বায়োনিক লিফ যেভাবে জ্বালানির চাহিদা মেটাবে
জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এক নতুন প্রযুক্তি

প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানির চাহিদাও। খনিজ তেলনির্ভর সভ্যতা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও তা পৃথিবীকে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জীবাশ্ম জ্বালানির সবচেয়ে নেতিবাচক দিক কার্বন নিঃসরণ। এই গ্রহ তথা সভ্যতাকে ধ্বংস করার অন্যতম উপাদান কার্বন, যা উৎপন্ন হচ্ছে খনিজ তেল ও কয়লা থেকে। এ বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে হয় কার্বণ নিঃসরণ কমিয়ে সভ্যতার উন্নয়ন শ্লথ করতে হবে নতুবা সভ্যতার চূড়ান্তে পৌঁছে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ধ্বংস করতে হবে। অথচ একটি ক্ষুদ্র প্রাণীও চায় না তার অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করতে। তাই নিজস্ব অস্তিÍত্ব জানান দিতে লড়তে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে। এ পরিস্থিতিতে গবেষকেরা পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির সন্ধানে কাজ করছেন প্রতিনিয়ত। এখন পর্যন্ত বেশ কিছু বিকল্প জ্বালানি আবিষ্কৃতও হয়েছে। কিন্তু কোনোটাই খরচের দিক থেকে খনিজ তেল বা কয়লার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। যেমন- সৌরবিদ্যুৎ বা হাইড্রোজেন থেকে উৎপন্ন শক্তি। যদিও এসব বিকল্প জ্বালানি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে; তারপরও নতুন উৎসের সন্ধান কিন্তু থেমে নেই। যেমন-লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি তৈরি করেছে বিশেষ একধরনের বায়োনিক লিফ (Bionic Leaf) বা কৃত্রিম পাতা। কোনো গাছের পাতা যেভাবে সূর্যের আলো থেকে গাছের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করে, প্রায় একই পদ্ধতিতে এই বায়োনিক পাতা সূর্যের আলো থেকে জ্বালানি তৈরিতে সক্ষম।

আমরা এটাকে বায়োনিক পাতা বা কৃত্রিম পাতা যে নামই দিই না কেন, এর কাজের ধরন অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির চেয়ে তুলনামূলক খুব সাধারণ। এখানে সরাসরি সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কোনো ফটোভোল্টায়িক সেল (Photovoltaic Cell) ব্যবহার না করে ব্যবহার করা হয় বায়োনিক পাতা। এটা সূর্যের আলোকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত না হয়ে সূর্যশক্তিকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পাতার মধ্যে হাইড্রোজেনরূপে সঞ্চিত থাকে। আর সঞ্চয়কৃত এই হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে (Hydrogen Fuel Cell) ব্যবহার করে উৎপাদন করা যায় বিদ্যুৎ। এ রকম সেল যদি ল্যাবের মতো ল্যাবের বাইরেও সূর্য থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করতে পারে, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি এটা একটা বিশাল সমস্যার সমাধান করতে যাচ্ছে। প্রথমত, এই বায়োনিক পাতার কার্যকারিতার জন্য আমাদের সূর্যের আলোর তীব্রতার ওপর নির্ভর করতে হবে না। কারণ, এটি হালকা ও বহনযোগ্য। তাই এটাকে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, এটা অনেকটা ব্যাটারির মতো কাজ করবে। ফলে এর বিদ্যুৎ অর্থাৎ হাইড্রোজেন সঞ্চয় ক্ষমতা হবে তাত্ত্বিকভাবে অসীম। এ ধরনের ফটো-ইলেকট্রোকেমিক্যাল সেল (Photo Electrochemical Cell) এক বালতি পানিতে ফেলে দিলেই শুরু করবে হাইড্রোজেন নিঃসরণ আর জমা হতে থাকবে সেলের মধ্যে।

বর্তমানে যেভাবে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয় তারচেয়ে এই পদ্ধতি অনেক সহজ ও পরিবেশবান্ধব বলে মনে করেন এই বায়োনিক পাতা নিয়ে কাজ করছেন যাঁরা। ‘একটি ফুয়েল বা জ্বালানি সেলের ভেতর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হাইড্রোজেন সরাসরি ব্যবহৃত হতে পারে। এখন অনেক কোম্পানিই ফুয়েল সেলচালিত ইঞ্জিন গাড়ি তৈরি করছে। এমনকি এই হাইড্রোজেনকে বাসগৃহের ছাদে খুব সস্তায় সৌরবিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে সংগ্রহে রাখছে।’ বলে মনে করেন প্রফেসর ডগ ম্যাকফারল্যান্স।

