নির্মাণকাজে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে চারটি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটে। আর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্র্রেশন (ওএসএইচএ)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, বছরে ৩০ হাজার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়, এর ফলে সাত হাজার মানুষ পুড়ে আহত হয়। পুড়ে যাওয়ার কারণে বা আহত হওয়ার কারণে দুই হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় গুরুতর অবস্থায়। হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়, তাদের অধিকাংশই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণামতে, এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসতর্কতা, বাসগৃহে বা কর্মস্থলে ব্যবহৃত ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্র, দায়িত্বহীনতাসহ আরও অনেক কারণে ঘটে, যার সহজ শিকার শিশুসহ সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষত যেখানে নির্মাণকাজ চলে সেখানে আরও বেশি ঝুঁকির। নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন মানুষের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনা এত পরিমাণে ঘটছে যে তা সত্যিই শঙ্কার কারণ। আমাদের দেশে বলতে গেলে প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পে দু-একটি ছোট হোক বড় হোক বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটেই। আহত, গুরুতর আহত এমনকি মৃত্যুর ঘটনা অহরহ ঘটছে এমন সব দুর্ঘটনায়। অবশ্য এ ধরনের দুর্ঘটনার যৌক্তিক কিছু কারণও রয়েছে। যেমন, এখানে যারা কাজ করে, বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণি, তারা সাধারণত নির্মাণ সাইটের নিয়মকানুনের খুব একটা তোয়াক্কা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্মাণ সাইটের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সংযোগ অস্থায়ী ও খোলা অবস্থায় থাকে আর কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এসব সংযোগ পরিবর্তন বা স্থানান্তরিত হয়। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো যে এখানে উচ্চ ভোল্টেজের (সাধারণত ২২০ বা ৪৪০ ভোল্ট) বিদ্যুতের সংযোগ ব্যবহার করা হয়। এ কারণে প্রতিটি শ্রমিককে নির্মাণ সাইটের নিরাপত্তা, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়ে কাজে যোগ দেওয়ার আগেই সতর্ক করাটা জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে কর্তৃপক্ষ বা নিয়োগকর্তা খুব কম ক্ষেত্রেই তা করে থাকে।

একটু দেখা যাক কেন আমরা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হই বা বিদ্যুৎ কেন আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না আমাদের শরীর বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। অবশ্য সব সময় মানবদেহ ভালো পরিবাহী হিসেবে কাজ নাও করতে পারে। মানবদেহের বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন, একজন মানুষের স্বাস্থ্য, আক্রান্ত ব্যক্তি কতক্ষণ বিদ্যুৎ প্রবাহের সংস্পর্শে থাকছে, শরীরের কতটুকু অংশ বৈদ্যুতিক তার বা যন্ত্রের সংস্পর্শে থাকছে, এমনকি চামড়ার ধরনের ওপরও নির্ভর করে। অর্থাৎ চামড়া ভেজা থাকলে যে রকম আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, শুকনা থাকলে সে রকম আশঙ্কা থাকে না। আবার তৈলাক্ত বা গ্রিজ-জাতীয় কিছু থাকলে আহত হওয়ার পরিমাণ বদলে যায়।

আমরা অনেকেই মনে করি যে লো-ভোল্টেজের বিদ্যুৎ বিপজ্জনক নয়। কিন্তু বৈদ্যুতিক চাপ বা ভোল্টেজ কম হলেই যে ঝুঁকি কম হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃত সত্য হলো, বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার জন্য সব সময় নিরবচ্ছিন্ন  রাস্তা খুঁজে নেয়। যখন মানবদেহ এই রাস্তার একটি অংশ হয়ে যায়, তখনই ঘটে দুর্ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় লো-ভোল্টেজের এমনকি মাত্র ৩০ ভোল্ট চাপের বিদ্যুৎই একজন মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে। একজন মানুষ কতটুকু আহত হবে বা কতটুকু পুড়ে যাবে তা নির্ভর করে তার দেহে কী মাত্রায় বিদ্যুৎ তথা কারেন্ট প্রবাহিত হচ্ছে তার ওপর। যদি মানবদেহ একটা বর্তনী বা সার্কিটের অংশ হয় এবং তা দিয়ে লোহা, তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো পরিবাহীতে যেভাবে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, ঠিক সেভাবেই বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, তবে অবশ্যই তা ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে।

