বিস্ফোরণের বিকট শব্দে প্রায়ই কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। শোনা যায় অগ্নিদগ্ধ মানুষের আহাজারি। না এটি কোনো বোমার শব্দ নয়, বরং তার চেয়েও ভয়ংকর এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার বিস্ফোরণের শব্দ। রান্নায় গ্যাসের তীব্র সংকট নগরীর নিত্য নৈমিত্তিক সমস্যা। কিছু কিছু এলাকায় গ্যাস থাকে না প্রায়ই। গ্যাসসংকট থেকে রেহাই পেতে অনেকেই ঝুঁকছেন এলপি গ্যাসের দিকে। এই এলপি গ্যাস সিলিন্ডার শুধু বাসাবাড়িতে কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে নয়, ব্যবহৃত হচ্ছে যানবাহনেও। নিম্নমানের সিলিন্ডার ও অসাবধানতার কারণে হরহামেশাই ঘটছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা; হতাহত হচ্ছেন অনেকেই। গ্যাসলাইনের ত্রুটি থেকেও দুর্ঘটনার ঘটনা নেহাত কম নয়। একের পর এক দুর্ঘটনা জনমনে ছড়াচ্ছে আতঙ্ক। গ্যাস লাইন ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। দগ্ধ হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে; নতুবা গভীর ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকে বাকিটা জীবন। সচেতনতা ও কতিপয় পদক্ষেপ এই দুর্ঘটনা রোধে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বাংলাদেশে বাসাবাড়িতে আর বিভিন্ন যানবাহনে যেসব গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে তার বড় একটি অংশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ওই সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। মূলত সিলিন্ডারের গ্যাস লিক থেকেই সূত্রপাত মূল সমস্যার। এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাস লিক হতে পারে নানা কারণে। হোস পাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভাল্ব হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত। আর তা হলেই বিপত্তি! যেহেতু সিলিন্ডারের গ্যাস প্রচন্ড চাপে তরলীকরনে প্রবেশ করানো হয়, তাই এটির বিস্ফোরণও হয় মারাত্মক। জমে থাকা এসব গ্যাস শক্তিশালী বোমার চেয়েও ভয়ংকর। রান্নাঘরের পাইপ লিকেজ হয়ে বের হওয়া গ্যাস ধীরে ধীরে তাপ ও চাপ তৈরি করে। এরপর ওই স্থানে কোনো ধরনের দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠি কিংবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হলেই সঙ্গে সঙ্গে তা বিস্ফোরিত হয়ে আশপাশের সবকিছুকে লন্ডভন্ড করে দেয়। উচ্চমাত্রার শব্দ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জ্বলে ওঠে আগুন, যা মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে না এলে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ এই এক বছরে চুলা থেকে সৃষ্ট কারণে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে ২৩৮টি। আর এ সময় গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৬৫০টি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তথ্যে, প্রতি মাসেই ছোট-বড় মিলিয়ে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১৫ থেকে ২০ জন অগ্নিদগ্ধ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চারপাশে শক ওয়েভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে এত বেশি শক্তি উৎপন্ন হয় যে ওই সময় আশপাশে থাকা ব্যক্তিদের হওয়ায় ভাসিয়ে অনেক দূরে ছিটকে ফেলে। এতে ভেঙে যেতে পারে শরীরের হাড়; মাথায় আঘাত লাগলে তা হতে পারে আরো মারাত্মক। শক ওয়েভ শরীরের যে অংশে লাগে, সে অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ফুসফুসের। গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড এক্সচেঞ্জে (অদল-বদলে) বাধা দেয়। এতে দম বন্ধ হওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফুসফুসে রক্ত জমতে পারে; এতে সম্পূর্ণ ফুসফুস ছিন্নভিন্ন হতে পারে। ফলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। অক্সিজেনের ঘাটতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক। মাথা ঝিমঝিম করে, মাথা খালি খালি লাগে, অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হয়। প্রাণহানির ঘটনা ঘটে কয়েক মুহূর্তেই। অগ্নিদগ্ধ হলে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যু অনেকটাই নিশ্চিত।
বুঝবেন যেভাবে
সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হঠাৎ করেই হতে পারে। তবে বিস্ফোরণের আগে সিলিন্ডার থেকে গ্যাসের কটু গন্ধ পাওয়া যায়। অর্থাৎ লিক হলে খুব উৎকট গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। তাই এমন উৎকট গন্ধ পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে-
- কোনোভাবেই আগুন জ্বালাবেন না।
- ঘরে আলো জ্বালানোর দরকার হলেও দেয়াশলাই, মোমবাতি বা আগুন সম্পৃক্ত অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনে চার্জার বা টর্চ লাইট ব্যবহার করতে পারেন।
- বাসার সব বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিন।
- প্রয়োজনে মেইন সুইচ বন্ধ করুন।
- ঘরের দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
- সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করুন।
- সিলিন্ডারে সেফটি ক্যাপ লাগান।
গ্যাস বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিক করণীয়
যদি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে অথবা কোনোভাবে আগুন লেগে যায় তাহলে যে যে ব্যবস্থা নিতে হবে-
- পোশাকে আগুন লাগলে দ্রুত তা খুলে ফেলুন।
- সম্ভব না হলে অথবা আগুনের পরিমাণ বেশি হলে মাটিতে গড়াগড়ি দিন।
- সিলিন্ডারের গ্যাস যদি শরীরের কোথাও লাগে, ২০ মিনিট ধরে পানি দিয়ে দ্রুত ধুয়ে ফেলুন।
- যদি চোখে লাগে, তাহলে পানির ঝাপটা দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন।
- যদি শরীরে ফোস্কা পড়ে, তা তুলতে যাবেন না।
