সিন্ধু সভ্যতা (Indus Valley Civilization) ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা। সিন্ধু নদীর তীরে গড়ে ওঠায় এ সভ্যতা ‘সিন্ধু সভ্যতা’ নামে খ্যাত। সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা (৩৩০০-১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; পূর্ণবর্ধিত কাল ২৬০০-১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। পূর্ণবর্ধিত সময়কালে এই সভ্যতা ‘হরপ্পা সভ্যতা’ নামে পরিচিত। ১৯২০ সাল থেকে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে আবিষ্কৃত হয় মাটির নিচের এই শহরটি। সম্প্রতিককালেও এই সভ্যতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী আবিষ্কৃত হয়েছে। বাণিজ্য, বিজ্ঞান, ধাতুবিদ্যা ইত্যাদিতেও এ সভ্যতার মানুষ ছিল সমান দক্ষ।
ভৌগোলিক অবস্থান
সিন্ধু সভ্যতা পাঞ্জাবের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করলেও তা প্রসারিত হয় ঘগ্গর-ভাকরা নদী উপত্যকা ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমান পাকিস্তানের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতের পশ্চিমের রাজ্যগুলো, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তান এবং ইরানের বেলুচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশে বিস্তৃত ছিল এই সভ্যতা। এ সভ্যতার উদ্ভব মিসর ও পেরুর প্রাচীন সভ্যতার মতো উচ্চভূমি, মরুভূমি ও সমুদ্রবেষ্টিত উর্বর কৃষিজমিতে। পশ্চিম বেলুচিস্তানের সুকতাগান ডোর ও গুজরাটের লোথাল ছিল এই সভ্যতার উপকূলীয় বসতি অঞ্চল। উত্তর আফগানিস্তানের শোর্তুঘাইতে অক্সাস নদীর ধারে, উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে গোমাল নদী উপত্যকায়, ভারতের জম্মুর কাছে বিপাশা নদীর তীরে মান্ডাতে এবং দিল্লি থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে হিন্দোন নদীর তীরে আলমগিরপুরেও সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও গুজরাটে এ সভ্যতার কতিপয় নিদর্শন ও উপনিবেশ আবিষ্কৃত হয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলো নদীতীরে আবিষ্কৃত হলেও বালাকোটের মতো প্রাচীন সমুদ্রসৈকতেও কতকগুলো কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আবার কিছু দ্বীপেও এই সভ্যতার প্রাচীন কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যার অন্যতম ধোলাবীরা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের ব্যাপারে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মতামত। সভ্যতাটি আবিষ্কারের পর হুইজেলসহ কিছু পশ্চিমা প্রত্নতাত্ত্বি¡ক দাবি করেন সভ্যতাটি বর্তমান দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিঢ়দের, যাদের বহিরাগত আর্যরা পরাজিত করে সভ্যতাটি ধ্বংস করে দেয়। এই তত্ত্ব দীর্ঘদিন প্রাধান্য পেলেও পরবর্তী গবেষণায় তা ভুল প্রমাণিত হয়। বর্তমান বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই প্রাচীন সভ্যতাটি আর্য, দ্রাবিড় (অস্ট্রালয়েড), মঙ্গোল এমনকি সুমেরীয়দেরও মিলিত সৃষ্টি।
সিন্ধু সভ্যতার প্রধান দুটি কেন্দ্র ছিল-
১. হরপ্পা এবং
২. মহেঞ্জোদারো
হরপ্পা সভ্যতা
