১৮২৪ সালে সিমেন্ট উদ্ভাবনের পরপরই কংক্রিট জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। দীর্ঘস্থায়িত্বের উপযোগী, মজবুত এবং উচ্চমাত্রার নমনীয়তাসম্পন্ন কংক্রিট তৈরি করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে একটি স্বপ্নের মতো ব্যাপার ছিল। ১৯৮০ সালের পর দীর্ঘদিনের লালিত এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে মিনারেল ও কেমিক্যাল অ্যাডমিক্সচারসমূহের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে। সিমেন্ট, পানি ও অন্যান্য অ্যাগ্রিগেটসের সঙ্গে এগুলো কংক্রিটের বাড়তি উপাদান। এগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে কংক্রিটকে ৩০ হাজার পিএসআইয়েরও বেশি শক্তিশালী করা এবং ১০০ বছরেরও অধিক স্থায়িত্বের স্থাপনা নির্মাণের ডিজাইন করা সম্ভব হয়েছে। যেমন, এই অতিরিক্ত উপাদানগুলো ব্যবহার করে বিশ্বের উচ্চতম কংক্রিট স্থাপনা দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারটিও ডিজাইন করা হয়েছে ১০০ বছর স্থায়িত্বের উপযোগী করে।
কংক্রিটের শক্তিমাত্রার সঙ্গে কংক্রিটের দীর্ঘস্থায়িত্বের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কংক্রিটের শক্তি যত বেশি দীর্ঘস্থায়িত্বও তত বেশি। কংক্রিটের শক্তিমাত্রা বৃদ্ধির জন্য কংক্রিট মিক্স করার সময় কম পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে হয়। অন্যদিকে পানি কম ব্যবহার করলে কংক্রিটের কম্প্যাকশন অ্যাবিলিটি বা নমনীয়তা কমে যায়। তবে ওয়াটার রিডিউসিং অ্যাডমিক্সচার বা পানি কমানোর জন্য বিশেষ উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকট দূর করা যায়। সিমেন্টে যে পানি ব্যবহার করা হয় তার বড় একটা অংশ সিমেন্টের ছোট ছোট কণা দ্বারা সৃষ্ট চেইনের মাঝে আটকা পড়ে। ওয়াটার রিডিউসিং অ্যাডমিক্সচার সেই চেইন ভেঙে আটককৃত পানি মুক্ত করে কংক্রিটের নমনীয়তা বৃদ্ধি করে। এখন আমরা পানি ও সিমেন্টের অনুপাত (০.৩০ বা তার নিচে) অনেক কমিয়েও কংক্রিটকে নমনীয় অবস্থায় ব্যবহার করতে পারি।
কংক্রিটের অধিক শক্তিমাত্রা অর্জনে সিমেন্টের পরিমাণ বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে সিমেন্টের পরিমাণ বেশি হলে অনেক সময় কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে, যেমন- সিমেন্ট ও পানির বিক্রিয়ায় অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়ে কংক্রিট ফেটে যেতে পারে। কিছু পরিমাণ সিমেন্টের পরিবর্তে মিনারেল অ্যাডমিক্সচার, যেমন- আয়রন স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ ইত্যাদি ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। মিনারেল অ্যাডমিক্সচার হিট অব হাইড্রেশন কমায়, কংক্রিটের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফাঁকা জায়গা পূর্ণ করে এবং কংক্রিটের মধ্যে অবস্থিত ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নতুন সিএইচএস জেল (শক্তিমাত্রা বৃদ্ধি করে এমন উপাদান) উৎপন্ন করে। মিনারেল অ্যাডমিক্সচার ব্যবহারের মাধ্যমে সিমেন্টের চাহিদা অনেক কমে যাবে। যার ফলে সিমেন্ট শিল্প থেকে উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণও কমবে। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শিল্প থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বার্ষিক ৪০ ট্রিলিয়ন টন, যার ৪ ট্রিলিয়ন টনই আসে সিমেন্ট শিল্প থেকে। যেহেতু মিনারেল অ্যাডমিক্সচারসমূহ বিভিন্ন শিল্পের বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত দ্রব্য, তাই কংক্রিটে এর ব্যবহার পরিবেশবান্ধব হিসেবে কাজ করে। মিনারেল ও কেমিক্যাল অ্যাডমিক্সচার ব্যবহারের মাধ্যমে আজকের কংক্রিট অনেক স্মার্ট হয়েছে, কংক্রিটকে পানির মতো নমনীয় করে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, অধিক শক্তিমাত্রাসম্পন্ন কংক্রিট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, দীর্ঘস্থায়িত্বের উপযোগী কংক্রিট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। কংক্রিট দীঘস্থায়ী করে তৈরি করা সম্ভব হলে কংক্রিট তৈরির উপাদানগুলোর চাহিদা কমে যাবে, যার ফলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্র্মাণসামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত থাকবে। অন্যথায় পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের চাহিদা অনুযায়ী কংক্রিটের উপাদানগুলোর সরবরাহ পাবে না।
অধ্যাপক
সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)
বোর্ড বাজার, গাজীপুর।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৪তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