তবে রাবার, সিরামিক বা শুকনো কাঠের মতো যদি কোনো বস্তুর কারণে বর্তনী বা সার্কিট সম্পন্ন না হয়, তাহলে দেহের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে না, এতে ঝুঁকি এড়ানো যায়। এ রকম ক্ষেত্রে যদি ২২০ ভোল্ট লাইনের সংস্পর্শে আসে, তাহলে বড়জোর মৃদু ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। কারণ, এসব উপাদান খুব ভালো ইনস্যুলেটর বা বিদ্যুৎ অপরিবাহী হিসেবে কাজ করে। কিন্তু নির্মাণ সাইটে কাজ চলাকালীন অবস্থায় শ্রমিক, সুপারভাইজার, কেয়ারটেকার বা ইঞ্জিনিয়ারসহ সবাই হয় কাজের চাপে, নাহয় অজ্ঞতাবশত এসব বিষয় মাথায় রেখে কাজ করে না। ফলে উচ্চ চাপের বৈদ্যুতিক তারের বা যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

নির্মাণ সাইটের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, সাধারণত অস্থায়ী সংযোগ দেওয়ার কারণে উপযুক্ত আর্থিং বা গ্রাউন্ডিংকে উপেক্ষা করা হয়। অথচ গ্রাউন্ডিং করা থাকলে ঝুঁকি অনেক কমিয়ে ফেলা যায়। যেমন ধরা যাক, একজন শ্রমিক একটি ড্রিল মেশিন নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু মেশিনটি যে শর্ট হয়ে আছে তা তার জানা নেই, আবার গ্রাউন্ডিংও নেই। এ রকম অবস্থায় যদি সে উপযুক্ত অপরিবাহীর ওপর না থাকে অর্থাৎ পায়ে রাবারের জুতা বা স্যান্ডেল না থাকে অথবা হাতে রাবার গ্লাভস না পরে কিংবা শুকনো কাঠের ওপর দাঁড়ানো অবস্থায় না থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবে সে নিজেই গ্রাউন্ডিংয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে এবং ড্রিলের বডি থেকে বিদ্যুৎ শ্রমিকের দেহ হয়ে মাটিতে প্রবাহিত হবে। ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে সে আহত বা নিহত হবে কি না। কিন্তু যদি গ্রাউন্ডিং করা থাকত তাহলে ড্রিলের বডির বিদ্যুৎ হওয়ায় আগেই সহজ রাস্তা পেয়ে ভূমিতে প্রবাহিত হতে পারত আর শ্রমিক খুব বেশি হলে ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেয়েই পার পেত।

নির্মাণ সাইটের দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রায় সব দুর্ঘটনাই একই ধরনের। যেমন, কোনো পরিবাহী বস্তু বহন করার সময় তা বৈদ্যুতিক তারের বা যন্ত্রের সংস্পর্শে আসা। কিংবা ছাদের রড বহন করার সময় অসতর্কতার কারণে তা বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে যাওয়া হাই-ভোল্টেজ লাইন স্পর্শ করা। এতে রড বহনকারী শ্রমিকেরা গুরুতরভাবে আহত হয়। পরে হাত কেটে ফেলা কিংবা দীর্ঘ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না এসব নির্মাণ শ্রমিক। এ ধরনের ঘটনা আমাদের এখানে অহরহ ঘটছে। যদিও বর্তমানে অনেক ওভারহেড লাইনে ইনস্যুলেটেড কেব্ল ব্যবহার করা হচ্ছে। তারপরও অনেক জায়গায় এখনো প্রচুর খোলা তার রয়েছে। আর এসব খোলা তারে অনেক নির্মাণ শ্রমিক হয় গুরুতর আহত হচ্ছে নতুবা প্রাণ হারাচ্ছে। তা ছাড়া নির্মাণ সাইটের অভ্যন্তরে ধাতব মই, অ্যালুমিনিয়াম চ্যানেল, লোহার রড/বার, জিআইপাইপ ইত্যাদি বিদ্যুৎ পরিবাহী জিনিস আনা-নেওয়া করার সময় খোলা তারে বা বোর্ডে ঠেকে গিয়ে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা ঘটছে।

এসব দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক উভয়েরই সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রথম কর্তব্য হবে এমন কোনো স্থানে খোলা তার, বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা বোর্ড না বসানো, যেখানে সাধারণ শ্রমিকদের ঘন ঘন চলাচল করতে হয় অথবা এসবের খুব কাছাকাছি কাজ করতে হয়। আর শ্রমিকদের প্রথম দায়িত্ব হলো কাজের আগেই দেখে নেওয়া যে তাদের কাজের জায়গার আশপাশে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এ রকম কোনো বৈদ্যুতিক তার বা যন্ত্রপাতি আছে কি না। যদি থাকে তাহলে কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অবহিত করা। তারা যদি সরানোর কোনো ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে সাবধানতার সঙ্গে কাজ করা। এসব ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শ্রমিকদের কাজ শুরু করার আগেই উপযুক্ত নির্দেশনা দিয়ে দেওয়া, যেন তারা সাবধান হতে পারে।