হরপ্পা ছিল এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহরগুলোর অন্যতম। ১৮৪২ সালে চার্লস ম্যাসন তাঁর ন্যারেটিভস অব ভেরিয়াস জার্নিস ইন বালোচিস্তান, আফগানিস্তান অ্যান্ড দ্য পাঞ্জাব গ্রন্থের হরপ্পার ধ্বংসাবশেষের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা তাঁকে ১৩ ক্রোশ দূরে একটি প্রাচীন নগরীর উপস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় শতাব্দীকাল এই বিষয়ে কেউ কোনো প্রকার প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহ দেখাননি। হরপ্পা পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সাহিওয়াল থেকে ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। প্রত্নস্থলটি রাবি নদীর পুরোনো খাতের ধারে অবস্থিত। আধুনিক হরপ্পা ব্রিটিশ আমল থেকেই একটি ট্রেন স্টেশন। মনে করা হয়, শহরটিতে ২৩ হাজার ৫০০ মানুষ বাস করত। ব্রিটিশ আমলে প্রাচীন হরপ্পা শহরটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে ইট এনে তা লাহোর-মূলতান রেলপথ নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয়। সরস্বতী নদীর (বর্তমানে নদীটি মজে গেলেও অতীতে খরস্রোতা ছিল) পাড়েই হরপ্পার ৮০ শতাংশ প্রাচীন বসতি গড়ে উঠেছিল; যে কারণে হরপ্পা সংস্কৃতিটি সরস্বতী সভ্যতা নামেও পরিচিত। হরপ্পার নগর ছিল সুপরিকল্পিত। নগরের প্রধান সড়ক ছিল ৩৫ ফুট চওড়া। সাধারণ রাস্তাও চওড়ায় ছিল অন্তত ১০ ফুট। রাস্তার পাশে সমান দূরত্বে ছিল সড়ক বাতি বা ল্যাম্পপোস্ট। ময়লা ফেলার জন্য ছিল ডাস্টবিন। নগরটি ছিল প্রাচীরবেষ্টিত।
মহেঞ্জোদারো সভ্যতা
মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থ ‘মৃতদের স্তূপ’। তবে নানা জাঁকজমকপূর্ণ কর্মকাণ্ড আর সভ্য ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে কিংবদন্তি রয়েছে এ নগরের। মহেঞ্জোদারো ছিল সিন্ধু সভ্যতার বৃহত্তম নগর-বসতিগুলোর অন্যতম। ৫ হাজার বছর আগে, যখন ইউরোপ এবং অন্য জায়গার মানুষ গুহায়-জঙ্গলে বাস করত, তখন মহেঞ্জোদারোর বাসিন্দারা একটি সভ্য ও পরিকল্পিত নগরীতে ইটের তৈরি বাড়িতে বাস করত। ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ নির্মিত এই শহরটি ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর অন্যতম এবং প্রাচীন মিসর, মেসোপটেমিয়া ও ক্রিটের সভ্যতার সমসাময়িক। শহরটি অবস্থান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায়। এই শহরের পুরাতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
ধারণা করা হয় মহেঞ্জোদারো ছিল সিন্ধু সভ্যতার প্রশাসনিক কেন্দ্র। এই শহরের নগর পরিকল্পনা ও উন্নত পুরকৌশল ব্যবস্থাই প্রমাণ করে যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের কাছে এই শহর ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই শহরের গণভবনগুলো উচ্চমানের সামাজিক সংগঠনের পরিচায়ক। মহেঞ্জোদারোয় নগরের বিস্তার এবং বাড়িঘরের সংখ্যা থেকে অনুমান করা যায় সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বাস ছিল।
আবিষ্কার ও খননকার্য
