প্রতিনিয়তই এই বিশ্বে ঘটে চলেছে নতুন কিছু। নগরে স্থান পাচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। তবে এ কথা ভাবার বিষয় যে আমরা পিছিয়ে পড়ছি না তো? আমাদের নগরায়ণের ক্ষেত্রে আমরা কি সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছি, যাকে আমরা টেকসই উন্নয়ন বলি? মানুষ বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে আমাদের চাহিদা। এক বিস্তর চাপ পড়ছে শহরের মাটিতে। আমরা যখন গৎবাঁধা কিছু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে শহরকে টেকসই উন্নতির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছি, ঠিক তখনই একটু দেখে আসা যাক বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কীভাবে কাজ করছে?
ঠিক যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যারিসের পরিবেশ চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিল ঠিক তখনই এশিয়ার মহাশক্তি চীন নির্গমন হ্রাসের বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে নতুন একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। বিশ্বের সব থেকে বড় ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ব চীনের হুয়ানান শহরে স্থাপন করা হয়েছে। শহরের নিকটবর্তী জলাশয়ে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এবং এটিকে হুয়ানান এর পাড় থেকে শহরের মূল বৈদ্যুতিক গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে শহরের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে। এখানে সমুদ্রের পানিকে শীতলীকরণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সাধারণত পানির ওপর স্থাপিত হওয়ার কারণে স্থলভাগে কোনো ভূমি দখলেরও প্রয়োজন পড়েনি, যা টেকসই উন্নয়নের সামগ্রিক বিশ্বের অন্যতম মূল লক্ষ্য। সঞ্জো নামের বিশ্বের বড় একটি সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এটি স্থাপনে মূল ভূমিকা পালন করছে এবং এই ধরনের ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র যেকোনো ধরনের গভীর অগভীর গ্রাম শহরের জলাশয়ের ওপর স্থাপন করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
আরেকটি প্রযুক্তিতে চোখ রাখা যাক এবার। বিশ্বের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী বর্তমানে নতুন একটি প্রযুক্তি নিয়ে বেশ অনেক দিন ধরেই কাজ এবং গবেষণা করে আসছিল, যা সত্যি হলে টেকসই উন্নয়নে আমাদের বিশ্ব আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। সম্প্রতি কয়েকটি কোম্পানি প্রজেক্টির বাস্তবায়ন এবং বাজারজাতের কথা ভাবতে শুরু করেছে। সেটি হলো রাস্তার মধ্যবর্তী রোড ডিভাইডারের মাঝখানে ছোট সাইজের টার্বাইন স্থাপন এবং সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন। বিষয়টিকে আরও সহজভাবে বোঝানো যাক। বড় বড় রাস্তায় যেখানে দুই দিক থেকে বাস ট্রাক চলাচল করে স্বভাবতই সেখানে বাতাস তৈরি হয়। আর রোড ডিভাইডারে স্থাপিত টার্বাইনের পাখাগুলো সেই দুই দিক থেকে আসা বাতাসে অনবরত ঘুরতে থাকে। আর তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। তাদের ধারণামতে এমন ৩০০টি টার্বাইন বছরজুড়ে প্রায় কয়েক হাজার ছোট আবাসনের জন্য বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে সক্ষম। আমাদের দেশেও যে এমন পরিকল্পনা হচ্ছে না, সেটা ঠিক না। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হরহামেশাই এমন অনেক সহজ কিন্তু বাস্তবমুখী পরিকল্পনার খবর পাওয়া যায়।
বেশ কিছুদিন আগে এমনটা লিখেছিলাম একটি জাতীয় দৈনিকে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩। সান ফ্রানসিস্কোর একটি রাস্তা, যেখানে সাধারণত দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গাড়ি পার্ক করা হয়ে থাকে। পার্কিং সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সেখানে একদল শিক্ষার্থী বিশেষভাবে তৈরি প্রাকৃতিক সবুজ ঘাসের কার্পেট বিছাতে আরম্ভ করলেন এবং অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই সেই জায়গাটি পরিণত হলো ব্যস্ত রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা ‘সবুজ আরবান পার্ক’ রাস্তায় কাজে ব্যস্ত কোনো নাগরিক একচিলতে শান্তির জন্য একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছে এখানে এসে। পার্কিংয়ের সময় ছাড়া দিনের বাকি সময় জায়গাটিকে এভাবেই অস্থায়ী আরবান পার্ক হিসেবে গড়ে তুলল ল্যান্ডস্কেপ স্থাপত্যের ওপর শিক্ষারত একদল শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ম্যানহাটন হাইলাইন পার্কের কথা আমরা অনেকেই জানি, যেখানে ফুটওভার ব্রিজের ওপর সুপরিসর একটি সবুজ পার্ক একদিকে যেমন শহরের সৌন্দর্য অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে অন্যদিকে শহরে কোলাহল থেকে একটু শান্তি খুঁজে পাওয়ার আশায় সাধারণ নাগরিকের পছন্দের জায়গাতেও পরিণত হয়েছে এই বিশেষ স্থানটি। তা ছাড়া শিকাগোতে ইয়ুথ সেন্টারের ছাদে তৈরি করা বাগান, যেখানে সবজির ক্ষেত তৈরি করা হয়েছে এবং প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম বলয় প্রস্তুত করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
আর এমন সব উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। অথচ একটু বৃষ্টিতেই পানিতে তলিয়ে যায় আমাদের রাস্তাগুলো। ফ্লাইওভারের ওপরে জমে পানির টেউ। ওপর থেকে দেখে বোঝারই উপায় নেই যে এটি একটি ফ্লাইওভার, মনে হয় খরস্রোতা নদী। যানবাহন চলাচলের কোনো সুনির্দিষ্ট লেন নেই শহরজুড়ে, আর না আছে পার্কিংয়ের জায়গা। এখন তো আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাস্তার ওপর পার্কিংয়ের দাগ কাটা আছে। আবাসনসমূহের নেই কোনো সঠিক রূপরেখা। সবুজায়নের নেই কোনো সদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সত্যি কথা এই যে আমরা সব সময় কিছু হলেই দোষ দিয়ে ফেলি সরকারকে। এটিই যেন সব থেকে সহজ পন্থা। আসল সমস্যা তো আমাদের। আমরা কি পারি না আমাদের পাশের পরিবেশটাকে ঠিক করতে? আমাদের বড় বড় প্রতিষ্ঠান কি পারে না নতুন কিছু প্রযুক্তির উদ্ভাবন করে শহরটাকে সাজাতে? অবশ্যই পারি, দরকার শুধু মন-মানসিকতার পরিবর্তন আর দেশকে একেবারে নিজের করে ভাবা। তাহলেই সম্ভব।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৯তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৮।