আরেকটি সাধারণ সমস্যা হলো বহনযোগ্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের সময় নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া। এ সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ভূমিকা তো রয়েছেই, তার চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে যিনি যন্ত্রটি ব্যবহার করছেন তিনি নিজেই। সাধারণত এ ধরনের যন্ত্রে থ্রি-পিন প্লাগ ব্যবহার করা হয়। যেমন, হ্যান্ড ড্রিল, গ্রাইন্ডিং মেশিন, ওয়াল কাটিং মেশিন ইত্যাদি। তার মধ্যে একটি থাকে আর্থিং পিন। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় এ পিনটি ভেঙে ফেলা হয়। কারণ, তাতে সহজেই যেকোনো সকেটে ঢুকিয়ে কাজ করা যায়। আবার আর্থিং পিন থাকা সত্ত্বেও সকেট না থাকায় অনেকে খোলা তার পেঁচিয়ে নিয়ে কাজ করেন। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। উপযুক্ত আর্থিং বা গ্রাউন্ডিং কীভাবে দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে তা আমরা আগেই বলেছি। অনেক সময় আমরা দেখি শ্রমিকদের ভেজা জায়গায় অথবা পানিতে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক মেশিন নিয়ে কাজ করতে হয় বা কোনো বৈদ্যুতিক মেশিন এমন জায়গায় স্থাপন করা হয়, যে জায়গাটি সব সময় স্যাঁতসেঁতে বা ভেজা থাকে। আমাদের জেনে রাখা উচিত যে যেখানে কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হবে সে স্থানটিতে কোনোভাবেই পানি জমে থাকা, ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। যদি একান্তই নিরুপায় হয়ে এ রকম জায়গায় কাজ করতেই হয়, তাহলে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া এসব যন্ত্র এমন জায়গায় ব্যবহার করা কোনোভাবেই উচিত নয়।

বহনযোগ্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের সময় প্রায়ই ব্যবহারকারীকে এক্সটেনশন কেব্ল ব্যবহার করতে হয়। এক্সটেনশন কেব্ল ব্যবহার করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে তা হলো এক্সটেনশন কেব্লের বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা। কম বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতাসম্পন্ন এক্সটেনশন কেব্লে অতিরিক্ত লোড দেওয়ার ফলে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে ব্যবহারকারীর ন্যূনতম জ্ঞান থাকা জরুরি। তা না হলে দুর্ঘটনা এড়ানো খুবই কঠিন ব্যপার। এ ছাড়া বহু ব্যবহারের কারণে বৈদুতিক তার প্রায়ই পেঁচিয়ে যায়, ফলে এর ইনস্যুলেশন দুর্বল হয়ে যায়, অনেক সময় ফেটে যায়। এ রকম দুর্বল বা ফেটে যাওয়া ইনস্যুলেশনের কেব্লও অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শুধু এক্সটেনশন কেব্লেই যে ওভার লোডের সমস্যা হয় তা কিন্তু নয়। নির্মাণ সাইটে বিভিন্ন ধরনের যেমন, হালকা, মাঝারি বা ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। আর এসব যন্ত্রের ধরন অনুযায়ী কেব্ল বা তার ব্যবহার করতে হয়। এ ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা হচ্ছে একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি, যিনি ঠিক করে দেবেন কোথায় কোন ধরনের তার ব্যবহার করতে হবে। ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা যায় এ রকম তার বা কেব্লে হালকা বা মাঝারি যন্ত্রের সংযোগ দিলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু এর উল্টোটা হলেই তার পুড়ে গিয়ে প্রথমে শর্টসার্কিট, স্পার্কের পর আশপাশে কোনো দাহ্য বস্তু থাকলে আগুন লেগে দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের দেশের নির্মাণশ্রমিকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত না হওয়ায় এ রকম আগুন অনেক সময় পানি দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। এ রকম অবস্থায় কর্তব্য হলো আগুন নেভানোর জন্য বালু বা মাটি ব্যবহার করা আর বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ বা বিচ্ছিন্ন করে নিকটস্থ দমকল বাহিনীকে খবর দেওয়া।

আমাদের নির্মাণ সাইটের অন্যতম সমস্যা হলো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের অপব্যবহার যা দুর্ঘটনার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দায়ী। প্রতিটি যন্ত্র বা টুলস নির্মাতা কোম্পানি তাদের পণ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কোথায় কোথায় ব্যবহার করা যাবে, কী রকম পরিবেশে ব্যবহার করা যাবে অথবা যাবে না তার একটা নির্দেশনা দিয়ে থাকে। সাধারণভাবে আমরা এটাকে ব্যবহার নির্দেশিকা বা ইউজার ম্যানুয়াল বলে থাকি। কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারী এটি খুলেও দেখে না। যে কারণে একটি যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না এবং একসময় হয় ব্যবহারকারী দুর্ঘটনার শিকার হয় নতুবা যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে পড়ে।