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী জন ও উইলিয়াম ব্রান্টন করাচি ও লাহোরের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি লাইন স্থাপনের দায়িত্ব পায়। তাঁরা জানতে পারে, লাইনের কাছে ব্রাহ্মণাবাদ নামে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সেই শহরে এসে তাঁরা উত্তমভাবে পোড়ানো মজবুদ ইটের সন্ধান পায় এবং নিশ্চিত হন এই ভেবে যে ব্যালাস্টের একটি উপযুক্ত উৎস পাওয়া গেছে। কয়েক মাস পরে আরও উত্তরে জনের ভাই উইলিয়াম ব্রান্টনের কর্মস্থলে লাইনের অংশে অপর একটি শহরের ধ্বংসাবশেষের দেখা মেলে। এই ধ্বংসাবশেষের ইট নিকটবর্তী হরপ্পা গ্রামের অধিবাসীরাও ব্যবহার করত। এই ইটেরই ব্যালাস্টে তৈরি হয় লাহোর থেকে করাচি পর্যন্ত ৯৩ মাইল (১৫০ কিলোমিটার) দীর্ঘ রেলপথ।
১৮৭২-৭৫ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম হরপ্পা সিলমোহর প্রকাশ করেন। তিনি ভুলবশত এটিকে ব্রাহ্মী লিপি মনে করেছিলেন। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ১৯১২ সালে জে ফ্লিট আরও কতকগুলো হরপ্পা সিলমোহর আবিষ্কার করেন। এই সিলমোহর দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২১-২২ সালে স্যার জন মার্শাল এ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলেই স্যার জন মার্শাল, রায়বাহাদুর দয়ারাম সাহানি ও মাধোস্বরূপ ভাট হরপ্পা সভ্যতা এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ই জে এইচ ম্যাককি ও স্যার জন মার্শাল মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন। ১৯৩১ সালের মধ্যেই মহেঞ্জোদারোর অধিকাংশ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও খননকার্য অব্যাহত ছিল। এরপর ১৯৪৪ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক তদনীন্তন ডিরেক্টর স্যার মর্টিমার হুইলারের নেতৃত্বে অপর একটি দল এই অঞ্চলে খননকার্য চালায়। ১৯৪৭ সালের পূর্বে আহমদ হাসান দানি, ব্রিজবাসী লাল, ননীগোপাল মজুমদার, স্যার মার্ক অরেল স্টেইন প্রমুখ এই অঞ্চলে খননকার্যে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তান ভূখণ্ডই ছিল এই প্রাচীন সভ্যতার মূল কেন্দ্র। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকারের পুরাতাত্ত্বিক উপদেষ্টা স্যার মর্টিমার হুইলার এই সব অঞ্চলে খননকার্য চালান।
মহেঞ্জোদারোয় শেষ বড় খননকার্য চলে ১৯৬৪-৬৫ সালে ড. জি এফ ডেলসের অধীনে। এরপর উন্মুক্ত স্থাপনাগুলো আবহাওয়াজনিত ক্ষয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেখে এখানে খননকার্য নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে এখানে কেবল রক্ষণমূলক খননকার্য, উপরিতল সমীক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পেরই অনুমোদন দেওয়া হতো। আশির দশকে ড. মাইকেল জ্যানসেন ও ড. মরিজিও তোসির নেতৃত্বে একট যৌথ জার্মান-ইতালিয়ান সমীক্ষা দল আর্কিটেকচারাল ডকুমেন্টেশন, উপরিতল সমীক্ষা, সারফেস স্ক্র্যাপিং ও প্রোবিংয়ের উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে প্রাচীন সভ্যতার বেশ কিছু সূত্র আবিষ্কার করেন।
নগর পরিকল্পনা
সিন্ধু সভ্যতায় এক অভিজাত ও উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন নগর সংস্কৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। নগর পরিকল্পনার উচ্চমান প্রমাণ করে পুরকৌশলে এই অঞ্চলের মানুষের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল এবং এখানে একটি দক্ষ পৌর সরকারেরও অস্তিত্ব ছিল। সড়কে ছিল ড্রেনেজ ব্যবস্থা যার অবস্থান ছিল শহরের প্রধান প্রধান রাস্তার দুই পাশে। ড্রেনগুলো খোলা