূত বৃক্ষরোপণ পদ্ধতি
যেসব গাছে পানি কম দরকার হয়, সেসব গাছকে ওপরের দিকে রেখে ধীরে ধীরে সিঁড়ির মতো করে স্টেপ তৈরি করে যে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা হয়, তাকে বলা হয় স্তরীভূত সবুজায়ন পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে ওপরের স্তরে পানি দিলেই হয়। সেই পানি গড়িয়ে গিয়ে নিচের ভারী স্তরে চলে আসে।
দেয়ালে সবুজ তৈরির এসব পদ্ধতি অবলম্বন করে যেকোনো দেয়ালকে দেয়াললিখন, চিকা ও পোস্টার মুক্ত রাখা যায় সহজেই। দেয়াললিখন যদিও বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। তবুও অনেকেই দেয়াললিখন হোক বা দেয়াল ছবি আঁকা হোক, এটা চান না। তবে পশ্চিমে এই দেয়াললিখন অনেকটা শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। আমেরিকার মতো দেশগুলোতে দেয়াললিখন ও পেইন্টিং রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে আঁকা হয়, যা অনেক দেশেই এখন শুরু হয়েছে। এসব পেইন্টিংকে বলা হয় গ্রাফিত্তি। এসব গ্রাফিত্তি যাঁরা আঁকেন, তাঁদের গ্রাফিত্তি আর্টিস্ট বলা হয়। এসব গ্রাফিত্তি আঁকার জন্য শিল্পীরা নানা রকম রং ব্যবহার করেন। যেমন ক্যান পেইন্ট, হ্যান্ড পেইন্ট, প্লাস্টিক পেইন্ট প্রভৃতি।
তবে বাংলাদেশে নতুন করে গ্রাফিত্তি কালচার শুরু হয়েছে ২০১৬-১৭ সালে এসে। সুবোধ নামে একটা চরিত্রকে রাজধানীর বিভিন্ন সীমানাপ্রাচীরে দেখা গেছে। সুবোধ চরিত্রটির স্রষ্টা কে তা জানা যায়নি। প্রতিটি পেইন্টিংয়ের একটা সিকোয়েন্স আছে। সেসব সিকোয়েন্স মিলিয়ে একসময় প্রচুর আলোচনা শুরু হয় দেশজুড়ে। যে বা যাঁরা এটাকে এঁকেছেন, তাঁরা কখনোই সামনে আসেননি বলে এটা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। সুবোধ কে, সুবোধ কেন আঁকা হলো, কীভাবে সুবোধ আঁকা হয় এসব নিয়ে নানা হাইপোথিসিস সামনে চলে আসে। কেউ কেউ এটার মধ্যে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র দেখতে পান। কেউ এটাকে সুন্দর বোধ ফিরে আসার জন্য একটা উপায় বলে প্রচার করতে থাকেন। লেখা হয় নানা ফিচার। নানা বই ও গেঞ্জিতে উঠে আসে সুবোধ আর্ট।
যদিও খুঁজে পাওয়া যায়নি, এই সুবোধকে কে এঁকেছেন, তবে খুঁজে পাওয়া গেছে একটি নাম-হবেকি? এই হবেকিই হয়তো সুবোধেরই আঁকা। তবে সুবোধের গ্রাফিত্তির সঙ্গে সঙ্গে দেশের গ্রাফিত্তির কালচারে পরিবর্তন ঘটে। অনেক দিকেই সুন্দর সব চিত্র চোখে পড়ে এখন। আগে শুধু দৃষ্টিকটু রাজনৈতিক পোস্টারের দেখা মিলত। এখন সেটা অনেকটাই আছে চিত্রপ্রদর্শনীতে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৯।