ত্রুটিযুক্ত যন্ত্র ব্যবহার করা আমাদের খুব সাধারণ একটা অভ্যাস। অনেক সময় আমরা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের আগে এটা ঠিকমতো পরীক্ষা করি না। যন্ত্রটি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ব্যবহার শুরু করি। অথচ নিয়ম হচ্ছে যেকোনো যন্ত্র ব্যবহারের আগে তা নির্দেশিত নিয়মমতো পরীক্ষা করা। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের আগে যেসব জিনিস দেখে নেওয়া প্রয়োজন তা হলো, প্লাগটা ঠিক আছে কি না। যদি বডি ভাঙা, পিন বাঁকা বা ভাঙা থাকে তাহলে তা ঠিক করে নিতে হবে। তারের কোনো অংশ ঘষা বা চাপ খেয়ে দুর্বল হয়ে গেছে কি না অথবা ইনস্যুলেশন ক্ষয়ে গিয়ে ভেতরের তার বেরিয়ে গেছে কি না তা দেখে নিতে হবে। যন্ত্র চালু করলে কোনো ধোঁয়া বের হয় কি না বা সুইচ/কন্ট্রোলে স্পার্ক করে কি না খেয়াল করতে হবে। যন্ত্রের ওপর বা ভেতরে কোনো তরল পদার্থ গড়িয়ে পড়েছে কি না তাও দেখে নিতে হবে। যদি ব্যবহারের আগে এ রকম কিছু চোখে পড়ে তাহলে তা ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যথাযথ ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে তা অবহিত করতে হবে। নির্মাণ সাইটের প্রতিটি যন্ত্র নিয়মিত একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান বা ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা পরীক্ষা করানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এতে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমে তেমনি যন্ত্রের কর্মক্ষমতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়।

দুর্ঘটনা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো বর্তনী বা সার্কিটে উপযুক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা। অনেক সময় নির্মাণ সাইটে এটি নিশ্চিত করা কষ্টকর হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক মানের ফিউজ, সার্কিট ব্রেকার, জিএফসিআই (Ground Fault Circuit Interrupters) ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক কমে আসে। অনেক নির্মাণ সাইটে এমনকি বাসাবাড়িতেও যখন বারবার ফিউজ পুড়ে যায় বা সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করে তখন ইলেকট্রিশিয়ানরা এর কারণ অনুসন্ধান না করে বেশি অ্যাম্পিয়ারের ফিউজ অথবা সার্কিট ব্রেকার লাগিয়ে দেয়। এ ধরনের কাজ দুর্ঘটনা না কমিয়ে বরং ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। এ কারণে একজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইলেকট্রিশিয়ান বা ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা লোড হিসাব করে ফিউজ বা সার্কিট ব্রেকার স্থাপন করা এবং কোনো সমস্যা হলে তাদের সাহায্য নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সতর্কতা বা সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই। উপযুক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তি দুর্ঘটনার কবলে পড়তে পারে শুধু অসাবধানতার কারণে। আর যদি কেউ কোনো কারণে দুর্ঘটনায় পড়েই যায়, তাহলে প্রথম কাজ হচ্ছে যেকোনো প্রকারেই হোক না কেন আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ করা। কারণ বেশির ভাগ সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে তার স্থান থেকে সরিয়ে নিতে পারে না। এ জন্য আশপাশের লোকজনকে হয় সুইচ বা অন্য কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে নয়তো কোনো অপরিবাহী বস্তুর মাধ্যমে যেমন, শুকনো কাপড়, দড়ি, কাঠ বা লাঠি দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিদ্যুৎ থেকে বিছিন্ন করতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই তাকে খালি হাতে ধরা যাবে না। খালি হাতে ধরলে উদ্ধারকারীও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হবে। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের দেশে নির্মাণ সাইটে সাধারণত বৈদ্যুতিক কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকÑ এ দুই ধরনের লোক বেশি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। বৈদ্যুতিক কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবহেলা অথবা অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়। অন্য দিকে সাধারণ নির্মাণশ্রমিকেরা দুর্ঘটনার শিকার হয় অজ্ঞতার কারণে। তাই নির্মাণ সাইটে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষ বা নিয়োগকর্তার প্রধান কাজ হবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সে নির্মাণ সাইটে কাজ করার জন্য কতটুকু উপযুক্ত তা যাচাই করে নেওয়া। প্রয়োজনে স্বল্প সময়ের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া। এতে করে যেমন শ্রমিক বা কর্মীদের নিরাপত্তা থাকবে, তেমনি নির্মাণকাজেও কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে না। নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত সবাইকে মনে রাখতে হবে, ‘নিরাপত্তাই প্রথমÑসেফটি ফার্স্ট’।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top