নয় বরং স্লাবে ঢাকা। শহরের একটি কেন্দ্রীয় বাজার ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের অস্তিত্ব মেলে। এছাড়াও পোতাঙ্গন, শস্যাগার, গুদাম, ইষ্টকনির্মিত অঙ্গন ও রক্ষা প্রাচীরগুলো (হরপ্পায়) উন্নত স্থাপত্যকলার পরিচায়ক। মনে করা হয়, শহরের অনেক বাসিন্দাই ছিলেন বণিক ও শিল্পী। তারা নির্দিষ্ট পেশার ভিত্তিতে শহরের মধ্যে পল্লি নির্মাণ করে বাস করত। দ্বিতল কিছু ভবন মিললেও মেসোপটেমিয়া বা প্রাচীন মিসরের মতো এই সভ্যতায় কোনো বৃহদাকার ভবন বা স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রাসাদ বা মন্দিরেরও কোনো সন্দেহাতীত প্রমাণ নেই। প্রমাণ নেই রাজা, সেনাবাহিনী বা পুরোহিত শ্রেণির অস্তিত্বেরও। কয়েকটি বড় স্থাপনা রয়েছে যেগুলোকে শস্যাগার হিসেবে অনুমান করা হয়। শস্যাগারে গ্রামাঞ্চল থেকে গরুর গাড়িতে আনীত শস্য জমা রাখা হতো। শস্য শুকিয়ে রাখারও ব্যবস্থা ছিল এখানে।
মহেঞ্জোদারোতে এক সুবিশাল স্নানাগারের (The Grate Bath) সন্ধান পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, এটি ছিল গণস্নানাগার। এর দৈর্ঘ্য ১১.৮৮ মিটার, প্রস্থ ৭.০১ মিটার ও গভীরতা ২.৪৩ মিটার। উত্তরে ও দক্ষিণে দুটি চওড়া সিঁড়ির মাধ্যমে স্নানাগারে প্রবেশ করা যেত। মহাস্নানাগার নির্মিত হয়েছিল উন্নতমানের পোড়া ইট দিয়ে। বিটুমিনের সারি (যা সম্ভবত জল বেরিয়ে যাওয়া রোধ করত) থেকে অনুমিত হয় এটি জল ধরে রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। কোনো কোনো গবেষক এই স্নানাগারকে প্রথাগত স্নান বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানস্থল বলেছেন। তবে এই স্নানাগার নির্মাণের প্রকৃত উদ্দেশ্য আজও অজ্ঞাত।
শহরের প্রতিটি বাড়ির মুখ বা সদর দরজা থাকত অভ্যন্তরীণ অঙ্গন বা ছোট ছোট গলির দিকে। অধিকাংশ বাড়ির ভেতরে ছিল উঠান। বাড়িগুলোতে ছিল স্বতন্ত্র কূপ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক বাড়ি একটি সর্বজনীন কূপ থেকেও পানি সংগ্রহ করত। স্নানের জন্য ছিল আলাদা ঘর। সেখান থেকে পানি নির্গমনব্যবস্থাও ছিল। কিছু বাড়িতে ছিল বিশেষ ধরনের ফ্ল্যাশযুক্ত টয়লেট। হরপ্পা সভ্যতায় কয়েকটি বাড়ি অন্যান্য বাড়ি থেকে বড় আকারের ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সভ্যতার শহরগুলোতে সমতাবাদী বা ইগালেটারিয়ান সমাজব্যবস্থার দেখা পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের কোনো কোনো গ্রামের গৃহনির্মাণ পদ্ধতির মধ্যে আজও হরপ্পার গৃহনির্মাণ পদ্ধতির কিছু রীতি বিদ্যমান।
এখানে প্রাচীন যত বাড়িঘরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় তার প্রায় সবই পোড়ামাটির ইটের তৈরি। কিছু বাড়িতে কাঠের ব্যবহারও ছিল। প্রধান নির্মাণ উপকরণ ছিল রোদে শুকানো ইট যার অনুপাত ১:২:৪। সিমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো মাটি এবং জিপসাম সিমেন্ট। মাটি ও জিপসাম উভয় ধরনের প্লাস্টার দেয়ালের অস্তিত্ব মিলেছে। তবে মাড মর্টার অধিক ব্যবহৃত হতো হরপ্পায়। দরজা এবং জানালায় ব্যবহৃত হতো কাঠের ফ্রেম।
