জাম্বুরি পার্ক
চট্টগ্রাম মহানগরী ক্রমেই রাজধানী ঢাকার মতো জনবহুল হয়ে উঠছে। কল-কারখানা, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনদিন। জীবিকার তাগিদে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভীড় করছে অগনিত মানুষ। ফলে কর্মমূখরতা, ব্যস্ততা, যানজট এখানকার নিত্যদিনের সঙ্গি। এ যান্ত্রিক যুগে কর্মব্যস্ত মানুষ একটু সময় পেলেই বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরীতে নেই পর্যাপ্ত বিনোদনের পার্ক। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কিছু প্রকল্প হাতে নিলেও তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কাজির দেউড়ি, শিশুপার্ক, আগ্রাবাদ শিশুপার্ক, বিপ্লব উদ্যান ছাড়া আর তেমন বিনোদনের পার্ক মহানগরীতে নেই। চকবাজার জাতিসংঘ শিশুপার্কও এখন বন্ধ। সাধারণ মানুষ বন্ধের দিনে বিনোদনের জন্য আগ্রহী হলেও পর্যাপ্ত বিনোদন পরিসর না থাকায় সীমিত বিনোদন স্পটে ছুটির দিনে ব্যাপক ভিড় হয়। পরিস্থিতি যখন এমন, তখন এগিয়ে আসে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। নগরের আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠেই গড়ে তোলে নান্দনিক জাম্বুরি পার্ক। বর্তমানে এই পার্কটিই হয়ে উঠেছে নগরবাসীর কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নগরের সবচেয়ে আধুনিক পার্ক।
রাতে জমকালো মায়াবী রূপ ধারণ করে এই পার্কটি। সাড়ে ৫০০ এলইডি বাতির আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে পুরো পার্ক প্রাঙ্গন। আলো-ঝলমলে মায়াবী পরিবেশটাকে আরও বর্ণিল করে তোলে দু’টি বিশাল ফোয়ারা। সৃষ্টি হয় যেন আলো-আঁধারের কাব্য! ফটক, হাটাপথ, ফোয়ারা কোথায় নেই আলোক বর্তিকা। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনী হরেক রঙের আলোক সজ্জা। হাটাপথের দু’পাশ ধরে কিছু দূর পরপর স্থাপিত আলোক বাতিগুলো পথচারীদেরকে দেয় অন্যরকম অনুভূতি। উঁচু ভবন থেকে দেখলে আলো-আধারী এই পার্কটিকে মনে হয় যেন এক স্বপ্নপুরী।
জাম্বুরি পার্কটি নকশা করে স্থাপত্য অধিদফতর। প্রায় ৮ দশমিক ৫৫ একর জমির জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পার্কটিকে ঘেরা হয়েছে আড়াই হাজার ফুট দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন সীমানাপ্রাচীরে। হাঁটার জন্য রাখা হয়েছে ৮ হাজার ফুট ওয়াকওয়ে। এই ওয়াকওয়ে ধরে ৫ হাজার মানুষ এক একই সময়ে হাঁটতে পারবে। মাঝে সাড়ে ৩ ফুট গভীর ৫০ হাজার বর্গফুট জলাধার ও দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা যে কারো নজর কাড়বেই। কৃত্রিম হ্রদের কিনারে বসার জন্য তিনটি দুই ধাপের গ্যালারি। মাঠজুড়ে ছোট ছোট সবুজের ঝোঁপ। মাঝখানে দুটি ছাউনি। মাঠের প্রান্তে বিশ্রামের জন্য স্থাপন করা হয়েছে স্থায়ী বেঞ্চ।
পার্কে প্রবেশের জন্য রয়েছে ছয়টি ফটক। চার কর্নারে রয়েছে চারটি স্থাপনা। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব কোণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পার্কের অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে আধুনিক শৌচাগার। জলাধারের পাশে রয়েছে দু’টি পাম্প হাউস। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি থেকে সুরক্ষার জন্য পুরো পার্কটি সড়ক থেকে তিন ফুট উঁচু করা হয়েছে। পার্কের ভেতরের ও বাইরের পানি নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাস্টার ড্রেন। নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে ১৪টি ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা।
পার্কটিকে পরিবেশবান্ধব করতে রোপণ করা হয়েছে ৬৫ প্রজাতির ১০ হাজার গাছের চারা। এর মধ্যে রয়েছে সোনালু, নাগেশ্বর, চাঁপা, রাধাচূড়া, বকুল, শিউলি, সাইকাস, টগর, জারুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। আছে পাঁচ শতাধিক দেশি-বিদেশি উদ্ভিদরাজি। খোলা চত্বরে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবুজ ঘাস। এই গাছগুলো ছোট অবস্থায় থাকায় পার্কটির সৌন্দর্য এখনও পায় নি পূর্ণতা। কিন্তু গাছগুলো বড় হলে গড়ে উঠবে সবুজ বলয়। তখন পার্কটি মেলে ধরবে তার নান্দনিকতা।
জাম্বুরি পার্কটি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের প্রশান্তির উন্মুক্ত উদ্যান। সর্বসাধারণের জন্য পার্কে বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকায় ফেলেছে ব্যাপক সাড়া। বিশেষ করে ছুটির দিনে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠছে পার্কটি। জাম্বুরি পার্কটিতে শরীরচর্চার জন্য প্রশস্ত ও দীর্ঘ জগিং ট্র্যাক থাকায় এখানে অনেকেই আসছেন হাটতে; শরীরচর্চা করতে। আশপাশের বহুতলা কলোনি, সিডিএ আবাসিক এলাকা, ব্যাংক কলোনি, টিঅ্যান্ডটি কলোনি, পোস্ট অফিস কলোনিসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় জাম্বুরি পার্কটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এই পার্কটি বাস্তবায়নে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের খরচ হয়েছে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। এর আগে এই স্থানটি ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়, মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডাস্থল। দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত এই জায়গাটি এখন চট্টগ্রামবাসীর মানসিক প্রশান্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। পার্কটির সৌন্দর্য অটুট রাখতে কর্তৃপক্ষ বেধে দিয়েছে কতিপয় নিয়ম-নীতি। পার্কে খাবার নেওয়া যাবে না, জলাধারে গোসল করা যাবে না গাছ ও আলোক বাতির কোন ক্ষতি করা যাবে না। তবে তা স্বত্বেও পার্কের এখানে সেখানে ও জলাধারে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখছে কোন কোন অসচেতন দর্শনার্থী। এভাবে সচেতনতার অভাবে নান্দনিক এই পার্কটি সৌন্দর্য হারিয়ে বখাটেদেও দখলে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০১তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বের ২০১৮