টেক এক্সপ্লোরিস্ট

ইতিমধ্যে টয়োটা, জিএমসহ অনেক বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হাইড্রোজেনচালিত গাড়ি উৎপাদন করে বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সূর্য থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করতে পারে এ রকম সেল নিশ্চিতভাবে নতুন মাত্রা যোগ করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বার্কলে ল্যাবরেটরির বায়োনিক পাতার বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এতে যে ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য যে ধরনের পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে তার খরচ অনেক কম। আর এ কারণেই নির্মাতারা এ নিয়ে অনেক বেশি আশাবাদী। তাঁরা মনে করছেন, খরচ যদি কম না হতো তাহলে একে ল্যাবের বাইরে নিয়ে ব্যবহার করা একটা অসম্ভব ব্যাপার হতো। তাঁরা খরচের বিষয়টিকে এভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন যেন এটা শুধু বড় বড় শিল্প-কারখনায় বা বিত্তবানদের ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানো। তাঁদের এ রকম চিন্তা করার যথেষ্ট যৌক্তিকতাও রয়েছে। কারণ, বায়োনিক পাতার খরচ অবশ্যই এর আকারের ওপর নির্ভর করবে, কিন্তু অতি সম্প্রতি যে ধরনের পাতা তারা তৈরি করেছে, সেটা  সাধারণ পানিতে ডুবিয়ে রাখলেই কাজ শুরু করবে। এই বায়োনিক পাতা মূলত পানির মধ্যে বিদ্যুতের প্রবাহ ঘটিয়ে পানি হতে হাইড্রোজেন কণাকে আলাদা করে ফেলায় এই হাইড্রোজেন কণাই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিষয়টা শুনে মনে হবে এটি ব্যয়বহুল এক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবে এটা অনেক কম খরচেই করা সম্ভব।

অবশ্য বার্কলের গবেষকেরা খরচের হিসাব করতে গিয়ে এর একটি ক্ষুদ্র অংশ ফটোক্যাথোডের খরচটাকেও বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। এই ফটোক্যাথোড মলিকিউলার লেভেলের কার্যকারিতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং একই সঙ্গে হাইড্রোজেন সেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ফটোক্যাথোড তৈরি করার জন্য গ্যালিয়াম ফসফাইড নামক একধরনের অর্ধপরিবাহী ব্যবহার হয়, যেটা দৃশ্যমান আলো শোষণ করার ক্ষমতা রাখে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় কোবালোজিয়াম নামে আরেকটি পদার্থ। এই কোবালোজিয়াম হাইড্রোজেন উৎপাদনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। গ্যালিয়াম ফসফাইড ও কোবালোজিয়াম এ দুটি পদার্থই বর্র্তমানে হাইড্রোজেন উৎপাদনে ব্যবহৃত মূল্যবান ধাতু। যেমন প্লাটিনামের চেয়ে অনেক সহজলভ্য ও দামেও সস্তা। অবশ্য এ পদার্থ দুটির কার্যক্ষমতায় গবেষকেরা খুব বেশি সন্তুষ্ট নন। তাঁরা চাইছেন আরও কার্যক্ষম কিছু।

যখন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য পানি থেকে হাইড্রোজেনকে আলাদা করা হবে তখন যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে তা যদি খুব ধীরগতির অথবা ব্যয়বহুল হয় তাহলে এটাকে বাস্তবসম্মত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বায়োনিক পাতা বা বায়োসিন্থেসাইজিং পদ্ধতি যদি কমপক্ষে শতকরা ১০ ভাগ শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে তাহলে সেটাও গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু এই লক্ষ্যও এর মধ্যে অর্জিত হয়ে গেছে। এখন গবেষকদের লক্ষ্য হচ্ছে এটাকে শতকরা ২২ ভাগে নিয়ে যাওয়া। তাই অন্য একটি দল এই ক্যাথোড তৈরির জন্য বিকল্প ধাতুর খোঁজে নেমেছেন। তাঁরা আয়রন অক্সাইড ব্যবহার করে তুলনামূলক বেশি কার্যকর ক্যাথোড তৈরির চেষ্টা করছেন। যদিও এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক দিক থেকে এ লক্ষ্য অর্জন করা লাভজনক হবে না। তারপরও যদি অনেক বড় আকারে উৎপাদনে যাওয়া যায় আর ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা যায়, তাহলে খরচের বিষয়টা খুব বেশি গুরুত্ব পাবে না।

মেলবোর্নের মনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক মনে করছেন, ‘আমরা অতি সত্বর এমন একটা সময়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছি যেখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হবে এই বায়োনিক বা কৃত্রিম পাতা। যেভাবে গাছ তার খাদ্য সংগ্রহ করে, সেভাবে এসব পাতা সূর্যের আলো ব্যবহার করে পানি থেকে শক্তি উৎপাদন করবে। আর এ শক্তি ব্যবহার হবে গাড়ি চালানোর কাজে, বাসগৃহে এবং হতে পারে পুরো সমাজে। আসলে এই কৃত্রিম পাতাকে আমরা এমন একটা ডিভাইস বলতে পারি, যেটা সৌরশক্তি ব্যবহার করে হাইড্রোজেন তৈরি করতে পারে এবং এর কার্যকারিতা অসাধারণ।’

সবচেয়ে বড় কথা, এ জ্বালানিতে অর্থাৎ হাইড্রোজেনে কোনো কার্বন না থাকায় এটা ব্যবহার করার সময় উপজাত হিসেবে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় না। আর এখন আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করাটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বায়োনিক এই পাতা সভ্যতাকে নতুন এক মাত্রায় এগিয়ে নেবে- এ রকম আশা আমরা করতেই পারি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯১তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭।

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top