মহেঞ্জোদারোতে কবরস্থানও পাওয়া গেছে। তবে সব কবর এক নয়। একধরনের কবরে মৃত ব্যক্তির আসবাব অলংকার সমাহিত করা হতো। কিছু কবরে মৃত ব্যক্তির কঙ্কাল স্থাপন করা হতো। এ ছাড়া আরও একশ্রেণির কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এতে মৃতদেহ পূর্বে দাহ করে, পরে ভস্ম করে ওই কবরে রাখা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম ও ব্যবহার্য সামগ্রী
সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন প্রত্নস্থল উৎখননে আবিষ্কৃত হয় অসংখ্য পুরাসামগ্রী, শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য ও ব্যবহার্য সামগ্রী। এগুলোর মধ্যে অলংকারসমৃদ্ধ ইট, মূর্তি, তামা ও পাথর সরঞ্জাম, দাঁড়িপাল্লা ও ওজন, স্বর্ণ ও জ্যাসপার গয়না, শিশুদের খেলনা, লিপি খোদিত সিলমোহর, মৃৎ ও মূল্যবান পাথরের পুঁতির হার উল্লেখযোগ্য। এসব স্থানীয়ভাবে তৈরি করা ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমদানি করা উপাদানও রয়েছে। কোনো কোনো সিলমোহর ব্যবহৃত হতো পণ্যদ্রব্যের ওপর মাটির ছাপ দেওয়ার জন্য। এগুলোর অন্যান্য ব্যবহারও ছিল সম্ভবত।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এ বিষয়ে একমত যে সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা প্রচুর অলংকার ব্যবহার করত। পুঁতির মালা, হার, কানের দুল, মাদুলি, শাঁখের চুড়ি, ব্রোচ ইত্যাদি। কারিগরেরা কার্নেলিয়ান পাথর পুড়িয়ে লাল করত। সেগুলো ঠান্ডা হলে পুঁতির আকৃতি ও ছিদ্র করা হতো। অলংকারের বেশির ভাগই লোকজ। তবে ধাতুর তৈরি গয়না বেশি দেখা যায়নি। মধ্য এশিয়ায় পাওয়া খোদাই করা কার্নেলিয়ান পুঁতি, হাতির দাঁতের দণ্ড, একটি রুপার কবচ ও দুটি সিলমোহরকে ঐতিহাসিকেরা হরপ্পার জিনিস মনে করতো। মানুষ ও পশুর পোড়ামাটির মূর্তি ও খেলনা দেখে অনুমান করা হয় হরপ্পাবাসীরা শিল্পরসিক ছিল। ব্রোঞ্জ, পাথর ও বেলেপাথরের মূর্তি তাদের শিল্পবোধের পরিচায়ক। তবে চিত্রকর্মে তাদের বিশেষ দক্ষতা না থাকলেও মৃৎশিল্পে বেশ দক্ষতা ছিল।
সিন্ধু উপত্যকায় মানুষেরা অস্ত্রের চেয়ে যন্ত্রপাতি বেশি ব্যবহার করত। ঢাল, তলোয়ার, বর্ম ইত্যাদি সামরিক অস্ত্রের নিদর্শন নেই। নেই কোনো অস্ত্রাগারের চিহ্নও। ছুরি, কুঠার, তির-ধনুক, বর্শা, গুলতি ছাড়া তেমন কোনো অস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আর পাওয়া গেছে কাস্তে, বাটালি, করাত, জুতা সেলাই করার সুই ইত্যাদি। কারণ, তারা ছিল শান্তিপ্রিয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়। এখানে প্রাপ্ত অনেক প্রত্নতত্ত্ব ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
পরিবহনব্যবস্থা
সিন্ধুবাসীর যোগাযোগব্যবস্থাও যথেষ্ট ভালো ছিল। সিলমোহর ও মৃৎপাত্রের গায়ের ছবিতে জাহাজ ও নৌকার ছবি থেকে বোঝা যায় তারা আরব সাগরে সমুদ্রবাণিজ্যে লিপ্ত ছিল। স্থলপথে বাণিজ্য চলত মূলত বলদের গাড়িতে। ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার ছিল খুবই কম। সমসাময়িক বিশ্বের মেসোপটেমিয়া, মিসর, তুর্কমেনিয়া, ওমান ও বাহরাইন সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পাবাসীর যোগাযোগ ছিল। হরপ্পার শামুকের খোলা ও কার্নেলিয়ান পুঁতি মেসোপটেমিয়ার রাজকীয় সমাধি থেকে পাওয়া গেছে। হরপ্পার সঙ্গে মিসরের যোগাযোগের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা যায় না। তবে মিসর ও মহেঞ্জোদারোর মৃৎপাত্রগুলোর কিছু মিল এবং দুই অঞ্চলের হরফের মধ্যে মিলও লক্ষণীয়। হরপ্পার মতো শস্যাগার দক্ষিণ আফগানিস্তানেও পাওয়া গেছে। হরপ্পায় পাওয়া একটা সিলে ঈগল পাখির ছবি দেখে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে হরপ্পাবাসীর যোগাযোগের কথা অনুমিত হয়।