- সাহায্যকারী কেউ থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত খোলা জায়গায় নিন, যেখানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে।
- তাৎক্ষনিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নিন।
- অক্সিজেন দেওয়ার দরকার হতে পারে।
- আগুনের পরিমাণ বেশি হলে দ্রুত স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসে খবর দিন।
প্রতিরোধের উপায়
দুর্ঘটনা রোধে ব্যবহারকারীদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ত্রুটি থেকেই মূলত দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বিশেষ করে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকা খুব জরুরি। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধকেই গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। এ ছাড়া প্রাত্যহিক গ্যাস ব্যবহার করার সময় এই বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখুন-
- গ্যাস সিলিন্ডার নেওয়ার আগে সিলিন্ডারের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখে নিন।
- গ্যাস সিলিন্ডার সোজা করে সঠিকভাবে সমতল স্থানে রাখুন যেন পড়ে না যায়। উঁচু-নিচু জায়গায় রাখবেন না।
- গ্যাস সিলিন্ডার বহনকালে কখনোই ফেলে দেওয়া, ঘষা বা টানা উচিত নয়।
- রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হলে সেখানে বাতাস চলাচলের যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখুন। গ্যাস ব্যবহার করার সময় জানালা খুলে রাখুন।
- গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলার পাশে দাহ্য বস্তু একেবারেই রাখা উচিত নয়। প্লাস্টিকের জিনিসপত্রও দূরে রাখুন।
- সিলিন্ডার উচ্চ চাপ ও তাপের এলাকায় রাখবেন না।
- রান্না তুলে দিয়ে অন্য কাজে যাবেন না। এতে খাবারে আগুন ধরে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হতে পারে।
- রান্না করার সময় পোশাকের ব্যাপারে সর্তক থাকুন। কারণ, কাপড়ে আগুন লেগে পুড়ে যেতে পারে।
- সিলিন্ডারের গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার মূল কারণ। তাই সিলিন্ডার লিক হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। পরীক্ষার জন্য পানিতে সাবানের ফেনা তৈরি করে হোস পাইপ, রেগুলেটর, ভাল্ব ইত্যাদিতে লাগান। যদি দেখেন সাবান-পানির ফোঁটা বড় হচ্ছে বা বুদবুদ উঠছে, তাহলে বুঝবেন লিক হচ্ছে গ্যাস। দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
- গ্যাসের পাইপের দৈর্ঘ্য বেশি লম্বা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
- গ্যাসের পাইপ সময় সময় পাল্টানো দরকার। জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার না করাই ভালো। পাইপ ফেটে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে ফেলুন।
- গ্যাস বদলের সময় রেগুলেটরটি সঠিকভাবে লাগানো হয়েছে কি না দেখে নিন।
- অনেকেই বাড়িতে একটি বাড়তি গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার রাখেন। একটি শেষ হলেই যাতে অন্যটি হাতের কাছে পাওয়া যায়। গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার কখনোই ঘরের মধ্যে রাখবেন না। খোলামেলা জায়গায় রাখুন, যেখানে ছায়া আছে। তাপ থেকে গ্যাস সিলিন্ডারকে দূরে রাখাই ভালো।
- অনেকেই বাড়িতে বড় গ্যাস থেকে ছোট গ্যাস ভর্তি করেন। এমনটা বাড়িতে করা একেবারেই অনুচিত। এতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যদিও কেউ কেউ এটা করে থাকেন। সাবধান থাকাটা খুব জরুরি।
- দীর্ঘদিনের পুরোনো সিলিন্ডার ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
- রান্নার পর অবশ্যই গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখতে হবে। একটি ম্যাচের কাঠির জন্য দীর্ঘ সময় চুলা জ্বালিয়ে রাখা মোটেও উচিত নয়। এতে গ্যাসের অপচয় যেমন হয়, তেমনি রান্নাঘরের জানালা বন্ধ থাকলে সারা ঘরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। হতে পারে গ্যাস বিস্ফোরণ।
- রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই চুলা বন্ধ করা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করুন।
- রান্নার আগে ও পরে রান্নাঘরের জানালা বন্ধ রাখবেন না। জানালা বন্ধ রাখলে গ্যাস জমে হতে পারে বিস্ফোরণ। তাই গ্যাসের চুলার বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে রান্নাঘরে জানালা খুলে রাখুন।
সচেতনতা বাড়িয়ে দুর্ঘটনার হার কমানো গেলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্যাস বিতরণ ও সিলিন্ডার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট গ্যাস কর্তৃপক্ষ এ দুর্ঘটনায় দায় এড়াতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব অবৈধ ও অনিরাপদ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা উচিত। এ ছাড়া-
দীর্ঘদিনের ব্যবহার্য মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বাজার থেকে তুলে নিয়ে ধ্বংস অথবা পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা উচিত।
গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনগুলো নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা অপরিহার্য।
গ্যাসের পুরোনো পাইপলাইনে ক্ষয়, পুরোনো কিংবা নতুন পাইপলাইনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
গ্যাস কোম্পানিগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে নজর দিতে হবে।
সিলিন্ডার পরিবহন সঠিকভাবে করতে হবে। অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর মতো খোলা ট্রাকে করে রোদের মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার বহন করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র:
বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ।
বাংলাদেশ বিস্ফোরক পরিদপ্তর।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্য, জানুয়ারী ২০১৯