কৃষি ও জীবিকা
কৃষিক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায় বিশেষ করে কৃষি হাতিয়ারে। এ সময়ে শুরু হয় লাঙলের ব্যবহার। তবে ফসল কাটার জন্য তেমন কোনো যন্ত্রপাতির অস্তিস্ত পাওয়া যায়নি। কৃষিকাজে পানির চাহিদা মেটাতে বড় কূপ খনন করা হতো। প্রাচীন এবং পরিণত সিন্ধু এলাকায় খেজুর, তুলা, বদরী, আঙুর এবং আনারস চাষের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সিন্ধু এলাকার জনগণের অন্যতম পেশা ছিল শিকার। প্রাপ্ত সিলমোহর থেকে শিকারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য
উন্নত কৃষি-অর্থনীতি সিন্ধুবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও উদ্বুদ্ধ করেছিল। বাণিজ্য শুধু অভ্যন্তরীণ স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল পারস্য উপসাগর ও মেসোপটেমিয়ায়। হরপ্পাবাসীর সিলমোহর ও হরপ্পাবাসী বণিক ও ব্যবসায়ীদের পণ্য সিল করার ছোট ছোট বস্তু মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া গেছে। সিন্ধুবাসীর সিলমোহর ও পণ্য পাওয়া গেছে সুমেরিওতেও। এর অর্থ মেসোপটেমিয়াতেও সিন্ধু বণিকেরা বাস করত। সম্ভবত সিন্ধুবাসীর প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিল তুলা, যা রপ্তানি করা হতো লোথাল বন্দরের মাধ্যমে। সিন্ধুবাসীর সমুদ্রবাণিজ্যে দক্ষতার প্রমাণও পাওয়া যায়। গুজরাটে অনেক ছোট ছোট খেলনা পোড়ামাটির নৌকা পাওয়া গেছে। লোথালে ইটের তৈরি একটি পোতাশ্রয়েরও সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে কোনো মুদ্রা পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়, পণ্যবিনিময়ের মাধ্যমেই ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। যদিও পরিমাপের এককগুলো ছিল ভারি চমৎকার। বস্তুর ওজন মাপার জন্য নানা মাপের সুষম বাটখারা ব্যবহৃত হতো।
মহেঞ্জোদারো ছিল সিন্ধু সভ্যতার একটি প্রধান শিল্পকেন্দ্র। মনে করা হয়, বয়নশিল্পই ছিল এখানকার প্রধান শিল্প। হরপ্পাবাসী ডায়িং বা রঞ্জনকার্য সম্পর্কে অবহিত ছিল। মৃৎশিল্পও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ছিল। হরপ্পাবাসীর চিত্রলিখনগুলো পাওয়া গেছে মাটির পাত্রের গায়েই। এসব মাটির পাত্র তৈরি হতো কুমোরের চাকায়। তারপর নিকটবর্তী এমনকি দূরবর্তী চুল্লিগুলোতে পোড়ানো হতো। এসব মৃৎপাত্র রপ্তানিও করা হতো। হরপ্পাবাসী ধাতু গলানোর শিল্পও জানত। সিসা, ব্রোঞ্জ ও টিনের ব্যবহার ছিল খুব বেশি। বড় বড় ইটের স্থাপনা থেকে ধারণা করা হয় ইটশিল্পও এখানকার খুব বড় শিল্প ছিল। প্রস্তরশিল্পের উদাহরণ অল্প হলেও কিছু কিছু পাওয়া গেছে। হরপ্পাবাসী নৌকা নির্মাণ, সিলমোহর-প্রস্তুতি ও পোড়ামাটির শিল্পে যুক্ত ছিল। লোথাল ও চানহুদাড়োতে পুঁতিশিল্পীরাও বাস করত।
ধর্ম
হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সিলমোহরগুলোতে উৎকীর্ণ লিপি পাঠোদ্ধার না হওয়ায় এই বিশাল সভ্যতাটির অনেক কিছুর মতোই ধর্মের বিষয়টিও অনেকটা স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া মাতৃমূর্তি এবং লিঙ্গ-জাতীয় প্রতীকই তাদের ধর্ম পোড়ামাটির প্রধান ইঙ্গিত বাহক। হরপ্পা মহেঞ্জোদারোতে পোড়ামাটির অনেক মাতৃত্ব সূচক অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। এসব হতে মনে করা হয় ভারতের প্রাচীনতম ধর্মব্যবস্থায় মাতৃকা পূজার প্রাধান্য ছিল। সৃষ্টির মূলে পুরুষ ও নারীর সহবদ্ধতার প্রতীক হিসেবে এসব আচরণকে চিহ্নিত করা যায়। হরপ্পাবাসীর ধর্মজীবন সম্পর্কে অল্প কয়েকটি কথাই জানা যায়। প্রধান পুরুষদেবতা ছিলেন সম্ভবত ‘পশুপতি মহাদেব’, যাকে ‘প্রোটো-শিব’ বা শিবের আদিরূপ বলে মনে করা হয়। একটি সিলমোহরে তার যোগীমূর্তি খোদিত আছে। তার তিনটি মুখ ও দুটি সিং; তাকে ঘিরে আছে চারটি পশু-হাতি, বাঘ, গন্ডার ও মোষ; পায়ের কাছে দুটি হরিণ। একটি মাতৃদেবতার মূর্তি পাওয়া গেছে। কালিবঙ্গান, লোথাল ও হরপ্পার অগ্নিবেদী দেখে মনে হয়, অগ্নিপূজা প্রচলিত ছিল। পিপুল গাছ ও ইউনিকর্ন প্রভৃতিতে জন্তু পূজা করা হতো। তারা ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করত বলে ব্যবহার করত মন্ত্রপূত কবচ।
বর্ণমালা
সিন্ধু সভ্যতায় হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোবাসীর ব্যবহৃত বর্ণমালায় ৪০০ থেকে ৫০০টি চিহ্নের সন্ধান পাওয়া যায়। একেকটি চিহ্ন দিয়ে একেকটি জিনিসকে বোঝানো হতো। হরপ্পার লিপির পাঠোদ্ধার করা না গেলেও, কালিবঙ্গান থেকে প্রাপ্ত ভাঙা মৃৎপাত্রের টুকরোয় পাওয়া লেখা থেকে প্রমাণিত হয়েছে ডান থেকে বামে এবং বাম থেকে ডানে উভয় দিকেই লেখা চলত।
শাসনব্যবস্থা
সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কেও বেশি কিছু জানা যায় না। সম্ভবত শাসকেরা রাজ্যজয়ের থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যেই বেশি মনোনিবেশ করতেন। হয়তো, একশ্রেণির বণিকেরাই দেশ শাসন করতেন। অ্যামারি ডে রেইনকোর্টের মতে, ‘প্রাপ্ত প্রমাণাদি থেকে মনে হয়, শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের এবং সুসংহত কেন্দ্রমুখী; উৎপাদনের উপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং খুব সম্ভবত একটা অত্যন্ত কার্যকর করব্যবস্থারও অস্তিত্ব ছিল।’ নিকাশি, নগর পরিকল্পনা ও পণ্যবস্তু থেকে প্রমাণিত হয় নাগরিক পরিষেবার জন্য পুরসভা-জাতীয় কোনো সংগঠনও ছিল।
সিন্ধু সভ্যতার পতন
পৃথিবীর সব প্রাচীন সভ্যতার মতো সিন্ধু সভ্যতাও উন্নয়নের সোনালি লগ্নে কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। লিখিত উপাদান ও ঐতিহাসিক দলিলের অভাবে এ সভ্যতার পতনের কারণ সম্পর্কে এখনো সঠিক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি গবেষকরা। কতিপয় বিশেষজ্ঞের ধারণা ছিল উত্তর-পশ্চিম থেকে আসা আর্য আক্রমণের ফলেই ওই সভ্যতা নির্মূল হয়। সাম্প্রতিক গবেষণার ফলে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করছেন প্রায় ৪১০০ বছর আগে আনুমানিক ২০০ বছরব্যাপী চলা অনাবৃষ্টির ফলেই ওই সমৃদ্ধ সভ্যতার পতন হয়। গবেষণাটি চালিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। হরিয়ানা রাজ্যেও কোটলা দহর নামক এক অতি প্রাচীন হ্রদের তলার মাটি থেকে পাওয়া একধরনের শামুকের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করেন তাঁরা। ওই শামুকের খোলসে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম কার্বনেট যৌগে অক্সিজেন-১৬ ও অক্সিজেন-১৮-এর মাত্রার অনুপাত বিশ্লেষণ করে তাঁরা জানতে পারেন যে হাজার হাজার বছর আগে, যখন ওই শামুকগুলো জীবিত ছিল, সেসময় ওই এলাকায় কতটা বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
ভূবিজ্ঞানীদের মতে, কোটলা দহর হ্রদের একমাত্র জলের উৎস বৃষ্টিপাত এবং এর থেকে জল বাইরে বেরোনোর কোনো পথ নেই। সুতরাং হ্রদে মজুদ জলের পরিমাণ নির্ভর করে একমাত্র বৃষ্টিপাতের ও বাষ্পীভবনের ওপর। অনাবৃষ্টির সময় যখন বাষ্পীভবন হয় সে সময় হালকা হওয়ার দরুন অক্সিজেন-১৬ যুক্ত জল অক্সিজেন-১৮ যুক্ত জলের তুলনায় দ্রুততর বাষ্পীভূত হয়, যার ফলে জলে এবং ওই শামুকের খোলসে অক্সিজেন-১৮-র মাত্রা বৃদ্ধি পায়। শামুকের জীবাশ্মের অধ্যয়ন করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে ৪২০০ থেকে ৪০০০ বছর আগে ওই এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হঠাৎ নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং অন্তত ২০০ বছর ধরে বর্ষা প্রায় সম্পূর্ণভাবে লোপ পায়। যে কারণে মরুভূমির মতো পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং তার ফলেই ওই প্রাচীন সভ্যতার দ্রুত অবনতি ঘটে। এ পরিস্থিতিতে উপত্যকার বাসিন্দারা প্রাণে বাঁচতে অন্যত্র গমন করেন। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শহরগুলোর অবকাঠামো জঞ্জালে ভর্তি হয়। ভূমিকম্প বা বালুঝড়ের কারণেও শহরগুলো চাপা পড়তে পারে। তা ছাড়া বাইরের কোনো আক্রমণের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
সংরক্ষণ এবং বর্তমান অবস্থা
ভারত ভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার অধিকাংশ প্রত্নস্থল হয় পাকিস্তানের অন্তর্গত। দুই দেশ কড়ায়-গন্ডায় ভাগ করে নেয় উদ্ধারকৃত সব প্রত্নবস্তু। ১৯৯৬ সালে যখন পাকিস্তান সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা সাহায্য বন্ধ করে দেয়, তখন মহেঞ্জোদারোর সংরক্ষণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তহবিলের ব্যবস্থা করে ইউনেসকো ১৯৯৭ সালে এপ্রিলে পুনরায় সংরক্ষণের কাজ শুরু করে। বন্যা তহবিল থেকে অর্থের সংস্থান করে ২০ বছর মেয়াদি ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয় অঞ্চল এবং স্থায়ী কাঠামো রক্ষার জন্য। ২০১১ সালে সাইটের সংরক্ষণের দায়িত্ব সিন্ধু সরকারকে দেওয়া হয়। বর্তমানে, ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততা এবং ভ্রান্ত পুনর্নির্মাণ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেয়াল ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে এবং অন্যান্য দেয়াল ক্ষয়ে গেছে। ২০১২ সালে পাকিস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই বলে সতর্ক করেন যে উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা ছাড়া এলাকাটি ২০৩০ সাল নাগাদ হারিয়ে যেতে পারে। জার্মান গবেষক মিশায়েল ইয়ানসেন সম্প্রতি একদল বিশেষজ্ঞের সঙ্গে মিলে ‘ফ্রেন্ডস অব মহেঞ্জোদারো’ গড়ে তুলেছেন। মহেঞ্জোদারোকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলা ও সিন্ধু সভ্যতার হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার কারণ খোঁজায় এর মূল লক্ষ্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।